বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : শরতে-হেমন্তে বাংলাদেশ

ভূমিকা : ঋতু-রঙ্গমঞ্চে যখন অগ্নিক্ষরা গ্রীষ্মের আতঙ্ক-পাণ্ডুর বিবর্ণতা মুছে গেছে, যখন বর্ষার বিষণ্ণ-বিধুর নিঃসঙ্গতা আর নেই, তখনই নিঃশব্দ চরণ ফেলে শরতের আবির্ভাব। মুখে তার প্রসন্ন হাসি। অঙ্গে তার স্বর্ণবরণ মোহন কান্তি। তার স্নিগ্ধ রূপ-মাধুর্য সহজেই আমাদের মনকে নাড়া দেয়। শরৎ যে পূর্ণতার ঋতু! শরৎ আসে হালকা চপলা চপলা ছন্দে। এসেই মেঘ আর রৌদ্রের লুকোচুরি খেলায় মাতে। শরৎ শুভ্রতার প্রতীক। গাছের পাতায় ঝকঝকে রোদের ঝিলিক, ভরা নদীর পূর্ণতা, নদীতীরে ফুটে থাকা অজস্র কাশফুল, শিউলি আর সারা আকাশ জুড়ে তুলোর মতো শুভ্র মেঘ- এসবই জানিয়ে দেয় শরৎ এসে গেছে। 

শরতের অনুপম রূপরাশি : হালকা কুয়াশা আর বিন্দু বিন্দু জমে ওঠা শিশির, শারদ প্রভাতের প্রথম সলজ্জ উপহার। এর ওপর যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন মনে হয় চারদিকে ছড়িয়ে আছে অজস্র মুক্তোদানা। যথার্থই শরতের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের তুলনা নেই। আকাশে এখন গাঢ় নীলিমার অবারিত বিস্তার। ক্ষান্ত-বর্ষণ সুনীল আকাশের পটভূমিকায় জলহারা লঘুভার মেঘপুঞ্জ। ধীর মন্থর ছন্দে তার কেবলই সৌন্দর্যের নিরুদ্দেশ যাত্রা। দিকে দিকে তার প্রসন্ন হাসির নম্র আভা। নদী-সরসীর বুকে কুমুদ-কলমের নয়ন-মুদ্ধকর সমারোহ-শোভা। দিগন্ত-বিস্তার সবুজ ধানের ক্ষেত। আর শ্যামশস্য হিল্লোলে আনন্দ-গুঞ্জরণ। গাছে গাছে পত্রপল্লবে সবুজের ছড়াছড়ি। প্রাঙ্গণে প্রাঙ্গণে শেফালী-সৌরভ। আঙিনায় আঙিনায় গুচ্ছগুচ্ছ দোপাটির বর্ণসজ্জা। নদীকূলে কাছের বনে শুভ্র তরঙ্গ-কম্পন। প্রভাতে তৃণপল্লবে নবশিশিরের ভীরু স্পর্শ। তাতে অরুণ-আলোর রক্ত-আভার লজ্জানম্র ভুবন-ভোলানো রূপ-কান্তি। গাছে গাছে, ডালে ডালে, দোয়েল পাপিয়ার প্রাণমাতানো সুরমূর্ছনা। নৈশ নীলাকাশে রজতশুভ্র জোছনার উদাস-করা হাতছানি। শারদ-লক্ষ্মীর এই অপরূপ রূপলাবণ্য মর্ত্যভূমিকে করেছে এক সৌন্দর্যের অমরাবতী। 

শরতের রাত : স্নিগ্ধতা আর কোমলতার এক অপূর্ব রূপ নিয়ে আসে শরতের রাত। শরৎ-রাত্রির চাঁদ সারা রাত ধরে মাটির শ্যামলিমায় ঢেলে দেয় জোছনাধারা। মাঝে মাঝে বয়ে যায় স্নিগ্ধ বাতাস। দূর থেকে ভেসে আসে শিউলির সুবাস। মন কিছুতেই ঘর আটকে থাকতে চায় না। কেবলই ছুটে যেতে চায় বাইরে। ঝক ঝকে জোছনায় পাখিদের ভ্রম হয়। ভোর হয়ে গেছে ভেবে ডেকে ওঠে কাক। ভোর হতে না হতেই শিশিরসিক্ত শিউলি ঝরে পড়ে সবুজ ঘাসে। কমলা বোঁটায় তখনও টলমল করে জলের কণা। কবি-হৃদৎ চঞ্চল হয়। লেখে কবিতা কিংবা গান : 
‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা 
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজায়ে এনেছি বরণডালা।’ 
শরতে নীল সরোবরে পদ্মের সাথে হৃদয় মেলে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের প্রাণ। শরতে কেবলি বর্ণের স্নিগ্ধতা আর উদারতা। সবুজ, নীল আর সাদার এমন অপূর্ব সমন্বয় আর কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। জননী বাংলাদেশ আপনার হৃদয় উজাড় করে মেলে ধরে এই শরতে। 

শরতের উৎসব : এমনি করেই ধীরে ধীরে উৎসবের সাজে সেজে ওঠে শস্যবিচিত্রা ধরিত্রী। আকাশে-বাতাসে বাজে মধুর আগমনী গান। মানুষের মনে লাগে উৎসবের রঙ। শরতের ভুবনবিজয়ী রূপের প্রেক্ষাপটেই রচিত হয় উৎসব-বেদী। বাঙালির হৃদয়মন আসন্ন উৎসবের আনন্দ-জোয়ারে প্লাবিত হয়। বাঙালির মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ শারদ-উৎসব দুর্গাপুজোর আয়োজনে মুখরিত হয় বাংলার গ্রাম-নগর। দিকে দিকে তারই আনন্দ-স্রোত, কলোচ্ছ্বাস। 

ছুটির ঋতু শরৎ : শরতের অনুপম রূপ-বৈভবের মাঝখানেও বাঙালির মনে বেজে ওঠে ছুটির বাঁশি। আকাশে-বাতাসে তার উদার মুক্তির আহ্বান। জোছনা পুলকিত রাত্রির মোহিনী রূপ বাঙালিকে উতলা করে। ঘরের বন্ধন ছিন্ন করে সে ওই অফুরান সৌন্দর্যের জোয়ারে ভেসে যেতে চায়। তার শিউলি-বিতানে, শিশির-সিক্ত তৃণপল্লবে, আকাশের সীমাহীন নীলিমায়, দোয়েল-শ্যামার কলকণ্ঠ, ভ্রমরের-গুঞ্জনে তার কেবলই উদাস হাতছানি ছুটির সাদর আমন্ত্রণ। একে উপেক্ষা করার সাধ্য কার! গৃহবন্দী জীবনের ক্লান্তি ভুলতে সে দূর-দূরান্তরে বেরিয়ে পড়ে। শরৎ তাই ছুটির ঋতু। অবকাশের ঋতু। বাঙালির মনকে সে করেছে সৌন্দর্যের তীর্থাভিমুখী। 
‘শরতের রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে মনটা কেবল চলি চলি করে- বর্ষার মত সে অভিসারে চলা নয়, সে অভিমানের চলা’ 

শরতের অর্থনৈতিক অবদান : শরৎ ফসলের ঋতু নয়। আগামী ফসলের সম্ভাবনার বাণীই বহন করে আনে। পাকা ধানের ডগায় সোনালি রোদ গলে গলে পড়ে। চক্চক্ করে কৃষকের চোখ আনন্দে। দিগন্তে বিস্তৃত সবুজ ধানের ক্ষেত দেখে কৃষক আশায় বুক বাঁধে। আর কিছুদিন পরেই ঘরে উঠবে সোনার ধান, পরম আদরের ধান। শরৎ তাই আগামী ফসলের সম্ভাবনার বাণী। মাঠে মাঠে নবজীবনের আশ্বাস। বর্ষায় যে বীজ বপন, হেমন্তে যে পাকা ফসলের পরিণত-প্রতিশ্রতি, শরতে তারই পরিচর্যা। অনাগত দিনের স্বপ্ন-সম্ভাবনায় তার নম্র-নেত্রে খুশির ঝিলিক। এরই ওপর কৃষি-প্রধান বাংলাদেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব রচিত হয়। তাই অর্থনৈতিক প্রবাহে শরৎ ঋতুর রয়েছে এক অপরিহার্য ভূমিকা। 

শরতে-হেমন্তে বাংলার প্রকৃতি : কালচক্রের আবর্তনে শুধুই পট-পরিবর্তন। ঋতুরঙ্গশালায় শরতের স্থায়ীত্ব ক্ষণিকের। কেননা শরতের প্রথম দিকে অনেকটা সময়ই বর্ষার বর্ষণে সিক্ত থাকে। আবার হেমন্ত শিশিরভেজা পায়ে কিছুটা আগেই শরতের দরজায় কড়া নাড়ে। এবার শরৎ-বিদায়ের লগ্ন আসে এগিয়ে শিশির বিছানো, শিউলি-ঝরা পথের ওপর দিয়ে কখন সে নিঃশব্দে চলে গেছে। পথে পথে রেখে গেছে ম্লান, ঝরা শেফালি, বিষণ্ণ কাশের গুচ্ছ, আর মাঠভরা নতুন ধানের মঞ্জরি। সাঝের পর হালকা কুয়াশায় জোনাকিরা জ্বলে, নেভে। সেই আলো-আঁধারি কুয়াশা গায়ে মেখে হেমন্ত আসে। বড় কুণ্ঠজড়িত পদক্ষেপ তার। সে না এলে ঋতুমঞ্চে শীত আর বসন্তের আসা হবে না। কেবল সে জন্যেই যেন সে আসে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- 
‘হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা- 
হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধুমল রঙে আঁকা। 
সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে মলিন হেরি কুয়াশাতে, 
কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা। 
....... ....... ...... ...... ...... 
আপন দানের আড়ালেতে রইল কেন আসন পেতে, 
আপনাকে এই কেমন তোমার গোপন করে রাখা
রূপসী হেমন্ত ধূসর কুয়াশায় নয়ন ঢেকে ফসল ফলাবার নিঃসঙ্গ সাধনায় থাকে নিমগ্ন। ক্ষেতে-খামারে রাশি রাশি ভরা ভরা সোনার ধান উঠতে থাকে। চারদিকে অন্তহীন কর্মব্যস্ততা। আজও তিস্তা-করতোয়া থেকে শুরু করে পদ্মা-যমুনার তীরে তীরে যেসব সোনালি ফসল সোনা ছড়ায় সেও তো হেমন্তেরই দিনে। নবান্নের উৎসব হয়। প্রাচুর্যময়ী হেমন্তের ফুলের বাহার নেই, সৌন্দর্যের জৌলুস নেই, রূপ-সজ্জারও নেই প্রাচুর্য; আছে মমতাময়ী নারীর এক অনির্বচনীয় কল্যাণী রূপশ্রী। সে আমাদের ঘর সোনার ধানে ভরে দিয়ে শিশিরের মতো নিঃশব্দ চরণে বিদায় গ্রহণ করে। অলক্ষ্যে চেয়ে চেয়ে দেখে। আর প্রতীক্ষায় থাকে কখন শীত আসবে। 
হেমন্ত শরতের পরিণতি আর শীতের পথ-প্রদর্শক। হেমন্তে ঘরে ঘরে সোনার ফসল ওঠে। ধান ভানার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় বাড়ির আঙিনা। নবান্ন আর পিঠেপুলির উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। সকালের সোনালি রোদে সোনালি ধান ঝলমল করে হেসে ওঠে। ধূসর বর্ণের হেমন্তে তাই আছে পরিপূর্ণতা, রিক্ততার লেশমাত্র তাতে নেই। আর এই দান কুয়াশা আর বিষণ্ণতার পোশাক পরা শান্ত সৌম্য হেমন্তের। 
হেমন্তের ম্লান পাণ্ডুর বিষণ্ণতাকে কেউই যেন মনে রাখতে চায় না। কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সবার কাব্যেই বর্ষা ধরা দিয়েছে বেশি। কেবল জীবনানন্দ দাশের কাব্যেই হেমন্ত পেয়েছে শীর্ষস্থান। কবি লিখেছেন : 
“অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে; 
সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে 
হেমন্ত এসেছে তবু।”
হেমন্তের উচ্ছ্বাস নেই, চপলতা নেই। সে যতটা পারে কেবল দিয়েই যায়। ধরিত্রীর অন্তরঙ্গ সহচরী হেমন্তের তাই নিজের জন্য কোনো প্রত্যাশা নেই। দানেই তার আনন্দ। 

উপসংহার : এভাবে শরতে-হেমন্তে বাংলার প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। শরৎ যদি হয় উচ্ছ্বলতার ও আনন্দের, হেমন্ত তবে বিষণ্ণতার। দুজনেই সাধ্যমতো উপহার দেয়। শরৎ সাজায় প্রকৃতিকে, হেমন্ত ভরিয়ে তোলে গৃহ-ভাণ্ডার। একজনের দানের আভাস বড় বেশি স্পষ্ট। যেখানে উজ্জ্বলতা আছে, আছে উচ্ছলতা। অন্যজন ভরিয়ে তোলে গৃহকোণ। প্রকৃতি তখন ধূসর, মলিন। এ ঋতু চক্রের মহিমায় বাংলাদেশ চিরকাল অপূর্ব সুখ, সৌন্দর্য ও শান্তির নিকেতন। 
‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, 
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’ 
শুধু জননী জন্মভূমি রূপেই নয়, রূপসী বাংলার এই ষড়ঋতু নানা বর্ণ-গন্ধ গানের সমারোহে নিত্য-আবর্তিত হয়ে চলে। কিন্তু শহরবাসী ও শহরমুখী বাঙালি আজ আর অন্তরে অনুভব করে না তার সাদর নিমন্ত্রণ। ঋতু-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি যখন বিবাহের কন্যার মতো অপরূপ সাজে সেজে উঠবে বাঙালি তখন শুনবে কলকারখানার যন্ত্র-ঘর্ঘর-ধ্বনি কিংবা কম্পিউটারে অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত থাকবে সওদাগরি অফিসে।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো ]


বর্ষার অলসবিধুর মন্থরতায় একসময় একঘেয়েমি আসে। মনকে ভারাক্রান্ত করে বিষণ্ণতা। আর এ থেকে মুক্তির জন্যে মন আকুল হয়। ঠিক তখন হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো নীল আকাশ ঝলমল করে হেসে ওঠে। শরৎ আসে তার স্নিগ্ধ রূপ-মাধুর্য নিয়ে। কবির ভাষায় তখন বলতে ইচ্ছে করে :
আমার নয়ন ভুলানো এলে,
আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে-
শিউলিতলার পাশে পাশে ঝরা ফুলের রাশে রাশে
শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে অরুণরাঙা চরণ ফেলে
নয়ন-ভুলানো এলে-

শরৎ আসে হালকা চপল ছন্দে। এসেই মেঘ আর রৌদ্রের লুকোচুরি খেলায় মাতে। শরৎ শুভ্রতার প্রতীক। গাছের পাতায় ঝকঝকে রোদের ঝিলিক, ভরা নদীর পূর্ণতা, নদীতীরে ফুটে থাকা অজস্র কাশফুল, শিউলি। আর সারা আকাশ জুড়ে তুলোর মতো শুভ্র মেঘ- এসবই জানিয়ে দেয় শরৎ এসে গেছে।

শরতে প্রান্তরে প্রান্তরে সবুজের শোভা। এই সবুজের ওপর যখন সোনালি রোদ্দুর খেলা করে তখন প্রকৃতির চেনা রূপ যেন পালটে যায়। শরতের ভোরে ঘাসের ডগায়, গাছের পাতায় জমে থাকে শিশিরবিন্দু। এর ওপর যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন মনে হয় চারিদিকে ছড়িয়ে আছে অজস্র মুক্তোদানা। পাকা ধানের ডগায় সোনালি রোদ গলে গলে পড়ে। চকচক করে কৃষকের চোখ আনন্দে। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানের ক্ষেত দেখে কৃষক আশায় বুক বাঁধে। আর কিছুদিন পরেই ঘরে উঠবে সোনার ধান, পরম আদরের ধান। শরৎ তাই আগামী ফসলের সম্ভাবনার বাণী। বর্ষায় যে ফসলের বীজ বোনা হয়, হেমন্তে যে ফসল ঘরে ওঠে, শরতে চলে তার পরিচর্যা। শরৎ তাই নবজীবনের আশ্বাসবাণী শোনায়। এই ফসলের ওপরই নির্ভর করে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের আয়-ব্যায়ের হিসেব।

স্নিগ্ধতা আর কোমলতার এক অপূর্ব রূপ নিয়ে আসে শরতের রাত। শরৎ-রাত্রির চাঁদ সারারাত ধরে মাটির শ্যামলিমায় ঢেলে দেয় জ্যোৎস্নাধারা। মাঝে মাঝে বয়ে যায় স্নিগ্ধ বাতাস। দূর থেকে ভেসে আসে শিউলির সুবাস। মন কিছুতেই ঘরে আটকে থাকতে চায় না। কেবলই ছুটে যেতে চায় বাইরে। ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় পাখিদের ভ্রম হয়। ভোর হয়ে গেছে ভেবে ডেকে ওঠে কাক। ভোর হতে না হতেই শিশিরসিক্ত শিউলি ঝরে পড়ে সবুজ ঘাসে। কমোল বোঁটায় তখনও টলমল করে জলের কণা। কবি-হৃদয় চঞ্চল হয়। লেখে কবিতা কিংবা গান :
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ,
আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।

শরতে নীল সরোবরে পদ্মের সাথে হৃদয় মেলে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের প্রাণ। শরতে কেবলি বর্ণের স্নিগ্ধতা আর উদারতা। সবুজ, নীল আর সাদার এমন অপূর্ব সমন্বয় আর কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। জননী বাংলাদেশ আপনার হৃদয় উজাড় করে মেলে ধরে এই শরতে।

দারিদ্র্য আর সংকটে জর্জরিত আমরা এই শরতে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মুক্তি পেতে চাই। হারিয়ে যেতে চাই মন-মাতানো সৌন্দর্য আর আনন্দের মধ্যে। তাই শরৎ বাঙালির মনকে করেছে সৌন্দর্যপিপাসু। দল বেঁধে মানুষ বেরিয়ে পড়ে সৌন্দর্য সন্ধানে। শরৎ তাই ছুটির ঋতু, অবকাশের ঋতু। এই শরতেই হিন্দু সম্প্রদায় দুর্গোৎসবে মাতে।

জ্যোৎস্না রাত্রির মতো সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তেও শরতের প্রকৃতি অনন্য রূপ নেয়। মূলত শরৎ এসেই যেন মেলে ধরে অফুরন্ত সৌন্দর্যের ভাণ্ডার। কিন্তু ঋতুরঙ্গশালায় শরতের স্থায়িত্ব ক্ষণিকের কেননা শরতের প্রথম দিকে অনেকটা সময়ই বর্ষার বর্ষণে সিক্ত থাকে। আবার হেমন্ত শিশিরভেজা পায়ে কিছুটা আগেই শরতের দরজায় কড়া নাড়ে। আর শিউলি ফোটে না, ঝরে না। নদীতীরে কাশের গুচ্ছ উদাস হাওয়ায় মাতে না, কাশও ঝরে পড়ে। সাঁঝের পর হালকা কুয়াশায় জোনাকিরা জ্বলে, নেভে। সেই আলো-আঁধারি কুয়াশা গায়ে মেখে হেমন্ত আসে। বড় কুণ্ঠাজড়িত পদক্ষেপ তার। সে না এলে ঋতুমঞ্চে শীত আর বসন্তের আসা হবে না। কেবল সেজন্যেই যেন সে আসে। নবান্নের উৎসব হয়। হেমন্ত অলক্ষ্যে চেয়ে চেয়ে দেখে। আর প্রতীক্ষায় থাকে কখন শীত আসবে। কোনোরকম আত্মঘোষণা ছাড়াই সে আসে আর সারাটা ক্ষণ লুকিয়ে থাকে। তারই কল্যাণস্পর্শে ভরে ওঠে গৃহস্থের আঙিনা অথচ সে-ই যেন চরম উপেক্ষিত। তবু তার মুখে স্নিগ্ধ প্রসন্ন হাসি।

হেমন্ত অন্নদাত্রী, হেমন্ত লক্ষ্মী। ধরিত্রীর বুকে যেদিন প্রথম ফসল ঘরে উঠল, আদিম মানব-মানবী হলো আনন্দে আত্মহারা, সেদিন তা হেমন্তই অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। আজও তিস্তা-করতোয়া থেকে শুরু করে পদ্মা-যমুনার তীরে তীরে যেসব সোনালি ফসল সোনা ছড়ায় সেও তো হেমন্তেরই দিনে।

তাই ফসল ফলাবার নিরলস সাধনায় মগ্ন থেকে হেমন্ত। সে যেন কল্যাণদাত্রী জননী। হেমন্ত শরতের পরিণতি আর শীতের পথ-প্রদর্শক। হেমন্তে ঘরে ঘরে সোনার ফসল ওঠে। ধান ভানার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখরিত হয় বাড়ির আঙিনা। নবান্ন আর পিঠেপুলির উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। সকালের সোনালি রোদে সোনালি ধান ঝলমল করে হেসে ওঠে। ধূসর বর্ণের হেমন্তে তাই আছে পরিপূর্ণতা, রিক্ততার লেশমাত্র তাতে নেই। আর এই দান কুয়াশা আর বিষণ্ণতার পোশাক পরা শান্ত সৌম্য হেমন্তের।

হেমন্তের ম্লান পাণ্ডুর বিষণ্ণতাকে কেউই যেন মনে রাখতে চায় না। কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সবার কাব্যেই বর্ষা ধারা দিয়েছে বেশি। কেবল জীবনানন্দ দাশের কাব্যেই হেমন্ত পেয়েছে শীর্ষস্থান। কবি লিখেছেন :
অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর মনে ;-
সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে
হেমন্ত এসেছে তবু।

রবীন্দ্রনাথ হেমন্তকে নিয়ে কম লিখলেও এর কল্যাণদাত্রী রূপ তিনি ভোলেন নি। তিনি যেন হেমন্তের প্রতি অভিমানভরেই লিখলেন :
‘হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা- 
হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধুমল রঙে আঁকা। 
সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে মলিন হেরি কুয়াশাতে, 
কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা। 
....... ....... ...... ...... ...... 
আপন দানের আড়ালেতে রইল কেন আসন পেতে, 
আপনাকে এই কেমন তোমার গোপন করে রাখা

বাংলার কাব্যেও হেমন্ত এভাবেই ধরা দিয়েছে।

হেমন্তের উচ্ছ্বাস নেই, চপলতা নেই। সে যতটা পারে কেবল দিয়েই যায়। ধরিত্রীর অন্তরঙ্গ সহচরী হেমন্তের তাই নিজের জন্যে কোনো প্রত্যাশা নেই। দানেই তার আনন্দ।

এভাবে শরতে-হেমন্তে বাংলার প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। শরৎ যদি হয় উচ্ছলতার ও আনন্দের, হেমন্ত তবে বিষণ্ণতার দুজনেই সাধ্যমতো উপহার দেয়। শরৎ সাজায় প্রকৃতিকে, হেমন্ত ভরিযে তোলে গৃহ-ভাণ্ডার। একজনের দানের আভাস বড় বেশি স্পষ্ট। সেখানে উজ্জ্বলতা আছে, আছে উচ্ছলতা। অন্যজন ভারিয়ে তোলে গৃহকোণ। প্রকৃতি তখন ধূসর, মলিন। তাই শরৎ কিংবা হেমন্ত কোনোটির মহিমাই ঋতুরঙ্গশালায় হেলায় দেখবার নয়।


আরো দেখুন :

No comments