বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : ইন্টারনেট

↬ ইন্টারনেট ও আজকের বিশ্ব

↬ তথ্যবিপ্লবে ইন্টারনেট


ভূমিকা : মানবসভ্যতার বিস্ময়কর বিকাশে বিজ্ঞান যে অনন্য ভূমিকা পালন করছে তার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ইন্টারনেট। বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী একটি ব্যবস্থার নাম ইন্টারনেট। ইন্টারনেট কম্পিউটার বাহিত এমন একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা যার মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলো আজ পরস্পর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বিশ্বায়ন ধারণায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই ইন্টারনেট। জীবনের ব্যাপক ও বহুমুখী কাজে এখন ইন্টারনেট ব্যবহৃত হয়ে আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্স প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে বিপুলভাবে সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্যবিপ্লবেও রয়েছে ইন্টারনেটের গুরুত্বপূর্ণ ও সফল অবদান।

তথ্যবিপ্লব ও তথ্যপ্রযুক্তি : তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এ যুগে খুব জোর দিয়েই বলা যায়, ‘Information is power.’ জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি তথ্যসমৃদ্ধ হওয়া শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প বিপ্লবের পর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন পৃথিবীতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তথ্যপ্রযুক্তি দূরকে এনেছে চোখের সামনে, পরকে করেছে আপন, আর অসাধ্যকে সাধন করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ও চর্চা এখন শুধু হাতে গোনা দু-একটি উন্নত দেশের আভিজাত্যের বিষয় নয়, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

ইন্টারনেট কি : ইন্টারনেট কথাটি ইন্টারকানেক্টেড নেটওয়ার্ক এর সংক্ষিপ্ত রূপ। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটের উদ্ভব। কম্পিউটার নেটওয়ার্কের একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে এ প্রক্রিয়া। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত কম্পিউটারকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে যুক্ত করে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তাই হলো ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের সাথে অন্যান্য কম্পিউটার সংযুক্ত রয়েছে এ পদ্ধতিতে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন কম্পিউটার থেকে যে কোনো কম্পিউটারে ছবিসহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ করা যায়। ইন্টারনেট চালানোর জন্য সাধারণত তিনটি জিনিস প্রয়োজন, এগুলো হলো : কম্পিউটার, মডেম এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার।

ইন্টারনেটের সম্প্রসারণ : আমেরিকার প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ চারটি কম্পিউটারের মাধ্যমে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল তার নাম ছিল ‘আর্পানেট’। পরবর্তী তিন বছরে কম্পিউটারের সংখ্যা বেড়ে ছত্রিশে দাঁড়ায়। চাহিদা বাড়ার ফলে ১৯৮৪ সালে আমেরিকার ন্যাশনাল সাইন্স-ফাউন্ডেশন সর্বসাধারণের জন্য ‘নেস্ফেনেট’ নামে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করে। তিন বছরের মধ্যে এ ব্যবস্থা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটি তখন গবেষণা কাজে তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ ছিল। এর সঙ্গে অনেক ছোট বড় নেটওয়ার্ক যুক্ত হয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে। সমগ্র ব্যবস্থাটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ’৯০-এর দশকের শুরুতে কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক হিসেবে ইন্টারনেট গড়ে তোলা হয়। ১৯৯৩ সালে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেটকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। অল্পদিনের মধ্যে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হয় লাখ লাখ সদস্য। এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

ইন্টারনেটের প্রকারভেদ : ইন্টারনেট প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কতকগুলো পদ্ধতি রয়েছে সেগুলো নিচে দেয়া হলো :

১. ই-মেইল : ই-মেইলের মাধ্যমে যে কোনো সংবাদ পাঠানো যায়। এ প্রক্রিয়ায় খুব দ্রুত অর্থাৎ ফ্যাক্স-এর দশভাগের একভাগেরও কম সময় এবং কম খরচে তথ্যাদি পাঠানো যায়।
২. ওয়েব : ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত কম্পিউটারগুলোতে যে তথ্য রাখা হয়েছে সেগুলো ব্যবহার করার ব্যবস্থা বা পদ্ধতিকে ওয়েব বলে।
৩. নেট নিউজ : উন্টারনেটের তথ্যভাণ্ডারের সংরক্ষিত সংবাদ যে কোনো সময় এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্মুক্ত করা যায়।
৪. চ্যাট : এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির সাথে একই সময়ে কথা বলা যায় বা আড্ডা দেয়া যায়।
৫. আর্কি : আর্কির কাজ হলো তথ্যসমূহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূচি আকারে উপস্থাপন করা।
৬. ইউজনেট : অনেকগুলো সার্ভারের নিজস্ব সংবাদ নিয়ে গঠিত তথ্যভাণ্ডার, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
৭. গোফার : তথ্য খুঁজে দেয়ার একটি পদ্ধতি, যার সাহায্যে গুরুত্বানুযায়ী তথ্যের সমন্বয় সাধিত হয়।
৮. ই-ক্যাশ : ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ই-ক্যাশ পদ্ধতি বলে। আসলে ই-ক্যাশ অনেকগুলো আধুনিক অর্থনৈতিক লেনদেনের সমষ্টি।

বাংলাদেশের ইন্টারনেট : বাংলাদেশে ইন্টারনেট চালু হয় ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন এর ব্যবহার ছিল সীমিত এবং কেবল ই-মেইলে তার প্রয়োগ ছিল। ১৯৯৬ সালের ১৫ জুন থেকে অনলাইন সংযোগ দেয়া শুরু হলে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল জগতে প্রবেশ করে। ২০০০ সালের শুরুতে এর ৬০ হাজার সংযোগ দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে তা ক্রমাগত বাড়ছে। ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশে ফাইবার অপটিক কেবল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বড় শহরগুলোকে সংযুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়। ঢাকার মগবাজার ও গুলশানের টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মধ্যে প্রথম ফাইবার অপটিক সংযোগ স্থাপন করা হয়। বর্তমানে শহরগুলোতে আন্তঃএক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে ফাইবার অপটিক সংযোগ আছে।

তথ্যবিপ্লবে ইন্টারনেট : তথ্যবিপ্লবে ইন্টারনেট যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছে। ইন্টারনেট চোখের পলকে বিশ্বের যেকোনো জায়গায় তথ্য পাঠাতে বা তথ্য এনে দিতে সক্ষম। লেখাপড়া, শিক্ষা, গবেষণার ক্ষেত্রে বাই অত্যন্ত জরুরি, যা সবসময় হাতের কাছে পাওয়া যায় না। এখন ঘরে বসেই বিশ্বের যে কোনো লাইব্রেরিতে প্রবেশ করা যায় এবং প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করা যায়। ইন্টারনেট ভ্রমণবিলাসীদের জন্য বন্ধু স্বরূপ। এটি ভ্রমণ স্থানের আবহাওয়া, থাকার হোটেল রিজার্ভেশন, রেন্ট এ কার, প্লেনের টিকিট বুকিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকে। ইন্টারনেট ডাক্তার বা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে করেছে সহজলভ্য ও স্বল্প ব্যয়বহুল। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করা যায় পৃথিবীর ভালো ভালো চিকিৎসকদের সাথে। ফলে ঘরে বসেই পেতে পারি উন্নত চিকিৎসা। আইনগত পরামর্শ লাভের জন্য বা কোনো রেফারেন্সের প্রয়োজন হলে সেই আইনজীবী বা আইন ফার্মে ইন্টারনেট কমান্ড করলে তার তথ্যাদি ঘরে বসে পাওয়া সম্ভব। এতে সময়, অর্থ ও শ্রম বহুগুণে সাশ্রয় হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে জানা যায়। বিনোদন হিসেবে গান শোনা, সিনেমা দেখা, খেলা দেখা প্রভৃতি ঘরে বসেই সম্ভব ইন্টারনেটের কারণে। দৈনিক পত্রিকার খবর, শেয়ার বাজারের খবর, বাজারের হালচাল সবই জানা যায় এ প্রক্রিয়ায়।

বাংলাদেশের অবস্থান : তথ্যপ্রযুক্তি যে বাংলাদেশের জন্যও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি, এ কথা আজ সবাই উপলদ্ধি করছে। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপারে খুবই আগ্রহ প্রকাশ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, ইপিবি, বিসিসি, বিসিএস, নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশীদের সংগঠন ‘টেকবাংলা’ প্রভৃতি সংগঠন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ গত দশ বছরে এগিয়েছে। সম্প্রতি সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক তথ্য প্রবাহের সাম্রাজ্য ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির উন্ননে করণীয় : বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সাথে উন্নত দেশগুলোর এক ধরনের বৈষম্য আলোচিত হচ্ছে। ইংরেজিতে একে বলা হচ্ছে Digital Divide, বাংলায় ডিজিটাল বৈষম্য। তাই একবিংশ শতাব্দীর এ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হবে যোগ্যতা দিয়ে এবং তথ্যপ্রযুক্তির নবতর কৌশল আয়ত্তে এনে। এজন্য নিম্নলিখিত কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

১. বিশ্বায়নের এ যুগে টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশের তরুণ সমাজকে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
২. যেহেতু বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে, সেহেতু বিশাল সংখ্যক গ্রামবাসীকে শিক্ষিত, সচেতন ও তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানে দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং ইন্টারনেটের প্রসার ঘটাতে হবে।
৩. বিশ্বব্যাপী চলমান তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের অংশীদার হওয়ার জন্য জাতীয় তথ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
৪. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহার : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিই বর্তমান বিশ্বের সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল হাতিয়ার। তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে যারা যত বেশি অগ্রগামী, তারা তত বেশি উন্নত। বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতির ফসল ইন্টারনেট এখন পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে গ্রহান্তের কর্মকাণ্ডে নিজের স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতো আমরাও পিছিয়ে আছি। তাই আমাদের উচিত ইন্টারনেটের ব্যাপক ও বহুমাত্রিক প্রসার ঘটিয়ে দেশকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী করে গড়ে তোলা।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো: ]


ভূমিকা : ইন্টারনেট কম্পিউটার বাহিত এমনই এক সংযোগ ব্যবস্থা যার মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থে সারা বিশ্বেই চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। এর সাহায়্যে মানুষ উন্নীত হয়েছে এমন এক স্তরে যেখানে সারা বিশ্বের সকল ইন্টানেট ব্যবহারকারী একটি সমাজে পরিণত হয়েছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে এর মাধ্যমে। সাথে সাথে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসেছে এক অভাবনীয় সাফল্য।

ইন্টারনেট কী? : ইন্টারনেট হচ্ছে কম্পিউটার নেটওয়ার্কসমুহের একটি বিশ্ব ব্যবস্থা। এটি এমন একটি নেটওয়ার্ক বা জাল বিস্তার যার সাথে অনেক ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সংযোগ আছে। প্রতিটি শহরে মহাসড়কের সাথে যেমন অন্যান্য রাস্তা, গলি ও উপগলির যোগাযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি ইন্টানেট নামক নেটওয়ার্কের সাথে অন্যান্য ক্ষুদ্র কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সংযুক্ত। এদিক দিয়ে একে নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক বলা যায়। ইন্টানেটের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্তের কম্পিউটার থেকে অন্য প্রান্তের আর একটি কম্পিউটারে ছবিসহ যাবতীয় তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও প্রেরণ করা যায়। ইন্টারনেট একটি বিশাল ‘নেটওয়ার্কিং সিস্টেম’ যার বিস্তৃতি পৃথিবীময়। বিশ্বের লাখ লাখ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ কোটি কোটি লোকের ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে ইন্টারনেট।

ইন্টারনেটের উদ্ভব ও অগ্রগতি : ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা মাত্র ৪টি কম্পিউটারের সাহায্যে গড়ে তুলেছিলেন প্রথম অভ্যন্তরীণ এক নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার নাম লিছ ‘ডার্পানেট’। তিন বছর যেতে না যেতেই কম্পিউটারের সংখ্যা চা থেকে তেত্রিশ-এ পৌঁছায়। এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলে। ক্রমশ চাহিদার ভিত্তিতে ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ‘নেস্ফেনেট’ নামে সর্বসাধারণের জন্য অণ্য রকম একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করে। তখন তা ছিলো কেবল গবেষণার কাজে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যম। তিন বছরের মধ্যে নেস্ফেনেট সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে গড়ে ওঠে আরও অনেক ছোট-বড় ‘নেটওয়ার্ক’। এর ফলে এ ব্যবস্থায় কিছুটা অরাজকতা দেখা দেয়। এ অরাজকতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সমগ্র ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয। আর এই জন্যেই ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে গড়ে তোলা হয় একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক। বিশ্বের মানুষ পরিচিত হয় ‘ইন্টারনেট’ নামক একটি ধারণার সঙ্গে। ১৯৯৩ সালে ইন্টানেটকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আর এর কয়েক মাসের মধ্যেই লাখ লাখ নতুন সদস্য ইন্টানেটের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বের কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের সঙ্গে বিশ সহস্রাধিক নেওয়ার্ক যুক্ত হয়েছে। আর এই ব্যবহারকারীদের সংখ্যা এখন তিন কোটিরও বেশি। এই সংখ্যা প্রতিদিনই জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এভাবে সারা পৃথিবীকে ইন্টারনেট জালের মতো জড়িয়ে ফেলেছে।

ইটারনেটের প্রকারভেদ : ব্যবহারকারীরা দুভাবে ইন্টারনেটের গ্রাহক হতে পারে। প্রথমটি হলো অন-লাইন ইন্টারনেট। টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে সরাসিরি কম্পিউটারে ইন্টারনেটের অন্য যেকোনো সার্ভিস প্রভাইডারের সঙ্গে যুক্ত করার পদ্ধতিকে অন-লাইন ইন্টারনেট বলা হয়। তাতে ব্যবহারকারীরা যেকোনো সময় অন্য যেকোনো প্রভাইডারের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে। এছাড়াও IP Access পদ্ধতিতে সরাসরি অন-লাইন ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু  এ পদ্ধতি ব্যয়বহুল হওযায় সাধারণ গ্রাহক তাতে আগ্রহবোধ করে না।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো অফ-লাইন ইন্টারনেট যা ই-মেইল নামে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় গ্রহকরা নিকটবর্তী কোনো সার্ভারকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে বলেই এটাকে অফ-লাইন ইন্টারনেট বা ই-মেইল বলা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে গ্রহকরা কম খরচে অফ-লাইন বা ই-মেইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

ইন্টারনেট ব্যবহারের পদ্ধতি : ইন্টারনেটের ব্যবহার পদ্ধতি বিভিন্ন রকম। যেমন-
ক. ওয়েব : ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত কম্পিউটারগুলোতে যে তথ্য রাখা হয়েছে সেগুলো ব্যবহারের পদ্ধতি।
খ. চ্যাট : চ্যাটের সাহায্যে একই সময়ে একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলা যায়।
গ. ই-মেইল : এ পদ্ধতি হচ্ছে সংবাদ আদান-প্রদানের এক সহজ ব্যবস্থা। এ পদ্ধতিতে অতিদ্রুত তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব।
ঘ. নেট নিউজ : এ পদ্ধতিতে ইন্টারনেট সংরক্ষিত সংবাদ যেকোনো সময় উন্মুক্ত করা যায়।
ঙ. ই-ক্যাশ : ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ই-ক্যাশ পদ্ধতি বলে।
চ. আর্কি : আর্কি হচ্ছে নেটওয়ার্কে তথ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে স্থাপিত একটি পদ্ধতি, যা তথ্যগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সূচি আকারে সমন্বয় করে উপস্থাপন করতে সক্ষম।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট : ১৯৯৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ইন্টানেটের ব্যবহার শুরু হয়। শুরুর দিকে ইন্টারনেট অফলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা ছাড়াও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মেইল সার্ভিস দিয়ে আসছিল। কিন্তু অফলাইনে সংযুক্ত থাকার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশাল জগতের সকল সম্পদ ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। ই-মেইলের কেবল ডাুনলো (তথ্য গ্রহণ) ও আপলোড (তথ্য প্রেরণ) করা যেত। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ১৫ই জুলাই থেকে বাংলাদেশে অনলাইন ইন্টানেট সেবা প্রদান শুরু হয়। বাংলাদেশ ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে অর্থাৎ তথ্য প্রযুক্তির এক বিশাল জগতে প্রবেশ করে। এর ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার। ২০০০ সালের শুরুতে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৬০ হাজারে। ধারণা করা যাচ্ছে, এই সংখ্যা ২০০২ সালে আনুমানিক ১ লাখের বেশি। ২০১৭ সালের শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ কোটি ৭০ লক্ষের অধিকে।

ইন্টারনেটের সুবিধা : ইন্টারনেটের ব্যবহার মানুষের জীবনে এনেছে বিপুল পরিবর্তন। এই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আজ অসম্ভবকে করেছে সম্ভব। এর সাহায্যে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে যে-কোনো সময়ে তথ্য বা খবর প্রেরণ করা যায় এবং সেখান থেকে নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, বিনোদন, বিপণন ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই ইন্টানেটের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। এর দ্বারা কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অন্য দেশের লোক সহজেই জানতে পারছে। কোনো দেশের শেয়ার বাজারের অবস্থা ও দেশের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থাও অন্য দেশের লোকের মাধ্যমে সহজেই জেনে নিতে পারছে। ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বের যে-কোনো প্রান্ত হতে যে কেউ প্রবেশ করতে পারছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিতে, সেখানকার বিভিন্ন বই থেকে তথ্যও সংগ্রহ করতে পারছে। বর্তামানে দূরশিক্ষণে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো ছাত্র শিক্ষকের কাছ থেকে পড়া বুঝে নিতে পারে। বিনোদনের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের একজন লোকের পক্ষে ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিউইয়র্কের কোনো ওপেন এয়ার কনসার্ট উপভোগ করা সম্ভব হচ্ছে ইন্টানেট ব্যবহার করে বাংলাদেশের একজন রোগী বিদেশের ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারছে। বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশে বসে অন্য দেশের জিনিসপত্র কোকাটা করাও সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন ধরণের খেলা, গান শোনা, সিনেমা দেখা, রান্না শেখা, ফ্যাশন সম্পর্কে জানা এমন কি বিয়ের সম্পর্কও প্রতিষ্ঠা করা যায় ইন্টানেটের মাধ্যমে।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে আজ চাকরির জন্য ঘুরতে হয় না। ঘরে বসে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। আবার কেউ কেউ ইন্টারনেটে কাজ করে আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে। কেউ আবার অনলাইনে ঘরে বসে বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং মাস শেষে বেতনও পাচ্ছেন অনলাইনে।
ইন্টানেটের সুভিধাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো : (১) ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব, (২) ই-মেইল, (৩) নিউজগ্রুপ, (৪) টেলনেট (৫) গোফার ও (৬) ফাইল ট্রান্সফার। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব দ্বারা অন্যান্য কম্পিউটারের তথ্যাদি পড়া ও শোনা যায়। ই-মেইল দ্বারা অন্য কম্পিউটারের সাথে থথ্য আদান-প্রদান করা যায়। ইন্টানেটে প্রকাশিত প্রতিদিনের পত্রিকার পাঠক হওয়া যায় নিউজগ্রুপের মাধ্যমে। টেলনেটের মাধ্যমে সরাসরি কম্পিউটারে টাইপ করে অন্য ইন্টানেট ব্যবহারকারীর সাথে থথ্য বিনিময় করা যায়। আর ফাইল ট্রান্সফারের মাধ্যমে এক কম্পিউটার হতে অন্য কম্পিউটারে ফাইল আদান-প্রদান ও ফাইল সংরক্ষণ করা যায়। এক কথায় ইন্টানেট বিশ্বের তথ্য সমুদ্র থেকে মণিমুক্তা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডুবুরির কাজ করে। ইন্টারনেটের এই বহুবিধ ব্যবহারের কারণেই বিশ্ববাসী আজ প্রতিনিয়ত ইন্টারনেটের দ্বারস্থ হচ্ছে।

ইন্টারনেটের অসুবিধা : সব কিছুরই যেমন ভাল ও খারাপ দিক আছে তেমনি ইন্টারনেটও এর ব্যতিক্রম নয়। ইন্টরনেটের মাধ্যমে কিছু ব্যবহারকারী বা ভোক্তা মিথ্যা তথ্য প্রদান, পর্নোগ্রাফিক চিত্র আদান-প্রদান, কিংবা জুয়া খেলার মতো অনুচিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কেউ কেউ কম্পিউটার ভাইরাস তৈরি করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের লাখ লাখ কম্পিউটার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৮৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ইন্টারনেট ওয়ার্ম’ নামক ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে কয়েক হাজার কম্পিউটার ক্ষতিগ্রস্ত করে। ‘চেরানাবিল ভইরাস’ নামক একটি ভাইরাস বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে আক্রমণ চালিয়ে সারা বিশ্বের লাখ লাখ কম্পিউটার অকেজো করে দেয়। সম্প্রতি ‘লাভবাগ’ নামক একটি ভাইরাসও বিপুল ক্ষতি সাধন করেছে। ভাইরাস হলে একপ্রকার কম্পিউটার প্রোগ্রাম যা অন্য কম্পিউটারের স্মৃতি ধ্বংস করতে সক্ষম। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের তের বছর বয়সী তিনজন ছাত্র তাদের স্কুলে ফিট্ করে রাখা বোমা ফাটায়। ইন্টারনেট হ্যাকাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য কম্পিউটারের সকল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। কিছু দিন আগে ‘ব্লু হোয়েল’ নামক ইন্টারনেটে অনলাইন ভিত্তিক একটি খেলা সারা বিশ্বের কয়েক লাখ শিশু-কিশোরকে আত্মহত্যায় বাধ্য করে।
অর্থাৎ ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বের মানুষ যেমন উপকৃত হচ্ছে তেমনি বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে। তবে এজন্যে ইন্টারনেট পদ্ধতিকে দোষ দেওয়া যায় না। বরং এর সুষ্ঠ ববহাররের জন্যে বিশ্ববাসীকেই সচেতন হতে হবে।

ইন্টারনেট সংযুক্তিকরণ : ইন্টারনেট সংযুক্তিকরণের জন্যে সবপ্রথমে প্রয়োজন একটি কম্পিউটার বা মুঠোফোন। কম্পিউটারের ক্ষেত্রে লাগবে একটি মডেম। আর লাগবে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টারনেট সংযোগ। মুঠোফোন ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট দামে নির্দিষ্ট পরিমাণ ইন্টারনেট ক্রয় করতে হয় তার নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। তবে সবার আগে ব্যবহারকারীকে ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

উপসংহার : ইন্টারনেট বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা। ইন্টারনেট আজ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে আসছে। সারা বিশ্বের সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যদি ইন্টারনেটের অপকারিতা বন্ধের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করেন তাহলেই ইন্টারনেট মানব জীবনে আরও অগ্রগতি এনে দিতে সক্ষম হবে। আগামী দিনে হয়তো এই ইন্টারনেট ব্যবস্থাই পৃথিবীর সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে।


আরো দেখুন :

14 comments:


Show Comments