বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : চরিত্র

↬ জীবনগঠন ও চরিত্র

↬ চরিত্র ও মানব-জীবন

↬ চরিত্রই সম্পদ

↬ সৎ চরিত্র


ভূমিকা : চরিত্র এমন একটি শক্তি, ব্যক্তিত্বের এমন একটি দিক যা ন্যায় নীতি ও নৈতিক জীবনাচরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। একজন মানুষের স্বভাবে ভালো-মন্দ দুটো দিকই থাকতে পারে। মন্দের পাল্লা ভারি হলে সে দুশ্চরিত্র বলেই পরিচিত হয়। অন্যদিকে সৎ চরিত্রের অধিকারী বলতে আমরা বুঝি তিনি ন্যায়বান ও সুবিবেচক। অন্তর শক্তির দৃঢ়তা, অধ্যাবসায় ইত্যাদিও সুচরিত্রের অঙ্গ। চরিত্র অনুযায়ী গঠিত হয় ব্যক্তিজীবন যার প্রভাব গড়ে পরিবেশ ও সমাজ জীবনের ওপর।

চরিত্র কী : চরিত্র শব্দটি ইংরেজি ‘Character’ শব্দের প্রতিশব্দ হলেও মূলত তা এসেছে গ্রিক থেকে। আদিতে এর অর্থ ‘চিহ্ন’ হলেও প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকে শব্দটি ব্যক্তির আচরণ ও আদর্শের উৎকর্ষবাচক গুণ বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
চরিত্র গঠনের দুটো দিক রয়েছে। সচ্চরিত্র ও দুশ্চরিত্র। উৎকর্ষবাচক নানা গুণের সমন্বয়ে গঠিত চরিত্র সচ্চরিত্র। আর মানুষের মধ্যে লুকানো অপকর্ষ বা পশুত্ব যদি হয় চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য তবে সেই চরিত্রই দুশ্চরিত্র। চরিত্র মানবজীবনের এক মহামুল্যবান অবিনাশী সম্পদ। যিনি সৎ চরিত্রের অধিকারী তিনি সমাজের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার ও প্রজ্বলিত দীপশিখা। এ কারণেই চরিত্রকে জীবনের মুকুট বলা হয়। মুকুট যেমন সম্রাটের শোভা বর্ধন করে, তেমনি চরিত্র মানবজীবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সততা, সহৃদয়তা, সংবেদনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, ঔদার্য, কর্তব্যপরায়ণতা, গুরুজনে ভক্তি, মনবিকতা ও আত্মসংযম ইত্যাদি সচ্চরিত্রের লক্ষণ। যিনি চরিত্রবান তিনি কখনও সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হন না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। তিনি সযত্নে ক্রোধ, অহঙ্কার, রূঢ়তা ইত্যাদিকে পরিহার করেন। তিনি হন সত্যবাদী, সংযমী ও ন্যায়পরায়ণ। যাবতীয় মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে বলে চরিত্রবান মানুষ জাতির সম্পদ।

চরিত্র ঘঠনের গুরুত্ব : মানুষের জীবনে চরিত্রে মূল্য ও গুরুত্ব কতখানি তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কেবল চরিত্রের শক্তিতে ও প্রভাবে মানুষ হতে পারে বিশ্ববরেণ্য ও চিরস্মরণীয়। বিদ্যার মূল্য মানবজীবনে অপরিসীম। কিন্তু বিদ্যার চেয়ে চরিত্রকেই অনেক সময়ে দেওয়া হয় অধিকতর গুরুত্ব। প্রবাদ আছে-
‘দুর্জন বিদ্যান হলেও পরিত্যাজ্য।’

কারণ, বিদ্যান লোক দুর্জন হলে তা সমাজের কল্যাণ না হয়ে অকল্যাণই হয় বেশি। এ প্রসঙ্গে একটি সুভাষিত স্মরণীয় উক্তি :
‘অমরত্বের সুধা পান না করেও মানুষ অমর হতে পারে কেবল চরিত্রের গুণে।”

তাই চরিত্রের বিকাশ সাধনই মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত। পৃথিবীতে নিজেকে খাঁটি ও উন্নত করে গড়ে তোলাই মানুষের কাম্য। চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের জীবন পদ্ধতিই কেবল নির্ধারিত হয় না, চরিত্রই এক অর্থে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে।

চরিত্র গঠন-মূলক শিক্ষার লক্ষ্য : চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে, যুক্তির শক্তিতে সমাজস্বীকৃত আচরণ অনুসরণে ব্যক্তির ইচ্ছা ও সামর্থ্যকে বিকশিত করা। ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলি বিকাশের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত দিকগুলো শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

১. মানবিক গুণাবলির সমাহার হিসেবে ধৈর্য, সাহস, আনুগত্য, সততা, সৌজন্য, নির্ভরযোগ্যতা, কৃতজ্ঞবোধ, সহজ অমায়িকতা, পরহিতব্রত ইত্যাদি গুণাবলি;
২. শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, পরমত সহিষ্ণুতা, শিষ্টাচার ইত্যাদি সামগ্রিক আচার-আচরণ-অভ্যাস;
৩. দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবোধ, আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব, মানবপ্রেম ইত্যাদি সংগঠিত ভাবাবেগ;
৪. হিংসা, বিদ্বেষ, কুটিলতা ইত্যাদি মানসিতা পরিহার এবং বদ অভ্যাস বা প্রবৃত্তি দমন;
৫. ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ, পরহিতব্রত ইত্যাদি মানবিক গুণাবলিকে জীবনের চালিকা শক্তি হিসেবে গ্রহণ।

শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র গঠনের পদ্ধতি : দেশ ভেদে কাল ভেদে চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষায় ধারণা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পার্থক্য দেখা যায়। তা সত্ত্বেও বলা যায়, সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় চরিত্র গঠনের উপর বিশেষ গরুত্ব আরোপ করা হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ পদ্ধতিতে গুরুত্ব পায় : ন্যায়নীতি শিক্ষা, নৈতিক মান গঠন; কাজ, সততা, সৌন্দর্য, সৌজন্য, কৃতজ্ঞাবোধ ইত্যাদি গুণাবলির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি; পশুপাখির প্রতি মমত্ব ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি। সামগ্রিকভাবে প্রত্যক্ষ পদ্ধতির লক্ষ্য হচ্ছে ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলি ও সুঅভ্যাস গড়ে তোলায় সহায়তা দান।
চরিত্র গঠনমূলক শিক্ষার পরোক্ষ পদ্ধতি হচ্ছে ইতিহাস, জীবন ও সাহিত্য থেকে পাঠের মাধ্যমে দৈনন্দিন আচরণ ও মূল্যবোধ সৃষ্টি। এভাবে মহৎ চরিত্র সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে আদর্শ ধারণা সৃষ্টি করা হয়।
চরিত্র গঠনে বাবা-মা, পাড়া-প্রতিবেশীর ভূমিকা ছাড়াও বয় স্কাউট, গার্ল গাইড, রেডক্রস ইত্যাদি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ। স্বেচ্ছা সংগঠনের মাধ্যমে মানুষ যৌথ কাজের গুরুত্ব ও আনন্দ অনুভব করতে পারে।

শিশু বয়সে চরিত্র গঠন : শিশুর চরিত্র যেন নির্মল ও স্বচ্ছ হয় সেজন্যে উপযুক্ত শিক্ষাদানে অভিভাবকদের পাশাপাশি তৈরি করতে হয় অনুকূল পরিবেশ। শিশুকে সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করা হলে তাতে সৃজনী প্রতিভা বিকশিত হয়। শিশুর জীবনে মহৎ গুণের সমাবেশ ঘটাতে হলে চাই সৎ সঙ্গ। পিতামাতা, সঙ্গীসাথী, আত্মীয়-পরিজন সৎ চরিত্রের অধিকারী না হলে এদের সাহচর্যে শিশুর মধ্যে সচ্চরিত্রের গুণগুলো সুদৃঢ় ভিত্তি পেতে পারে না।
পারিবারিক পরিবেশ ছাড়াও শিশুর নৈতিক বিকাশে বিদ্যালয় জীবন ও শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রভাব গরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের কাজ শিশুকে সুশিক্ষা দেওয়া। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মহৎ গুণের সমাবেশ ঘটানোর গুরুদায়িত্ব তাঁদেরই। আজকাল শিশুর ভালো-মন্দ চরিত্র গঠনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখছে টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের মতো গণমাধ্যম। স্যাটেলাইটের বিভিন্ন চ্যানেলে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় তার মধ্যে এমন অনুষ্ঠানও থাকে যা শিশুর জন্যে অনুপযোগী। শিশুস্বভাবতই টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাই অভিভাবককে অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে যাতে তাদের শিশুদের চরিত্রের ওপর অপকৃষ্ট অনুষ্ঠানের কুপ্রভাব না পড়ে। এ কারণে খুন-জখম, মারামরি ও স্থুল বিকৃত রুচির বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান শিশুর চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তাই এ ধরণের অনুষ্ঠান দেখা থেকে শিশুকে বিরত রাখতে হবে।
তবে সর্বোপরি যে জিনিসটির ওপর অভিভাবককে বিশেষ সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তা হলো সৎ সঙ্গ। কুসঙ্গের পাল্লায় পড়ে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভা অকালে ঝরে পড়ে, হারিয়ে যায় অন্ধকারে। এ সম্পর্কে প্রবাদ আছে- ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ তাই শিশুর সঙ্গী ও বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকের সতর্ক বিবেচনা দরকার।

চরিত্র গঠনের সাধনা : চরিত্র গঠনের জন্যে ব্যক্তির নিজস্ব সাধনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লোভ লালসা ও অসৎ প্রবৃত্তির নানা কুপ্রলোভন মানুষকে পাপের পথে টানে। এসব পাপ পথ সতর্ক ও দৃঢ়চিত্তে পরিহার করে লোভকে জয় করার শক্তি অর্জন করে চরিত্রবানের আদর্শকে মশাল হিসেবে জ্বালিয়ে উন্নত জীবনের সাধনায় নিযুক্ত হলেই সুচরিত্র গঠনে এগিয়ে যাওয়া যায়। কেবল তাই নয়, চরিত্র রক্ষার জন্যেও মানুষকে আমৃত্যু নিরন্তর সাধনা করে যেতে হবে। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে-
When money is lost nothing is lost
When health is lost something is lost
When character is lost everything is lost.

অর্থাৎ টাকা হারালে টাকা অর্জন করা যায়, স্বাস্থ্য হারালে তাও পুনরুদ্ধার করা যায়, কিন্তু চরিত্র হারালে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই মনুষ্যত্বের অধিকারী হবার জন্যে গড়ে তুলতে হবে সুন্দর, নির্মল ও পরিচ্ছন্ন চরিত্র।

মহৎ চরিত্রের দৃষ্টান্ত : পৃথিবীতে যারা চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁরা ছিলেন চরিত্র শক্তিতে বলীয়ান। কোনো প্রলোভনই তাদেরকে ন্যায় ও সত্যের পথে বিচ্যুত করতে পারে নি। এমনই চরিত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন অন্যায়, অসত্য ও পাপের বিরুদ্ধে। যুগে যুগে সকলেই ছিলেন মানবব্রতী, ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। বিদ্যাসাগর, রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মওলানা ভাসানীর মতো মানবব্রতী, সমাজব্রতী, দেশব্রতী মহাপ্রাণ সকলেই ছলেন উন্নত ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। এমনি আরো অনেক মহৎ চরিত্রের মৃত্যুতে বিশ্বের মানুষ অশ্রুজল ফেলেছে। তাঁদের জীবনের মহিমা স্মরন করেই কবি লিখেছেন-
‘এমন জীবন হবে করিতে গঠন
মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’

চরিত্রবান ব্যক্তি ধনসম্পদে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও বংশ মর্যাদায় কাঙাল হলেও গৌরবে মহান। এ জন্যেই সুভাষিত উক্তিতে বলা হয়েছে:
‘রাজার প্রতাপ অর্থ-সম্পদে কিন্তু চরিত্রবানের প্রতাপ হৃদয়ে।’

উপসংহার : পরিভোগপ্রবণ বিশ্বে আজ চারপাশে বাড়ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। চরিত্রের শক্তি হারিয়ে ফেলতে বসেছে মানুষ। ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে অনৈতিক জীবনের অন্ধকারের অতলে। এ অবস্থায় জাতীয় জীবনে চাই চরিত্রশক্তির নবজাগরণ। যে প্রজন্ম চরিত্র হারিয়েছে তার কাছে কিছু আশা করার নেই। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে বেড়ে উঠতে হবে চরিত্রের মহান শক্তি অর্জন করে। তা হলেই আমাদের ভবিষ্যৎ হবে সুন্দর।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো ]


ভূমিকা : কোনো ব্যক্তির আচরণ ও আদর্শের উৎকর্ষতাবাচক গুণ বোঝাতে চরিত্র শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ‘চরিত্র’ বলতে আমরা বুঝি কথাবার্তায়, কাজ-কর্মে এবং চিন্তা-ভাবনায় একটি পবিত্র ভাব। মানুষকে তা ন্যায়পথে, সৎপথে পরিচালিত করে। মানুষের সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলির মধ্যে চরিত্র অন্যতম। এর মধ্যে মানুষের পরিচয় নিহিত। চরিত্রই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। তাই বিখ্যাত ইংরেজ লেখক সেমুয়্যাল স্মাইলস তাঁর ‘Character’ প্রবন্ধে বলেছেন-
“The crown and glory of life is character.”

চরিত্রের উপাদান বা বৈশিষ্ট্য : সততা, সত্যনিষ্ঠা, প্রেম, পরোপকারিতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও কর্তব্যপালন হল চরিত্রের মৌলিক উপাদান। এগুলো মানুষ যখন সহজে নিজর মধ্যে বিকশিত করে তোলে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার প্রতিটি কথা ও কাজের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়, তখন উত্তমচরিত্র তার স্বভাবের সাথে সমীভূত হয়ে যায়। ফলে, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক আচরণেও উত্তমচরিত্রের বৈশিষ্ট্যাবলি প্রকাশ পেতে থাকে। আর এ-পর্যায়ে গিয়ে ব্যক্তি তার চরিত্রকে একটি সম্পদ হিসেবে আবিষ্কার করে। সর্বোপরি ব্যক্তির চারিত্রিক গুণাবলি বিকাশের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন-

১. মানবিক গুণাবলির সমাহার হিসেবে ধৈর্য, সাহস, আনুগত্য, সততা, সৌজন্য, নির্ভরযোগ্যতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, সহজ অমায়িকতা, পরিহিতব্রত ইত্যাদি গুণাবলি;

২. শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, সহিষ্ণুতা, শিষ্টাচার ইত্যাদি সামগ্রিক আচার-আচরণ-অভ্যাস;

৩. দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবোধ, আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্ব, মানবপ্রেম ইত্যাদি সংগঠিত ভাবাবেগ;

৪. হিংসা, বিদ্বেষ, কুটিলতা, ইত্যাদি মানসিকতা পরিহার এবং বদ অভ্যাস বা প্রবৃত্তি দমন;

৫. ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ, পরহিতব্রত ইত্যাদি মানবিক গুণাবলিকে জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ।

সচ্চরিত্রের লক্ষণ : নামমাত্র নৈতিকতা বা ন্যায়নিষ্ঠাই চরিত্র নয়, চরিত্রের মধ্যে সমন্বয় ঘটবে মানুষের যাবতীয় মানবীয় গুণাবলি ও আদর্শের। চরিত্রবান ব্যক্তি জাগতিক মায়া-মোহ ও লোভ-লালসার বন্ধনকে ছিন্ন করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অবিচল থাকেন। যিনি চরিত্রবান তিনি কখনো সত্য থেকে বিচ্যুত হন না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না, ক্রোধে কিংবা আনন্দে আত্মহারা হন না, গর্বে গর্বিত হন না, কারো সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করেন না। তিনি সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয়, ভক্তি ও ন্যায়পরায়ণ হয়ে থাকেন এবং মানুষকে ভালোবাসার চোখে দেখেন। তাই প্রতিটি মানুষের সাধনা হওয়া উচিত চরিত্র গঠনের সাধনা।

সচ্চরিত্রের ফল : চরিত্রের মাধ্যমেই ঘোষিত হয় জীবনের গৌরব। চরিত্র দিয়ে জীবনের যে গৌরবময় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় তা আর কিছুতেই সম্ভব নয় বলে সবার উপরে চরিত্রের সুমহান মর্যাদা স্বীকৃত। যার পরশে জীবন ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয় এবং যার বদৌলতে মানুষ জনসমাজে শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র হিসেবে আদৃত হয়ে থাকে, তার মূলে রয়েছে উত্তম চরিত্র। যিনি সৎ চরিত্রের অধিকারী তিনি সমাজের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার ও প্রজ্জ্বলিত দীপশিখা। তাঁর মধ্যে যাবতীয় মানবীয় গুণাবলির বিকাশ ঘটে বলে চরিত্রবান মানুষ জাতির সম্পদ।

চরিত্র গঠনের সময় ও উপায় : চরিত্র গঠনের কাজ শিশুকাল থেকে মরণের পূর্ব পর্যন্ত চলতে থাকে। তাই চরিত্রের ওপর পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক সামাজিক বিধি-ব্যবস্থা প্রভাব বিস্তার করে।

চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা : শিশুকাল ও শৈশবকালই হচ্ছে চরিত্র গঠনের উৎকৃষ্ট সময়। তাই বাসগৃহকে চরিত্র গঠনের উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুকে সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করা হলে তাতে সৃজনী প্রতিভা বিকশিত হয়। প্রত্যেক শিশুই নিষ্পাপ হয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুরা স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়। তাই শৈশবে শিশুর কোমল হৃদয়ে যা প্রবিষ্ট হয় তা চিরস্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করে। তাই শিশুর পরিবার যদি সৎ ও আদর্শবান হয় তবে সেও সৎ ও আদর্শবান হতে বাধ্য। শিশুর জীবনে মহৎ গুণের সমাবেশ ঘটাতে হলে চাই সৎ সঙ্গ। আজকাল শিশুর ভালো-মন্দ চরিত্র গঠনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখছে টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের মতো গণমাধ্যম। স্যাটেলাইটের বিভিন্ন চ্যানেলে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় তার মধ্যে এমন অনেক অনুষ্ঠান রয়েছে যা শিশুদের জন্য অনুপযোগী। তাই অভিভাবককে এদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

চরিত্র গঠনে সামাজিক প্রভাব : মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন থেকে আরম্ভ করে পাড়া-প্রতিবেশীর পরিবেশের মধ্য দিয়েই শিশুর চরিত্র গঠিত হয়। শিক্ষাজীবনে বিদ্যালয়ে বা সমবয়স্কদের সাথে খেলাধুলায় এবং সঙ্গ-প্রভাবে শিশুরা আসল চরিত্ররূপ পরিগ্রহ করে। সেজন্যে অভিভাবক ও শিক্ষকদের লক্ষ্য রাখা উচিত, লেখাপড়ার ভেতর দিয়ে শিশুদের চরিত্র গঠন হচ্ছে কিনা।

চরিত্র গঠনে পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব : মানবচরিত্র গঠনে পারিপার্শ্বের গুরুত্ব অপরিসীম। সে যেরূপ পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে বাস করে, সাধারণত তার চরিত্র সেভাবেই গঠিত হয়। সেজন্যে সে যাতে পরিবারের বাইরে কুসংসর্গে মিশতে না পারে অথবা কুকার্যে লিপ্ত হতে না পারে, সেদিকেও অভিভাবকদের লক্ষ্য রাখা উচিত।

রিত্র গঠনে স্বীয় সাধনা : চরিত্রলাভের প্রধান উপায় স্বীয়-সাধনা। চরিত্র সাধনার ধন। বহুদিনের সাধনার বলে তা অর্জন ও রক্ষা করতে হয়। সংসার প্রলোভনময়। পাপের হাজার প্রলোভন মানুষকে বিপথে চালিত করতে সততই সচেষ্ট। আপনার আত্মিক শক্তির বলে সেই সব প্রলোভনকে দমন করে আপনাকে সত্যের পথে অবিচল রাখতে হবে। এর জন্যে সর্বাগ্রে দরকার নিজের শক্তিতে দৃঢ় আস্থা স্থাপন। যে দুর্বল সে চরিত্রলাভের উপযোগী নয়। যে বলহীন, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে, সংসারের যাবতীয় প্রলোভনকে জয় করার মতো মনোবল যার নেই, সে কখনো চরিত্ররূপ অমূল্য ধনের অধিকারী হতে পারে না। সে মানবসমাজে অধম।

চরিত্র গঠনে মহামানবদের উদাহরণ : পৃথিবীতে আজ যাঁরা স্বীয় কর্মবলে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন বা সমাজের মনুষ্য মহাকল্যাণ সাধন করে গিয়েছেন, তাঁদের জীবন-কাহিনী পড়লে দেখতে পাওয়া যায়, তাঁরা সকলেই ছিলেন চরিত্রবান এবং আদর্শ মহাপুরুষ। এরূপ মহামানব হযরত মোহাম্মদ (স), হযরত ঈসা (আ), হাজী মোহাম্মদ মহসীন, স্যার সলিমুল্লাহ, মুহম্মদ আলী ও শওকত আলী, সোহ্‌রওয়ার্দী, এ.কে. ফজলুল হক, মহাত্মা গান্ধী, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মহাপুরুষগণ চরিত্রবলে জগতে অসাধ্য সাধন করে গিয়েছেন। অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। তাঁদের অদম্য কর্মশক্তিতে মানবজাতির মহাকল্যাণ সাধিত হয়েছে। বস্তুতপক্ষে চরিত্রের মতো কোনো মহৎগুণ পৃথিবীতে নেই। যিনি চরিত্রবান তিনি মানবশ্রেষ্ঠ, সমগ্র মানবজাতির তিনি ভূষণস্বরূপ। তিনি সর্বজাতির কাণ্ডারী। তাঁদের জীবনের মহিমা স্মরণ করেই কবি লিখেছেন-
‘এমন জীবন হবে করিতে গঠন
মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’

চরিত্রহীন ব্যক্তি ঘৃণার পাত্র : মানবের সম্পদ একমাত্র চরিত্র। চরিত্রহীন লোক পশুর চেয়েও অধম। স্বাস্থ্য, অর্থ এবং বিদ্যাকে আমরা মানবজীবনের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু জীবনক্ষেত্রে এগুলোর যতই অবদান থাক না কেন, এককভাবে এগুলোর কোনোটিই মানুষকে সর্বোত্তম মানুষে পরিণত করতে সক্ষম নয়, যদি না সে সচ্চরিত্রবান না হয়। কারণ সমৃদ্ধিময় জীবনের জন্যে চরিত্র প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মানুষ তার মৌলিক দৈহিক আরও আকর্ষণীয় ও মধুময় করতে সুন্দর সুন্দর পোশাক ও অলঙ্কার ব্যবহার করে এক অনুপম সৌন্দর্যের বিকাশ সাধন করে, কিন্তু সে যদি সচ্চরিত্রবান না হয় তা হলে এ-সবই বৃথা।

উপসংহার : চরিত্রের কাছে পার্থিব সম্পদ ও বিত্ত অতি নগণ্য। প্রাচুর্যের বিনিময়ে চরিত্রকে কেনা যায় না। মানবজীবনে চরিত্রের মতো বড় অলঙ্কার আর নেই। চরিত্র মানবজীবনের এক অমূল্য সম্পদ। এ প্রসঙ্গে ইংরেজি প্রবাদটি প্রণিধানযোগ্য-
“When money is lost nothing is lost;
When health is lost, something is lost;
But if character is lost, everything is lost.”

2 comments:


Show Comments