প্রবন্ধ রচনা : তোমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা

History 📡 Page Views
Published
05-Jan-2020 | 08:30 AM
Total View
103K
Last Updated
26-Oct-2025 | 05:39 AM
Today View
0

↬ স্মরণীয় ঘটনা

↬ একটি স্মরণীয় ঘটনা

↬ আমার জীবনের স্মরণীয় দিন


ভূমিকা : মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। এর মধ্যেই জীবনে ঘটে অনেক ঘটনা। সমৃদ্ধ হয় স্মৃতির ভাণ্ডার। কোনো স্মৃতি আনন্দের, কোনো স্মৃতি বেদনার। আনন্দের ঘটনাগুলো স্মৃতি হয়ে মনকে রোমাঞ্চিত করে, আর বেদনার স্মৃতিগুলো আঘাতে আঘাতে হৃদয়কে করে জর্জরিত এবং ক্ষতবিক্ষত। ছোট ছোট ঘটনাগুলো কালের আবর্তে হারিয়ে যায়, আর বড়গুলো স্মরণীয় হয়ে থাকে। এমন অনেক ঘটনা থাকে মানুষের জীবনে যা ভুলে থাকা যায় না। আমার জীবনেও এ রকম ঘটনা আছে, যা পতিনিয়ত আমাকে আঘাত হানে, কষ্ট দেয়। ঘটনাটি ঘটেছিল কয়েক বছর আগে। সে দিনটি আজো আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে।

স্মরণীয় ঘটনা : ঘটনাটি আমার শিক্ষাজীবনের সাথে জড়িত। আমি ছিলাম নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার গোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। এখান থেকে পাস করে ভর্তি হয়েছিলাম দুপ্তারা সেন্ট্রাল করোনেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে চার বছর পড়ালেখার পর রাজনৈতিক কারণে আমাকে স্কুল বদলাতে হয়েছে। ভর্তি হয়েছিলাম মদনপুরে অবস্থিত রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৯০ সালে এস. এস. সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলাম এই বিদ্যালয় থেকে। সে বছর রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আমরা এস.এস.সি পরীক্ষার্থী ছিলাম সত্তর জন। শফিক উল্লাহ নামে আমাদের একজন সহপাঠী ছিল। সে ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তার ব্যবহার ছিল অমায়িক। সকলের সঙ্গেই সে এক মুহূর্তে মিশে যেতে পারত। এটাই ছিল তার একমাত্র বড় গুণ। কিছু পড়ালেখায় অত্যন্ত দুর্বল ছিল। তার মতো অমনোযোগী ছাত্র আমি আর কোথাও দেখিনি। সে নাকি কখনোই কোনো ক্লাসের পরীক্ষায় পাস করেনি। প্রত্যেক ক্লাসেই দু’বছর ফেল করার পর শিক্ষকরা তাকে তুলে দিতেন উপরের ক্লাসে। দশম শ্রেণিতেও সে দু বছর পড়েছে। শিক্ষকদের বেতের ভয়ে সব সময় শ্রেণিকক্ষে পেছনের চেঞ্চে বসত সে। দু তিন পিরিয়ড ক্লাস চলার পর আর তার দেখা পাওয়া যেত না। হয়ত কোথাও মাছ ধরতে চলে গেছে, নয়ত কারও সাথে সিনেমায়। না হয় কখনো কোথাও মাত্রা দলের আগমন ঘটেছে শুনে সেখানে চলে গেছে সে। এই ছিল শফিক উল্লাহর চিরাচরিত স্বভাব।

শফিক উল্লাহ আমাদের সঙ্গে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছিল। শিক্ষকরা তাকে এসএসসি পরীক্ষার জন্য মনোনীত করেননি নিশ্চিত ফেলের পরিসংখ্যান বেড়ে যাবে বলে। যেদিন পরীক্ষার ফল জানানো হয়েছিল সেদিন সে স্কুলেই আসেনি। বিকেলের দিকে আমরা কয়েকজন শফিক উল্লাহদের বাড়িতে গেলাম। গিয়ে দেখলাম মন খারাপ করে বসে আসে সে। লেখাপড়ায় মনোযোগী না হলেও ফেল করার পর ভীষণ মন খারাপ করার স্বভাব ছিল তার। আমরা তাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিলাম। চিন্তা না করতে অনুরোধ করলাম। কিনউত কে শোনে কার কথা। উল্টো তার চোখ থেকে পানি নেমে এল। সে বলে, দীর্ঘদিনের স্কুল জীবনে আমরা নাকি তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। অথচ তাকে বাদ দিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় আমরা অংশগ্রহণ করব, এই বেদনা সে সহ্য করতে পারছিল না। তাছাড়া আগামী বছর থেকে নতুন সিলেবাসে পরীক্ষা দিতে হবে, তখন সমস্যা হবে আরও অনেক বেশি।

আমরা শফিক উল্লাহর বাবাকে বললাম, তিনি যেন স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন করেন ছেলেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার জন্য। ছাত্রদের পক্ষ থেকে আমরাও আবেদন জানাব। শেষ পর্যন্ত আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল। মৌখিকভাবে নানা ধরনের শর্ত আরোপ করে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল শফিক উল্লাহকে। অনুমতি পাওয়ার পর এমন আনন্দের ঝলক দেখেছিলাম তার চেহারায়, যা আর কোনোদিন কারও মুখে দেখিনি। যেন সে দু হাতে আকাশের চাঁদটাকেই পেয়ে গিয়েছিল। আমরাও তাকে বারবার চাপ দিচ্ছিলাম, শফিক উল্লাহ, ঠিকমত পড়, একটু মনোযোগী হও, এবার কিন্তু পাস করতে হবে। তা না হলে আর কখনোই তোমার পক্ষে এসএসসি পাস করা হবে না। কারণ, আগামী বছর থেকে নতুন সিলেবাসে পরীক্ষা দিতে হবে।

আমাদের পরামর্শ শফিক উল্লাহর মনে ধরেছিল। দুষ্টুমি একেবারে ছেড়ে না দিলেও পড়ালেখায় মনোযোগী হয়েছিল। বাড়িতেও পড়ত। স্কুলে এসে কোচিং ক্লাসেও নিয়মিত অংশগ্রহণ করত। পরীক্ষার পূর্বদিন পর্যন্ত তার মধ্যে আর তেমন কোনো অনিয়ম দেখা যায় নি। আমরা সকলেই খুশি হয়েছিলাম। পরীক্ষার পর সে বলেছিল, মনে হয় এবার আমি ফেল করব না-অন্তত পাস করতে পারব।

একদিন টেলিভিশনের রাতের সংবাদে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা জানানো হলো। আমার যেন তর সইছিল না, কতক্ষণে রাত শেষ হবে আর রেলস্টেশনে গিয়ে ফলাফল দেখে নেব পত্রিকায়। সারারাত ঘুম হলো না, খুবই অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে কাটলো। সকাল হতেই স্টেশনের দিকে ছুটলাম। সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখলাম আরও কয়েকজন। আমরা ব্যস্ত হয়ে ফলাফলের পাতায় চোখ বুলাতে লাগলাম। আমি তিন বিষয়ে লেটার মার্কসহ প্রথম বিভাগে পাস করেছি। অন্যান্যদের মধ্যে আরও দুজন প্রথম বিভাগ এবং বাকিরা দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছে। এবার আমরা সবাই মিলে শফিক উল্লাহর রোল নম্বর খুঁজতে শুরু করলাম। প্রথমে তৃতীয় বিভাগে খুঁজলাম। একবার দেখে যখন ফেলাম না, তখন আবার খুঁজলাম। কিন্তু পাওয়া গেল না। আমাদের মন খারা হলো। সে পাস করতে পারেনি। কতক্ষণ পর আরও একবার খুঁজলাম, না পেয়ে আমাদের একজন বলল, দ্বিতীয় বিভাগে খুঁজে দেখি না। তাই করা হলো। একজন চিৎকার করে বলল, এই যে পাওয়া গেছে, শফিক উল্লাহ দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছে। সে কী আনন্দ আমাদের! মুহূর্তে যেন নিজেদের পাসের কথা ভুলে গেলাম আমরা। সবাই মিলে ছুটে চললাম শফিক উল্লাহদের বাড়ির দিকে।

বাড়িতে ওঠেই পেয়ে গেলাম শফিক উল্লাহর বাবাকে। তিনি জানালেন শফিক উল্লাহ স্টেশনের দিকে গেছে মিনিট দশেক আগে। আমরা পত্রিকা খুলে ফলাফল দেখালাম শফিক উল্লাহর বাবাকে। তিনি হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে পারছিলেন না। শুধু একবার শফিক উল্লাহর মাকে ডেকে বললেন, তোমার ছেলে পাস করেছে। শফিক উল্লাহর মা কাছে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের পাস করার সংবাদটা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কেবল তাকিয়েছিলেন ছলছল দৃষ্টিতে। এ সময়ে খবর এলো, স্টেশনে কে যেন রেলের নিচে কাটা পড়েছে। শুনে আমরা ছুটে গেলাম স্টেশনের দিকে।

মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। লোকজনকে ঠেলে ঠেলে আমি ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম, শফিক উল্লাহর দ্বিখণ্ডিত দেহটি পড়ে আছে নিথর হয়ে। চোখ দুটো তখনো তাজা। তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। আমার চিৎকার দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু পারছিলাম না। একটু পরেই পুলিশ এসে কাটা লাশ নিয়ে গেল রেলওয়ে থানায়। জানানো হলো, আপাতত লাশ দেওয়া হবে না। তারপর ডায়রি লেখা হলো। শফিক উল্লাহ কীভাবে মারা গেল, বিস্তারিতভাবে লেখা হলো ডায়রিতে। লাশ দেওয়ার দাবি জানিয়ে ব্যর্থ হলাম আমরা।

অবশেষে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলাম। অনেক কথা কাটাকাটির পর কর্তৃপক্ষ রাজি হলেন এক শর্তে, আমাদের সকলের স্বাক্ষরসহ লিখে দিতে হবে যে, ভবিষ্যতে এর জন্য রেলওয়েকে দায়ী করা যাবে না। আমরা তাই করলাম। তারপর শফিক উল্লাহর লাশ নিয়ে হাজির হলাম বাড়িতে। প্রথমেই চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন শফিক উল্লাহর মা। কান্নাকাটি শুরু করল ভাইবোনেরা। সে কী কান্না! শফিক উল্লাহর বাবা কোনো শব্দ করলেন না। শুধু তাকিয়ে ছিলেন বোবা মানুষের মতো। চোখে কোনো পানি ছিল না। হয়তো অতি শোকে তিনি পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। এমন ‍দৃশ্য আমি আর কখনো দেখি নি। দিনটি আমার কাছে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।

উপসংহার : শফিক উল্লাহর আত্মহত্যা ছিল সত্যিই এক মর্মান্তিক ঘটনা। সে সবসময় পরীক্ষায় ফেল করত। তার ধারণা ছিল এস.এস.সি পরীক্ষায় সে পাস করতে পারবে না। তাই সে ফলাফল প্রকাশের সংবাদ শুনেই ফেলের কথা ভেবে আত্মহত্যা করেছিল রেলগাড়ির চাকার নিচে পড়ে। এটা আমার জীবনে সবচেয়ে মর্মান্তিক স্মরণীয় ঘটনা।


Sribas Chandra Das

Sribas Chandra Das

Founder & Developer

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং পরিচালক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts

Facebook Messenger WhatsApp LinkedIn Copy Link

✅ The page link copied to clipboard!

Leave a Comment (Text or Voice)




Comments (6)

Guest 20-Nov-2024 | 10:54:31 AM

Thank bro this syit is so good ♡

Guest 05-Nov-2023 | 02:11:10 PM

ভালো হয়েছে

Guest 07-Jul-2022 | 07:24:54 PM

এই হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।

Guest 31-Jul-2021 | 03:34:51 PM

আমি খুশি কিছু খুঁজছিলাম, তারপর দুর্ঘটনাক্রমে এটি খুঁজে পেয়েছি

Guest 17-May-2020 | 04:18:13 PM

ভালো

Guest 09-Mar-2020 | 05:03:37 AM

খারাপ নয়

SSC রুটিন
২০২৬
আর মাত্র ৫৭ দিন বাকি
বাংলা-১ম পত্র
২১ এপ্রিল ২০২৬ | মঙ্গলবার
আর মাত্র ৫৯ দিন বাকি
বাংলা-২য় পত্র
২৩ এপ্রিল ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
আর মাত্র ৬২ দিন বাকি
ইংরেজি-১ম পত্র
২৬ এপ্রিল ২০২৬ | রবিবার
আর মাত্র ৬৪ দিন বাকি
ইংরেজি-২য় পত্র
২৮ এপ্রিল ২০২৬ | মঙ্গলবার
আর মাত্র ৬৬ দিন বাকি
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
৩০ এপ্রিল ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
আর মাত্র ৬৯ দিন বাকি
গণিত
০৩ মে ২০২৬ | রবিবার
আর মাত্র ৭১ দিন বাকি
বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়
০৫ মে ২০২৬ | মঙ্গলবার
আর মাত্র ৭৩ দিন বাকি
ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা
০৭ মে ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
আর মাত্র ৭৬ দিন বাকি
পদার্থবিজ্ঞান / ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা / ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং
১০ মে ২০২৬ | রবিবার
আর মাত্র ৭৭ দিন বাকি
ভূগোল ও পরিবেশ
১১ মে ২০২৬ | সোমবার
আর মাত্র ৭৮ দিন বাকি
কৃষি / গার্হস্থ্য / অন্যান্য
১২ মে ২০২৬ | মঙ্গলবার
আর মাত্র ৭৯ দিন বাকি
হিসাববিজ্ঞান
১৩ মে ২০২৬ | বুধবার
আর মাত্র ৮০ দিন বাকি
রসায়ন / পৌরনীতি / ব্যবসায় উদ্যোগ
১৪ মে ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
আর মাত্র ৮৩ দিন বাকি
উচ্চতর গণিত / বিজ্ঞান
১৭ মে ২০২৬ | রবিবার
আর মাত্র ৮৬ দিন বাকি
জীববিজ্ঞান / অর্থনীতি
২০ মে ২০২৬ | বুধবার