বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

ভূমিকা : নানা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলার পর হাঁটি হাঁটি পা পা করে সার্বিক উন্নয়নে অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। কিছু দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও ত্রুতি-বিচ্যুতি থাকলেও বাংলাদেশ ২০১৮ সালের মার্চে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এ বছরই ১১ মে বাংলাদেশ মহাকাশে নিজস্ব কৃত্রিম স্যাটেলাইট পাঠনোর অনন্য কীর্তি লাভ করেছে। বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে সফলভাবে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এটি সমগ্র জাতির গর্ব ও আত্মমর্যাদার অংশ। এতে দেশ হয়েছে অভিজাত ক্লাবের গর্বিত ও মহান সদস্য। এ কীর্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রযুক্তির আঙ্গিনায় নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এ স্যাটেলাইটের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতির পালেও লাগবে হাওয়া। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে-এটিই সকলের প্রত্যাশা। 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর প্রাথমিক পর্ব : ১৪ জুন ১৯৭৫ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাঙামাটিতে বেতবুনিয়ায় দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৯৮২ সালে গাজীপুরের তালিবাবাদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ ঢাকার মহাখালী ও ১৯৯৬ সালে স্যাটেলাইট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অতঃপর ১৯৯৮ সালে স্যাটেলাইট সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই সাথে স্যাটেলাইট সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ বোর্ড (BTTB) বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (BTCL)-এর একজন কর্মকর্তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। ২০০৮ সালের এপ্রিলে একটি কমিটি গঠন করে স্যাটেলাইট প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এরপর বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে ২০১০ সালে এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (EOI) আহ্বান করা হয়। এতে সাড়া দেয় বিভিন্ন দেশের ৩১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হলে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করে। এরপর পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন শেষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টিনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (SPI) যথাযথ প্রতিষ্ঠান বিবেচিত হয়। ৩১ মার্চ ২০১৩ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) পরামর্শক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনালের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একটি স্যাটেলাইট নির্মাণে প্রকল্প রূপরেখা তৈরি করার পর ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায়। অনুমোদন পর্যায়ে দেশের প্রথম স্যাটেলাইটের নাম রাখা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। প্রকল্পটি পরিচিতি পায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ নামে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সরকার উৎক্ষেপণ প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ‘অরবিটাল স্লট’ ইজারা নেয়ার প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়। ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান ইন্টার স্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ ভাড়া নিতে চুক্তি স্বাক্ষর করে BTRC । চুক্তি অনুযায়ী ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে বাংলাদেশ কক্ষপথ বরাদ্দ পায়। ২১ অক্টোবর ২০১৫ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সভায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং ১১ নভেম্বর ২০১৫ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের জন্য ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কিনতে স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়ার সাথে টার্ন-কি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৭ অক্টোবর ২০১৬ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি স্পেসএক্সের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ : ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫,৮০০ কিলোমিটার উপরে Geostationary Earth Orbit’র একটি কৃত্রিম উপগ্রহ। তাই এটি জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট (Geostationary Satellite) বা ভূস্থির উপগ্রহ। জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট (Geostationary Satellite) হলো এমন একটি কৃত্রিম উপগ্রহ যেটি নিরক্ষরেখা বরাবর ঐ কক্ষপথে থেকে পৃথিবীকে ২৪ ঘণ্টায় একবার প্রদক্ষিণ করবে। এ প্রদক্ষিণ হবে পৃথিবীর আবর্তনের দিকে, অর্থাৎ পশ্চিম থেকে পূর্বে। ফলে গ্রাউন্ডস্টেশনের সাপেক্ষে উপগ্রহটি থাকবে প্রায় স্থির। ৩,৬০০ কেজি উৎক্ষেপণ ভরের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মিশনের মেয়াদকাল হবে ১৫ বছর। স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ অথবা মাইক্রোওয়েভ সংকেত আকারে গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে পাঠানো তথ্য (আপ-লিংক) গ্রহণ করবে। ঐ সংকেতকে কয়েকগুণ ‘অ্যামপ্লিফাই’ করে এটি আবার তা ফেরত পাঠাবে (ডাউন-লিংক) পৃথিবীতে। 

ব্যয় ও ঋণচুক্তি : ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণে অর্থায়নের জন্য ৯ সেস্টেম্বর ২০১৬ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কমিশন (BTRC) ও বহুজাতিক ব্যাংক হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (HSBC) মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ঋণচুক্তি অনুযায়ী HSBC ১৫ কোটি ৭৫ লাখ ইউরো বা ১,৪০০ কোটি টাকা প্রদান করবে। BTRC কে এ ঋণ আগামী ১২ বছরে মোট ২০টি কিস্তিতে শোধ করতে হবে। স্যাটেলাইট প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২,৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ১,৩১৫ কোটি টাকা। বাকি ১,৬৫২ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নেয়া হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট উড়াতে সর্বমোট ২,৭৬৫ কোটি টাকা খরচ হয়। 

অরবিটাল স্লট বরাদ্দ : আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (ITU) বরাদ্দ অনুযায়ী বাংলাদেশের নিজস্ব অরবিটাল স্লট (Orbital Slot) ৬৯ ডিগ্রি ও ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পাওয়ার কথা। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ মহাকাশের ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে কক্ষপথ বরাদ্দ চেয়ে ITU’র কাছে আবেদন করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইল, জাপান, সাইপ্রাস, আর্মেনিয়া, উজবেকিস্তান, অস্ট্রেলিয়াসহ ২০টি দেশ তাতে আপত্তি জানায়। এরপর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্যাটেলাইট পরিচালনা ও স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া বেতার তরঙ্গের সর্বোত্তম ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৬৯ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে কক্ষপথ বরাদ্দ দেয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ ৬৯ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে কক্ষপথ বরাদ্দ চাইলে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর আপত্তি জানায়। এরপর রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনের (Intersputnik International Organization of Space Communication) তাদের মালিকানাধীন অরবিটাল লোকেশন ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করে। ১৫ জানুয়ারি ২০১৫ ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ ভাড়া নিতে চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC)। ইন্টারস্পুটনিকের সাথে ১৫ বছরের চুক্তি করা হলেও তিন ধাপে তা ৪৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। 

ট্রান্সপন্ডার : স্যাটেলাইটে ট্রান্সপন্ডার ৪০টি, যার ১৪টি ‘সি’ ব্যান্ডের (C-band) এবং ২৬টি ‘কে ইউ’ ব্যান্ডের (Ku-band)। কেইউ-ব্যান্ড বাংলাদেশসহ বঙ্গোপসাগর, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। অপরদিকে এর সি-ব্যান্ড বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কিমিনিস্তান এবং কাজাখাস্তানের একটি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। এগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ, অন্যগুলো ভাড়া দেয়া হবে। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার থেকে ৪০ মেগাহার্টজ হারে তরঙ্গ বরাদ্দ (ফ্রিকোয়েন্সি) সরবরাহ পাওয়া যাবে। এ হিসাবে ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা হলো ১,৬০০ মেগাহার্টজ। কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এ ১,৬০০ মেগাহার্টজ পুরোটা ব্যবহার করা যাবে না। তবে কমপক্ষে ১,৪০০ মেগাহার্টজ ব্যবহার করা হবে। 

নির্মাতা বা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান : ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ নির্মাণের জন্য ১১ নভেম্বর ২০১৫ ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের (Thales Alenis Space) সাথে টার্ন কি চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী, স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো, উৎক্ষেপণ-ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনায় সহায়তা ও ঋণের ব্যবস্থা করবে ফ্রান্সের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। স্যাটেলাইটটি তৈরি করা হয় ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালিনিয়া স্পেস ফ্যাসিলিটিতে। তৈরির পর এটি পরীক্ষা, পর্যালোচনা ও হস্তান্তর শেষে উৎক্ষেপণের জন্য বিশেষ কার্গো বিমান করে ২৯ মার্চ ২০১৮ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ সাইটে নেয়া হয়। এটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ১,৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। 

পরিচালনায় স্যাটেলাইট কোম্পানি : বর্তমানে স্যাটেলাইটের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশনে হস্তান্তর করা হবে। তখন বাংলাদেশের গ্রাউন্ড স্টেশন থেকেই এটি নিয়ন্ত্রিত হবে। এ কারণে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ কার্যক্রম পরিচালনা, স্থল স্টেশন থেকে উপগ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিপণন ও বিক্রয় সেবা ইত্যাদির জন্য বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BCSCL) নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। ১০ আগস্ট ২০১৭ BCSCL-এর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের প্রথম বৈঠকের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। পদাধিকার বলে এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব। 

গ্রাউন্ড স্টেশন : বাঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ‍নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গাজীপুরের তালিবাবাদ ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে গাজীপুর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এবং বেতবুনিয়া বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে দুটি ভূ-উপগ্রহ উপকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। 

যাত্রা যেভাবে : ১১ মে ২০১৮ বা ২৮ বৈশাখ ১৪২৫ (শুক্রবার) বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন। কারণ এ দিন বাংলাদেশের সময় রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত কেপ কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ (39A) থেকে মহাকাশের পথে উড়াল দেয় বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’। এটি ফ্যালকন-৯ রকেটের নতুন সংস্করণের প্রথম সফল উৎক্ষেপণ। উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে রকেটের স্টেজ-১ খুলে যায়। এ সময় চালু হয় স্টেজ-২-এর ইঞ্জিন। স্টেজ-১ ফিরে আসে আটলান্টিকে ভাসমান ড্রোন শিপে। আর স্টেজ-২ স্যাটেলাইটটিকে নিয়ে যায় জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটে। সেখানে পেলোড থেকে স্যাটেলাইটটিকে অবমুক্ত করা হয়। এ পুরো প্রক্রিয়া সমাপ্ত হতে সময় লাগে ৩০ মিনিট। রকেট থেকে উন্মুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর নিয়ন্ত্রণ নেয়া হয় উৎক্ষেপণের ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশন এর প্রাথমিক সংকেত গ্রহণ করে। মহাকাশের নির্ধারিত ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে নিজস্ব অরবিটাল স্লটে জায়গা করে নিতে ৩৫,৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১কে। আর এ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হলো। 

স্লোগান : ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটিতে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে ‘বিবি’ আর রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের লোগো। 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সুবিধা : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব যদি এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এ স্যাটেলাইটের সুবিধাবলি নিচে তুলে ধরা হলো : 

১. তথ্যপ্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমাদের টেলিকমিউনিকেশন্স, টেলিভিশন টেওয়ার্ক আর ইন্টারনেটে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যার জন্য পূর্বে আমরা ভারত ও অন্যান্য দেশের উপর নির্ভর করতাম। বছরে আমাদের দেশ থেকে ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যেত ভিনদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া নিতে। টেলিকমিউনিকেন্স, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আর ইন্টারনেটের কানেক্টিভিটির জন্য আমাদের নির্ভর করতে হতো অন্য দেশের দেয়া সুযোগের উপর। এখন আমাদের দেশেরই একটা অত্যাধনিক স্যাটেলাইট থাকায় স্যাটেলাইট ভাড়া হিসেবে দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমে এখন এক-তৃতীয়াংশ হয়ে যাবে। বেসরকারি চ্যানেলগুলোকে আগে প্রতি মাসে ৩০ হাজার ডলার খরচ করতে হতো ফ্রিকোয়েন্সি কিনতে। অত্যাধিক এ ব্যয় আর করতে হবে না, এখন তার কম দাশে দেশের ভেতর থেকেই ফ্রিকোয়েন্সি কিনতে পারবে। ফলে সাশ্রয় হবে প্রচুর অর্থ। আর তার চেয়েও বড় কথা, দেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের কাছে ফ্রিকোয়েন্সি বিক্রির মাধ্যমে দেশের টাকা দেশেই থাকবে বিদেশের উপর নির্ভরতা কমে যাবে। 

২. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন : দেশের টেলিকমিউনিকেশন, টেলিভিশন আর ইন্টারনেটের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির জন্য রাখা হবে। শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারের কাছে এ স্যাটেলাইট সার্ভিস বিক্রি করে আমরা বছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। 

৩. ই-সেবার উন্নয়ন : এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-রিসার্চ, ভিডিও কনফারেন্সিং, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সব সেক্টরেই ই-সেবা ম্যাসিভ বুস্ট আপ করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, যেটা এতদিন অনেকটাই অসম্ভব ছিল। বিদেষ করে দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী ও হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা চালুও সম্ভব হবে। অর্থাৎ বড় বড় সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যায় যেমন আগে টেলিফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়ত, সেটা আর এখন হবে না। 

৪. জলপথে চলাচল ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধান : নেভিগেশন বা জাহাজের ক্ষেত্রে দিক-নির্দেশনায়, গ্লোবাল পজিশনিং বা জিপিএস, ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করার ক্ষেত্রে, গামা রে এক্সপ্লোশন ডিটেকশন করতে আমাদের সাহায্য করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। মাটি বা পনির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিভিন্ন খনির শনাক্তকরণের মাধ্যমে নতুন সম্পদের দুয়ার খুলে দেয়ার কাজে সাহায্য করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। 

মহাকাশ গবেষণা : মহাকাশ বা জ্যোতিবিজ্ঞান গবেষণার এক বিশাল দুয়ার উন্মোচন করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। বিশেষ করে বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী এবং মহাকাশবিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গড়তে, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চাওয়া শিক্ষার্থীরা নতুন এক ডাইমেনশন পাবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মহাকাশবিজ্ঞান বিভাগ খোলা হবে। হাজার হাজার বেকারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এ স্যাটেলাইট দিয়েই। এ স্যাটেলাইটের হাত ধরেই একদিন হবে আমাদের নিজস্ব গবেষণা সংস্থা। পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ও ফান্ডিং পেলে শুরু হবে গবেষণার নতুন এক অধ্যায়। 

৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ থেকে পাওয়া যাবে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ। ফলে ব্যান্ডউইথের বিকল্প উৎসও পাওয়া যাবে। দেশের দুর্গম অঞ্চলে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে জরুরি টেলিযোগাযোগ সেবা পৌঁছে দেয়াও সম্ভব হবে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্বাভাবিক টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও উদ্ধারকর্মীরা স্যাটেলাইট ফোনে যোগাযোগ রেখে দুর্গত এলাকায় কাজ করতে সক্ষম হবেন। যদিও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২,৭৬৫ কোটি টাকা। কিন্তু এর ১০০% সঠিক ব্যবহার করতে পারলে সেটা খরচকৃত টাকার থেকে শতগুণ বেশি উপকার করবে। 

৭. বাণিজ্যিক দিক : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ। এ স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে, যার মধ্যে ২০টি দেশের কাজে ব্যবহৃত হবে আর ২০টি ভাড়া দেয়া যাবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ভাড়া দিলে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব হবে। 

৮. সামরিক ও প্রতিরক্ষা সুবিধা : দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সুবিধা পাবে। কারণ তারা স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করে। স্যাটেলাইট ফোন হলো যে ফোনে ট্রেস করা যায় না। এটি কোনো তারের মাধ্যমে চলে না। সামরিক খাত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এটি আমাদের একটি অনেক বড় কম্পিটিটিভ এডভান্টেজ হয়ে দাঁড়াবে। আজকাল জঙ্গী বা সন্ত্রাসীরা অনেক রিমোট এরিয়াতেও স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট না থাকায় আমাদের চৌকষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষেও এদের লোকেট করা, খুঁজে বের করা সম্ভব হয় না। শত্রুর অবস্থান জানার জন্য পরিদর্শন-প্ররিক্রমা, ছবি তোলার কাজে, স্থল সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য ইনটেলিজেন্স সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পেতে এমনকি পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং আসন্ন হামলার আগাম খবরাখবর সরবরাহের কাজেও এ স্যাটেলাইটটিই হবে আমাদের প্রধান গুপ্তচর। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে ও সন্ত্রাসীদের ধরতে এ স্যাটেলাইটটি রাখবে বিশাল ভূমিকা। 

৯. দেশের ভাবমূর্তি : তথ্যপ্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাকে ছাড়িয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেটি হলো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির অভিজাত দেশের ক্লাবে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তৈরির ঘোষণা আসার পরপরই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ন্যানো স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছেন এ দেশেরই কয়েকজন তরুণ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চারজন ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পে কাজ করছেন। এ তরুণেরা বলছেন, সরকারের দিক থেকে কিছুটা সহযোগিতা পেলে ২০২১ সালের মধ্যে দেশেই স্যাটেলাইট তৈরি করা সম্ভব। তারা মনে করেন, নিজেদের স্যাটেলাইট তৈরি হওয়ার কারণেই এমন বড় স্বপ্ন ও চিন্তাভাবনা করতে পারছেন তারা। 

উপসংহার : পরিশেষে আমরা বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বাংলাদেশ এখন ৫৭টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের অভিজাত ক্লাবের গর্বিত সদস্য।


আরো দেখুন :

7 comments:


Show Comments