বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : জাতীয় জীবনে টেলিভিশনের ভূমিকা

সূচনা : টেলিভিশন বর্তমান বিশ্বে বিনোদনের সর্বাধিক জনপ্রিয় মাধ্যম। ‘টেলি’ শব্দটি ল্যাটিন ‘tele’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ দূরবর্তী আর ‘Vision’ শব্দ ‘Visio’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ দেখা। টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা ঘরে বসে দূরবর্তী স্থানে প্রচারিত কোনো অনুষ্ঠানের দৃশ্য ও শব্দ একই সঙ্গে দেখতে এবং শুনতে পাই।

আবিষ্কার : বিজ্ঞানীদের বহু বছরের সাধনা ও গবেষণার পথ ধরে ১৯২৫ সালে ইংল্যান্ডের বৈজ্ঞানিক বেয়ার্ড টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৪৫ সালে তা বর্তমান রূপ লাভ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে টেলিভিশন এনে দিল অভাবিত উন্নতি। ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে মানুষ সারাবিশ্বকে জেনে নিতে পারছে আজ।

জনমনে টেলিভিশনের প্রভাব : জনমনে টেলিভিশনের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। কি আনন্দ, কি শিক্ষা, কি জ্ঞান, উপদেশ, সতর্কবাণী- যেকোনো বিষয়ে টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান লক্ষ লক্ষ দর্শক হৃদয়ে একই সঙ্গে যেভাবে অনুভূতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় তেমনটি আর কারো পক্ষেই করা সম্ভবপর নয়। সাধারণত টেলিভিশনকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ধরা হলেও শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, দেশ-বিদেশের খবরা-খবর, দেশের নানা সমস্যার সমাধান, সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়ন বিষয়ক নানা প্রকার আলোচনা, সমালোচনা, প্রতিবেদন ইত্যাদি ভিত্তি করে টেলিভিশনে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। তাই শিক্ষা-দীক্ষা বিস্তার এবং জাতি গঠনে টেলিভিশনের উপযোগিতা আজ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চ-নিম্ন সকল ধরনের পেশাজীবী, ছোট-বড় নির্বিশেষে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে টেলিভিশন একটি আকর্ষণীয় আনন্দের মাধ্যম। তাই জনকল্যাণের এক বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার অন্যতম হাতিয়ার রূপে আজকের দিনে টেলিভিশনের অপরিসমি ভূমিকা রয়েছে।

টেলিভিশন ও বিশ্ব শিল্প : টেলিভিশন দূরকে নিকট করে। সারা বিশ্বকে এনে দেয় চোখের সামনে। হিউস্টনে বসে আমেরিকার মানুষ দেখতে পেয়েছিল চাঁদের বুকে নীল আমস্ট্রং-এর অবতরণ। বাংলাদেশে বসে আমরা দেখতে পাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বড় বড় খেলাসমূহ। দেখতে পেয়েছি জাপানে অনুষ্ঠিত মোঃ আলী ক্লের মুষ্টিযুদ্ধ, ইংল্যান্ডের রাজপুত্র চার্লস-এর বর্ণাঢ্য বিবাহ উৎসব, সুদূর মক্কার কা’বা প্রাঙ্গনের হজ্জ্ব, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের আরো হাজারো চমকপ্রদ ঘটনাবলি। টেলিভিশন প্রতিদিনকার পৃথিবীকে তথ্যে সমৃদ্ধ করে আমাদের চোখের সামনে উদ্ঘাটিত করে দিচ্ছে।

শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশে টেলিভিশন : শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে টেলিভিশন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশ জাতীয় উন্নয়নের একটি অপরিহার্য শর্ত। টেলিভিশনে বিভিন্ন প্রকার গান, বাজনা, নাচ, নাটক, আবৃত্তি, কৌতুক প্রচারিত হয়। এতে একদিকে যেমন শিল্পচর্চার অব্যাহত ধারা সৃষ্টি হয় তেমনি জাতীয় জীবনে প্রতিভা বিকাশের পথও প্রশ্বস্ত হয়। টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পী ও উপস্থাপকদের উপস্থাপনা, কথাবর্তা, বাচনভঙ্গি ইত্যাদির শিল্প মাধুর্য জনগণের মধ্যে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

গণতান্ত্রিক সরকার ও টেলিভিশন : গণতান্ত্রিক সরকার সৃষ্টির একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম টেলিভিশন এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রধান বা দেশের প্রখ্যাত নেতাগণ জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করে দেশ ও সমাজের কল্যাণের লক্ষ্যে গণসচেতনতা ও জনমত সৃষ্টি করতে পারেন। সরকারের উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কার্যাবলির প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করে সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র গড়ে তোলা যায়।

টেলিভিশন ও বাংলাদেশ : সমস্যাসংকুল বাংলাদেশে টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সমাজের নানা সমস্যার সমাধানকল্পে টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে যথেষ্ট সুফল পাওয়া সম্ভবপর। টেলিভিশন গণশিক্ষার একটি উপযুক্ত মাধ্যম। উন্নত দেশে স্কুল কলেজে শিক্ষাদানের অনুষ্ঠান, পাঠ্যপুস্তকের আলোচনা, বিজ্ঞান ও গবেষণা বিষয়ক আলোচনা, বিতর্ক অনুষ্ঠান, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ইত্যাদি প্রচার করে শিক্ষা বিস্তারে ফলপ্রসূ অবদান রাখতে পারে।

কৃষি ও টেলিভিশন : বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। জাতীয় উন্নতির অন্যতম শর্ত কৃষির উন্নতি। এ লক্ষ্যে টেলিভিশনের উন্নত পদ্ধতিতে চাষবাস, সঠিক সময়ে উপযুক্ত শস্যের আবাদ, মৎস্য চাষ, পশুপালন, খামার স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন, আলোচনা ও প্রশিক্ষণমূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে বাংলাদেমের কৃষকদের অশেষ উপকার-সাধন করা যায়। এই উপলক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে ক্লাব অথবা সেবা সমিতি প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্র কৃষকদের দর্শনের সুবিধার্থে অধিকসংখ্যক টিভি সেট সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতি গঠনে টেলিভিশন : একটি জাতি গঠনে এবং জাতিকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে টিশিভিশনের সমকক্ষ আর কিছু নেই। ক্ষেত-খামার থেকে শুরু করে কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, খেলাধূলা ইত্যাদির সকল বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করে টিলিভিশন জাতির প্রতিটি সদস্যকে কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়ে থাকে।

জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে টেলিভিশনের গুরুত্ব : বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা, সমাজের নানা প্রকার দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতা ইত্যাদি বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আইন আদালত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের চোরাচালানী, কালো-বাজারী, দুর্নীতি, ধূমপান বা মাদকদ্রব্যের মরণনেশা ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নৈতিক অধঃপতন রোধে এবং দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে টেলিভিশনের ভূমিকা অসামান্য। বিনোদনের ক্ষেত্রে টেলিভিশন অবশ্যই উন্নত রুচির শিল্প মাধুর্যমন্ডিত অনুষ্ঠান প্রচার করে জনগণকে সুস্থ ও নির্মল আনন্দ-প্রধানের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। টেলিভিশনের মাধ্যমে একটি জাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞান লাভ করতে পারে।

উপসংহার : উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশগুলোতে টেলিভিশনকে শুধুমাত্র বিনোদনের বিলাসসামগ্রী হিসেবে না দেখে এবং ধনীগৃহে এর ব্যবহার সীমিত না রেখে সরকারি প্রচেষ্টায় তাকে গণমুখী করে তোলা দরকার।

3 comments:


Show Comments