বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : সময়ের মূল্য

↬ সময়ানুবর্তিতা

↬ সময়ের সদ্ব্যবহার

↬ জীবনে সময়ানুবর্তিতার মূল্য

↬ সময়

↬ সময়নিষ্ঠা


ভূমিকা : অন্তহীন যাত্রাপথে নিরন্তর বয়ে চলেছে সময়। সে চলার বিরতি নেই, নেই পিছুটান। মহাকালের সেই নিরবধি প্রবাহে ক্ষণবন্দী মানুষের জীবন। তাতে প্রত্যেক মানুষের জীবন সময়ের শৃঙ্খলে বাঁধা। সময়ের মহাসমুদ্রে মানুষ মাত্রই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেয়ে যায় তার ছোট্ট জীবনের ভেলা। অনন্ত প্রবাহিত সময়ধারা থেকে যে খণ্ড সময়টুকু মানুষ তার জীবন রচনার জন্যে পায় তা এত দুর্লভ, এত মূল্যবান যে মানুষকে চিরকাল হাহাকার করতে হয়- ‘নাই যে সময়, নাই নাই’। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে হাহাকার করে- ‘জীবন এত ছোট কেন?’ তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের জীবনে মহামূল্যবান।

মানবজীবনে সময়ের মূল্য : অনন্ত মহাকালের বুকে মানুষ তার জীবনে পায় সামান্য কিছু দুর্লভ সময়। এ সময়টুকুও অনন্ত বহমানতায় হারিয়ে যায়। কবি হেমচন্দ্রের ভাষায়-
দিন যায় ক্ষণ যায় সময় কাহারো নয়
বেগে ধায়, নাহি রহে স্থির।

তাই জীবনের মূল্যবান প্রতিটি মুহূর্ত ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলেই জীবন সফল হয়, সুন্দর হয়, সার্থক হয়, জীবনের মূল্যবান সময় হাতে পেয়েও মানুষ তাকে কাজে লাগায় না। সময়কে অবহেলা করে, আলস্য সময়ের অপচয় করে। সময়কে চোখে দেখা যায় না বলে মানুষ ভুল করে। অলস হয়ে, কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকে বলে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ফলে জীবনে তাদের ব্যর্থতার জ্বালা সইতে হয়। কারণ, যে সময় চলে যায় তা আর কখনো ফিরে আসে না। তাই মানুষের জীবনে কর্মের ও সৃজনের সফলতা অনতে হলে সময়ের মূল্য অনুধাবন করা দরকার।

বাঙালির সময়জ্ঞান : দুঃখের বিষয় বাঙালির জীবনে সময়-সচেতনতা খুবই কম। এর মূলে রয়েছে বাঙালির প্রাচীন জীবনযাত্রা থেকে প্রাপ্ত অভ্যাস। দীর্ঘকাল ধরে বাঙালির সমাজজীবনের কাঠামো ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। সেখানে জীবনে জটিলতা ছিল কম। অল্প আয়াসে সোনার ফসলে মাঠ ভরে যেত বলে জীবন সংগ্রামের গতি ছিল মন্থর। প্রচুর অবসর মিলত বলে সেকালে বাঙালির জীবনে ছিল বারো মাসে তের পার্বণের আনন্দ। বাইরের জগৎ কোথায় চলেছে সেদিকে বাঙালি খুব একটা ফিরে তাকায় নি। কিন্তু বাঙালির সুখবিভোর অলস-মন্থরতা ভরা জীবনে প্রবল অভিঘাত লাগে এদেশে ইংরেজ আগমনের পর পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে দেখা গেল, পৃথিবী যেমন এগিয়ে গেছে তেমনি তাদের সময়-সচেতনতার তুলনায় বাঙালির সময়-সচেতনতা রয়েছে অনেক পিছিয়ে। এরপর বাঙালির সময়-সচেতন হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু অলস অভ্যাসের জের এখনো চলছে। বাঙালির সময়জ্ঞান সম্পর্কে যে ঠাট্টা-বিদ্রুপ চলে সে অপবাদ এখনও আমরা মোচন করতে পারি নি।

সময় সচেতনতার গুরুত্ব : জীবনের সার্থকতার জন্যে সময়নিষ্ঠা একটা গরুত্বপূর্ণ শর্ত। Time and tide wait for none- এই সুভাষিতটি মনে রাখলে আমরা বুঝতে পারি আমাদের জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত কত মূল্যবান। স্বাস্থ্য হারালে তা আবার ফিরে পাওয়া যায়, হারানো সম্পদ হয়তো পুনরুদ্ধার সম্ভব। কিন্তু হারানো, উপেক্ষিত, অপব্যয়িত সময়কে জীবনে কিছুতেই আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো দরকার। সময়নিষ্ঠ ইংরেজদের আরোও একটি সুভাষিত রয়েছে : Time is money. কথাটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সময়জ্ঞান আক্ষরিক অর্থে সবসময় হয়তো অর্থপ্রাপ্তি ঘটায় না। কিছু সময় মানব জীবনে নিঃসন্দেহে মূল্যবান সম্পদ। সময়ের আক্ষরিক সদ্ব্যবহার করে মানুষ অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান, সৃজনকর্ম ইত্যাদি ফুল-ফল-ফসলে জীবনকে ভরিয়ে দিতে পারে। এতে জীবন হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ, সার্থক।

ছাত্রজীবন ও সময়নিষ্ঠা : ছাত্রজীবন হচ্ছে মানুষের ভবিষ্যৎ ফসল জীবন গঠনের প্রস্তুতিপর্ব। সময়ানুবর্তিতার মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর অভ্যাগ গড়ে তোলার প্রকৃষ্ট সময় ছাত্রজীবন। ছাত্রজীবনে লেখাপড়া, খেলাধুলা, বিনোদন ও বিশ্রামের জন্যে সুষ্ঠু সময়- পরিকল্পনা করা দরকার। শ্রমকুণ্ঠ, সময়-অসচেতন, আলস্যপ্রিয় ছাত্র কেবল যে লেখাপড়ায় পিছিয়ে যায় তা নয়, বৃহত্তর জীবনের পদে পদে তাকে ফেলতে হয় ব্যর্থতার দীর্ঘস্বাস। তাই অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি সময়নিষ্ঠ হওয়ার শিক্ষাও ছাত্রজীবনে অর্জন করতে হয়। এ সময় সময়ানুবর্তিতা অভ্যাসে পরিণত হলে তার ভবিষ্যৎজীবনেও তা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে।

মনীষীদের জীবনে সময়নিষ্ঠার তাৎপর্য : মানব-ইতিহাসে যাঁরা বরণীয় স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁদের জীবন সময়-সচেতনতার তাৎপর্যে ভাস্বর। খণ্ডকালের জীবনে সময়ের শাসনকে স্বীকার করে নিয়েই তাঁরা জীবনকে দিয়েছেন পূর্ণতা, কালের বাঁধনকে অতিক্রম করে অর্জন করেছেন কালান্তরের অমরত্ব। বিশ্ববনেণ্য কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকরা সীমিত জীবনেই ফলিয়ে গেছেন চিরায়ত সাহিত্য ও শিল্পকর্ম। নিবেদিতপ্রাণ মহৎ দার্শনিক, বিজ্ঞানী অতন্দ্র সাধনায় জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন নব নব আবিষ্কারের অজস্র সম্পদে। মহৎ ধর্মসাধক, দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক, রাষ্ট্রনায়কদের সীমিত খণ্ড-পরিসর জীবনের মহৎ অবদান ও ভূমিকায় অর্জিত হয়েছে মানুষের সমাজ ও সভ্যতার নব নব অগ্রগতি। এসব মহামানব জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়েই পেয়েছেন সাফল্যের স্বর্ণমুকুট। মর জীবনে অর্জন করেছেন অমরত্বের মহিমা। তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নিলে আমরা সময়ের মূল্য বুঝতে পারি। হতে পারি সময়ানুবর্তী ও সময়-সচেতন।

উপসংহার : আধুনিক কালে জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে জটিল ও বহুমুখী। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্র অকল্পনীয়ভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। জীবন সংগ্রামে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পারিবারিক, শিক্ষাগত, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক জীবনে নিত্য নতুন পরিস্থিতিতে অনেক কিছুর সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হয়। বিনোদনেও প্রচুর সময় দিতে হয়। তাই সময়ের ব্যবহার হওয়া চাই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ। তাহলেই স্বপ্নিল জীবনে আসবে সার্থকতা। সময়কে কাজে লাগানোর গুরুত্বটি কেবল ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপার নয়, জাতীয় জীবনেও তার গুরুত্ব অপরিসীম। একশ শতকের পৃথিবী আজ বিস্ময়কর গণিতে আগুয়ান। সুপরিকল্পিত সময়নিষ্ঠ ছাড়া আমাদের দেশ ও জাতি কি পশ্চাৎপদ জিবনকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে? এক্ষেত্রে সফল হতে হলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে চাই সময়নিষ্ঠার ছাড়পত্র।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো ]


ভূমিকা :
‘বার বার কারো পানে ফিরে চাহিবার
নাই যে সময়
নাই নাই।’
                              ----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সময়ের তটভূমিতেই মানুষের ভাঙা-গড়ার ইতিহাস। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের, জন্ম থেকে মৃত্যুর অন্তহীন এক লীলা। নদীর স্রোতের মতোই বহমানতা তার ধর্ম। কারো জন্যই তার অপেক্ষা নেই। নেই কোনো কিছুর জন্যেই আসক্তি, পিছুটান। মুহূর্তের জন্যেও সে থামে না। শুধু চলে, চলে আর চলে। মহাকালের সেই প্রবাহে ক্ষণবন্দি মানুষের জীবন। আনন্ত প্রবাহিত সময়ধারা থেকে যে-খণ্ডসময়টুকু মানুষ তার জীবন রচনার জন্যে পায় তা এত দুর্লভ, এত মূল্যবান যে মানুষকে চিরকাল হাহাকার করতে হয়- ‘নাই যে সময়, নাই নাই’। নদী সমুদ্রে গিয়ে তার কলতান থামায়, মানুষ অনন্তে মিশে তার জীবনের পূর্ণতা খোঁজে। তাই সংসারে এক মুহূর্ত থেমে থাকার উপায় নেই, একটু সময় নষ্ট করার অবসর নেই।

সময়ের গুরুত্ব : সময় অনন্ত এক দুর্লভ ঐশ্বর্য। মানুষের জীবনে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল জীবন, আর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হল সময়। সময় সবার জন্যেই মূল্যবান সম্পদ। সময়কে মূল্যবান সম্পদ বলা হলেও, সময়কে কখনোই মূল্যমানে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, কেননা পার্থিবজীবনের কোনো কিছুর বিনিময়েই চলে যাওয়া সময়কে আর ফিরিয়ে আনা যায় না
একটা দিন চলে যাওয়া মানে জীবন থেকে একটা দিন ঝরে যাওয়া।
                     --- রবার্ট ব্রাউনিং।

জীবন সীমাবদ্ধ, সংক্ষিপ্ত। এই সংক্ষিপ্ততার জন্যেই জীবনের এত মধুময় আকর্ষণ। জীবনের একপ্রান্তে জন্ম, অন্যপ্রান্তে মৃত্যু। জন্ম-মৃত্যুর আলিঙ্গনে জীবন সদা কুণ্ঠিত। জীবনের প্রারম্ভেও ঘুম, অন্তিমেও ঘুম। মধ্যিখানে ক্ষণিকের জন্যে চোখ মেলে চাওয়াই জীবন। জীবন তাই অনন্ত ধাবমান সময় থেকে কতকগুলো খণ্ডমুহূর্ত আহরণ করার আকুল আকুতি। ঘণ্টা-মিনিট-দিন-মাস বছরের সময়সূচিতে সেই জীবনের ক্ষণ-বন্ধন। আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনকে গৌরবময়, স্মরণীয় ও বরণীয় করে তোলার একমাত্র উপায় হচ্ছে ছন্দময়, গতিময় সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করা। এ বিশ্বের সকল কর্মকাণ্ড- ক্ষুদ্র বা বৃহৎ, সবকিছুর আধার সময়। আর জীবনের কর্মকাণ্ডের মধ্যেই মানুষের নাম, যশ, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি সবকিছু নির্ভর করে। কিন্তু- ‘Life is short but art is long.’ ক্ষণস্থায়ী এই জীবনে কাজের অন্ত নেই, তাই সময়ের বিপুল অংশ কাজে লাগিয়ে জীবনকে সফল ও সার্থক করা আমাদের ব্যক্তিক, সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে M.K. Gandhi বলেন,
Time is life, life is time. Balance between life and time can help one reach the highest apex of success.’
জীবনের সকল কর্মকাণ্ড যথাসময়ে শেষ করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নির্ভর করে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সদ্ব্যবহার করে অনেক সাধারণ লোকও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আবার সময়ের মূল্যবোধ না থাকায় বহু প্রতিভাবান লোকও দুঃখের সাগরে পতিত হয়েছে। তাই মানবজীবনে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ জন্যই লালন গেয়েছেন-
‘সময় গেলে সাধন হবে না।’

সময়ের সদ্ব্যবহার :
‘মানবজাতির প্রতি বিধাতার শ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে মহামূল্য সময়’
                                      – আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।

সময়ই মানবের জীবনাকাশে উন্নতির অরুণোদয় ঘটায়, আবার সময়ই মানবের জীবনে এনে দেয় অবনতির অমা-অন্ধকার। একমাত্র সময়ের সদ্ব্যবহারেই ক্ষণিকের জীবন চিরকালীন সার্থকতায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে নশ্বর পৃথিবীতে অবিনশ্বর কীর্তি স্থাপন করে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের চরম সার্থকতা নিহিত। খণ্ড-কালের সীমিত জীবন সময়ের যে ভগ্ন-মুহূর্ত মানুষ পায়, তার যথার্থ প্রয়োগেই জীবন সার্থক ও সুন্দর হয়। জগতের মধ্যে এমন একজন মনীষীও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিঁনি বড় হয়েছেন, অথচ সময়ের সদ্ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন না।

সময়ের অবহেলার পরিণাম : জীবনের এই সীমাবদ্ধ অবসরে সময়ের যে ভগ্নাংশটুকু পাওয়া যায়, তার সদ্ব্যবহারের মাধ্যমেই জীবন সার্থক এবং সুখময় হয়ে ওঠে। কাজেই, জীবনের সীমায়তনের মধ্যে যে পরম মূল্যবান সময় আমরা পাই, তাকে যদি অবহেলা করি, যদি আলস্যভরে সেই দুর্লভ সময় কাটিয়ে দিই, তাহলে সেই সময়ের অপচয়ের বেদনাা আমাদের জীবনে একদিন মর্মান্তিক দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন বুকফাটা আর্তনাদ, অজস্র অশ্রু বর্ষণে কিংবা অনুতাপের অন্তর্দাহে সেই আলস্যে অতিবাহিত সময় আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। আর এ জন্যেই কবি বলেছেন-

সময়কে চোখে দেখা যায় না, শোনা যায় না তার অনন্ত চলার ধ্বনি। মানুষ তাই ভুল করে। মনে করে সময় স্তব্ধ, অনড়। অলস, কর্মবিমুখ, উদাসীন মানুষ সময়ের মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞ, অচেতন। উপযুক্ত সময়ে মহাকাল নেয় এর প্রতিশোধ। দুঃখময়, অভিশাপের জীবন নিয়ে মানুষ শোধ করে তার জন্ম-ঋণ। আর যাঁরা সময়ের মূল্যবোধে শ্রদ্ধাবনত, নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে বহুতর কল্যাণ-কর্মে সময়-দেবতার করেন বন্দনা, তাঁদের মাথায় ঝরে পড়ে কালের দেবতার অপার করুণাধারা। সময় দুর্লভ। দুর্লভ এই মানবজন্মও। যথাসময়েই আবাদ করতে হয় এই মানব-জমিন। আর তাতেই ফলে সোনার ফসলের পর্যাপ্ত ফলন।

বাঙালির সময়জ্ঞান : বাঙালির যে সময়জ্ঞান কম তা বলাই বাহুল্য। এর মূলে রয়েছে বাঙালির প্রাচীন জীবনযাত্রা থেকে প্রাপ্ত অভ্যাস। দীর্ঘকাল ধরে বাঙালির সমাজজীবনের কাঠামো ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। যেখানে জীবনে জটিলতা ছিল কম। অল্প আয়াসে সোনার ফসলে মাঠ ভরে যেত বলে জীবনসংগ্রামের গতি ছিল মন্থর। প্রচুর অবসর মিলত বলে সেকালে বাঙালির জীবনে ছিল বারো মাসে তের পার্বণের আনন্দ। বাইরের জগৎ কোথায় চলছে সেদিকে বাঙালি খুব একটা ফিরে তাকায় নি। কিন্তু বাঙালির সুখবিভোর অলস-মন্থরতা ভরা জীবনে প্রবল অভিঘাত লাগে এদেশে ইংরেজ আগমনের পর পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব। দেখা গেল, পৃথিবী যেমন এগিয়ে গেছে তেমনি তাদের সময়-সচেতনতার তুলনায় বাঙালির সময়-সচেতনতা রয়েছে অনেক পিছিয়ে। এরপর বাঙালি সময়-সচেতন হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু অলস অভ্যাসের জের এখনো চলছ। বাঙালির সময়জ্ঞান সম্পর্কে যে ঠাট্টা-বিদ্রুপ চলে সে অপবাদ এখনও আমরা মোচন করতে পারি না।

সময়কে কাজে লাগানোর উপায় : কাজের পরিমাণ বিবেচনা করে সময়কে ভাগ করে নিলে যথাসময়ে যে কাজটি সহজেই সম্পাদন করা যায়। যে সময়ের কাজ, সে সময়ে না করে ফেলে রাখলে পরবর্তীতে তা আর করা হয়ে ওঠে না। মনে রাখতে হবে, ‘সময়ের একফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়।’ স্বল্প-পরিসর-জীবনের মধ্যে সকল দায়দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন করতে হলে উপযুক্ত সময় নির্ণয় করে নিতে হবে। স্কুল, কলেজে যেরূপ রুটিন মোতাবেক সময়কে কাজে লাগানো হচ্ছে, তেমনি প্রাত্যহিক জীবনেও আহার-বিহার ও বিনোদনের সময় চিন্তা করে সময়কে ভাগ করে নিতে হবে এবং প্রতিটি খণ্ড-সময়কে হীরার খণ্ড কিংবা তার চেয়েও দামী ভেবে কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে-
‘Work while you work, play while you play, And that is the way to be happy and gay.’

ছাত্রজীবনে সময়ের মূল্য : পবিত্র বাইবেলে ঘোষিত হয়েছে,
‘এই পৃথিবীতে প্রত্যেক কাজে একটা উদ্দেশ্য, একটা কাল ও একটা সময় আছে। জন্মবার একটা সময় আছে, মরবারও একটা সময় আছে। গাছ রোপণ করার একটা সময় আছে আর রোপিত গাছ উপড়ে ফেলারও একটা সময় আছে।’

অনুরূপভাবে সময় সম্পর্কে সচেতন হওয়ার প্রকৃষ্ট সময় ছাত্রজীবন। ছাত্রজীবনে সময়ানুবর্তিতার মূল্য সর্বাধিক। কর্মজীবনের পূর্ণ সফলতা নির্ভর করে ছাত্রজীবনে সময়ের সঠিক মূল্যায়নের ওপর। উপযুক্ত সময়েই কৃষক বীজ বপন করে। তবেই তো ফসলের ঋতুতে তার খামার শস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বীজ বপনেই তো ফসলের প্রতিশ্রুতি। তা না হলে খামার শূন্য। অশ্রুবর্ষণেও সেই অবহেলার ক্ষমা নেই। অনুশোচনায়ও নেই সেই অন্তর্জ্বালার অবসান। মানুষের ছাত্রজীবনই হলো ভবিষ্যৎ ফসলের বীজ বপনের প্রত্যাশিত লগ্ন, সুন্দর ও সার্থক জীবন-গঠনের প্রস্তুতিপর্ব। তখন থেকেই সময়ের সদ্ব্যবহারের শুভযাত্রা। শ্রমকুণ্ঠিত, সময়-অচেতন, অলস ছাত্র শুধু যে পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয় তাই নয়, বৃহত্তর জীবনের ক্ষেত্রেও পদে পদে তার ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস। সময়-শিক্ষার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রই হলো ছাত্রজীবন। প্রসঙ্গত উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছেন,
‘সময়ের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা নেই, তারাই পৃথিবীতে নিঃস্ব, বঞ্চিত ও পরমুখাপেক্ষী।’

সুতরাং ছাত্রজীবন থেকেই সময়সচেতন হয়ে নিজেকে উপযুক্তভাবে গড়ে তুলতে হবে।

মনীষীদের জীবনে সময়নিষ্ঠার তাৎপর্য : সমাজে যাঁরা বরণীয়, জীবনের শুরুতেই তাঁরা সময়-চেতনার মহৎ উপলব্ধিতে উজ্জীবিত হয়েছেন। খণ্ড-কালের জীবনেই তাঁরা রেখে যান মৃত্যুঞ্জয়ী স্বাক্ষর। সময়ের শাসনকে স্বীকার করেই জীবন-সাধনায় লাভ করেন পরম সিদ্ধি। সময়ের আরাধনা করেই মানুষ হয়েছে ইতিহাসের শ্রুতকীর্তি পুরুষ। কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকের দল ওই সীমিত জীবনেই কত মহৎ সৃষ্টির উপাচার সাজিয়ে মহাকালের আরাধনা করেছেন। বিজ্ঞানী তাঁর অতন্দ্র সাধনার মধ্য দিয়েই জগৎকে দিয়ে গেছেন নব নব আবিষ্কারের অতুল বৈভব। কত ধর্মনেতা হিংসায় মত্ত ধরণীর বুকে এনেছেন প্রেমের প্লাবন। বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (স), কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সক্রেটিস, আইনস্টাইন, নিউটন, শেক্সপিয়ার, মিলটন, উমর খৈয়াম প্রমুখ মনীষীদের জীবনী আলোচনা করলে দেখা যায়, তাঁরা দিন-রাত তাঁদের উপাসনা, গবেষণা ও লেখার কাজ চালিয়েছেন। এভাবে সময়ের মূল্যায়নের মাধ্যমেই তাঁরা জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন। সময়ানুবর্তিতার কারণেই ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশ শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিল্প-সংস্কৃতিতে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে পেয়েছে।

সময়ের অপব্যবহার ও আমাদের কর্তব্য : যারা সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগায় না ও সময়ের মূল্য দেয় না, তাদের জীবনাকাশ ঘনকালো মেঘে আচ্ছন্ন। ‘ওয়াটার-লু’র যুদ্ধে নেপোলিয়নের সেনাপতি নির্দিষ্ট সময়ের কিছুক্ষণ পরে সসৈন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হওয়ায় নেপোলিয়নের শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল। এমনিভাবে সময়ের অপব্যবহারে বহু প্রতিভাবান ও শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি জীবনযুদ্ধে হেরে গেছেন। সুতরাং সময়ের অবহেলা মানে জীবনকে অবহেলা করা। ঘড়ির কাঁটাটি টিক্ টিক্ করে যেন ঠিক এ কথাটিই বলে চলেছে-
‘সাবধান! আমাকে ভুলো না, তোমার সুপ্ত চৈতন্য জাগ্রত কর, কল্যাণ তোমারই হবে।’

উপসংহার : সময়জ্ঞানই মানুষের সার্বিক উন্নতির চাবিকাঠি। ব্যক্তিজীবনে ও জাতীয় জীবনে সময়ের মূল্য অপরিসীম-
“Time is part of modern civilization.”
পাশ্চাত্য দেশে বলা হয়,
‘Time is money.’
সুতরাং সময়ই হচ্ছে সকল সম্পদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সময়ের মূল্যবোধই দেশ ও জাতির জীবনকে শৌর্যে-বীর্যে, মননে, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তায় করেছে সমুন্নত সাধনার পীঠস্থান।

18 comments:


Show Comments