বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : কলেজ জীবনের স্মৃতি

↬ আমার কলেজ জীবন

↬ কলেজ জীবনের দিনগুলি


যেদিন শিক্ষার্থী হিসেবে কলেজে প্রথম পা রাখলাম সেদিনই অনুভব করলাম আমার সোনালি কৈশোরের ইতি হলো আজ। স্কুল জীবনের গুণ্ডি পেরিয়ে কলেজের গুণ্ডি -এ যেন হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া। 

দেশের নামজাদা বিশালায়তন বা বিপুল ছাত্র সমৃদ্ধ কোন কলেজে পড়ার সুযোগ আমার হয় নি। গৃহশিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল ছাত্র-ছাত্রী কলেজে অনিয়ন্ত্রিত হুল্লোড়ে সময় কাটাচ্ছে, রাজনীতির হাতছানি চোখের সামনে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে-এই বিষয়গুলোর অীভজ্ঞতা থেকে আমি বঞ্চিত। চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে রাঙামাটির পথে বেশ কিছুদূর গেলে যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, তারই এক প্রান্তে আমাদের নাতিদীর্ঘ কলেজ-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। ছাত্র-শিক্ষক সংখ্যা যদি কৌলিন্যের একমাত্র মাপকাঠি হয়তবে আমরা পশ্চাৎপদ। প্রতি ব্যাচে অনধিক দেড়শ’ ছাত্র এবং প্রতি বিষয়ে এক বা দুজন শিক্ষক। তবে প্রকৃতি এখানে উদার হাতে ঢেলে দিয়েছে তার অফুরন্ত সৌন্দর্য। আর অন্য সব দিক দিয়ে কলেজটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শহরের বাইরে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যে কোন দুর্নীতির কলুষমুক্ত থেকে উন্নত শিক্ষা বিতরণ এর অনন্য বৈশিষ্ট্য। 

কলেজের দালান নিয়ে গর্ব করার সুযোগ নেই। পুরোনো দিনের সারিবদ্ধ কামরা, সামনে প্রশস্ত বারান্দা, তারও সামনে সুপরিসর মাঠ। বেষ্টনীর বন্ধতা নেই, অনতিদূরে পাহাড়ের সারি আর অসংখ্য গাছপালা। খুব সহজেই যে কারো নজর কেড়ে নেয়। চারিদিক শুধু সবুজ আর সবুজ। সেই সাথে পাখির কূজন। মনে হতো, এটা অন্য কোন পৃথিবী। শীতকালে প্র্যাকটিকাল ক্লাস করতে করতে বিকেল গড়িয়ে গেলে সূর্য হারিয়ে যেত পাহাড়ের আড়ালে। আর শেষ বিকেলের ‘কনে দেখা আলো’ অপরূপ মায়াজাল তৈরি করত। আমরা গভীর বিস্ময়ে এই পার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। 

কলেজের প্রথম দিনটির কথা খুব মনে পড়ে। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকেই এর জন্যে প্রতীক্ষা। একের পর এক আবিষ্কার। প্রথমেই দেখা গেল, একটি ক্লাসরূমে সব বিষয়ের ক্লাস হয় না। তাই প্রতি ক্লাসের শেষে করিডর ধরে সবাই ছুটে যাই পরের ক্লাসের সেরা আসনটি দখল করতে। আর টানা তিনটের বেশি ক্লাস করার প্রয়োজনও নেই। সেই অবসরে কানে আসে কমন রুমের কোলাহল। নতুন ছাত্রের মনে পুলক জাগায় সেই হল্লা। আমাদের সবাইকে তা অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে টানে। ক্লাসগুলোও কম উত্তেজনার খোরাক জাগায় না। কোন স্যারের কড়া শাসন আর শৃঙ্খলা, কারো পাণ্ডিত্য, কারো বা মুদ্রাদোষ আমাদের দিন কয়েকের আলোচনায় বেশ বড় স্থানই করে নিয়েছিল। 

রহস্যময় মস্তিস্ক অনেক তুচ্ছ স্মৃতিই ধারণ করে রেখেছে, হয়ত বা হারিয়ে গেছে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু। একটা কথা আছে, পৃথিবীর সবচেয়ে স্থায়ী বন্ধুত্বগুলো গড়ে ওঠে কলেজের কমনরুমে। ব্যাপারটা অন্তত আমার ক্ষেত্রে অনেকটা সত্য। ক্লাস শেষে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে আসতাম টেবিল টেনিস টেবিলে জায়গা পাবার জন্যে। সুযোগ না পেলেও অসুবিধা নেই, চলতি বিতর্কে যোগ দিতাম সবজান্তার মত। দৃঢ় স্বরে প্রকাশ করতাম নিজের মতামত- সে বিষয়ে সত্যি কিছু জনি কিনা এই প্রশ্ন কেউ তুলবে না -সেতো বেশ ভালই জানতাম। 

কলেজে সহশিক্ষার সুযোগ ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই সব সঙ্কোচ দূর হয়ে যায়। যথার্থ বন্ধু হয়ে ওঠে এতদিন বিজাতীয় প্রাণী বলে মনে করে আসা মেয়েগুলো। লেখাপড়ার পাশাপাশি আড্ডায়-তর্কে ওদের অবাধ প্রবেশ বা বিচরণ খুবই স্বাভাবিক মনে হয়। এতদিনের সঙ্কোচ রসিকতার বিষয় হয়ে ওঠে। 

আমাদের ছোট কলেজের সুবিধা-অসুবিধা দুই-ই ছিল। শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় শহরের ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াত সমস্যা ছিল। একজন শিক্ষক অসুস্থ থাকলে সে বিষয়ে ক্লাস হতো না -পাঠ্যসূচি কিছুটা অসমাপ্ত থেকে যেত। তবে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে তিনি তা পুষিয়ে দিতেন। অন্যদিকে শিক্ষক-ছাত্রের নৈকট্য ছিল অনেক বেশি। সহজেই আন্তরিকতা স্পর্শ করত দু’পক্ষকেই। 

বিশেষভাবে মনে পড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা খেলার দিনগুলোর কথা। প্রথম বর্ষ বনাম দ্বিতীয় বর্ষের ক্রিকেট ম্যাচের উৎসাহ-উদ্দীপনা একেবারেই তুলনারহিত। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ বিষয়টি ছিল সবচেয়ে উপভোগ্য। ছেলেদের সৃষ্টিশীলতা না দুষ্টুমি বুদ্ধি -কিসের প্রদর্শন বলা যায় একে? আমাদের এক সহপাঠীর জেলা পর্যায়ে অ্যাথলেটিক্‌সে। ব্যক্তিগতভাবে প্রথম হবার গৌরব আমরা সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। 

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর আগে রিহার্সেল কক্ষের জমজমাট আসর আরেকটি দীপ্যমান স্মৃতি। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশে কলেজের অনুষ্ঠানগুলোর একটা ভূমিকা থাকে, একথা অনেকেই বলেন। এখনকার জনপ্রিয় জীবনমুখী বাংলা গানের শিল্পী অঞ্জন দত্ত কলেজেই তাঁর নতুন ধরনের গান নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। জানি না, আমরা যারা একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেছি, তাদের মধ্যেই কেউ একজন এমন বরেণ্য শিল্পী হয়ে উঠবেন কিনা। তবে তিনি নিশ্চয়ই স্মরণ করবেন একেবারে পূর্বদিকে অপরিসর রিহার্সেল কক্ষটির কথা। 

কলেজে কোন ক্যান্টিন ছিল না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেবার সময়, অন্য যে কোন সুযোগে ছাত্রদের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হত। তবে মনে মনে সবাই হয়ত সামনের চায়ের দোকানগুলোতেই সন্তুষ্ট ছিলাম। কত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে এই চায়ের দোকানে। বিতর্কের ঝড় উঠেছে। বাঙালির বিখ্যাত চায়ের কাপের আড্ডা -বষয়ের শেষ নেই, সিদ্ধান্ত অনাবশ্যক, চলছে তো চলছেই। অনেকের ধূমপানের হাতেখড়ি হয়েছিল এখানে। স্যাররা এসে পড়লে জ্বলন্ত শলাকা লুকাবার জন্যে যে উদ্ভাবনী শক্তি ব্যয় হয়েছিল, তা অন্যত্র কাজে লাগালে ফলাফল কী দাঁড়াতো, তা ভাববার বিষয়। 

ছাত্ররাজনীতি যার প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে সন্ত্রাস শব্দটি আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই কলেজ পর্যন্ত বিস্তৃত। সৌভাগ্যক্রমে এই সর্বনাশী অনলের কোন আঁচ আমরা অনুভব করি নি। কোন ক্ষমতাধর বড় ভাইয়ের ভ্রুকুটি কাউকে বিদ্ধ করে নি। শিক্ষকদের কর্তৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। 

কলেজ প্রসঙ্গে এখন মনে হয়, আরেকটু বড় আকারের হলে, বেশি ছাত্র-ছাত্রীর সমাবেশ ঘটলে ভালোই হতো। আরো অনেকে উপকৃত হতো। কিন্তু যখনই মনে হয়, এতে সেই নিরুপদ্রব পরিবেশের সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ হতো, তখনই নেতিবাচক মনোভাব জেগে ওঠে। কলেজটা বড় হোক চাই, তবে এর শান্ত পরিবেশ অকলুষিত থাকুক, এটাই সবচেয়ে বড় কামনা।


আরো দেখুন :

No comments