প্রবন্ধ রচনা : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে একদিন

Article Stats 📡 Page Views
Reading Effort
1,085 words | 7 mins to read
Total View
2K
Last Updated
27-Dec-2024 | 04:00 PM
Today View
0

↬ আমার দেখা একটি জাদুঘর


সকালে মাইকে মুক্তিযুদ্ধের গান বাজার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আজ ষোলই ডিসেম্বর। তাড়াতাড়ি গোসল সেরে, কোনমতে নাশতা শেষ করলাম। গায়ে ইস্ত্রি করা কড়কড়ে পাঞ্জাবি চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে। 

সারা ঢাকা শহর যেন উৎসবে মাতোয়ারা। সব দোকানে, বাড়ির ছাদে সবুজ আর লাল রঙা বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে পতপত করে। তার উজ্জ্বলতা যেন আজ ছড়িয়ে পড়েছে সবার মনে। মনে মনে ভেবে নিলাম, কোথায় কোথায় যাব। 

প্রথমে গেলাম বাংলা একাডেমীতে, তারপর টি এস সি-তে। পথ জুড়ে বিভিন্ন জিনিসের মেলা, আর মাঠ জুড়ে কবিতা ও গানের মেলা। কে বলে, স্যাটেলাইট নবপ্রজন্মকে সংস্কৃতিবিমুখ করে দিয়েছে? এত গান, এত আবৃত্তির ঢল নামছে তবে কীভাবে? বাহারি শাড়ি পরে, ফুলে ফুলে সেজে কিংবা গায়জামা-পাঞ্জাবি পরে দৃপ্ত কণ্ঠে কবিতা পাঠ কিংবা চারুকলার প্রদর্শনী তবে কারা করছে। সত্যিই তরুণরাই তো সব সময় বাংলার প্রাণভোমরা। ভালো লাগলো, নিজে সেই তরুণদের একজন হওয়ায়। মনে হলো, আমি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখি নি। তবু মুক্তিযুদ্ধ আমাকে আলোড়িত করে, রক্তে জাগায় শিহরণ। বাবা-মায়ের মুখে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা শুনে, বইতে ৭১-এর বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ঘটনা পড়ে আমারও মনে হয়, আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। এই কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনের মধ্যে উঁকি দিল একটা চকিত ভাবনা-আচ্ছা, আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গেলে কেমন হয়! আশ্চর্য! পরের মুহূর্তেই নিজের অজান্তেই আমার পা চলা শুরু করল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দিকে। 

আগেই জানা ছিল, জাদুঘরটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ঠিক বিপরীত দিকের পথে। কাছে যেতেই এক জায়গায় চোখে পড়ল তীর-চিহ্নিত পথ-নির্দেশ, হলুদ সাইনবোর্ডে লাল হরফে লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। কিছুটা এগিয়ে ডান দিকের দ্বিতীয় রাস্তায় একটা সাবেকি তিন তলা ভবনকে রূপান্তর করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সামনে রয়েছে রেলিংয়ের বড় একটা গেট। দেখলাম, সিকিউরিটি গার্ড গাঁড়িয়ে, একপাশে কাউন্টার, দণ্ডশীর্ষে পত্‌পত্‌ করে উড়ছে আমাদের জাতীয় পতাকা। তিন টাকা দিয়ে টিকিট কিনে জাদুঘরের অঙ্গনে ঢুকলাম। ঢুকেই চোখে পড়ল, ‘শিখা চির অম্লান’। তরকাকৃতি একটা বেদির ওপর জ্বলছে অনির্বাণ শিখা। পেছনে পাথরের বুকে খোদাই বরা বাণী : 
সাক্ষী বাংলার রক্তভেজা মাটি 
সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা 
ভুলি নাই শহীদের কোন স্মৃতি 
ভুলব না কিছুই আমরা। 

শিখা চির অম্লানের সামনে শোভা পাচ্ছে তাজা ফুল। আমি কেমন যেন আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়লাম। এক মিনিট নীরবতা পালন করে ধীর পায়ে প্রবেশ করলাম মূল কক্ষে। 

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বলতেই মনে হয় এখানে সংরক্ষিত থাকবে মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য ও নিদর্শন। আমি ভেবেছিলাম এখানে নিশ্চয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত যুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন দেখতে পাবো। কিন্তু ভিতরে ঢুকে আমি একটু অবাকই হলাম। এবং সেই সঙ্গে অনুভব করলাম, জাদুঘরের বিন্যাসে সুন্দর পরিকল্পনার ছাপ। 

এখানে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম কেবল একাত্তরের মার্চ মাসে শুরু হয় নি, এর সূচনা আরও আগে। সেই ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন থেকেই শুরু হয়েছিল এ দেশের মানুষের মুক্তির লড়াই। তাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও ১৯৫৭ সাল থেকে শুরু হওয়া মুক্তি সংগ্রামের নিদর্শনগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বাংলার প্রাচীন ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ও বিভিন্ন নিদর্শন। কারণ যে বাঙালি জাতি লড়াই করেছিল একাত্তরে সে জাতি হাজার বছরের পুরনো সভ্যতায় গরীয়ান। 

শিখা চির অম্লানের বাঁ দিকের প্রথম গ্যালারিতে ঢুকে দেখলাম, এখানে দুটি ভাগে নিদর্শনগুলো বিন্যস্ত। প্রথম পর্বে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং দ্বিতীয় পর্বে ব্রিটিশ ও ঔপনিবেশিক যুগের বিভিন্ন নিদর্শন। বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পর্বে রয়েছে সিলেট অঞ্চলে প্রাপ্ত ফসিল, পাহাড়পুরের সোমপুর বিহারের মডেল, ভুটান থেকে পাওয়া অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান-এর মূর্তি, ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদের মডেল। বিভিন্ন মন্দিরের পোড়ামাটির কারুকাজ ও মসজিদের টালির নিদর্শন। এসবের পাশাপাশি নানা সময়ের মুদ্রা, তালপাতার লিপি, তুলট কাগজে মানসামঙ্গল কাব্যের অংশবিশেষ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলাম- এই তিন ধর্মের সমন্বয়ে সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বাঙালি সংস্কৃতির একটা পরিচয় পাওয়া যায় এখানে। 

দ্বিতীয় পর্বে গিয়ে আমি খুব কৌতূহলী হয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যেখানে পরাজিত হয়েছিলেন সেই পলাশীর আম্রকাননের নকশাটা খুঁটিয়ে লক্ষ করলাম। সেখানেই সাজানো সিরাজউদ্দৌলা, টিপু সুলতান, তিতুমীর, রামমোহন রায়-এর প্রতিকৃতি; ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, যতীন্দ্রনাথ মুর্খাজি, মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর ফটোগ্রাফ এবং সিপাহী বিদ্রোহের স্থির চিত্রগুলো বার বার আমাকে সেই সুদূর অতীতে টেনে নিয়ে গেল। দেখলাম, এখানে রয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার একটি কপি, রয়েছে সূর্যসেন সহ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের শহীদদের চিত্র। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের একটি ছবি দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম; বেদনায় আমার মন ভরে গেল। সবশেষে দেখলাম ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের একটি পত্রিকা এবং জিন্না-মাউন্টব্যাটেনের ছবি। এভাবেই সমাপ্ত হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের। আমি গ্যালারি দুইয়ে প্রবেশ করলাম। 

গ্যালারি দুই থেকে শুরু হয়েছে পাকিস্তান আমলের ইতিহাস। একে একে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-র সাধারণ নির্বাচন, ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬২-এর সামরিক শাসবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ৬-দফা আন্দোলন; আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর জলোচ্ছ্বাস ও নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন দলিল, ছবি ও স্মারক দেখতে পেলাম। মনে হলো আমি তৎকালীন বিভিন্ন আন্দোলন সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পেয়েছি, যা এতদিন ইতিহাস পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

গ্যালারি তিন-এ ঢুকে দেখলাম, এটি সাজানো হয়েছে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন নিদর্শন দিয়ে। এখানে রয়েছে ১৯৭১-এর অসহোযোগ আন্দোলন, ২৫শে মার্চ কালরাত্রি, শরণার্থী শিবির ও প্রবাসী সরকার সংক্রান্ত ছবি, স্মারক, দলিল ও নিদর্শনাদি। এই গ্যালারিটি আমাকে খুব নাড়া দিল। বিশেষ করে ২৫ মার্চ কালরাত্রির নির্মম অত্যাচারের ছবিগুলো দেখে আমারও ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো। মনে হলো, কী নিষ্ঠুর আর বর্বর ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারা মানুষ নামে পশু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। 

এবার ঢুকলাম গ্যালারি চার-এ। দেখলাম, পাকবাহিনীর নিষ্ঠুরতার বিভিন্ন ছবি, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, প্রাথমিক প্রতিরোধ, প্রবাসী সরকার ও সেক্টর কমান্ডারদের তৎপরতার তথ্য। এখানে ঘুরে জানতে পারলাম অনেক অজানা কথা। এতদিন পত্রিকার পাতায় যে ঐতিহাসিক ছবিগুলো দেখেছি, সেগুলোকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হলো। 

গ্যালারি পাঁচ-এ দেখলাম পতিরোধের লড়াই, গেরিলাযুদ্ধ, নৌ-কমাণ্ডো, বিমানবাহিনী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন, পাকবাহিনীর দালালদের ভূমিকা ও সশস্ত্র যুদ্ধের ছবি, স্মারক দ্রব্য ও বিবরণ। এবং সবশেষে গ্যালারী ছয়-এ রয়েছে গনহত্যা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠ, শহীদ বুদ্ধিজীবী, চূড়ান্ত লড়াই এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সম্পৃক্ত বিভিন্ন স্মারক, বিবরণ ও ছবি। প্রতিটি গ্যালারিতেই একজন করে মার্জিত চৌকস তরুণী গাইড ছিলেন। তাঁরা আমাকে ঘুরে দেখতে সহযোগিতা করেছেন, সেই সঙ্গে আমার কৌতূহলী মনের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন। 

সবমেষে চমৎকার ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে চত্বরে নেমে এলাম। দেখলাম এখানে রয়েছে চমৎকার রুচিসম্পন্ন একটি জলখাবারের দোকান। আরো আছে একটি ‘কিওস্ক’ অথাৎ বইপত্র ও স্মারক সামগ্রীর বিপণি। এখানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নানারকম বই, পোস্টার, ক্যাসেট, স্মারকসামগ্রী এবং ভিউকার্ড বিক্রি হয়। এছাড়াও পেছনের আঙ্গিনায় দেখলাম, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্যে উন্মুক্ত মঞ্চ। জাদুঘরের সামনের অংশে দেখলাম ১০০ আসনবিশিষ্ট চমৎকার একটি অডিটোরিয়াম। সেখানে রয়েছে আমন্ত্রিত দর্শকদের জন্যে ভিডিও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা। 

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেখে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে মন ভরে উঠল। সত্যি কী বিপুল আত্মদানের বিনিময়ে, কী অনন্য সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। সেই আত্মদান, সেই গৌরবের ইতিহাসকে ধরে রেখেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আমাদের নতুন প্রজন্মকে তা দিচ্ছে দেশব্রতী ভবিষ্যৎ রচনার প্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কেবল আমাদের অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় না, একই সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আত্মবিশ্বাসের সমুন্নত পথে। 

আস্তে আস্তে রোদ চড়ে এল, জাদুঘরে দর্শকের সমাগমও বেড়ে চলল। আমি ধীরে ধীরে বের হয়ে এলাম। চারপাশের লোকজনের কোলাহল আমাকে স্পর্শ করছিল না। যেন স্বপ্নের ঘোরে আমি বার বার মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শনগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা রিক্সা ডেকে জাদুঘরটার কথা ভাবতে ভাবতেই রওনা হলাম বাসার পথে। ভাবলাম আবার আসব, বার বার আসব এই গৌরবময় স্মৃতির আবেশে হারিয়ে যেতে।

💎 উপরের লিখাগুলো ওয়ার্ড ফাইলে সেভ করুন!

মাত্র 10 টাকা Send Money করে অফলাইনে পড়ার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য উপরের লিখাগুলো Microsoft Word ফাইলে ডাউনলোড করুন।

Download (.docx)

Sribas Ch Das

Founder & Developer

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং পরিচালক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts

Facebook Messenger WhatsApp LinkedIn Copy Link

✅ The page link copied to clipboard!

Leave a Comment (Text or Voice)




Comments (0)

Old Taka Archive (ota.bd)

✓ ১০০% আসল নোটের নিশ্চয়তা