বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : চিকিৎসা ক্ষেত্রে কম্পিউটার

ভূমিকা :

‘বিজ্ঞান বিশ্বসভ্যতায় অনেক বিস্ময়কর উপহার দিয়েছে। 
এই বিস্ময়ের অন্যতম হল আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা।’
                              – হেনরি ডেভিড। 
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে যন্ত্রবিজ্ঞানের জয়যাত্রা অব্যাহত। বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎশক্তি ও আণবিকশক্তি যন্ত্রবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার নিত্য নতুন দ্বার দিয়েছে খুলে। ফলে সংখ্যাতীত আবিষ্কারের মধ্যস্থতায় মানুষ যন্ত্রশক্তিতে হয়েছে দুর্বার শক্তির অধিকারী। যন্ত্র আজ তার হাতের ক্রীড়নক। তার কর্মজীবনে বিজ্ঞানের বৃহত্তর ক্ষেত্রে অনুগত ভৃত্যের মতো হুকুম তালিম করতে যে যন্ত্র সদা ব্যস্ত তার নাম কম্পিউটার। আজকের দিনে তাই মানবসভ্যতা হয়ে পড়েছে কম্পিউটার-নির্ভর স্বয়ংক্রিয়তা-কেন্দ্রিক। কম্পিউটার বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী বিস্ময় ও আধুনিকতম আবিষ্কার। কম্পিউটার প্রযুক্তি চিকিকৎসাবিজ্ঞানকে নিয়ে এসেছে সর্বাধুনিক পর্যায়ে। চিকিৎসাক্ষেত্রে কম্পিউটার ছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞান কল্পনা করা যায় না। চিকিৎসার প্রতিটি স্তরেই কম্পিউটারের ব্যবহার এতটাই বেশি যে কম্পিউটারকে বাদ দিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান কল্পনা মাত্র। 

কম্পিউটার কী? : আভিধানিক অর্থে কম্পিউটার হল এক ধরনের গণক যন্ত্র। কিন্তু আজকাল কম্পিউটারকে কেবল গণনাকারী বলা চলে না। এখন তা এক ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ধারণা দেয় যা অগণিত তথ্য বা উপাত্ত গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ, গণনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করতে পারে। ফলে কম্পিউটার মুহূর্তের মধ্যেই একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীর মতো কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতো রোগের বিভিন্ন পরিস্থিতি, উপসর্গ, আচরণ ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বিভিন্ন প্রকার ঔষধের গুণগত মান। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় কম্পিউটারের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ও কম্পিউটার নির্ভর হয়ে পড়েছে। 

সনাতন চিকিৎসা ব্যবস্থা : প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যার শুধু আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে। আদিম মানুষ রোগবালাই ও অন্যান্য দুর্যোগকে স্রষ্টার অভিশাপ, শরীরে ভূতপ্রেতের অশুভ আছর বা দুষ্টগ্রহের কুপ্রভাবের ফল মনে করত। সে সময় মানুষ রোগমুক্তির জন্য বিভিন্ন ধরনের কবিরাজ ওষুধ, গাছ-গাছালি, দোয়া, তাবিজ-কবজ, পানিপড়া ইত্যাদির ওপর নির্ভর করত। সনাতন পদ্ধতিতে চিকিৎসা ও উপশম কৌশল উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানের প্রথাগত ব্যবহার ও সাংস্কৃতিক আচরণ, সামাজিক সংস্কার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অনেকক্ষেত্রে বর্তমান ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের বিভিন্ন কুসংস্কারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ফলে রোগ-জিবাণু শনাক্তকরণে কিংবা ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ছিল তাদের নাগালের বাইরে। কম্পিউটার কিংবা এ ধরনের কোন যন্ত্রের কথা সে সময়ের মানুষ কল্পনাও করতে পারে নি। বস্তুত সে সময়ে চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি না থাকায় জটিল রোগ নির্ণয় করা ছিল দুঃসাধ্য। ফলে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসাব্যবস্থার অভাবে মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হতো এবং সুচিকিৎসার অভাবে মারা যেত অনেকে। পরবর্তী কালের মানুষ চিকিৎসাবিদ্যার অনেক উন্নতি ঘটায় এবং বিভিন্ন দ্রব্যাদি রোগের নিরাময়ে ব্যবহার করে। 

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সূচনা : সপ্তম শতাব্দীতে আল রাজি, ইবনে-সিনা, আল-রশিদ এর মতো আরব ও পারস্যের মুসলীম মনীষীদের ইউনানী চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও জ্ঞানচর্চার ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয় এবং প্রকৃতরূপ লাভ করে। ইউনানি চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে আরব চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে একে গ্রেকো-আরব ব্যবস্থাও বলা হয়। ইবনে-সিনার (৯৮০ – ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দ) চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কানুন) (ইউনানি ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে লেখা) ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞান অধ্যয়নে পাঠ্যপুস্তক ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর মুসলীম জ্ঞানচর্চা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে। এ উপমহাদেশে বৈদিক যুদ থেকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়। তারপর ভারতে মুসলমান বিজয়ের পর থেকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়। তারপর ভারতে মুসলমান বিজয়ের পর থেকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার ক্রমে অবনতি ঘটতে থাকে। পাঠান ও মুগল রাজাদের আনুকূল্যে বিকশিত ইউনানি তিব্বি চিকিৎসার প্রসার অব্যাহত থাকে। ১৮১০ ও ১৮৩৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা এ উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর এলোপ্যাথিক চিকিৎসার প্রচলন হয় ব্রিটিশ আমলে। 

আধুনিক চিকিৎসার ধ্যান-ধারণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কম্পিউটার বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কম্পিউটারের বদৌলতে আবিষ্কৃত হয় চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন নতুন পদ্ধতি ও রোগ নির্ণয়ের নতুন নতুন যন্ত্রপাতি। কম্পিউটারের সাহায্যে জটিল সব রোগ নির্ণয় করা সম্ভবপর হয়েছে আধুনিক যুগে। কম্পিউটারের অবদান আধুনিক যুগে সনাতন ও লোকজ চিকিৎসার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার প্রবর্তন হয়েছে। ফলে বিজ্ঞানের এই যুগে মানুষ ক্রমেই প্রাচীনকালের মতো লোকজ ও সনাতন অপ্রচলিত পদ্ধতি, ধর্মীয় বিশ্বস ও সামাজিক সংস্কারের ওপর নির্ভর না করে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সুফল পেতে থাকে। অতীতের গুটিবসন্ত, প্লেগ জাতীয় কঠিন সব রোগ ও মহামারীর হাত থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে আধুনিক চিকিৎসার বদৌলতেই। কম্পিউটারের মধ্য দিয়েই এসব মহামারি জনিত রোগের ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান লাভ করতে সক্ষম হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। 

চিকিৎসাক্ষেত্রে কম্পিউটার ও তার কার্যকারিতা : কম্পিউটার আসলে এক ধরনের যন্ত্র মস্তিস্ক। কম্পিউটারের বড় উপযোগিতা হল তথ্য ও প্রোগ্রামের রদবদল বা সংযোজন ঘটিয়ে একই কম্পিউটারকে দিয়ে নানা রকম কাজ করা যায়। কম্পিউটার যে আজকের দিনে বিস্ময়কর ও বিশ্বস্তভাবে সবধরনের কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছে তার মূলে রয়েছে এর বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন : 
  • অত্যন্ত দ্রুত গণনার ক্ষমতা 
  • বিপুল পরিমাণ উপাত্তকে সুসংবদ্ধভাবে যন্ত্র মগজে ধরে রাখার ক্ষমতা 
  • তথ্য বিশ্লেষণের নির্ভুল ক্ষমতা 
  • ‘ডাটা’‘প্রোগ্রাম’ অনুসারে কাজ করার ক্ষমতা। 
চিকিৎসাক্ষেত্রে এখন কম্পিউটারের একচ্ছত্র আধিপত্য। চিকিৎসা জগতে কম্পিউটার আজ যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে নব আশীর্বাদরূপে আবির্ভূত হয়েছে। স্বাস্থ্য সংরক্ষণের জন্য চাই উন্নততর চিকিৎসাব্যবস্থা। তাই চিকিৎসাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে কম্পিউটার মানুষের স্বাস্থ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কম্পিউটারের মাধ্যমেই মানুষ দুরারোগ্য জটিল সব রোগের কারণ অনুসন্ধান করতে সক্ষম হয়েছে, জীবাণুর সন্ধান করতে পেরেছে। কিছুদিন আগেও যেখানে মানবদেহের অভ্যন্তরীন রোগ নির্ণয়ের জন্য এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের রোগবালাই উপশমের জন্য অপারেশন ও কাটাছেড়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না, সেখানে কম্পিউটারের মাধ্যমে অপারেশন ছাড়াই বিভিন্ন জটিল রোগ নিরাময় সম্ভব হচ্ছে। কম্পিউটারাইজড ডায়াগনোস্টিক সিস্টেমে আজকাল বহু ধরনের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাব্যবস্থা করা হচ্ছে কম্পিউটারের উপর নির্ভর করে। যে কোন রোগ নির্ণয়েই কম্পিউটারের ওপর কোনো-না-কোনোভাবে নির্ভর করতে হয়। ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি (অপারেশন ছাড়া পিত্ত থলির পাথর অপারেশন), আলট্রাসনোগ্রাফ, ভিডিও এন্ডোস্কপি, প্যাথলজি, ইসিজি, ডিজিটাল এক্স-রে, ইকো কার্ডিওগ্রাফি, আল্ট্রা সাউন্ড ইমাজিং, ইকো কার্ডিওগ্রাম, স্পাইরাল সিটি স্ক্যান ইত্যাদি সবকটির ক্ষেত্রেই কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। সর্বোপরি কম্পিউটারাইজড চিকিৎসা ব্যবস্থার ফলেই মানুষ দুরারোগ্য ও জটিল সব রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে, নতুন ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানুষ সুখে-স্বাচ্ছন্দে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পাচ্ছে। 

চিকিৎসাক্ষেত্রে কম্পিউটারের সাফল্য : বিংশ শতাব্দীর পূর্বে চিকিৎসা পদ্ধতি ততটা উন্নত ছিল না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলেই আজ মানুষের গড় আয়ু ৫০-৭০ বছর আগে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির পরিসংখ্যান নিলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে, মানবসভ্যতার বিগত সাত-আট হাজার বছরের ইতিহাসে চিকিৎসা শাস্ত্রের যে উন্নতি সাধত হয়েছে তার মূলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে যন্ত্রটি নিরলস ভূমিকা রেখে চলেছে, তা হল কম্পিউটার। যেখানে গত শতাব্দীতেও বসন্ত, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, নিউমোনিয়া প্রভৃতি রোগে নিশ্বের হাজার হাজার মানুষের জীবনাবসান ঘটেছে, সেখানে বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের অপরাপর শাখার মতো চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হওয়ায় এসব মহামারির নিয়ন্ত্রণ যেমন সহজ হয়েছে তেমনি মানুষ এসব জটিল রোগের হাত থেকেও রক্ষা পেয়েছে অতি সহজে। আর এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে কম্পিউটারাইজড চিকিৎসা পদ্ধতি। যেখানে রোগ নির্ণয়, শনাক্তকরণে, বিশ্লেষণে, উপাত্ত সংরক্ষণে কম্পিউটারের ভূমিকাই ছিল প্রধান। 

চিকিৎসা জগতে কম্পিউটার : চিকিৎসা জগতে কম্পিউটার আজ যুগান্তর এনেছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুর সংখ্যা আজ হ্রাস পেয়েছে। কর্নিয়া (অক্ষিগোলকের স্বচ্ছ আবরণ), বৃক্ক, অস্থিমজ্জা, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস এবং যকৃতের মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনে কম্পিউটারাইজড চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক সাফল্য অভাবনীয়। কালাজ্বরের জীবানূ আবিষ্কার (১৯০০), সহযোগী হৃৎপিণ্ড আবিষ্কার (১৯০৮), কোলেস্টরল (১৯১২) ও পেনিসিলিন ওষুধ (১৯২৮), রক্তরস আবিষ্কার (১৯৪০), কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন (১৯৪৩), বংশগতি ধারা বিষয়ক ডিএনএ (১৯৫৩), হার্টের পেসমেকার (১৯৫৩), ওপেন হার্ট সার্জারি ও হার্টের বাইপাস সার্জারিতে প্রয়োজনীয় হার্টলাং মেশিন তৈরি ইত্যাদি। এছাড়া যে আল্ট্রাসনিক স্ক্যানিং এর মাধ্যমে শরীরের ভেতরের যকৃত, পিত্তথলি, কিডনি ইত্যাদির অবস্থা নির্ণয় করা ইত্যাদিসহ সবকটি ক্ষেত্রেই কম্পিউটারের প্রয়োগ ও ব্যবহার অনস্বিকার্য। অপারেশন দ্রুত করার জন্য লেজার সার্জারি আবিষ্কার, তাছাড়া সিটি স্ক্যান আবিষ্কারের কারণে রোগীর শরীরে সরু রশ্মি প্রবেশ করিয়ে টিস্যুর ঘনত্ব নির্ণয় করা রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হয়েছে। এন্ডাস্কোপ (১৯৬৫) আবিষ্কারের ফলে পাকস্থলীর মধ্যে নল ঢুকিয়ে পাশাপাশি কম্পিউটারে পাকস্থলির ছবি পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা করা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফাইবার অপটিকস্ (আলোক তন্তু বিদ্যা) ব্যবহারের ফলে মানবদেহের অভ্যন্তরস্থ ফুসফুস, পাকস্থলী, বৃহদন্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত্র, উদর, অস্থিগ্রন্থি, শিরা, ধমনী ইত্যাদির অবস্থা বিশেষ কম্পিউটার যন্ত্রের সাহায্যে অবলোকন করে নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করা যায়। শুধু তাই নয়, অপটিক ফাইবার (আলোক তন্তু) সংবলিত বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্যে নমুনা সংগ্রহ করা যায়। অতিকম্পনশীল শব্দ ও লেজারকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেছে। এর ফলে বিশেষ চিকিৎসা-সম্পর্কিত কম্পিউটারের সাহায্যে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন দেখা সম্ভব হচ্ছে তেমনি মূত্রথলি ও পিত্তকোষের পাথর চূর্ণ করার কাজেও এর সফল ব্যবহার হচ্ছে। আধুনিক অন্টাক্ট লেন্স (১৯৫৬), ঘাতক ব্যাধি এইডসের জীবাণু আবিষ্কার (১৯৮৪), তাছাড়া ১৯৭৮ সালে প্রথম টেস্টটিউব লুইস ব্রাউন নামক শিশুর জন্ম, ১৯৯৭ সালে পূর্ণাঙ্গ ভেড়ার দেহকোষ থেকে ডলির জন্মগ্রহণ নিঃসন্দেহে চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নয়নের অনবদ্য সাফল্যের সোনালি স্বাক্ষর। আর এর সব কিছুর মূলেই আছে কম্পিউটার নামক বিশেষ যন্ত্রাদির সাফল্য ও অবাদ ব্যবহার। 

রোগ নির্ণয়ে কম্পিউটার : রোগ নিরাময়ের পূর্বশর্ত রোগ নির্ণয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমেই রোগের সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করা সম্ভব। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে না পারলে সুচিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসাক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে কম্পিউটার। চিকিৎসা বিজ্ঞানে নব নব আবিষ্কার : রঞ্জন রশ্মি, এক্সরে, ইসিজি, সিটি স্ক্যান, মাইক্রোস্কোপ, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এমআরআই ইত্যাদি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পরীক্ষা চালিয়ে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে একমাত্র কম্পিউটারের কারণেই। 

রোগ নিরাময় ও ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কম্পিউটার : আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিজ্ঞানের আশীর্বাদেই সম্ভব হয়েছে। রোগ নিরাময়ের আধুনিক সব ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির ফলেই পেনিসিলিন, স্ট্রেপটোমাইসিন, ক্লোরোমাইসিন ইত্যাদি মহৌষধের আবিষ্কার হয়েছে। এছাড়াও সর্দিজ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, জন্ডিস, পেপটিক আলসার ইত্যাদি ছোটখাটো যেসব রোগ, যা প্রতিনিয়তই মানুষের জীবনে লেগে আছে তারও অনেক প্রকার ওষুধ বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে। আর এসব ঔষধের মাননিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কম্পিউটার ব্যবহার অবিসংবাদিত। কম্পিউটারাইজড চিকিৎসা পদ্ধতির আশীর্বাদেই মানুষ আজ জটিল সব রোগ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে পেয়েছে। অধ্যাপক কুরি ও মাদাম কুরির আবিষ্কৃত রেডিয়াম ব্যবহার করে দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগেরও চিকিৎসা করছেন চিকিৎসকরা। প্লাস্টিক সার্জারি করে মানুষের শরীরের আকৃতি বা চেহারা পরিবর্তনের মতো দুঃসাধ্য কাজও সম্ভব হচ্ছে কম্পিউটারাইজড চিকিৎসা পদ্ধতির বদৌলতে। এমনকি কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গও সংযোজন করা হচ্ছে মানবদেহে। আজকাল জেনেটিক রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি শনাক্ত ও চিকিৎসা আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। মোটকথা, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসম্ভব বলে আর কিছুই থাকছে না। আর এ সবের মূলে আছে কম্পিউটার। 

চিকিৎসাক্ষেত্রে কম্পিউটারের গুরুত্ব : চিকিৎসাক্ষেত্রে কম্পিউটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। অনেক অসাধ্য ও দুঃসাধ্য রোগ নির্ণয় ও তার চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে কম্পিউটারের মাধ্যমে। মানুষের জন্যই বিশ্ব। সুস্থ-সবল মানুষই জাতিকে উন্নতির দিকে ধাবিত করে। বিজ্ঞান যদি চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন না আনত তাহলে কঠিন সব রোগ-ব্যাধি থেকে মানুষ মুক্তি পেত না। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত অসংখ্য মানুষ। অসুস্থ, অথর্ব মানুষ নিয়ে বিশ্ব হয়ে পড়ত অচল। কিন্তু বিজ্ঞান মানুষকে সচল রাখছে। মানুষের জীবনে সুখ-শান্তি বয়ে এনেছে বিজ্ঞানভিত্তিক কম্পিউটারাইজড চিকিৎসা পদ্ধতি। 

উপসংহার : মানুষ বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। যে জীবন ধারণের জন্য মানুষের প্রাণান্ত চেষ্টা, যে জীবনকে উন্নত করতে নব নব আবিষ্কার, সে জীবনের রোগ-শোক, ব্যাধি-জরা থেকে রক্ষা করতে বিজ্ঞানের চেষ্টার অন্ত নেই। মানুষ আর এখন কঠিন রোগে হাল ছাড়তে রাজি নন। যে করেই হউক সে রোগের কারণ ও জীবাণুর সন্ধান তার চাই-ই চাই। রাত দিন কম্পিউটারের বদৌলতে রোগের কারণ ও জীবাণুর সন্ধান করে চলছে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। তাই আজ চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে কম্পিউটার হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের সঙ্গী, আলোর পথের অভিযাত্রী।


আরো দেখুন :

No comments