প্রবন্ধ রচনা : নদীতীরে সূর্যাস্ত

Article Stats 📡 Page Views
Reading Effort
837 words | 5 mins to read
Total View
12.5K
Last Updated
26-Feb-2026 | 03:03 PM
Today View
0

↬ নদীর তীরে সূর্যাস্ত


গিয়েছিলাম আলমডাঙা, আমার মামার সাথে তাঁর শ্বশুববাড়িতে। ছায়া সুনিবিড় ছোট্ট শান্ত গ্রাম- যেন শিল্পীর নিপুণ তুলির আঁচড়। গ্রামের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে শান্ত গ্রামের মতোই শান্ত নদীটি।

দুপুরে দারুণ ভূরিভোজ সেরে একচোট ঘুমিয়ে নিলাম। বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম গ্রামের পথে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে একসময় চলে এলাম আশ্চর্য সুন্দর নদীটার কাছে। সূর্য তখন পশ্চিম আমাকে ঢলে পড়েছে। নদীতীরে ফুটে রয়েছে অসংখ্য কাশফুল। শেষ বিকেলের সূর্যের সোনালি আলোর ছোঁয়ায় ধবধবে সাদা ফুলগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, মাথায় যেন সোনার মুকুট পরেছে ওরা।

শেষ বিকেলের আলো মেখে পৃথিবী যেন ক্লান্ত, অবসন্ন। অল্প হিমেল হাওয়া কাঁপছে নদীর জল। মধ্যাহ্নের তীব্র রুক্ষ্ম তেজ মিলিয়ে এল বিকেলের নিবিড় শান্ত প্রশান্তিতে। মনে হলো, পৃথিবী যেন এখন একটু বিশ্রাম খুঁজছে। পাখিরা নীড়ে ফিরছে, তাদের ডানায় সোনালি আলোর পরশ।

এই নদীর জলটা অদ্ভুত নীল। শরতের নীলাকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ। তারই ছায়া পড়েছে নীল জলে; সেই সাথে রক্তলাল সূর্যের রক্তিম আভা- যেন এক মায়াবী ইন্দ্রজাল- যেন চারিদিকে ঝরে পড়ছে রাশি রাশি সোনা।

চারিদিকে অপরূপ কনে দেখা আলো। সেই আলোয় অবগাহন করে অপার বিস্ময়ে আমি দেখছি সৃষ্টির অপূর্ব রূপ। সারাদিনের দীপ্তি ছড়ানো প্রবল তেজী সূর্য বিদায় বেলায় যেন লজ্জাবনত, কোমল। ভয়ঙ্কর সুন্দরের মাঝেও যে কোমলতা লুকিয়ে থাকে এ যেন তাই প্রতিরূপ।

নদীর বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে দু-একটা পালতোলা নৌকা। দূরের নৌকো থেকে ভেসে আসছে মাঝির কণ্ঠের ভাটিয়ালি গান- ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না ’। দূরের মেঠো পথ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলছে গরুর গাড়ি, হাট থেকে ফিরছে হাটুরে। কিন্তু সবাই কেমন চুপচাপ, সবার মধ্যেই যেন ঘরে ফেরার তাড়া। সন্ধ্যার এই সোনালি আবিরমাখা মায়াময় মুহূর্তে সবাই যেন মৌনী তাপস। শুধু পাখিদের কাকলি আর দূরে ক্ষীণ একটা যান্ত্রিক আওয়াজ পাওয়া যায়। মনে হয় অনেক দূরের রাস্তায় চলাচলকারী কোন গাড়ির শব্দ।

সূর্য অস্ত যায় যায়। যাবার আগে শেষবারের মতো সূর্য যেন পৃথিবীর বুকে পাঠিয়ে দিচ্ছে কিছু রক্তিম রশ্মি। মনে হয়, এই নদীর দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ একটা মঞ্চ। সূর্য দূর থেকে তার ওপর আলোকসম্পাত করছে, পালন করছে খেয়ালি অথচ নিপুণ এক কোরিওগ্রাফারের ভূমিকা। দূরের গাছপালাগুলোর মধ্যে ঝির ঝির করে বইছে শেষ বিকেলের হাওয়া। নারকেল গাছগুলোর পেছনকার আকাশ হয়ে উঠল সোনালি। শেষ বিকেলের আলোর অপূর্ব রূপছটা দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। এত সুন্দর। এত অপূর্ব। এ সৌন্দর্যকে ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই।

কণে দেখা সোনালি আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর রঙ এখন ধূসর। সূর্য যেন কিছুটা ম্লান। ধীরে ধীরে আলো কমে আসছে। আর একটু পরেই নদীর জলে টুপ করে ডুবে যাবে সূর্যটা। এমনি এক সন্ধ্যায় বুঝি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :
                                        সন্ধ্যা হয়ে আসে,
সোনা-মিশেল ধূসর আলো ঘিরল চারিপাশে।
নৌকাখানা বাঁধা আমার মধ্যিখানের গাঙে;
অস্তরবির কাছে নয়ন কী যেন রঙ মাঙে।
সূর্যটাকে এখন পরিপূর্ণ রক্তিম চাঁদ বলে ভ্রম হয়। পাখিদের কাকলি থেমে গেছে। অসীম আকাশের সীমানায় যে যার নীড়ের খোঁজে উড়ে চলেছে। তাদের ঢানায় ঠিকরে পড়েছে ডুবন্ত সূর্যের সোনালি ছটা। নদীর জলে রক্তিম সূর্যের প্রতিবিম্ব এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে অনেক দূরে। চেনা পৃথিবীটাকে মনে হচ্ছে অনেক বেশি অচেনা। আমার মনে হলো, আজ, এই প্রথম বুঝি পৃথিবীর বুকে সূর্যাস্তের ক্ষণটি এল। আলের সঙ্গে আকাশ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আমার মনে পড়ে গলে, রবি ঠাকুরের কবিতার আরও কয়েকটি লাইন :
আলোর সঙ্গে আকাশ যেথায়
এক হয়ে যায় মিলে                
                      শুভ্রে এবং নীলে
তীর্থ আমার জিনেছি এখনানে               
অতল নীরবতার মাঝে অবগাহন স্নানে।
একসময় নদীর জলে হারিয়ে গেল সূর্যটা। নেমে এল সন্ধ্যা। পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিল কোলাহলমুখর একটি দিন। ঝোপ-ঝাড় থেকে লতাপাতার বুনো গন্ধ ভেসে আসছে; ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। দাঁড় টেনে টেনে এই মাত্র ঘাটে ভিড়ল একটা নৌকা। পশ্চিম আকাশটা এখন নীল হয়ে আছে। নদীর পাড়ে এ এক আশ্চর্য সন্ধ্যা। চারপাশে আলো-আঁধারি পরিবেশ। দূরের ধান ক্ষেত, আরও দূরের গাছপালা মিলিয়ে যাচ্ছে আবছা অন্ধকারে। আকাশ যেন দুরের অন্ধকারের আঁচল বিছিয়ে এগিয়ে আসছে নদীর ওপর দিয়ে। আঁধারের কালো পর্দা ঠেলে আকাশ আর প্রকৃতির এই এক হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা অপূর্ব। প্রকৃতির এক বিশাল, প্রশান্ত ও অবাধ বিস্তারের মধ্যে স্তব্ধ নীরবতার এ এক অদ্ভুত অনুভব। ক্রমে আঁধারে চারপাশ অস্পষ্ট হয়ে এল। নদী শান্ত পটভূমিতে আমার মনে একটু আগে দেখা অপরূপ সৌন্দর্যটুকু হারিয়ে ফেলার জন্য এক ধরনের বেদনা অনুভব করলাম। আশ্চর্য এই আলো-আঁধার, এই আকাশ-মাটির মধ্যে রয়েছে কী অপরূপ মায়া, কী গভীর প্রশান্তি, কী অপরিসীম সৌন্দর্য! আজ নদীর পাড়ে এসে সেই সূর্যাস্ত না দেখলে তা কি আমি অনুভব করতে পারতাম। অন্যরকম এক ভালো লাগা নিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবার ফিরতে হবে।

পৃথিবীর বুকে প্রতিদিন সূর্যোদয় হয়, আসে সূর্যাস্তের ক্ষণ। শহুরে যান্ত্রিকতায় কখনই তা মনে-প্রাণে অবলোকন করার অবকাশ মেলে না। শহরে ইট-কাঠ দালানের ফাঁকে সূর্যাস্ত আর নদীতীরের সূর্যাস্তের মধ্যে যোজন যোজন ফারক। আজ যেন আমার সামনে উন্মোচিত হলো নতুন এক দিগন্ত। আকাশের লাল রঙটা মিলিয়ে গিয়ে চারিদিকে নেমে এল আঁধার। জোনাকির আলোয় পথ চিনে চিনে বাড়ি ফিরে এলাম মনের পর্দায় বার বার উঁকি দিতে থাকল একটু আগে দেখা সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্যগুলো।


💎 উপরের লিখাগুলো ওয়ার্ড ফাইলে সেভ করুন!

মাত্র 10 টাকা Send Money করে অফলাইনে পড়ার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য উপরের লিখাগুলো Microsoft Word ফাইলে ডাউনলোড করুন।

Download (.doc)

Sribas Ch Das

Founder & Developer

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং পরিচালক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts

Facebook Messenger WhatsApp LinkedIn Copy Link

✅ The page link copied to clipboard!

Leave a Comment (Text or Voice)




Comments (0)

Old Taka Archive (ota.bd)

✓ ১০০% আসল নোটের নিশ্চয়তা