বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : গণমাধ্যম

↬ গণমাধ্যম ও শিক্ষাবিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকা

↬ জনমত গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা

↬ শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে গণমাধ্যম


ভূমিকা : মহাকালের রথের চাকা কখনো থামে না। সে চলে, এগিয়েই চলে। যুগ বদলায়। বদলায় তার জীবনধারা। এককালের লোকশিক্ষার যে প্রসার-প্রয়াস ছিল, তার পরিবর্তন হল। দিকে দিকে শুরু হয়েছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। মানুষ মেতে উঠেছে অনাবিষ্কৃত জগতের রহস্য সন্ধানে। একে একে মানুষ আয়ত্ত করেছে আনন্দের নানা উপকরণ। নতুন গণমাধ্যম এসে দখল করল পুরনো গণমাধ্যমের জায়গা। বিজ্ঞান মানুষের হাতে তুলে দিল সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র। এগুলোই হল আধুনিক যুগের আধুনিক গণমাধ্যম। গণশিক্ষার উপযোগিতা আজ দেশে দেশে স্বীকৃত এবং ব্যাপৃত। গণশিক্ষার জন্যে চাই গণমাধ্যম; অর্থাৎ এমন ধরনের কিছু উপাদান যা শিক্ষাবিস্তারে বাতাসের মত নিরপেক্ষ, পানির মত সর্বত্রগামী এবং আলোর মত দ্রুত-বিস্তারী। সর্বোপরি জনগণকে প্রভাবান্বিত করার সবচেয়ে বড় শক্তি হল গণমাধ্যম। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষ জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ওপর নীর্ভরশীল হয়ে পড়েছে। 

গণমাধ্যম কী : একই সঙ্গে ব্যাপক সংখ্যক জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমকে গণমাধ্যম বলা হয়। গণমাধ্যমকে জনসংযোগের উপায় হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রচারিত গণমাধ্যমের মধ্যে জনপ্রিয় হল রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং চলচ্চিত্র। এছাড়া মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার-ইন্টারনেটও গৌণ গণমাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এসব গণমাধ্যম ব্যবহার করে অনেক দূরের মানুষের কাছেও খুব সহজেই বার্তা পৌঁছে দেয়া যায়। অবশ্য গণমাধ্যমের সহায়তায় জনগণের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ সংযোগ সম্ভব নয়। তাই তাৎক্ষণিক মতামতও পাওয়া যায় না। জনগণের ফিডব্যাক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে বিশেষ ব্যবস্থাধীন ক্ষেত্রবিশেষে তাৎক্ষণিক মতামত সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যায়। গণমাধ্যম জনগণের বিনোদন মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গণমাধ্যমে কোনো দেশ, সমাজ, গোষ্ঠীর শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে। ফলে এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশে পৌঁছে যায়। 

অতীতের গণমাধ্যম : অতীত এই দেশের সহৃদয় সমাজই ছিল গণমাধ্যম। কর্মক্লান্ত মানুষের হাতে সমাজই সেদিন তুলে দিত লোকশিক্ষার আনন্দপাত্র। শিক্ষিতদের ছিল অশিক্ষিতদের প্রতি গভীর দরদ। সেই আনন্দযজ্ঞে সেদিন সকলেরই ছিল সাদর আহ্বান। ছিল আত্মিক বন্ধন। যাত্রা, পাঁচালি, কবিগানের আসর বসত। বেহুলা-লখিন্দরের ভাসান গান শুনতে শুনতে চোখের জলে বুক ভাসাত শ্রোতারা। ব্রতকথায়, ছড়ায়, যাত্রা, সারি-জারি-ভাটিয়ালি-বাউল, ধর্মীয় কাহিনীর বিচিত্র ধারা দিকে দিকে প্রবাহিত হয়েছে। অবশেষে এল বিপর্যয়ের দিন। দিন বদলের পালায় জনমনে লালন নতুন দিনের জোয়ার। গড়ে উঠল নতুন নতুন শহর। তার আকর্ষণে ছুটে এল মানুষ। গ্রাম হল উপেক্ষিত। গণশিক্ষার ধারা হল রুদ্ধ। নতুন শিক্ষিতের দল দেশের জীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হল। কথকঠাকুরের আসর আর জমল না। কথা-কবিদের দল গেলেন হারিয়ে। পুরাণ কথায় আর মন ভরে না। দিকে দিকে শুরু হল বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। গণমাধ্যমের রূপ গেল পাল্টে। সৃষ্টি হল আধুনিক গণমাধ্যমের জোয়ার। 

আধুনিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভূমিকা : বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের বদৌলতে শিক্ষা-বিস্তারে বিশিষ্ট কয়েকটি ‘ম্যাস মিডিয়া’ বা গণমাধ্যম আমাদের বিশেষ সহায়ক হতে পারে। এসব গণমাধ্যমগুলো হচ্ছে- সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও সিনেমা। 

যারা স্বল্পশিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, সংবাদপত্র তাদের শিক্ষা বা জ্ঞানবুদ্ধির পুঁজিকে বাড়াবার শক্তি রাখে। আর রেডিও টেলিভিশন ও সেনেমা-এ তিনটি মাধ্যম দ্বারা সম্পূর্ণ নিরক্ষররাও উপকৃত হতে সক্ষম। তবে চলচ্ছিত্রে দর্শকরা নিজেদের পছন্দ বা অভিরুচি অনুযায়ী ছবি দেখে থাকে। রেডিওতে শ্রোতারা শুনে শিখতে পারে, জানতে পারে অনেক নতুন নতুন বিষয়। বিষয়-নির্ধারণের সুযোগ রেডিওর ক্ষেত্রে আছে। তাই বেশিরভাগ প্রোগ্রাম নির্ধারিত থাকে বলে শ্রোতাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও বহু বিষয় শুনতে হয়। অন্যদিকে, টেলিভিশনের ক্ষেত্রে শোনার সঙ্গে সঙ্গে দেখারও বিরাট ভূমিকা থাকে বলে শিক্ষার এই গণমাধ্যমটি আজকের দিনে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এককথায়, সংবাদপত্রের শিক্ষা পড়ে পড়ে, রেডিও শুনে শুনে, আর টেলিভিশন ও চলচ্ছিত্রের বেলায় তা দেখে-শুনে। সম্প্রতি ক্যাসেট, রেডিও-প্লেয়ার ইত্যাদিও শিক্ষা-বিস্তারে গণমাধ্যম হিসেবে বিশেষ কাজ করছে। 

গণমাধ্যম হিসেবে ও জনমত গঠনে প্রিন্টমিডিয়া বা সংবাদপত্রের ভূমিকা : সংবাদপত্র চলমান এই পৃথিবীর বিচিত্র ঘটনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও যুদ্ধবিগ্রহের বর্ণনা থেকে শুরু করে বিদ্রোহী বিপ্লব, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতির অজস্র বিষয় সংবাদপত্রের আওতাভুক্ত। কোথায় কোন্ মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হল, নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কে শপথ নিলেন, কোথায় বিশিষ্ট কোন্ মানুষ পরলোকগমন করলেন, কোন্ বিজ্ঞানী নতুন আবিষ্কার করে রাতারাতি বিশ্ববিখ্যাত হলেন, কোথায় চির-তুষারাচ্ছন্ন দূরধিগম্য পর্বত-চূড়ায় কোন অভিযাত্রীর পদচিহ্ন অঙ্কিত হল, কোথায় গমন কোন্ অরণ্যে প্রাগৈতিহাসিক কোন্ প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেল-সংবাদপত্র থেকে আমরা সব খবর জানতে পারি। এছাড়া, খেলাধুলা, আইন-আদালত, ব্যবসায়-বাণিজ্য, খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি, আমোদ-প্রমোদ, ধর্মকর্ম, শেয়ার মার্কেট, বাজার-দর, কর্মখালি, টেন্ডার-বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদির খবরও সংবাদপত্র সযত্নে আমাদের সামনে উপস্থাপিত করে জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। তবে প্রিন্টমিডিয়া অর্থাৎ দৈনিক সংবাদপত্র, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা পড়ার জন্য যেহেতু একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন এ জন্য শিক্ষার সঙ্গে প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশে এখনও প্রিন্ট মিডিয়ার পাঠক/গ্রাহকের সংখ্যা সবচেয়ে কম। মাত্র ২৫.৮ ভাগ মানুষ সংবাদপত্র এবং প্রায় ৮ ভাগ মানুষ ম্যাগাজিন পড়েন।

জনমত গঠনে সংবাদপত্রের ভূমিকা : গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রকৃত ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে। ফলে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভূমিকা জাতীয় অগ্রগতির পক্ষে কতটা সহায়ক এবং কতটা জনস্বার্থের পরিপূরক তা নিয়ে জনগণের মধ্যে অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ক্ষমতাসীনরা সবসময় তাদের পদক্ষেপকে জোর গলায় ইতিবাচক বলে প্রচার করে এবং বিরোধীরা তাকে একেবারেই প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু সংবাদপত্র উভয় পক্ষের মতামত, যুক্তি ও তথ্যানির্ভর আলোচনা প্রকাশ করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিজেদের অভিমত গঠন করতে পারে। সংবাদপত্রের পাতায় জ্ঞানীগুণী বিশেষজ্ঞদের লেখা প্রবন্ধ ও অভিমত, সম্পাদকীয়, চিঠিপত্র, কলাম লেখকদের তর্কবিতর্ক, যুক্তিপ্রদান ও যুক্তিখণ্ডন ইত্যাদি জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে জাতয় নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, সন্ত্রাস দমন, সড়ক দুর্ঘটনা, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ও প্রতিকার, পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে জনমত গঠনে সংবাদপত্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য কখনো কখনো কোনো কোনো সংবাদপত্র বিশেষ গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থে জনমতকে তাদের পক্ষে টানার জন্য সঙ্কীর্ণ উদ্দেশ্যপূর্ণ নানারকম প্রচারণার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু পাঠকসমাজ সচেতন হলে শেষ পর্যন্ত এসব সংবাদপত্রের অপপ্রচারের চেষ্টা ও হীন উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না। 

শিক্ষা-বিস্তারে ও জনমত গঠনে রেডিও বা বেতারের ভূমিকা : শিক্ষা-বিস্তারে রেডিও আমাদের নানাভাবে সাহায্য করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যার্থীরা শিক্ষালাভ করে উপকৃত হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের পঠন-পাঠনে সরাসরি কাজে লাগে এমন সব অনুষ্ঠান প্রায়ই রেডিও থেকে প্রচারিত হতে শোনা যায়। বিদ্যার্থীদের বয়স ও চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে এসব অনুষ্ঠানকে বহুলাংশে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। এছাড়া, নিরক্ষরদের মধ্যে শিক্ষা-বিস্তারে রেডিও বিশেষ সহায়ক হতে পারে। নিরক্ষরদের বয়স, জীবিকা ও মন-মানসিকতার দিকে লক্ষ্য রেখে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করলে সমাজ নানাদিক দিয়ে লাভবান হতে পারে। বর্তমানে আমাদের দেশে শিশুতোষ অনুষ্ঠানগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে ‘রেডিও টুডে’, ’রেডিও ফুর্তি’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। তবে তাদের বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে ‘বাংরেজি উপস্থাপন’ -এর কায়দা -কৌশল নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। এ দুটি মাধ্যমে শুধু বিনোদণমূলক অনুষ্ঠান, বিশেষভাবে হিন্দি, ইংরেজি, বাংলাসহ নানা ধরনের গান বাজিয়ে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করার বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। যা সমাজের কোনো উপকারে আসে না। কারণ- 

গণমাধ্যম হিসেবে রেডিওর ভূমিকা ও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি মাত্র বেতার যন্ত্রই একটা ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে নাড়া দিতে সক্ষম। ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধে বিবিসি বেতার অনুষ্ঠান শুনার জন্য ‘হাটে’র বদলে হয়ে গিয়েছিল ‘বিবিসির হাট’। ওই হাটের একটি দোকানই এই প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। বেতারযন্ত্রের শক্তিশালী ভূমিকা বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে ১৯৭১ সনে দেখেছিল ও বুঝেছিল। এক অসাধারণ আবেগ মিশ্রিত চাহিদা সৃষ্টি করেছিল একটি ক্ষুদ্র গ্রাম সম্প্রদায়ের একটি ক্ষুদ্র বেতার যন্ত্র। সেক্ষেত্রে বেতার যন্ত্র শুধুই বেতার যন্ত্র নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রেরকের বার্তা, গ্রাহকের অনুধাবন, গ্রাহক বা সাধারণ মানুষের আলোচনা ও উদ্দীপনা। এর মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিল জনমত। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের চেতনাকে করেছিল উজ্জীবিত। 

রেডিও বাংলাদেশের সবচেয়ে সহজলভ্য গণমাধ্যম। দামে অত্যন্ত সস্তা। সর্বনিম্ন একশত টাকায় একটি রেডিও পাওয়া যায়। রেডিও এমন একটি গণমাধ্যম যা যে কোনো পেশার মানুষ শুনতে পারে। রেডিও শোনার জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই। রেডিওর অনুষ্ঠান এমনভাবে করা হয় যাতে যে কোন স্তরের মানুষ রেডিও থেকে তথ্য পেতে পারে এবং বিনোদন উপভোগ করতে পারে। নানা ধরনের পেশা ও কর্মে, বিশেষভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গণমাধ্যম হিসেবে রেডিওর ভূমিকা গরুত্বপূর্ণ। বৃক্ষরোপণ, মাছ চাষ, উন্নত জাতের হাঁস মুরগী ও গবাদি পশু পালন, ছোট সংসার গঠন, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে জনগণ রেডিও শুনে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এ ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্যে 'দেশ আমার মাটি আমার’, ‘বৃক্ষ রোপণ’, ’সুযোগ চাই মানুষ হব' (শ্লোগান) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রেডিও গণযোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ২০০২ সালে জাতীয় মিডিয়া সার্ভে দেখা গেছে, শতকরা ৩০.৪ ভাগ রেডিও শোনেন। 

শিক্ষা-বিস্তারে ও জনমত গঠনে টেলিভিশনের ভূমিকা : টেলিভিশনের মাধ্যমে মানুষ চিত্ত-বিনোদনের উপকরণ ছাড়া শিক্ষার সুযোগও পেয়ে থাকে। এতে প্রচারিত হয় নাচ, গান, বাজনা, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার, নাটক, যাত্রা, সিনেমা ইত্যাদি। খেলাধুলা ও উৎসব-অনুষ্ঠানের প্রচারকে ঘিরেও দেশে দেশে এর জনপ্রিয়তা। ও বস্তুটির সঙ্গে চলমান বাস্তব জীবনের স্পর্শ জড়িয়ে আছে। বলেই আমাদের কাছে এর আকর্ষণ এতো বেশি। বস্তুত, এর সাহায্যে আমাদের তিক্ত সময়গুলো আনন্দের হয়ে ওঠে। এছাড়া, এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বহু বিচিত্র দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ পাই আমরা। কত অনুপম প্রাকৃতিক দৃশ্য, মানুষের কত মহিমাময় কীর্তি, শ্রেষ্ঠ মানুষের বাণী ও জীবন-সাধনার কত বিচিত্র পরিচয় টেলিভিশন আমাদের সামনে তুলে ধরে। উপরন্তু জাতীয়জীবনে সংহতি প্রতিষ্ঠায়, সমাজ জীবনের স্বাস্থ্য রক্ষায়, বিজ্ঞান-শিক্ষায়, সাহিত্য-চর্চায়, ধর্মীয় ও দার্শনিক মতবাদ প্রচারে শিক্ষা-বিস্তারে টেলিভিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছুদিন যাবৎ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় জীবনে এক বিরাট অবদান। 

বর্তমান বিশ্বে টেলিভিশন বিনোদন ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মানুষের মধ্যে টেলিভিশনের দর্শক সংখ্যা সর্বাধিক। ২০০২ সালের জাতীয় মিডিয়া সার্ভে থেকে দেখা যায় এ সংখ্যা ৬১%। জনমত গঠনে বেতারের মতোই টেলিভিশনের ভূমিকা অনন্যসাধারণ। কোনো বিষয়ে জনমত গঠনের লক্ষ্যে টেলিভিশনে প্রচারণা চালানো হলে তা সহজেই জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জনগণ বিচার-বিশ্লেষণ করে সে বিষয়ের প্রতি তাদের মতামত প্রদান করে। টেলিভিশনের প্রচারণা অত্যন্ত মোহনীয়। এটা বিভিন্ন অস্পষ্ট ধারণাকে সুস্পষ্টভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। যার ফলশ্রুতিতে জনমত হয়ে ওঠে প্রায়োগিক ও গতিশীল। আজকাল টেলিভিশনের নানা ধরনের টক শো বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এসব টক শোতে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সব ধরনের বিষয়েই প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। বিশেষভাবে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য কয়েকহাজার পর্বে প্রচারিত হচ্ছে চ্যানেল আই-এর ‘তৃতীয় মাত্রা’। এসব অনুষ্ঠান জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। টেলিভিশন জনমত গঠনে প্রধানত তিনটি ভূমিকা পালন করে। যথা : 
(১) জনগণের বিভ্রান্তি দূরীকরণ। 
(২) জনগণের মতামত স্পৃহাকে অধিকতর জোরালো করা এবং 
(৩) জনগণকে করে তোলে সচেতন ও আত্মপ্রত্যয়ী। 

শিক্ষা-বিস্তারে চলচ্চিত্রের ভূমিকা : সমাজ জীবনের বিভিন্ন দিকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিক্ষা-বিস্তার এক ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা নিয়ে থাকে। কোনদিন নিজের চোখে দেখা সম্ভব নয় এমন সব দৃশ্য আমরা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেখে থাকি। এ থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি তার মূল্য অনেক বেশি। আবার নানা জায়গায় ভ্রমণ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জনে সময়ক্ষেপণ, শ্রম ও অর্থের অপচয় হত- চলচ্চিত্রের সাহায্যে অতি সহজেই তা রোধ সম্ভব হয়ে থাকে। আমাদের জীবন ছোট, কিন্তু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে বিশাল। চলচ্চিত্র অল্প সময়ের মধ্যে এ বিশাল ক্ষেত্রকে জানবার সুযোগ করে দেয়। 

আমরা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আরো নানাবিধ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় কর থাকি। কোথায় কোন্ তুষারধবল দূরধিগম্য পর্বত-শিখর, সভ্য সমাজ থেকে বহুদূরে চিররহস্যে আবৃত গহন-গভীর অরণ্য, শ্বাপদসংকুল, ভয়ঙ্কর প্রমত্তা নদী, নিঃশব্দ মেরুপ্রদেশ, তপ্ত-ধূসর বালুকাস্তীর্ণ মরুভূমি, কোলাহলমুখর জনপদ -চলচ্চিত্রের কৌশলে আমরা প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন করে থাকি। এছাড়া, ঐতিহাসিক স্মৃতিজড়িত কত অপরূপ সৌধ, কত বিস্ময়কর মানুষের কীর্তি ও মহিমার কত বিচিত্র নিদর্শন আমরা প্রত্যক্ষ করে বিস্ময়াভিভূত হই। প্রকৃতি ও জীব জগতের তথ্য-চিত্রগুলো শিক্ষার এক বিশেষ ক্ষেত্র হিসেবে আমাদের কাছে চিহ্নিত। ২০০২ সালের জাতীয় মিডিয়া সার্ভে থেকে দেখা যায় দর্শকদের সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮৫ সালে সিনেমায় দর্শকের হার ছিল ১২ ভাগ, ১৯৮৮ সালে ছিল ১৭ ভাগ এবং ২০০২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ ভাগে। বর্তমানেতো আরো কমে গেছে। 

সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রভাব : 
(১) বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে গণমাধ্যমের প্রচার বৃদ্ধির ফলে, বিশেষভাবে বিদেশি গণমাধ্যমের প্রভাবে গ্রামীণ জীবনে চিরায়ত লোকজ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ পালা, পার্বণ, যাত্রা, জারি-সারি প্রায় বিলুপ্ত। 

(২) গণমাধ্যম মানুষের মনোভাব ও অভিরুচিকে প্রভাবিত করে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব তরুণ-তরুণীর মাঝে সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় এবং এর প্রভাব পড়েছে পারিবারিক আচার-আচরণে, সামাজিক চালচলনে, কথা-বার্তা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও ফাস্টফুডের ক্ষেত্রে। আজকাল তো আমাদের সমাজে ফাস্টফুডের একটা কালচারই গড়ে ওঠেছে। এমনকি ভাষার ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করছে। কথা-বার্তায় নিজের অজান্তে চলে আসছে হিন্দি ভাষা, বাংরেজি ভাষা (ভুল করে বাংলা ও ইংরেজি মিশিয়ে যে ভাষা বলা হচ্ছে)। 

(৩) গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন সত্যিকার অর্থে এ সময়কালে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মাধ্যম। টিভি দর্শনে বিষ ও অমৃত দুটোই রয়েছে। নারী হয়েছে সৌন্দর্য সচেতন, বিজ্ঞাপনের ভাষা বাজারকে করেছে প্রভাবিত। উন্নয়ন সম্পাদিত চিন্তা ভাবনা ও মতাদর্শ সাধারণ দর্শকের দোড়গোড়ায় এসেছে। নাটক ও সিরিয়াল মানবিক সম্পর্কের বহুরূপ ও রসকে উপস্থাপন করছে। ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশীয় মেয়ে শিশুদের প্রতি যত্নবান হতে মিনা কার্টুন গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গ্রামের মানুষ মিনার মাঝে খুঁজে পায় তার ঘরের বা প্রতিবেশীর বালিকা কণ্যার জীবনচিত্র। এভাবে বালিকাদের শিক্ষার প্রতি অভিভাবকরা মনোযোগী হয়। মিনার এ উদাহরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, গণমাধ্যম মানুষের মাঝে আকাঙ্ক্ষা, শিক্ষা ও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

গণমাধ্যমের বিরূপ প্রভাব : গণমাধ্যমের মধ্যে দৃশ্য মাধ্যম খুবই শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেখানে নিরক্ষর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অজ্ঞতা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ব্যাপকভাবে পরিদৃষ্টমান সেখানে দৃশ্যমাধ্যম শিক্ষামূলক না হয়ে ব্যাপকভাবে বিনোদনমূলক। বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো অত্যন্ত বিনোদন ও প্রচারধর্মী। সমাজে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। 

অবক্ষয়ে চলচ্চিত্রের প্রভাব : সিনেমার চটুল কাহিনীতে, নাচে-গানে, চলনে-বলনে, পোশাকে-আশাকে মার্জিত রুচির অভাব। সিনেমার উদ্ভট কাহিনীকে তারা অনেক সময় বাস্তব জীবন বলে ভুল করে। সেই অবাস্তব জীবন-মরীচিকার পেছনে ছুটে ছুটে তারা ক্লান্ত হয়। নিঃশেষিত হয় প্রাণশক্তি। পোশাক আশাকের অন্ধ অনুকরণে প্রকট হয় হৃদয়ের অন্তঃসারশূন্যতা। বাস্তবের রূঢ় কঠিন আঘাতে তাদের সেই স্বপ্নের পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে যায়। দুঃসহ বেদনা আর সীমাহীন দীর্ঘশ্বাসে ভরে ওঠে সেই জীবন। অধকাংশ ছায়াছবিতেই খুন-জখম, রাহাজানি-ডাকাতি, শালীনতা-বার্জিত নাচগান, নায়ক-নায়িকার উদ্দম প্রণয়চিত্র। তরুণ মনেও এর দীর্ঘ বিস্তার ছায়া। 

টিলিভিশনের প্রভাব : টেলিভিশন আধুনিক বিজ্ঞানের একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার। বর্তমানে এ টেলিভিশনের সাথে ডিশ অ্যান্টেনা সংযোগ হয়ে আমাদের ঘরে এসে গেছে বিজাতীয় সংস্কৃতি। যা আমাদের সমাজব্যবস্থার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। ফলে এসব সস্তা-বিনোদনে আকৃষ্ট হয়ে আমাদের যুবসমাজ অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। 

পত্র-পত্রিকার প্রভাব : সংবাদপত্র একটি শক্তিশালী গণযোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু আমাদের দেশে এমন কিছু পত্র-পত্রিকা আছে যা আমাদের সুস্থ জ্ঞানকে অসুস্থ করে তোলে। উদ্ভট নগ্ন-ছবি ও অশ্লীল আজগুবি কল্পকাহিনী এমনভাবে পরিবেশিত হয় যা বিদেশি অপসংস্কৃতিকেও হার মানায়। এসব নগ্ন ছবি দেখে এবং কুরুচিপূর্ণ কাহিনী পাঠ করে যুব সম্প্রদায় এগিয়ে যায় ধ্বংসাত্মক অবক্ষয়ের দিকে। 

আমাদের করণীয় : 
(১) সিনেমা সাংস্কৃতিক বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশে সিনেমার দর্শক প্রচুর। সিনেমায় যাতে অশালীণ ও উগ্র পোষাক ব্যবহৃত না হয় তা প্রতি কর্তৃপক্ষের (ফিল্ম সেন্সর বোর্ড) নজর রাখা উচিত। 

(২) মানুষের সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নে ও সভ্যতা বিকাশে গণমাধ্যম প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। ফলে গণমাধ্যমে মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তনের বিষয়গুলো বেশি বেশি প্রচার হওয়া উচিত। 

(৩) আমাদের টিভি মিডিয়ার নিজস্ব সংস্কৃতির উজ্জ্বল দিকগুলোকে আরো উজ্জ্বল করে তোলা দরকার। অনুকরণ নয়, অনুসরণ করে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ করতে হবে। 

উপসংহার : বর্তমানে বিজ্ঞান-বিদ্যার অগ্রগতির সাথে সাথে শিক্ষা-বিস্তারে গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা ক্রমেই বিশেষ অর্থবহ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে শিক্ষাসহ জাতীয় অগ্রগতিতে ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনস করবে -এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 

উৎস-নির্দেশ : 
১. গ্রাম বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে গণমাধ্যম; বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড), কোটবাড়ী, কুমিল্লা।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো ]


ভূমিকা : জনগণকে প্রভাবান্বিত করার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গণমাধ্যম। আমাদের দেশে শিক্ষার সামগ্রিক হার বিবেচনায় শিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যমগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু লোকশিক্ষা কেন, প্রথাগত শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই গণমাধ্যমগুলো শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ। এগুলো শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এগুলোর দ্বারা প্রাপ্ত শিক্ষা গ্রন্থগত শিক্ষার পরিপূরক। সুতরাং শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে এ শক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। 

গণমাধ্যম : একই সঙ্গে ব্যাপক সংখ্যক জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমকে গণমাধ্যম বলা হয়। গণমাধ্যমকে জনসংযোগের উপায় হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত গণমাধ্যমের মধ্যে জনপ্রিয় হলো রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন বা ইন্টারনেট মিডিয়া ইত্যাদি। এসব গণমাধ্যম ব্যবহার করে অনেক ঘরের মানুষের কাছেও খুব সহজেই বার্তা পৌঁছে দেয়া যায়। অবশ্য গণমাধ্যমের সহায়তায় জনগণের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ সংযোগ সম্ভব নয়। তাই তাৎক্ষণিক মতামতও পাওয়া যায় না। জনগণের ফিডব্যাক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে ক্ষেত্রেবিশেষে তাৎক্ষণিক মতামত সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যায়। গণমাধ্যম জনগণের বিনোদন মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গণমাধ্যমে কোনো দেশ, সমাজ, গোষ্ঠীর শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে। ফলে এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশে পৌঁছে যায়। 

শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে গণমাধ্যম : বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের বদৌলতে শিক্ষা-বিস্তারে বিশিষ্ট কয়েকটি ‘মাস মিডিয়া’ বা গণমাধ্যম আমাদের বিশেষ সহায়ক হতে পারে। এসব গণমাধ্যমগুলো হচ্ছে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও সিনেমা। যারা স্বল্পশিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, সংবাদপত্র তাদের শিক্ষা বা জ্ঞানবুদ্ধির পুঁজিকে বাড়ানোর শক্তি রাখে। আর রেডিও, টেলিভিশন ও সিনেমা -এ তিনটি মাধ্যম দ্বারা সম্পূর্ণ নিরক্ষররাও উপকৃত হতে সক্ষম। তবে চলচ্চিত্রে দর্শকরা নিজেদের পছন্দ বা অভিরুচি অনুযায়ী ছবি দেখে থাকে। রেডিওতে শ্রোতারা শুনে শিখতে পারে, জানতে পারে অনেক নতুন নতুন বিষয়। বিষয় নির্ধারণের সুযোগ রেডিওর ক্ষেত্রে আছে। তাই বেশিরভাগ প্রোগ্রাম নির্ধারিত থাকে বলে শ্রোতাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও বহু বিষয় শুনতে হয়। অন্যদিকে, টেলিভিশনের ক্ষেত্রে শোনার সঙ্গে সঙ্গে দেখারও বিরাট ভূমিকা থাকে বলে শিক্ষার এই গণমাধ্যমটি আজকের দিনে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এক কথায়, সংবাদপত্রের শিক্ষা পড়ে পড়ে, রেডিও শুনে শুনে, আর টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের বেলায় তা দেখেশুনে। সম্প্রতি ইন্টারনেট তথা অনলাইন মাধ্যমও শিক্ষা-বিস্তারে গণমাধ্যম হিসেবে বিশেষ কাজ করছে। 

শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র : গণশিক্ষার অন্যতম বলিষ্ঠ হাতিয়ার হলো সংবাদপত্র। সংবাদপত্র প্রতিনিয়ত অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে জনগণের কাছে বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য উপস্থাপন করে। স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সংবাদপত্র জনশিক্ষাকে সম্প্রসারিত করে। সংবাদপত্র সামাজিক চিত্র ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের তত্ত্ববহুল অসংখ্য বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরে। এটা জনসচেতনা সৃষ্টি করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার করতে হলে জনগণকে ব্যাপক ভিত্তিতে ন্যূনতম অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। 

শিক্ষা বিস্তারে বেতার : আধুনিক বিজ্ঞান-নির্ভর যুগে গণশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে বেতার। ধনীর বিশাল অট্টালিকা ও রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার দরিদ্র কুটির পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে বেতার। সুতরাং এ মাধ্যমটি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে পারে। বেতার অতি সহজেই জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারে দেশ-বিদেশের নানা খবর ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিত্যনতুন কথা। আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ শিক্ষা অনুষ্ঠানের সম্প্রচার করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়-মনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করতে পারে বেতার। দূর শিক্ষণের কার্যক্রমে বাংলাদেশেও বেতারকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। 

শিক্ষা বিস্থারে টেলিভিশন : টেলিভিশন বা দূরদর্শন বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। বিশ্বের সর্বত্রই আজ বেতারের মতো টেলিভিশনের ছড়াছড়ি। গণশিক্ষা বিস্তারে এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত এ শক্তির প্রভাব অপ্রতিরোধ্য। বেতারের সকল ঘটনাপ্রবাহ ও শিক্ষণীয় পর্ব অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে সচিত্র তুলে ধরতে পারে। টেলিভিশন। শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারের মাধ্যমে জাতি গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা ও বিস্ময়কর অবদান রাখতে পারে টেলিভিশন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জ্ঞানগর্ভ বিষয়ের পাশাপাশি গণশিক্ষা কর্মসূচি বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো বাস্তব চিত্রে উপস্থাপন করতে পারে টেলিভিশন। ঘরোয়া পরিবেশে চলচ্চিত্রের আনন্দ উপভোগের সুযোগ এনে দেয় টেলিভিশন। 

শিক্ষা বিস্তারে ইন্টারনেট : বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যেকোনো বিষয় সম্পর্কে জানা যায় মুহূর্তের মধ্যেই। কোনো অজানা বিষয় লিখে সার্চ দিলেই জানা যায় সেই বিষয়ের সব কিছু। আজকাল অনলাইনে ক্লাসরুম ভিডিও আকারে প্রকাশ করে দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরাও সেই ক্লাসে অংশগ্রহণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ইউটিউব থেকে যেকোনো বিষয়ে শিক্ষা, সংবাদ বা তথ্যচিত্র ভিডিও আকারে দেখা যায়। 

দেশাত্মবোধের জাগরণে গণমাধ্যম : শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো জনগণকে জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত করা। গণমাধ্যমগুলো শিক্ষার এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বেতার, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রসমূহ দেশের জনগণকে স্বাধীনতা ও দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত করে। দেশদ্রোহী বিভিন্ন শক্তি ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম। পাশাপাশি এটা দেশের জন্য কল্যাণকর বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরে। এজন্য বলা হয়েছে – ‘Freedom and sovereignty of people is dependent on mass media.’ 

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা : ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘Religion and culture are the two ideal power of a nation.’ ধর্ম ও সংস্কৃতি ছাড়া কোনো জাতি বেঁচে থাকতে পারে না। শিক্ষার অন্যতম দিক হলো ধর্ম ও সংস্কৃতির চর্চা। ধর্ম ও সংস্কৃতির বিস্তারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন দেশ ও জাতির আচার-আচরণ, কৃষ্টি-সভ্যতা, ধর্ম-সংস্কৃতি ইত্যাদির সচিত্র বিবরণ তুলে ধরে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সুস্থ বিকাশের মাধ্যমে আদর্শ জাতি গঠন সম্ভব। তাই গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে থাকে। পক্ষান্তরে, গণমাধ্যমগুলো যদি ধর্মের নামে অর্ধম, অনাচার ও সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির বিস্তার ঘটায় তাহলে দেশ ও জাতি এক নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। 

সামাজিক ও রাজনৈতিক জ্ঞান : যে কোনো দেশ ও জাতি সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন শিক্ষার অপরিহার্য দিক। বিশ্বের কোন রাষ্ট্র কিভাবে চলছে, কোন রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়, কোন দেশ বা জাতির সামাজিকতা কেমন ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া প্রতিটি সচেতন নাগরিকের জন্য অবশ্য কর্তব্য। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে রাজনৈতিক শক্তি কর্তৃক। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘In the modern world the earth is directed by political power’ গণমাধ্যমগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতির সামাজিক ও রাজনৈতিক জ্ঞান বিস্তারে গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। 

উপসংহার : শিক্ষার প্রভাব ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-সর্বক্ষেত্রে-সর্বজনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষার সুফল বর্তায়। গণশিক্ষার সবচেয়ে বড় ভূমিকা গণমাধ্যমের, এতে পাঠক্রম-নির্দিষ্ট গ্রন্থের স্থান নেই। কোনো ক্ষেত্রে পড়া, কোনো ক্ষেত্রে শোনা, কোনো ক্ষেত্রে যুগপৎ শোনা ও দেখার সাহায্যে গণমাধ্যম থেকে শিক্ষণীয় বিষয় মনে স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় ও কৌতূহলে আনন্দাশ্রিত হয়ে বহুজনের হৃদয়বেদ্য হয়। এক এক পশলা বৃষ্টির পানি এক এক জনপদের বিশাল অঞ্চল যেমন রসসিক্ত হয়ে শস্য-প্রসবিনী হয়ে ওঠে, অনেকটা তেমনই। ব্যষ্টি নিয়ে সমষ্টি হলেও গণশিক্ষার সমষ্টির শিক্ষাই মুখ্য। উন্নত বিশ্বে জনমত গঠন, সমাজ পরিশোধন ও মুক্ত চিন্তার বিকাশ সাধনে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অবদান পালন করে। বাংলাদেশে বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে এখনো যথার্থ মানসম্পন্নহয়ে ওঠেনি। চলচ্চিত্র নগ্নতা ও অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট। সংবাদপত্রগুলো মোটামুটি গণমুখী। তাই জাতি গঠনের ক্ষেত্রে আমাদেরগণমাধ্যমসমূহ কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

7 comments:


Show Comments