বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : সমাজ জীবনে দুর্নীতি

↬ দুর্নীতি ও সমাজ

↬ দুর্নীতি ও অপচয়

↬ বাংলাদেশের দুর্নীতি : কারণ ও প্রতিকার


ভূমিকা : সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়া সর্বগ্রাসী দুর্নীতির ভয়াল কালো থাবায় বিপন্ন আজ মানবসভ্যতা। এ সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ জর্জরিত। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। ‘দুর্নীতিতে শীর্ষে বাংলাদেশ’ এটি ছিল গত কয়েক বছরের দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রধান শিরোনাম। সাফল্যের সংবাদে কে না উল্লসিত হয়! কিন্তু নেতিবাচক জাতীয় জীবনে এমন কিছু সাফল্য আসে যা জাতিকে বিষণ্ণ করে। আমাদের জাতীয় জীবনে নেতিবাচক সাফল্য সম্পর্কিত এমনতর একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর একটি রিপোর্টে। এই রিপোর্টে ২০০১ থেকে ২০০৫ এ পাঁচ বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আঠার কোটি মানুষের ললাটে দুর্নীতির কলঙ্ক তিলক এঁকে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে প্রথম হতে পারার গ্লানি বড়ই বেদনাদায়ক। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল বহু ত্যাগ-সংগ্রামের পর। কিন্তু হায়! বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের এহেন লজ্জাকর ও বিপর্যস্ত চিত্র উন্মোচিত হবার পর আমাদের বিগত পঁয়তাল্লিশ বছরের অর্জিত সব কিছুই ম্লান হয়ে গেছে। একবার নয়, পর পর পাঁচবার দুর্নীতিবাজ জাতি হিসেবে এই পরিচিতি, সারাবিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, হুমকির সম্মুখীন করেছে জাতীয় অস্তিত্বকে। আমরা বিশ্ববাসীর সামনে নবপ্রজন্মের জন্য কি ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছি? আগামী প্রজন্মের জন্য কী এক অনিশ্চিত ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎই না রচনা করেছি!

দুর্নীতি কী? : দুর্নীতি শব্দটির অর্থ হল নীতিবিরুদ্ধ, কুনীতি, অসদাচরণ। স্বাভাবিকভাবে যা নীতি সমর্থিত নয় তাকেই আমরা দুর্নীতি বলি। এভাবেই বলা যায়, মানুষ যখন স্বেচ্ছাচারিতার প্রকাশ ঘটিয়ে অন্যায়ভাবে নীতিকে লঙ্ঘন করে কোনো কাজ করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে তাই দুর্নীতি। বস্তুত দুর্নীতি একটি ব্যাপক ও জটিল প্রত্যয়। দুর্নীতির গতিপ্রকৃতি বহুমুখী এবং বিচিত্র বলে এর সংজ্ঞা নিরূপণ জটিল কাজ। দুর্নীতি সমাজের প্রচলিত নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী বিশেষ ধরনের অপরাধমূলক আচরণ। দুর্নীতির সাথে পেশা, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, পদবী প্রভৃতি অপব্যবহার সংশ্লিষ্ট। Social Work Dictionary দুর্নীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে : ‘রাজনৈতিক ও সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতি বলতে অফিস-আদালতকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অপব্যবহার করাকে বোঝায়। সাধারণত ঘুষ, বলপ্রয়োগ বা ভয়প্রদর্শন, প্রভাব এবং ব্যক্তিবিশেষকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে গণ প্রশাসনের ক্ষমতা অপব্যবহারের দ্বারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনকে দুর্নীতি বলে।’

দুর্নীতি ও বাংলাদেশ (সমাজের সর্বস্তরের দুর্নীতির চিত্র) : দুর্নীতি শব্দটি আমাদের প্রাত্যহিকতার সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সামাজিক জীবনে প্রতিদিনই আমরা কোন না কোন দুর্নীতির খবর জানছি, শুনছি এবং পড়ছি। আমাদের দেশের এমন কোনো পর্যায় নেই যেখানে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে নি। সরকার থেকে শুরু করে আমাদের পারিবারিক জীবন এমন কি ব্যক্তি জীবনে পর্যন্ত দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে মারাত্মকভাবে। বাংলাদেশ আজ সীমাহীন দুর্নীতির আবর্তে নিমজ্জিত। এই দুর্নীতি রয়েছে সর্বত্র : ঋণ নিয়ে বেমালুম হজম করে ফেলা, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস চুরি, চাকরির নামে প্রতারণা ও হয়রানি করা- দুর্নীতি কোথায় নেই? এমনকী দুঃস্থ মাতাদের গম নিয়ে, এতিমখানায় এতিমদের বস্ত্র নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে। পরীক্ষার আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি অতঃপর পরীক্ষার হলেও দুর্নীতি আধিপত্য বিস্তার করেছে। ভাবা যায় না, মেধা তালিকায় স্থান নির্ধারনেও চলে দুর্নীতি। সরকার দুর্নীতি দমন সংস্থা করেছেন দুর্নীতি সামাল দিতে। কিন্তু দুর্নীতির ভূত সেখানেও আসর গেড়েছে। অসহায় মানুষ যেখানে ন্যায়বিচার আশা করে, সেই বিচার ব্যবস্থায় আইনের শাসনের হাত-পা ভেঙে দিয়েছে দুর্নীতি।

বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে এক নম্বর দেশ হিসেবে টিআই -এর জরিপে প্রথমবারের মতো চিহ্নিত করা হয় ২০০১ সালে। এ সময় টিআই মোট ৯১টি দেশের প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করে। ৯১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ছিল ৯১। অর্থাৎ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলা হয়। টিআই রিপোর্ট ছাড়াও কে না জানে বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন ব্যবস্থার অব্যাহত দুর্নীতির কথা? সরকারি অফিস-আদালত যেমন ভূমি প্রশাসন, কাস্টমস ও কর সংগ্রহ ব্যবস্থা, পুলিশ, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন এবং শিক্ষা এমনকি কোর্টকাচারির সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অপ্রতিরোধ্য দাপট! ২০০৩ -এর শুরুতে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে পরিচালিত এক জনমত জরিপের উপর ভিত্তি করে রচিত, ‘বাংলাদেশ : ইমপ্রুভিং গভর্নেন্স ফর রিডিউসিং পোভার্টি’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও প্রশাসনে কর্তব্যবোধের অভাব, অদক্ষতা, দুর্নীতি, সরকারি সেবার অত্যন্ত নিম্নমান এবং জনগণকে সেবা প্রদানের ব্যাপারে প্রশাসনের অমনোযোগ ইত্যাদির এক হতাশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটে উঠেছে (প্রথম আলো, ১০-০১-০৩)। অথচ আমাদের সংবিধানের ২১ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ কিন্তু উল্লিখিত বাস্তব চিত্র সংবিধানে বর্ণিত ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণের’ [অনুচ্ছেদ ৭(১)] দুর্বিষহ ভোগান্তি ছাড়াও প্রতিবছর দুর্নীতির কারণে সরকারের অপচয় হয় ১১,২৫৬ কোটি টাকা (দৈনিক যুগান্তর, ২৩-০৯-০২)। সম্প্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের বিশ্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সমীক্ষায় দেখা যায় বাংলাদেশে ব্যবসারত অধিকাংশ কোম্পানি মনে করে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার পরিবেশ উন্নয়নে দুর্নীতি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। টিআই -এর অপর এক তথ্যানুসন্ধ্যানী গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পেশকৃত ৭৭০টি অডিট রিপোর্টের মধ্যে ৬২৯টি আলোচিত না হওয়ায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি ঝুলে আছে। এছাড়াও দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৬০,০০০ কোটে টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে থাকে বলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারাকাত এক গবেষণা সমীক্ষায় উল্লেখ করেছেন (বিবিসি, ২৬-০৯-০৩)। দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হলে তা দিয়ে শিশু ও প্রসূতির চিকিৎসা, আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মেরামত ও জনকল্যাণে ব্যয়ের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে দেশটা যেমন অনেকদূর এগিয়ে যেত, তেমনি দাতাদের উপর আমাদের নির্ভরশীলতাও অনেকটা কমে আসত। জাতীয় জীবনের গভীরে প্রোথিত এহেন জাতীয় সমস্যার সমাধানের সুস্পষ্ট কোনো দিক নির্দেশনা নেই! তবে সবাই এ কথা স্বীকার করেছেন যে, জাতীয় জীবনীশক্তি বিনাশকারী এই ভয়াবহ মহামারী হতে জাতিকে রক্ষা পেতে হলে ‘সামাজিক আন্দোলনে’র প্রয়োজন।

দুর্নীতি ও দেশের ক্ষতি : বাংলাদেশে দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তার এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ অন্যান্য ক্ষতির বিশালতার কারণে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞগণ দুর্নীতিকে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ছে এও নতুন কথা নয়। তবু দুর্নীতি কমছে না। দিন যতই যাচ্ছে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তত বেশি প্রবেশ করছে। সমাজে সৃষ্টি করছে চরম অস্থিতিশীলতা। দুর্নীতির কারণে সামাজিক ভারসাম্যের নষ্টের ফলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী দুষ্ট ক্ষতের। বিভিন্ন উৎসে প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে কয়েকটি খাতে বছরে ক্ষতি হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯ জুলাই, ২০০৫) এই খাতগুলোর মধ্যে আছে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পেট্রোলিয়াম, সরকারি ক্রয়, ঘুষ, বন্দর অব্যবস্থাপনা, বিমান খাত ও ব্যাকিং খাত প্রভৃতি। এছাড়া এজিবি অফিসের অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিগত ৩৫ বছরে বাংলাদেশে ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
  • প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশে যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশের কম লোক বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে বছরে বিদ্যুৎ চুরি হয়ে থাকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার। চুরি ছাড়াও সিস্টেম লসের কারণে বিদ্যুৎ খাতে ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে আরো ৫০০ কোটি টাকার। বিদ্যুৎ চুরি কিংবা সিস্টেম লস ছাড়াও বিদ্যুৎ সুবিধা বঞ্চিত হওয়ায় আরো ক্ষতি সাধিত হয়। বিশেষ করে শিল্প খাতে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু বিদ্যুৎ সুবিধার অপ্রতুলতার কারণে অর্থাৎ লোডশেডিং, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে শিল্পের উৎপাদন খাতে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।
  • বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি গ্যাস খাতেও ব্যাপক লোকসান হয়ে থাকে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস খাতে সিস্টেম লস হয়ে থাকে বছরে ৫০০ কোটি টাকা।
  • পেট্রোলিয়াম খাতে শুধু পাচারের কারণে ক্ষতি হচ্ছে বছরে ৪০০ কোটি টাকা।
  • সরকারি ক্রয়েও দুর্নীতি হয়ে থাকে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সরকারি ক্রয়ে বছরে দুর্নীতি হচ্ছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
  • ঘুষের কথাতো আছেই। ঘুষ প্রদান ছাড়া ফাইল নড়ে না -এও নতুন কথা নয়। উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলেন, এক সময় ঘুষের প্রতি এতই অনীহা ছিল যে, যে চাকরিতে ঘুষের সুযোগ থাকতো, সামাজিকভাবে ঐ ধরনের চাকরি কর্মরতদের সঙ্গে সামাজিক বন্ধনেও অনীহা ছিল। এখন অনীহা বদলে দেখা যায় উপরি আয়ের কথা চিন্তা করেই আত্মীয়তার ক্ষেত্রে অনেকেই এগুচ্ছে। নৈতিকতার প্রতি মানুষের আন্তরিকতা যেন আর থাকছে না। সমাজে এ ধরনের নৈতিক স্থলনে ফলে, সংজ্ঞাভেদে বাংলাদেশে এখন ঘুষের লেনদেন হয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক ১৯৯৫ সালের ‘সাহায্য স্মারক’ প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে মোট লেনদেনের শতকরা ৭ ভাগ ঘুষ দিতে হয়।
  • চট্টগ্রাম বন্দর অব্যবস্থাপনায় বছরে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা যা দেশের গার্মেন্টস খাতে আহরিত নীট আয়ের প্রায় সমান।
  • দুর্নীতি অপচয়ের আরেকটি খাত বিমান পরিবহণ খাত। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিমান খাতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিমানের অদক্ষতার কারণে বিদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর কাছে।
  • রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা।
  • ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতার কারণে লোকসান হচ্ছে ৮০০০ কোটি টাকা।
  • এছাড়া প্রতি বছর হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে উৎপাদনে ও রপ্তানির ক্ষেত্রে কয়েক হাজার কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে।
  • পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে গত সাড়ে তিন দশকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সাহায্য এসেছে তার মাত্র ২৫ ভাগ উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৭৫ ভাগই দুর্নীতিবাজ শাসক, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পকেটে গেছে। (সূত্র : উপরের সব কটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯ জুলাই, ২০০৫)
দুর্নীতির অন্যান্য প্রভাব : দুর্নীতি আরো বিভিন্নভাবে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। যেমন :
  • প্রশাসনিক দক্ষতা হ্রাস করে।
  • জনগণের বিড়ম্বনা বৃদ্ধি করে।
  • সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করে।
  • জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
  • সরকারের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য হ্রাস করে।
  • আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
  • মূলধন গঠন ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে।
  • সামাজিক নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও সন্ত্রাস বৃদ্ধি করে।

দুর্নীতি দমন আইন : আমাদের দেশে দুর্নীতিবিষয়ক যেসব আইন রয়েছে তার মধ্যে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭’ এবং ‘দুর্নীতি দমন আইন ১৯৫৭’ উল্লেখযোগ্য।

দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ : সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে ঘুষ ও দুর্নীতিতে জড়িত হতে না পারে তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই আইনটি করা হয়। এই আইনের আওতায় কেউ এ জাতীয় অপরাধ করলে সাত বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড কিংবা অর্থদণ্ড অথবা কারো ও অর্থ উভয় দণ্ডে দণ্ডীত হবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৫৭ : এই আইনে বিধান রয়েছে যে, সরকার যদি তথ্য প্রাপ্তির পর অনুসন্ধান চালিয়ে চিশ্চিত হন যে, কোন ব্যক্তি তার নিজস্ব কোন প্রতিনিধির নিকট এমন পরিমাণ অর্থ কিংবা সম্পদ রয়েছে যা ঐ ব্যক্তির জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৩ : দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে একটি ‘স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন’ গঠনের জন্য ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৩’ গঠন।

বর্তমান সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ : আশার কথা যে, বর্তমান সরকার সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদে বিশেষ অভিযান শুরু করেন। অবৈধ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতা অপব্যবহারে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে সাবেক প্রধান মন্ত্রী (খালেদা জিয়া), মন্ত্রী, সাংসদ, আমলা থেকে শুরু করে হাতেনাতে গ্রেফতার হয়েছে অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী। রাজউক, চউক, পিডিবি, ডেসা, ক্রীড়া পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগ, ওষুধ প্রশাসন, শিক্ষা ভবন, পিএসসি. পুলিশ বিভাগ, ব্যাংক, আয়কর বিভাগ, বন বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরে চলানো হচ্ছে শুদ্ধি অভিযান। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনকে একা কার্যকর ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া হয়েছে। দেশব্যাপী যৌথবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে জঙ্গি তৎপরতা, সর্বহারা তৎপরতা, বিচ্ছিন্ন সংঘাত-সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যহত থাকলে সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমাদের করণীয় : উল্লিখিত আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, দুর্নীতির মতো জাতির অর্থনীতি ধ্বংসকারী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের গভীরে প্রোথিত একটি অবিনাশী ব্যাধি। এই সমস্যার সমাধানে সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন। একা সরকারের পক্ষে এর সমাধান সম্ভব নয়। কেননা, জনগণের পক্ষ হতে সহযোগিতা না পেলে সরকারি শাসকগোষ্ঠীর কর্মকর্তারা দুর্নীতি করতে পারে না। অতএব, এই আন্দোলনে সরকার ও সুশীল সমাজের সম্মিলিত প্রয়াস অপরিহার্য। এজন্য আমাদেরকে যা যা করতে হবে তা হল :
(১) বিচার বিভাগের কক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে।
(২) আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
(৩) স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে।
(৪) বর্তমানে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও অন্যান্য নিবৃত্তিমূলক যে সকল আইন বলবৎ রয়েছে সেগুলো বাতিল করতে হবে।
(৫) সাংবিধানিক বা গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
(৬) সাংবিধানিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যবস্থায় বহুদলীয় গণতন্ত্র থাকে বলে সরকারের পক্ষে একনায়ককের ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয় না।
(৭) জনগণের সমর্থনের উপর সরকারের ক্ষমতায় আসা নির্ভর করে বলে সরকার আইনের শাসন নিশ্চিত করার মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে।
(৮) মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
(৯) ধর্মীয় বিশ্বাসকে উজ্জীবিত করতে হবে।

এছাড়া মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করার ব্যাপারে কতিপয় আচরণবিধি প্রণয়ন ও কার্যকর করার ব্যাপারে নিম্নোক্ত তিনটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে :

প্রথমত : সমাজতত্ত্ববিদ, মনোবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন, যা দুর্নীতিপ্রবণতার কারণসমূহ চিহ্নিত করবে এবং এসবের প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করবে।

দ্বিতীয়ত  : দুর্নীতির প্রবণতা প্রতিরোধে প্রেরণাদীপ্ত কতিপয় নৈতিক বিধিমালা প্রণয়ন এবং তা জাতীয় শিক্ষা ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সূচিতে আন্তর্ভুক্তকরণ।

তৃতীয়ত : দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রণীত নীতিমালাসমূহ সরকারি কর্মে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা। এছাড়াও জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাসে ট্রেনে, শপিং সেন্টার, নাটক-সিনেমা, চিত্রকলা এবং অফিস-আদালত সর্বত্রই উচ্চারিত হবে আমাদের স্লোগান :
‘ঘুষ নেব না, ঘুষ দেব না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না।’

উপসংহার : রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগে আকাশচুম্বি সমস্যারও যে সহজ ও দ্রুত সমাধান সম্ভব তার সাম্প্রতিক প্রমাণ হচ্ছে ‘পলিথিনমুক্ত বাংলাদে’‘দূষিত বায়ুমুক্ত ঢাকা নগরী’বিশ্বায়নের এই তীব্র প্রতিযোগিতার ‍যুগে আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশীরা দুর্নীতির কারণে এভাবে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারি না। আমাদের স্রষ্টা প্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও জাতিকে উজ্জীবিত করার শক্তিশালী আদর্শ। শুধু প্রয়োজন সুচিন্তিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ। ‘ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ’ গঠনের অঙ্গীকার ও ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হউক আমাদের হাজার মাইল পদযাত্রার পথম পদক্ষেপ।

No comments