বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : নববর্ষ

↬ বাংলা নববর্ষ

↬ পহেলা বৈশাখ

↬ নববর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

↬ সর্বজনীন উৎসব : পহেলা বৈশাখ


ভূমিকা :
‘হে নূতন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি 
পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে’ -রবীন্দ্রনাথ

দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস গড়িয়ে আসে পহেলা বৈশাখ। চৈত্র অবসানে বর্ষ হল শেষ। এল নতুন বছর। নববর্ষ। পৃথিবীর সর্বত্রই নববর্ষ একটি ‘ট্র্যাডিশন’ বা প্রচলিত সংস্কৃতিধারা। আদিকাল থেকেই যে কোনো বছরের প্রথম দিনই ‘নববর্ষ’ নামে পরিচিত হয়ে আসছে। ‘পুরাতন বছরের জীর্ণ ক্লান্ত রাত্রি’-র অন্তিম প্রহর হল ঘোষিত। তিমির রাত্রি ভেদ করে পূর্বদিগন্তে উদিত হল নতুন দিনের জ্যোতির্ময় সূর্য। প্রকৃতির নিসর্গ মঞ্চে ধ্বনিত হল নব-জীবনের সঙ্গীত। আকাশ সাজল অপরূপ সাজে। পত্রে পত্রে তার পুলক-শিহরণ। গাছে গাছে তার আনন্দ-উচ্ছ্বাস। পাখির কণ্ঠে কণ্ঠে নব প্রভাতের বন্দনা-গীতি। দিকে দিকে মানুষের বর্ষ-বরণের উৎসব-আয়োজন। অভিনন্দন-শঙ্খধ্বনিতে হয় নতুনের অভিষেক। রাত্রির তপস্যা শেষে এই শুভদিনের উদার অভ্যুদয়ে মানুষের হৃদয়ে-উৎসারিত কলোচ্ছ্বাসে ভরে গেল পৃথিবী। নতুন দিনের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা, প্রার্থনা দুঃখ জয়ের।

পহেলা বৈশাখ : পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হল নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্‌যাপিত হয় নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। তারপর থেকে মোগলরা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ পালন করতেন।

নববর্ষের আশ্বাস : নববর্ষের দিনটি প্রতিদিনের মতোই একটি সাধারণ দিন মাত্র। প্রতিদিনের মতো এ দিনটিও যথানিয়মেই উদয়-দিগন্তে ভেসে ওঠে। আলোক-প্লাবনে পৃথিবী উদ্ভাসিত হয়। পাখি গান গায়। গাছে গাছে শিহরণ জাগে। কিন্তু তবু ও দিনটি অন্য দিনগুলোর চেয়ে স্বতন্ত্র, বিশিষ্ট। প্রাত্যহিক তুচ্ছতার ঊর্ধ্বচারী। বর্ষ-প্রদক্ষিণের পথে এ দিনটি বিশেষ তাৎপর্যে মহিমা-ভাস্বর। এ দিনটি আমাদের কাছে মুক্তির বার্তা বয়ে আনে। মুক্তি প্রাত্যহিকতার জীর্ণ জীবন থেকে, মুক্তি প্রতিদিনের ক্ষুদ্র, আত্মসর্বস্ব জীবনের গণ্ডি থেকে। মুক্তি চিত্তের দীনতা ও হতাশা থেকে। প্রতিদিনের জীবনে আমরা লাভ করি এক মহাজীবনের উদার সান্নিধ্য। বর্ষারম্ভের পুণ্য-প্রভাতে আমরা মহৎ। এ দিন আমাদের কাছে পরম আশ্বাসের, পরম প্রার্থনার। এই পুণ্য দিনে আমরা লাভ করি এক মহাজীবনের উদার সান্নিধ্য। বর্ষারম্ভের পুণ্য-মুহূর্তে নবোদিত সূর্যের আলোকের ঝরণা ধারায় আমরা শুচিস্নাত হয়ে অনুভব করি পরম প্রেমময়ের আনন্দ-স্পর্শ। আমাদের স্বার্থপরতা, ক্ষুদ্রতার নির্মোক ভেঙে আমরা সেদিন মিলনের উদার উৎসব-প্রাঙ্গণে এসে সম্মিলিত হই। আমাদের হৃদয় আজ কোন্ অসীমের রাজ্যে, কোন্ অনির্বচনীয় আনন্দের অভিমুখে ধেয়ে চলেছে। নববর্ষের পুণ্য-প্রভাতে আমাদের নিজেদের মধ্যে সর্বজয়ী মানবশক্তি উপলব্ধি করার দিন। মানুষের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল সুখ-দুঃখে গড়া একটি বছর। কিন্তু তার জন্য শোক নয়- যা এলো, যা অনাগত সম্ভাবনায় সমুজ্জ্বল, তাকে আবাহন করার দিন আজ।

বাংলাদেশে নববর্ষ উদ্‌যাপনের বৈশিষ্ট্য : পয়লা বৈশাখ বাংলার জনসমষ্টি অতীতের সুখ-দুঃখ ভুলে গিয়ে নতুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওঠে। জানে এ নতুন অনিশ্চিতের সুনিশ্চিত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। তাই মন সাড়া দেয়, চঞ্চল হয়। নতুনকে গ্রহণ করার প্রস্তুতি নেয়। আর সে দিন প্রাত্যহিক কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে। আটপৌরে জামা কাপড় ছেড়ে ধোপদুরস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ পরে, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করে পানাহারে মেতে ওঠে। রমনার বটের তলায় জড়ো হয়ে গান গাই, হাততালি দিই। সবকিছু মিলে দেশটা যেন হয়ে ওঠে উৎসবে আনন্দে পরিপূর্ণ। এছাড়াও এদেশের স্থানীয় কতগুলো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষের বৈশিষ্ট্যসমূহ ফুটে ওঠে। যেমন : ‘মেঘের কাছে জল ভিক্ষা করা’, ‘বার্ষিক মেলা’, ‘পুণ্যাহ’, ‘হালখাতা’ ইত্যাদি।

নববর্ষ উদ্‌যাপনে গ্রামীণজীবন ও নগরজীবন : নববর্ষের উৎসব গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নববর্ষে পল্লী অঞ্চলের কোথাও কোথাও বেশ বর্ণাঢ্য মেলা বসে। মেলার বিচিত্র আনন্দ-অনুষ্ঠানে, কেনা-বেচার বাণিজ্যিক লেনদেনে, মিলনের অমলিন খুশিতে, অবারিত আন্তর প্রীতির স্পর্শে নববর্ষের বিশেষ দিনটি মুখর হয়ে ওঠে। এই পুণ্য দিনেই শুরু হয় ব্যবসায়ীদের হালখাতার শুভ মহরৎ। প্রায় প্রতি বিক্রয়- প্রতিষ্ঠানেই ক্রেতাদের মিষ্টান্ন সহযোগে আপ্যায়ন করা হয়। সর্বত্রই এক মধুর প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ। এ ছাড়া দরিদ্র ভোজনে, নৃত্য-গীতে, সভা-সমিতিতে, আনন্দে-উৎসবে বছরের প্রথম দিনটি মহিমোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গৃহস্থরাও নানাবিধ অনুষ্ঠান-ব্রতে পুণ্য দিনটিকে স্মরণীয় করায় মেতে ওঠে। পল্লীর কোথাও কোথাও রচিত হয় নববর্ষ উদ্‌যাপনের উৎসব-মঞ্চ। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বৈশাখী মেলা : নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সকলপ্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তাঁরা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসঙ্গীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি বিভিন্ন আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজে এখনও বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক আনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।

নগরজীবনে নববর্ষ উদ্‌যাপন : বর্তমানে নগরজীবনে নগর-সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উদ্‌যাপিত হয়। পয়লা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোনো বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যুষে নগরবাসীরা সমবেত হয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সকল শ্রেণীর এবং সকল বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে। নববর্ষকে স্বাগত জানাতে তরুণীরা লালপেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে; আর ছেলেরা পরে পাজামা ও পাঞ্জাবি। কেউ কেউ ধুতি-পাঞ্জাবিও পরে। এদিন সকালবেলা পানতা ভাত খাওয়া একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সঙ্গে থাকে ইলিশ মাছ ভাজা। এভাবে লোকজ বর্ষবরণ প্রথাগুলোর কোনো কোনোটির অনুসরণের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য অনেকটা সংরক্ষিত হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকার বর্ষবরণ আয়োজন : বর্ষবরণের চমকপ্রদ ও জমজমাট আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এখানে বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও এর চারপাশের এলাকায় উচ্ছ্বল জনস্রোতে সৃষ্টি হয় জাতীয় বন্ধন। ছায়ানটের উদ্যোগে জনকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান
‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’
-এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলার প্রভাতী অনুষ্ঠানেও নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। এখানকার চারুশিল্পীদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নববর্ষের আহ্বানকে করে তোলে নয়ন-মনোহর। এ শোভাযাত্রা উপভোগ করে সকল শ্রেণীর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। এদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গন, টি.এস.সি. এবং চারুকলাসহ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।

জাতীয় কর্মসূচি ও নববর্ষ পালন : বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমী, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, ছায়ানট, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, নজরুল একাডেমী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।

বাংলা নববর্ষ ও উপজাতি সম্প্রদায় : বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এটি পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা ‘বিজু’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’ এবং ত্রিপুরারা ‘বৈসুক’ বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত।

নববর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : আমাদের জীবনেতিহাসের সার্বিক পটভূমিতে এ দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আমাদের জাতীয় চেতনা অর্থাৎ বাঙালি সত্তার সঙ্গে পহেলা বৈশাখের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতির অস্থিমজ্জার সঙ্গে একাকার হয়ে আছে বাংলা নববর্ষের মাহাত্ম্য। রূপকথার জিয়ন কাঠির মতো এ দিনটির মর্মস্পর্শে দূরীভূত হয় পুরোনো দিনের সকল জরাজীর্ণতা। নতুনের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে উঠে বাঙালির ক্লান্ত-শ্রান্ত জীবন। প্রতিবছর এ দিনটি হয়ে উঠে উৎসবমুখর। বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুজাতি-গোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি শান্তির দেশ। এখানে প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব। এগুলোর অধিকাংশই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আনন্দ অনুষঙ্গ বলে স্বীকৃত, কিন্তু পহেলা বৈশাখই একমাত্র উৎসব যা কোনো ধর্মের বা গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি গোটা জাতির তথা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অখণ্ড বাঙালি জাতির উৎসব। পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গে দেশের সকল মানুষ একই সময় অভিন্ন আনন্দ-অনুভূতিতে উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের মনে করে এক অখণ্ড সত্তা রূপে। ফলে জাতিগত সংহতি ও ঐক্য সুদৃঢ় হয়ে মানুষে মানুষে, ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে দূরত্ব কমে আসে। নববর্ষ পরিণত হয় একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠানে।

দিন বদলের পালায় নববর্ষ : আজ উৎসবের অঙ্গে যুগ-পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। উৎসবে যেখানে একদা হৃদয়-আবেগের প্রাধান্য ছিল, ছিল প্রীতিময় আন্তরিকতা, আজ কৃত্রিমতা তাকে গ্রাস করেছে। সেখানে হৃদয়হীন আচার-অনুষ্ঠানের মাতামাতি। চোখ-ঝলসানো চাকচিক্য আজ উৎসবের বৈশিষ্ট্য। নাগরিক সভ্যতার যান্ত্রিকতা আজ আমাদের হৃদয়-ঐশ্বর্য লুণ্ঠন করেছে। নির্বাসিত করেছে শুষ্ক, নিষ্প্রাণ জড়জগতে। উৎসবে তাই আজ আমাদের হৃদয়-দৈন্যের নগ্নতা। উৎসবের মহতী কল্যাণী রূপটি তাই আজ আমাদের কাছে অনুদ্ভাসিত। নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠানেও আজ আন্তরিক প্রীতির অনেক অভাব। মাইকে চটুল গানের বাড়াবাড়ি। সেখানেও উল্লাস মত্ততার চিত্র। সেখানে আমাদের হৃদয়-সংকুচিত, আমাদের দ্বার রুদ্ধ। বর্ষবরণ উৎসবেও ‘দীপালোকের উজ্জ্বলতা, খাদ্য-প্রাচুর্য, আয়োজন-বৈচিত্র্য।’ সেখানে আমাদের শুষ্কতা, আমাদের দীনতা, আমাদের নির্লজ্জ কৃপণতারই প্রকাশ। তাই আজ এই সর্ব-বন্দনার পূর্ণ্য-মুহূর্তে আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘সমারোহ সহকারে আমোদ প্রমোদ করায় আমাদের উৎসব কলা কিছুমাত্র চরিতার্থ হয় না। তাহার মধ্যে সর্বদলের আন্তরিক প্রসন্নতা ও ইচ্ছাটুকু না থাকিলেই নয়।’ নববর্ষে যেন ফিরে পাই আমাদের সেই হৃত-গৌরব। আবার যেন আমাদের হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে আন্তরিক প্রসন্নতা ও কল্যাণী ইচ্ছার ভাবরসে। আবার যেন আমরা বর্ষারম্ভের উৎসবে খুঁজে পাই ‘মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব’ করার মহত্ত্ব। আজ নববর্ষ উৎসব ‘সত্যের গৌরবে, প্রেমের গৌরবে, মঙ্গলের গৌরবের, কঠিন বীর্য, নির্ভীক মহত্বের গৌরবে’ উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক।

উপসংহার : নববর্ষ সমগ্র মানুষের কাছে নবজীবনের দ্বার উন্মোচিত করে দিক। নতুন বছর যেন মুষ্টিমেয় ধনীর ভোগবিলাসের সঙ্কীর্ণ উল্লাসে পরিণত না হয়’ দারিদ্র্য লাঞ্ছিত পীড়িত মানুষের নিষ্ফল বিলাপে যেন পৃথিবী বিষণ্ণ না হয়ে ওঠে; যুদ্ধদীর্ণ বিশ্বের পাশবশক্তির তাণ্ডব যেন শান্তির শুভশক্তির কাছে পরাভূত হয়। আসুন পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে আমরা আমাদের মধ্যকার সকল বিভেদ ও দ্বিধা দূর করতে সচেষ্ট হই। আমরা জাগ্রত হই অখণ্ড জাতীয় চেতনায়। আমরা ঋদ্ধ হই আগামীর গর্বিত প্রেরণায়। নতুন বছর আমাদের সবাই জীবনে সুখ-সম্ভার বয়ে আনুক এটাই হউক আমাদের প্রত্যাশা। আজ নববর্ষের এই শুভক্ষণে, আসুন, কবিকণ্ঠে মিলিয়ে আমরা বলি,
‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।


একই রচনা অন্য বই থেকে সংগ্রহ করে আবার দেয়া হলো


ভূমিকা : ঋতু পরিক্রমায় পুরোনো বছর শেষ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে শেষ হয় বিগত দিনের জীর্ণতা ও ক্লান্তি। চৈত্রের শেষে বকুল ঝরানো পথে বিদায় নেয় বসন্ত। আসে পহেলা বৈশাখ। আসে নববর্ষের শুভক্ষণ। আমাদের জাতীয় জীবনে আসে উৎসবের আমেজ। এ উৎসবের মর্মবাণী হলো : নতুন বছরে আমার আনন্দটুকু হোক সবার আনন্দ। আমার শুভটুকু হয়ে উঠুক সকলের শুভ। সবার সঙ্গে আমার যোগ হোক পৃীতিময়, হোক গভীরতর।

দেশে দেশে নববর্ষ : বিশ্বের দেশে নানা জাতি নানা ভাবে নববর্ষ উদযাপন করে। বাঙালি, ইরানি, চিনা, জাপানি, ইংরেজ, ফরাসি। সবাই পালন করে নিজ নিজ নববর্ষ উৎসব। খ্রিস্টান জগতে পয়লা জানুয়ারি পালিত হয় নববর্ষ। তার প্রভাব আমাদের দেশের অভিজাত সম্প্রদায়ের উপরও পড়েছে। ধর্মীয় দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দুনিয়ায় নববর্ষ আসে মুহররমের আশুরা থেকে । ইরানিদের নববর্ষ হচ্ছে ‘নওরোজ’, ইহুদিদের নববর্ষ হচ্ছে ‘রাশ হাসানা’ আর ভিয়েতনামিদের নববর্ষ হচ্ছে ‘তেত’। যেভাবে যে নামে উদযাপন করা হোক নববর্ষের মূল বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে স্বতস্ফূর্ত আনন্দ-উৎসব ও শুভবোধ। নববর্ষের উজ্জ্বল প্রত্যুষ বাঙালির জীবনেও আনে আনন্দবোধ, আনে সম্মিলন চেতন। নানা সমারোহে আমরা উদযাপন করি নববর্ষ উৎসব। কামনা করি : পুরোনো দিনের জীর্ণ ক্লান্ত দিনগুলোর অবসান হোক; আসুক নানা জীবন, নতুন স্বপ্ন নিয়ে, নতুন প্রত্যাশা নিয়ে। প্রত্যাশা করি : হতাশা ও নৈরাজ্যের হাত থেকে মুক্তির, মনের কালিমা ও চিত্তের দৈন্য থেকে মুক্তির। কবিগুরুর কণ্ঠে উচ্চারিত বাণী যেন মুখর হয়ে ওঠে প্রতিটি বাঙালির সত্ত্বায়।
নিশি অবসান, ওই পুরাতন
বর্ষ হল গত!
আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন
করিলাম নত।
বন্ধু হও, শত্রু হও,         যেখানে যে কেহ রও,
ক্ষমা করো আজিকার মতো
পুরাতন বরষের সাথে
পুরাতন অপরাধ যত।

নববর্ষে বাঙালির উৎসব অনুষ্ঠান : নববর্ষ বাঙালির জীবনে আসে নানা অনুষ্ঠানের মালা সাজিয়ে। পহেলা বৈশাখের শুভ দিনটিতে বাঙালির ঘরে ঘরে আসে নতুন আনন্দ, নতুন উদ্দীপনা। ঘরদোর সাজানো হয় নতুন করে। উপহার-পাওয়া নতুন পোশাকে সাজে অনেকেই। একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানানো, পরস্পরের মঙ্গল কামনা এ দিনের সামাজিকতার প্রধান অঙ্গ।

নববর্ষ দোকানি ও ব্যবসায়ীদের জন্যে নিয়ে আসে শুভ হালখাতা অনুষ্ঠান। তাঁরা তাঁদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আলোকমালা দিয়ে সাজান, সুগন্ধী দিয়ে সুবাসিত করে রাখেন। হালখাতা অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের জানানো হয় প্রীতিময় শুভেচ্ছা। পারস্পরিক শুভকামনার বিনিময় হয় আলিঙ্গনে। অতিথির হাতে তুলে দেওয়া হয় মিষ্টি-মেঠাই। সেদিন বেচাকেনা তেমন হয় না। দোকানের মালিক নতুন খাতা খুলে বসেন। পাশে থাকে বড় একটা সাজানো থালা। আগত ব্যবসায়ী, মহাজন, ক্রেতারা সে থালায় সামান্য কিছু টাকা রেখে হালখাতার সম্মান রক্ষা করেন। বছরের শেষে বকেয়া পরিশোধের তাগাদা দিলেও এদিন আর সে প্রসঙ্গ ওঠে না। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্কের শুভ নবায়ন ঘটে হালখাতা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। তাই এখানে প্রাধান্য পায় হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা।

নববর্ষের আর একটি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান বৈশাখী মেলা। নাগরদোলার ঘূর্ণিপাক, তালপাতার ভেঁপুর আওয়াজ, খেলনা, মেঠাই, হাড়িকুড়ির বেসাতি, লোকশিল্পসামগ্রীর বেচাকেনা, বাউল গান ও লোকগীতির অনুষ্ঠান। এ সবই মেলার ঐতিহ্য। সেকালের বৈশাখী মেলায় ছিল মন আকুল করা আনন্দ, ছিল তুচ্ছ প্রাত্যহিকতার উর্ধ্বে উঠে সবার সঙ্গে মিলিত হবার উদ্ভুত আকর্ষণ। একালে তার প্রকৃতি গেছে বদলে। ভোগবাদী পণ্য বিলাসিতা ও ক্ষয়িষ্ণু অপসংস্কৃতির দাপটে বাঙালির বৈশাখী মেলা তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

আমাদের নাগরিক জীবনে নববর্ষের নানা অনুষ্ঠান ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন লক্ষ করা যায়। বড় বড় শহরে নানা ভাবে নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় নববর্ষ। কোথাও বসে কবিদের আসর, কোথাও হয় আলোচনা সভা। কোথাও নাচগানের অনুষ্ঠানে লোকের ভিড় জমে। কোথাও আবৃত্তির অনুষ্ঠান শ্রোতাদের ধরে রাখে। কোথাও হয় চিত্রপ্রদর্শনী কিংবা বইমেলা; কোথাও আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নানা রকম খেলাধুলার আয়োজনও হয়ে থাকে জায়গায় জায়গায়। ঢাকার বাংলা একাডেমীতে বৈশাখী মেলা এবং রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বেজে উঠে রবি ঠাকুরের সুর...
এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...

রমনার ঐ গান এখন ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য শহরেও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নববর্ষ উপলক্ষে রেডিও-টেলিভিশন জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা পরিবেশন করে। পত্র-পত্রিকাগুলো বের করে বিশেষ নববর্ষ সংখ্যা। ছুটির এই দিনে যাঁরা বাইরের অনুষ্ঠানে যোগ দেন না তারা ঘরে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন, পত্র-পত্রিকা পড়ে আনন্দ পান।

নববর্ষ উপলক্ষে অন্যের মঙ্গল ও শুভ কামনা করে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শুভেচ্ছা। কার্ড পাঠানো আধুনিক রীতি হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো সংগঠন নিজেরাই সুদৃশ্য শুভেচ্ছা কার্ড প্রকাশ করে। কারোটা ছাপানো, কারোটা হাতে করা। ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠানো এখন ক্রমেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নকশা-আঁকা সুদৃশ্য শুভেচ্ছা কার্ডে অল্প কথায় প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় মনের মাধুরি মেশানো প্রীতি, ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। এ উপলক্ষে বহু দোকানে ঘটা করে শুভেচ্ছা কার্ড বিক্রিও হয়ে থাকে। অনেকের পছন্দ হাতে আঁকা কার্ড। তাই অনেক তরুণ শিল্পী হাতে আঁকা মনলোভা কার্ড তৈরি করে দোকানে দেন বিক্রি করতে। কোনো কোনো শিল্পী সুবিধামতো কোনো জায়গায় নিজেই বসে যান কার্ড বিক্রিতে। কখনো কখনো তাঁর সঙ্গে থাকেন তরুণ কোন স্বভাব কবি। তিনি কার্ড ক্রেতার শুভেচ্ছার ভাষাকে ফুটিয়ে তোলেন কবিতার বাণীতে।

নববর্ষের তাৎপর্য : নববর্ষের নানা উৎসব-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবনে আনন্দময় সামাজিক যোগাযোগ ঘটে থাকে। ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠি আমরা। উদ্বুদ্ধ হই বৃহত্তর জীবনবোধ ও সমষ্টিচেতনায়। একই সঙ্গে জাতি হিসেবে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে চেতনা বাড়ে। তা সাংস্কৃতিক জাতি কিংবা রাষ্ট্রজাতি হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে শক্তি জোগায়। যারা ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি চেতনা কিংবা আঞ্চলিকতার সংকীর্ণতায় আমাদের আচ্ছন্ন করতে চায় তাদের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে নববর্ষ হয় আমাদের চেতনায় অগ্নিমশাল। এই অনবদ্য মিলনোৎসবের ভেতর দিয়ে আমাদের জীবনে বিস্তার ঘটে প্রীতিময়তার। শুভ ইচ্ছা, শুভ সংকল্প এবং সকল আবিলতা কাটিয়ে এগিয়ে চলার প্রেরণা নতুনভাবে আমাদের উজ্জীবিত করে। দুঃখের মধ্যেও বাঙালি কবির সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় :
‘হে চির নতুন আজি এ দিনের প্রথম গানে
জীবন আমার উঠুক বিকশি তোমার গানে।’

উপসংহার : নববর্ষের চেতনা হচ্ছে আনন্দলোকে সমবেত হয়ে সকলের আনন্দ যুক্ত হওয়া। নববর্ষ তাই আমাদের জাতীয় জীবনে ও সংস্কৃতিতে এক আনন্দঘন শুভদিন। এ দিন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে নতুন দিনের সূর্যকে, চারপাশের প্রকৃতিকে, চেনা-অচেনা সব মানুষকে মনে হয় একান্ত আপনার। নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা, নতুন প্রেরণার পাশাপাশি নববর্ষ আনে নতুন সাধনার প্রতিশ্রুতি। সকল মানুষের শুভ কামনার মধ্য দিয়ে মানব স্বীকৃতিই তার মূল কথা।


একই রচনা অন্য বই থেকে সংগ্রহ করে আবার দেয়া হলো


ভূমিকা : পহেলা বৈশাখ বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন। দিনটি আমাদের কাছে নববর্ষ নামে চিহ্নিত। কারণ নববর্ষ আমাদের কাছে ব্যষ্টি ও সমষ্টিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সর্বত্র নববর্ষ একটা ঐতিহ্য। নববর্ষে আমরা অতীত বছরের তিরোধান এবং সমাগত বছরের আবির্ভাবের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে যাই। যে বছর প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিল একদিকে তার সুখ-দুঃকের বহু স্মৃতিমাখা চিত্র বিলীয়মান এবং অন্যদিকে যে বছর প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হলো তার ভাবী, অথচ অনিশ্চিত সম্ভাবনা সুনিশ্চিত রূপে বিদ্যমান। বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় গণমুখী, সর্বজনীন উৎসব। এ দিনে বাংলাদেশের জনসমষ্টি অতীতের সুখ-দুঃখ ভুলে গিয়ে নতুনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওঠে। তারা জানে, এ নতুন অনিশ্চিত-সুনিশ্চিত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। তাই মন সাড়া দেয়, চঞ্চল হয়, নতুনকে গ্রহণ করার প্রস্তুতি নেয়। চির চেনা অতি আপন ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় বাংলার হাটে-মাঠে, ঘাটে, শহরে-বন্দরে মহা আনন্দে মেতে উঠে সকল মানুষ। সাফল্য ও সমৃদ্ধির আলোক ধারায় বিভিন্ন আনন্দ উৎসবে, বৈশাখী মেলায় সমবেত হয় দেশের সর্বস্তরের মানুষ।

বাংলা নববর্ষের উদ্ভব : এ উপমহাদেশে মুসলিম শাসকগণ সর্বপ্রথম হিজরি সন প্রবর্তন করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী বঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন ৬০০ হিজরি মোতাবিক ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে। তখন থেকে শুরু করে উপমহাদেশে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালেও চন্দ্র বর্ষভিত্তিক হিজরি সন প্রচলিত ছিল। সরকারি কাজেও হিজরি সন ব্যবহার করা হতো। হিজরি সন চন্দ্র সন বলে এ সনের বছর ছিল কিছু কম অর্থাৎ ৩৫৪ দিন। অন্যদিকে সৌরসনের বছর ৩৬৫ দিনে হওয়ায় প্রতি বছর চন্দ্র সনের সাথে ১০/১১ দিনের পার্থক্য হয়ে যেত। এর ফলে প্রতি বছরে দিনক্ষণ ও তিথি নক্ষত্র, লগ্নভিত্তিক উৎসব, আচার-আচরণ, উৎসব অনুষ্ঠানে দারুণ অসুবিধা দেখা দেয়। এ ছাড়াও চন্দ্র বর্ষের হিসেবে একই মৌসুমে একই মাস বিদ্যমান থাকে না বিধায় উপমহাদেশে রাজকোষের খেরাজ বা খাজনা আদায়ের ব্যাপারে অসুবিধায় পড়তে হয়। সাধারণত কৃষকেরা প্রধান ফসল যখন তোলেন তখন খাজনা আদায় সুবিধাজনক। কেননা ফসল মওসুম ঋতুভিত্তিক আর হিজরি সন চান্দ্রভিত্তিক। কিন্তু চান্দ্র বর্ষে মাস এগিয়ে যায় বলে তহসীলদাররা এবং প্রজারা উভয়ই অসুবিধায় সম্মুখীন হন। এ সকল অসুবিধার কথা সম্রাট আকবরের দরবারে নবরত্ন ও অন্যান্য সভাসদদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।

সভাসদদের আলোচনার ভিত্তিতে মুঘল সম্রাট আকবর সৌর মাসভিত্তিক বর্ষ গণনার কথা চিন্তা করেন। তার রাজত্বের ২৯ বছরের সময় তিনি তার দরবারের অন্যতম পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে হিজরি সনের সাথে সমন্বয় করে সৌরবর্ষভিত্তিক ‘ফসলি সন’ প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। তিনি সম্রাটের নির্দেশ মোতাবিক সৌর মাসভিত্তিক একটি নতুন সনের উদ্ভাবন করেন। এটি মৌসুম ভিত্তিক সৌরসন। এর নাম দেয়া হয় ‘ফসলি সন’। সম্রাট আকবর ৯৯৩ হিজরি সন মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ মতান্তরে ১১ মার্চ ‘ফসলি সন’-এর ফরমান জারি করেন। পরবর্তীকালে এ ফসলি সনই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দে নামান্তরিত হয়।

পহেলা বৈশাখ : বাংলার সর্বজনীন উৎসব : যদিও বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত ইংরেজি বর্ষের দিনক্ষণ মেনে চলতে হয় তবুও বাঙালির ঐতিহ্যের শেকড়ে প্রথিত বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা নববর্ষই আমাদের একমাত্র সাংস্কৃতিক সর্বজনীন উৎসব। জাতিগত দিক থেকে এ দেশের মুসলমানরা ঈদ, হিন্দুরা দুর্গোৎসব, বৌদ্ধরা বৌদ্ধ পূর্ণিমা এবং খ্রিস্টানরা বড় দিনের উৎসব পালন করে থাকেন। এগুলো ধর্মীয় চেতনায় উদ্ভূত উৎসব। কিন্তু বাঙালি জাতির সম্মিলিত উৎসব একটিই। তাহলো নববর্ষের এ বৈশাখী উৎসব।

বাংলা নববর্ষ বহুমাত্রিকতায় পরিপূর্ণ। আমাদের প্রকৃতি ও সমাজ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, আমাদের জীবনাচার সবকিছুর সঙ্গেই নববর্ষের যোগ। আগে নববর্ষের উৎসব অনুষ্ঠান পল্লীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু এখন তা শহরে ব্যাপ্ত হয়ে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখ নতুনতর চেতনা ও উপলব্ধি নিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক চৈতন্যে পল্লব বিস্তার করছে। ব্যক্তির কাছে ব্যক্তিকে, ব্যষ্টির কাছে সমষ্টিকে এনে মেলবন্ধন রচনা করছে। আর তাই কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইলের আধুনিক যুগেও আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় পহেলা বৈশাখে সাড়ম্বরে শুভ হালখাতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দোকানপাঠ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে আনন্দের ঢল। মিষ্টি মুখের মাধ্যমে খোলা হয় নতুন বছরের হালখাতা। হাটে-বাজারে, খোলামাঠে, দর্শনীয় এলাকায় বসে বৈশাখী মেলা। মৌসুমী ফলমূল, নানারকম কুটির শিল্পজাতদ্রব্য, মাটি, কাঠ, বাঁশ, বেতের তৈরি প্রয়োজনীয় জিনিস ও খেলনা যেমন হাতি, ঘোড়া, গাড়ি, ঢাক-ঢোল, ভেঁপু, মুখোশ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা কেনার ধুম পড়ে যায়। নাগরদোলা, পুতুল নাচের আসরে আনন্দ উপভোগ করে কেউ কেউ। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নামে জনতার ঢাল। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাঙালির আপন ঐতিহ্য আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। আর এভাবেই পহেলা বৈশাখ পরিণত হয় বাংলার সর্বজনীন লোক উৎসবে।

নববর্ষের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য : বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়কে বহন করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নববর্ষ আজ আমাদের জাতীয় উৎসব। আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে আমরা প্রত্যক্ষ করি নববর্ষের অনুষ্ঠানে, আবিষ্কারও করি এ উৎসবে। নববর্ষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা আমাদের জীবনবাদী ও কল্যাণধর্মী রূপটিকেই খুঁজে পাই। নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো মানে আমাদের জীবনকেই নতুনভাবে গ্রহণের, সাজানোর প্রস্তুতি। আমাদের নববর্ষের উৎসব নির্মল আনন্দের উৎসধারা। এখানে আনন্দের বিস্তার আছে, তা কখনো পরিমিতিবোধকে ছাড়িয়ে যায় না। বিদেশে নিউ ইয়ার্স ডে-তে যে উদ্দামতা প্রত্যক্ষ করা যায় তাতে প্রতি বছর বহু প্রাণের অকাল মৃত্যু ঘটে। আনন্দের আয়োজন বিষাদের ক্রন্দনে বিধুর হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা বাংলা নববর্ষকে বরণ করি প্রভাতী অরুণালোকে-প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে নির্মল আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে।

নববর্ষ ও বৈশাখী মেলা : বৈশাখী মেলা সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সর্বজনীন মিলনোৎসব। নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের এক মহামিলন ক্ষেত্র এই মেলা। ‘মেলা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রাচুর্য, আমাদের কুটির শিল্পজাত এমন কোনো পণ্য নেই যা বৈশাখী মেলায় দৃষ্টিগোচর হয় না। প্রচুর সামগ্রীর এমন বিপুল সমাবেশ হয় বলেই এর নাম ‘মেলা’। বৈশাখী মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী ও সকল প্রকার হস্তশিল্পজাত এবং মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এ মেলায় পাওয়া যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন : চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির বৈচিত্রময় সমারোহ থাকে বৈশাখী মেলায়।

বাংলা নববর্ষে উপজাতীয় উৎসব : বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এ নামগুলোর আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বৈসাবি’ পালিত হয়।

পাহাড়িরা তিন দিনব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়। নববর্ষের দিন মারমা উপজাতীরা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টিবল বা পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়িদের মধ্যে পানি উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা বৈসাবি উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে। প্রথম দিনটির নাম ফুল বিজু। এ দিন শিশু-কিশোররা ফুল তুলে ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিনটি হচ্ছে মুরুবিজু। এ দিনে হয় মূল অনুষ্ঠান। এ দিন নানারকম সব্জির সমন্বয়ে এক ধরনের নিরামিষ রান্না করা হয়, যার নাম পাজন। এটি বৈসাবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। অতিথিদের জন্য এদিন সবার ঘরের দরজা খোলা থাকে। বলা যায়, এ পালা পার্বণকে কেন্দ্র করেই বাঙালি সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মনের উদারতা প্রশস্ত হয়, অটুট বন্ধনে আবদ্ধ হয় বাঙ্গালিত্বের বন্ধন।

উপসংহার : বাংলা নববর্ষ শুধু আমাদের বর্ষসূচনার দিন নয়। নববর্ষ আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে জাগ্রত করে, বর্তমানের মূল্যায়ন ঘটায়, জাতির আগামী দিনের রূপরেখাটির দিক নির্দেশনা দেয়। তাই বাংলা নববর্ষ আমাদের গৌরব, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। নববর্ষ উপলক্ষে সর্বজনীন উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা দেশের এক অবিভাজ্য সাংস্কৃতিকরূপ ফুটে ওঠে। বিভিন্ন আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোটা দেশটা যেন ওঠে উৎসবমুখর। এ দিনে আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়ে গোটা দেশটা যেন হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এ দিনে মানুষ অতীতের সমস্ত দুঃখ-বেদনা ভুলে নতুন আহ্বানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বাঙালি এ দিনে নিজেকে আবিষ্কার করে নতুন আঙ্গিকে। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে সে জীবনের নতুন হালখাতার প্রবর্তন করে, আনাগত দিনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। তাই পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন।


আরো দেখুন :

19 comments:


Show Comments