বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা

↬ জীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা

↬ শিক্ষা ও খেলাধুলা

↬ খেলাধুলা শিক্ষার অঙ্গ

↬ শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তা


ভূমিকা :
‘দুর্বল মস্তিষ্ক কিছু করিতে পারে না। আমাদিগকে উহা বদলাইয়া সবল মস্তিষ্ক হইতে হইবে। তোমরা সবল হও, গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমার স্বর্গের সমীপবর্তী হইবে।’
                                      -স্বামী বিবেকানন্দ

সবলতাই মানুষের জন্মমুহূর্তের অঙ্গীকার। শারীরিক সুস্থতাই মানসিক বলিষ্ঠতার উপায়-উপকরণ। শরীর ও মনের যৌথ কল্যাণপ্রসূ বোঝাপড়ার ওপরই নির্ভর করে তার অনাগত দিনের সুখ-সমৃদ্ধি; নির্ভর করে তার ভবিষ্যৎ ব্যর্থতা সফলতার বিষণ্ণমধুর ইতিহাস। খেলাধুলা তাই শরীর-মন গঠনের এক অন্যতম উৎস। মানব সভ্যতা ক্রমবিবর্তনের এক অপরিহার্য দলিল। দেশে দেশে যুগে যুগে খেলাধুলারও হয়েছে নানা রূপান্তর। হয়েছে গ্রহণ-বর্জনের নব নব পট পরিবর্তন। খেলাধুলা মানুষের অন্ন-প্রাণ-মুক্তবায়ু-স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল-পরমায়ু, সাহস-বিস্তৃত বক্ষপট ইত্যাদির চিরন্তন প্রার্থনার এক মহৎ সাধনা ও সিদ্ধি। খেলাধুলার মধ্যেই মানুষ খুঁজে পায় জীবন বিকাশের উন্মুক্ত বিশালতা, পায় জীবনসংগ্রামের দুর্জয় মনোভাব। লাভ করে সাফল্য উচ্ছ্বাস ও পরাজয় গ্লানিকে সহজভাবে মেনে নেয়ার দুর্লভ মানসিকতা। মাবন শরীরের জন্যে কর্মের পাশাপাশি বিনোদনেরও প্রয়োজন। এ বিনোদনের একটি অন্যতম উপায় খেলাধুলা। খেলাধুলার মাধ্যমে শরীর-মন সতেজ ও প্রফুল্ল থাকে ফলে মানুষ কাজে প্রেরণা পায় যা জাতি গঠনের ক্ষেত্রকে প্রসারি করে।
'Sports makes a man strong,
Sports makes a man live long.'

খেলাধুলার প্রকারভেদ : পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রকারের খেলাধুলা রয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, শুটিং, সাঁতার, টেনিস, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি ছাড়াও আরও অসংখ্য রকমের খেলা রয়েছে। এর ভিতর কিছু কিছু খেলা দেশীয় পর্যায়ে আর কিছু খেলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

খেলাধুলার উদ্ভব : খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছরেরও আগে কুস্তি খেলার প্রথম সূচনা হয় ইরাকে। এছাড়া মুষ্টিযুদ্ধ, অসিযুদ্ধ, দৌড়-ঝাঁপ ইত্যাদির ইতিহাসের সূচনাও ৪০০০ বছর আগেই। ৩০০০ বছর আগে প্রাচীন মিশরের খেলা ছিল ডালকুত্তা নিয়ে শিকার। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০ বছর আগে প্রাচীন রোমে ক্রীড়া হিসেবে মল্লযুদ্ধ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। খেলাধুলার ইতিহাসে অনন্য ঘটনা খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে প্রাচীন গ্রিসে অলিম্পিক খেলার সূত্রপাত। সেই বিশাল প্রতিযোগিতায় গ্রিসের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াকুশলীরা দৌড়-ঝাঁপ, মল্লযুদ্ধ, চাকতি নিক্ষেপ, বর্শা ছোঁড়া, মুষ্টিযুদ্ধ ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। পরবর্তীকালে খেলাধুলার জগতে নৌকা চালনা, বক্সিং, স্কেটিং, পোলো, সাঁতার, ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি অসংখ্য খেলার উদ্ভব হয়েছে এবং আরও নতুন নতুন খেলা উদ্ভাবিত হচ্ছে।

খেলাধুলার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা
শরীর গঠনে খেলাধুলা : খেলাধুলা মানুষের শরীর ও মন সতেজ করে। বলা হয়ে থাকে- ‘স্বাস্থ্যই সম্পদ’। আর সুস্থ শরীরই মানুষকে দান করতে পারে দুর্দম তেজস্বিতা ও উদম্য উদ্দীপনা। জীবনে স্বাস্থ্যের অপরিহার্যতার কথা বিবেচনা করে মানুষ সুস্থ শরীরের জন্যে যুগ যুগ ধরে খেলাধুলার অনুশীলন করে আসছে। দেহের পেশি গঠনে খেলাধুলা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। দেহকে সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রাণ-প্রাচুর্যে পূর্ণ করার জন্যে খেলাধুলা অপরিহার্য। সুস্থ শরীর মনের যে শক্তি ও সুদৃঢ় বুনিয়াদ রচনা করে দেয়, তাতে মানুষ পরবর্তীকালে জীবনযুদ্ধে মনোবল হা হারিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অর্জন করে।

মানসিক উন্নয়নে খেলাধুলা : মানসিক উন্নয়নের জন্য খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ও আনন্দময় পরিবেশের সংস্পর্শে বেড়ে উঠলে শিশুর মন হয় উচ্ছল ও আনন্দমুখর। মনের সতেজতা ও প্রাণময়তা বৃদ্ধিতে খেলাধুলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেখা যায়, শিশুদেরকে পুতুল খেলতে না দিয়ে যদি বয়স্কদের জগতে আবদ্ধ করে রাখা হয় তবে তাদের প্রাণোচ্ছল মানসিক বিকাশ হয় না। বরং তারা অভিমানী, অস্থির ও বদমেজাজি হয়। তাই সুস্থ মানসিক বিকাশে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তাকে অবহেলা করার কোনো উপায় নেই।

খেলাধুলা ও শৃঙ্খলা : শৃঙ্খলাবোধ শুধু ব্যক্তির নয়, সমগ্র দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নতির এক প্রধান হাতিয়ার। ক্রীড়াঙ্গনই শৃঙ্খলাবোধের সূতিকাগৃহ। এরই নিয়মিত অনুশীলনে মানুষ আয়ত্ত করে দেহমনে শৃঙ্খলা। জীবন সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে। সমষ্টি চেতনার উন্মেষ ঘটে। দলগত ঐক্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়। ব্যষ্টির সংকল্প মিশে যায় সমষ্টির সংকল্পে। ব্যক্তিগত দুর্বলতা হারিয়ে যায় দলগত প্রচেষ্টার মধ্যে। গোটা দল সর্বশক্তি উজাড় করে জয়ের প্রত্যাশায় ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের উপর। একক নৈপুণ্য প্রদর্শন নয়, দলগত সংস্থাই সেখানে প্রধান। আর এই দলগত শৃঙ্খলাবোধই জাতির অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। সেজন্যেই প্রত্যেক সমাজ-রাষ্ট্রে খেলাধুলার এত কদর।

খেলাধুলা ও চরিত্র গঠন : খেলাধুলা এক অনাবিল আনন্দের চিরন্তন উৎস। এই আনন্দের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে মানুষের শরীর, মন ও চরিত্র। সেই চরিত্রই ভাবীকালের জীবন-যুদ্ধে সফলতার প্রধান সোপান। খেলাধুলার সংযম শাসনেই জীবনের শৃঙ্খলা। খেলাধুলাই মানুষকে দেয় এক ভারসাম্যের শিক্ষা। খেলার মাঠের মত জীবনের প্রাঙ্গণে সাফল্যের জন্য আছে প্রতিযোগিতা, আছে বিজয়-উল্লাস, পরাজয়ের গ্লানি। আছে শান্ত চিত্তে তা মেনে নেয়ার ক্ষমতা। খেলার মাধ্যমেই সে সংগ্রহ করে জীবনে শ্রেষ্ঠ আচরণের দীক্ষা। সংগ্রহ করে চারিদিকে বলিষ্ঠতা। খেলাধুলা একদিকে তার চরিত্রকে দেয় সংকল্পের দৃঢ়তা, প্রতিযোগিতার একাগ্রতা, অপরদিকে দেয় পরাজয়ের সহনশীলতা, হৃদয়ের উদারতা।

খেলাধুলা ও শিক্ষা : শিক্ষা নিছক পরীক্ষাবৈতরণী উত্তরণের প্রতিশ্রুতি মাত্র নয়, রুজি রোজগারের উপকরণও নয়, নয় মানসিক ব্যায়ামের আখড়া। শিক্ষা সমগ্র জাতির অগ্রগতির উপায় উদ্ভাবন, মানুষের সুপ্ত প্রতিভার উন্মোচন- প্রেরণা। দেহমনের সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্য বিধানেই আছে মানুষের পূর্ণতার সন্ধান। খেলাধুলার আনন্দস্পর্শে দেহ-মন হয়ে উঠে সজীব ও প্রাণময়। একদা শিক্ষার সঙ্গে ছিল খেলাধুলার অহি-নকুল বিরোধ। ছিল উপেক্ষা, নির্বাসন। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় খেলাধুলা আর অনাদৃত নয়। শিক্ষা তাই সাবলীল স্বাচ্ছন্দ জীবনপ্রবাহে উদ্ভাসিত। মুক্তি ও আনন্দে উচ্ছলিত। শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য যদি হয় সুস্থ জীবনবোধের উজ্জীবন, তবে খেলাধুলার গুরুত্ব সেখানে সর্বাধিক।

খেলাধুলা ও জাতীয়তাবোধ : খেলাধুলা জাতীয়তাবোধেরও জন্ম দেয়। জাতীয়তাবোধ প্রত্যেক দেশেরই এক অমূল্য সম্পদ। এই মহৎ অনুভবেই দেশের গৌরব, জাতির ললাটে জয়ের তিলক। একদল যখন ভিন্ন দেশের ভিন্ন দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয, তখন সেই দলের সঙ্গে সেই দেশের অগণিত মানুষের আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রামী চেতনা, এক উজ্জ্বল আদর্শবাদ জড়িয়ে থাকে। সেই দল তখন আর কয়েকজন খেলোয়াড়ের সমষ্টিমাত্র নয়, সমগ্র দেশের অগণিত মানুষের প্রতিনিধি। সেই দলও তখন সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে। ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে তখন এক মন এক প্রাণ। জাতীয়তাবোধের চেতনা থাকে বলেই প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো চারিত্রিক দৃঢ়তায়, অনমনীয় মনোভাবে, নয়ম-শৃঙ্খলার অনুসরণে সংগ্রামী সংকল্পে হয়ে ওঠে দুর্জয়, ক্রীড়ানৈপুণ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও অনুপম শিল্পশ্রীর স্মরণীয় আসর।

খেলাধুলা ও বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ : খেলাধুলা দূরের ব্যবধান ঘুচিয়েছে, পরকে আপন করেছে। এরই মাধ্যমে এক দেশ অন্য দেশে শুভেচ্ছার বার্তা পাঠিয়েছে, প্রীতির সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছে। পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র হয়েছে প্রসারিত। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের উগ্র প্রতিযোগিতা হ্রাস পেয়েছে। খেলাধুলা মানুষে মানুষে প্রীতির সেতুবন্ধন। খেলাধুলা বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণের প্রধান উৎস। ভ্রাতৃত্ববোধ উন্মেষের প্রত্যক্ষ আনন্দ-আসর। জয়-পরাজয়ের হিসেবটা এখানে বড় নয়। প্রতিযোগিতার আন্তরিকতায়, উন্নতমানের ক্রীড়া-কৌশলে, হাজার হাজার ক্রীড়াপ্রেমিকের মন জয করে ক্রীড়াবিদরা। দর্শকরা মুগ্ধ হয়, প্রীতির হাত বাড়িয়ে দেয়, অকুণ্ঠ প্রশংসায় অভিনন্দিত করে। কি ক্রিকেট, কি ফুটবল, কি টেনিস, কি টেবিলটেনিস, কি ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি কত না ক্রীড়া-প্রতিযোগিতার আসর বসে দেশে দেশে। এভাবেই মানুষ সঞ্চয় করে ভ্রাতৃত্ববোধের এক মহৎ অভিজ্ঞতা। লাভ করে মনুষ্যত্বের দুর্লভ ঐশ্বর্য।

স্বাস্থ্যোন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধে খেলাধুলা : রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উচ্ছল পরমায়ু।’ স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে হলে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। শরীরের কোষগুলোর পুষ্টিসাধন, সহজ ও স্বাভাবিক রক্তচালনা, পরিপাক যন্ত্রকে কর্মক্ষম রাখা প্রভৃতির জন্যে প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো খেলা বা শারীরিক ব্যায়াম করা উচিত। সাঁতারের মতো খেলাধুলার ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোতে এখন বৃদ্ধরাও তাদের স্বাস্থ্য ধরে রাখতে বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে। এর ফলে তাদের গড় আয়ু বাড়ছে।

অত্যধিক খেলাধুলার অপকারিতা : নিয়মমাফিক খেলাধুলার কোনো অপকারিতাই নেই। তবে অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ। মাত্রাতিরিক্ত খেলাধুলায় অনেক সময় স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। আবার আহত হওয়ার সম্ভাবনাও তখন বেশি থাকে। অতিরিক্ত খেলায় অনেক সময় অযথা সময় নষ্ট হয় এবং তা জীবনের স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

উপসংহার : খেলাধুলায় প্রতিযোগিতার মনোভাব মানুষকে দৃঢ়সংকল্প করে, চলার পথে দেয় সহিষ্ণুতার দীক্ষা, অনমনীয় পৌরুষকে দীপ্ত করে, ছিন্ন করে সংকীর্ণতার আবরণ। জয়ে-পরাজয়ে, সাফল্যে-ব্যর্থতায় সেখানে মানুষ লাভ করে এক সুশৃঙ্খল জীবনবোধ। খেলার মাঠও মানুষের অন্তহীন সাধনার পীঠস্থান। আজ বিশ্ব ফুটবলে পেলে, ম্যারাডোনা শ্রদ্ধাভাজন এক অবিস্মরণীয় জাদুকর, এমনি আরও কত স্মরণীয় বরণীয় নাম। বর্তমানে আমাদের দেশেও সার্বিক প্রগতির জন্য প্রয়োজন দেহ-মনের স্বাভাবিক বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা। প্রয়োজন সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে খেলাধুলার অঙ্গনে নতুন প্রতিভার সাদর আমন্ত্রণ, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি। তবেই দেশ নবজাগ্রত এক চেতনায় আবার উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব, পারবে সাফল্যের বিজয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে।


একই রচনা অন্য বই থেকে সংগ্রহ করে আবার দেয়া হলো


ভূমিকা : ক্রীড়া বা খেলাধুলা শরীরচর্চা ও আনন্দ লাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত ক্রিয়াকলাপ। সুন্দর ও সুস্থ জীবন গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা অন্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন এমনকি জাতীয় জীবনের সফলতা লাভের পেছনে কাজ করে সুস্থ ও সুঠাম দেহ। আর এই সুস্থ দেহ গঠনের জন্যে খেলাধুলা অপরিহার্য।

খেলাধুলার উদ্ভব : সুপ্রাচীন কাল থেকেই মানুষকে সুস্থদেহী, সবল ও কর্মক্ষম করে রাখার জন্যে বিভিন্ন খেলার প্রচলন ছিল। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ বছর আগে থেকে প্রাচীন মিশরের খেলা ছিল ডালকুকুর নিয়ে শিকার। কুস্তি খেলার প্রথম সূচনা হয় ইরাকে, ৪০০০ বছরেরও বেশি আঘে। খ্রিস্টপূর্ব ২০৫০ বছর আগে মিশরে শুরু হয় হকি খেলা। এছাড়া মুষ্টিযুদ্ধ, অসিযুদ্ধ, দৌড়-ঝাঁপ ইত্যাদির ইতিহাসের সূচনাও প্রায় ৪০০০ বছর আগে। প্রাচীন কালে বিভিন্ন দেশে শারীরিক সামর্থ্য পরীক্ষার জন্যে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজিত হত। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫০ বছর আগে প্রাচীন রোমে ক্রীড়া হিসেবে মল্লযুদ্ধ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আসিরিয়া ও মিশরের স্থাপত্য থেকে জানা যায়, সেখালের তীর চালনা খেলার কথা। খেলাধুলার ইতিহাসে অনন্য ঘটনা খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে প্রাচীন গ্রিসে অলিম্পিক খেলার সূত্রপাত। সেই বিশাল প্রতিযোগিতায় গ্রিসের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াকুশলীরা দৌড়, ঝাঁপ, মল্লযুদ্ধ, চাকতি নিক্ষেপ, বর্শা ছোঁড়া, মুষ্টিযুদ্ধ ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। তাছাড়া ঘোড়ায় টানা শকট চালনা খেলার প্রচলন ছিল সেই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়। পরবর্তীকালে খেলাধুলার জগতে নৌকা চালনা, বক্সিং, স্কেটিং, পোলো, সাঁতার, ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি অসংখ্য খেলার উদ্ভব হয়েছে এবং আরও নতুন নতুন খেলা উদ্ভাবিত হচ্ছে। এভাবে অতি প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের জীবনে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতি পেয়ে এসেছে।

বিভিন্ন বয়সে খেলাধুলা : জন্মের কিছুকাল পর থেকেই শিশুরা খেলাধুলার প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দৌড়-ঝাঁপ আর বিভিন্ন খেলাধুলায় আত্মনিয়োগের মাধ্যমে শরীরের শ্রমের চাহিদা পূরণ করতে হয়। শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হবার পর নিয়মিত ব্যায়াম ও খেলাধুলা করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে, কারণ এটাই শরীর গঠনের প্রকৃষ্ট সময়। কৈশোর থেকে যৌবনে পৌঁছতে পৌঁছতে খেলাধুলার উপকরণ অনেক বদলে যায়। তরুণ বয়সে খেলাধুলা মানুষের মনে আনে মুক্তির স্বাদ। পড়াশুনার চাপে ক্লান্ত ও অবসন্ন যুবক তার অবসরকে আনন্দময় ভাবে উপভোগ করতে পারে খেলাধুল করে। সাথে সাথে দেহ ও মন হয় সতেজ ও সবল।

মানসিক উন্নয়নে খেলাধুলা : মানসিক উন্নয়নের জন্যেও খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা ও আনন্দময় পরিবেশের সংস্পর্শে বেড়ে উঠলে শিশুর মন হয় উচ্ছল ও আনন্দমুখর। মনের সতেজতা ও প্রাণময়তা বৃদ্ধিতে খেলাধুলার ভূমিকা যথেষ্ট। তাই দেখা যায়, শিশুদেরকে পুতুল খেলতে না দিয়ে যদি বয়স্কদের জগতে আবদ্ধ করে রাখাা হয় তবে তাদের প্রাণোচ্ছল মানসিক বিকাশ হয় না। বরং তারা অভিমানী, অস্থির ও বদমেজাজি হয়ে ওঠে। খেলাধুলা অনেক ক্ষেত্রে মানসিক দুশ্চিন্তা লাঘবের উপায়। তাছাড়া দাবা, তাস ইত্যাদি চিন্তামূলক খেলা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে বিকশিত করে।

শিক্ষায় খেলাধুলা : জীবন গঠনের সূচনায় সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই খেলাধুলা শিক্ষার উপায়। ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যাশিক্ষাকে চিত্তাকর্ষক করতে এবং পাঠ্য বিষয়ের প্রচণ্ড চাপ লাঘব করতে শিক্ষার সাথে সাথে খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেমন বলা যায় বার্লিনের একটি স্কুলের কথা। সেখানে হয়তো ক্লাস করতে করতে শিক্ষিকা হঠাৎ করে ছাত্রছাত্রীদের ব্যায়াম করার নির্দেশ দিলেন। এতে অঙ্ক কষায় ছাত্রছাত্রীদের একঘেয়েমি কেটে যায়। আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে টেবিল টেনিস, ব্যায়াম, দাবা, বাক্সেটবল ইত্যাদি খেলার ব্যবস্থা থাকে। আজকাল ছাত্রছাত্রীদেরকে খেলাধুলায় উৎসাহী করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়ে থাকে।

আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে খেলাধুলা : মানুষ যে চেষ্টা ও নিষ্ঠার সাহায্যে অসাধ্য সাধন করতে পারে, খেলাধুলার জগতই তার উৎ]কৃষ্ট প্রাণ। ছোটবেলায় যিনি নানা রোগে ভুগে মতে বসেছিলেন সেই জনি ওয়েসমুলারই অলিম্পিক সাঁতারে সোনা জয় করলেন। ১৯৬০-এর অলিম্পিক দৌড়ে তিনটি সোনা বিজয়ী ‘হিউম্যান লোকোমোটিভ’ নামে পরিচিত চেকোশ্লোভাকিয়ার এমিল জেটাপেক ছোটবেলায় খুঁড়িয়ে চলতেন। রাশিয়ার ‘আলেকজাণ্ডার মেলেনতেভ’ স্কুল প্রতিযোগিতার স্যুটিং-এ সবার পেছনে ছিলেন, তিনিই স্যুটিং-এ বিশ্ব রেকর্ড করেন। এই সব নিষ্ঠাবান ও আত্মপ্রত্যয়ী ক্রীড়াবিদদের অনন্যসাধারণ ক্রীড়ানৈপুণ্যই প্রমাণ করে আত্মশক্তি অর্জনে খেলাধুলার অসামান্য ভূমিকা।

মানব মৈত্রী গঠনে খেলাধুলা : খেলাধুলা দেশে-দেশে রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে প্রীতির বন্ধনকে সুদৃঢ় করায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ভারত ও পাকিস্তানের কথা। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট বা হকি টেস্ট উভয় দেশের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শান্তি ও মৈত্রী স্থাপনের সবচেয়ে বড় সম্মেলন অলিম্পিক গেমস্। এই বিশাল ক্রীড়া সম্মেলনে সারা বিশ্বের প্রায় সব দেশের হাজার হাজার খেলোয়াড় অংশ গ্রহণ করেন। প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষ উপলব্ধি করেন যে মানবজাতি এক এবং অবিচ্ছিন্ন। ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিকের অনুপম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রতিটি বিশ্ববাসী অনুভব করেছে, দেশ ভেদ জাতি ভেদ সত্ত্বেও মানুষ এক ও অভিন্ন সত্তা। অলিম্পিক ছাড়াও এমনিভাবে ক্রিকেট ও ফুটবল বিশ্বকাপ, ইউরোপীয়ান গেমস, এশিয়ান গেমস ইত্যাদি বহু খেলার আসর আন্তর্জাতিক সম্প্রীতি রক্ষায় সহায়তা করে। এসব প্রতিযোগিতায় সকল ধরনের বৈষম্য ভুলে গিয়ে খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব নিয়ে প্রতিযোগীরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্য দিয়েই বিশ্বে সাম্য, মৈত্রী ও সৌভ্রাতৃত্বের জয়গান ধ্বনিত হয়।

স্বাস্থ্যোন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধে খেলাধুলা : স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উচ্ছল পরমায়ু।” জীবনকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সবার আগে নিজের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে হবে। আর সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। শরীরের কোষগুলোর পুষ্টিসাধন, সহজ ও স্বাভাবিক রক্তচালনা, পরিপাক যন্ত্রকে কর্মক্ষম রাখা প্রভৃতির জন্যে প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো শারীরিক খেলায় অংশ নেওয়া বা ব্যায়াম ও শরীরচর্চা করা। একজন সুস্থ সবল নাগরিক তার দেশের ও জাতির জন্যে যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে তা একজন অসুস্থ ও রুগ্ন নাগরিকের দ্বারা অসম্ভব। তাই দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায় উৎসাহ দান করা প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই উচিত। শুধু স্বাস্থ্য উন্নয়নেই নয় বিভিন্ন প্রকার ব্যাধি থেকে স্বাস্থ্যকে রক্ষা করতেও খেলাধুলা প্রয়োজনীয়। হৃদপিণ্ডের ও ফুসফুসের বিভিন্ন অসুখ প্রতিরোধেও প্রয়োজন খেলাধুলা। খেলাধুলা মানুষের মনের দুশ্চিন্তা লাঘব করে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং দৈহিক পরিশ্রমের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সাঁতারের মতো খেলাগুলো মানুষের ফুসফুসের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে। মেদ চর্বি ইত্যাদি দূর করে সুন্দর ও সুঠাম শরীর গঠন করতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলোতে এখন বৃদ্ধরাও তাদের স্বাস্থ্য ধরে রাখতে বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে। এর ফলে তাদের গড় আয়ু বাড়ছে। বয়স বাড়া সত্ত্বেও তারা বুড়িয়ে যাচ্ছেন না। তাই সুস্থ জাতি গঠনের জন্যে খেলাধুলার চর্চা সমগ্র জাতির সংশগ্রহণ দরকার।

চরিত্র গঠনে খেলাধুলা : খেলাধুলা মানুষের চরিত্র গঠনেও সাহায্য করে। খেলাধুলার নিয়ম-কানুন মেনে চলতে গিয়ে মানুষ শেখে নিয়মানুবর্তিতা। খেলাধুলা মানুষকে করে সুশৃঙ্খল। দলপতি, কোচ ও রেফারির কথা মান্য করে, দলপতির অধীনে দলবদ্ধ হয়ে খেলতে গিয়ে খেলোয়াড়রা সকলে মিলেমিশে কাজ করার শিক্ষা পায়। এভাবে যৌথ পরিকল্পনা, যৌথ কাজ ও যৌথ শ্রমের মধ্য দিয়ে মানুষ নৈতিকভাবে সবল হয়ে ওঠে। তাছাড়া সাঁতার, ফুটবল ইত্যাদি খেলা মানুষকে সময় সচেতন করে তোলে। এভাবে খেলাধুলা মানুষের চরিত্রকে আরও উন্নত ও মহৎ করে।

খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি : সারা বিশ্বের প্রগতিশীল সকল রাষ্ট্রেই খেলাধুলা জাতীয় উন্নতির কর্মপ্রেরণার শক্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। জাপানের কলকারখানায় কাজ শুরু করার আগে হাজার হাজার কর্মী খোলা মাঠে ১৫ মিনিট খালি হাতে ব্যায়াম করেন। জার্মানরা প্রতি পাঁচ জনের অন্তত একজন কোনো-না-কোনো ক্রীড়া সংস্থার সক্রিয় সদস্য। একসময় চীনারা চিল পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে রোগগ্রস্ত জাতি। কিন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে চৈনিকরা খেলাধুলাকে সুস্বাস্থ্য গঠনের পথ হিসেবে বেছে নিয়ে সেই বদনাম কেবল ঘোচায় নি, খর্বতা সত্ত্বেও সোনা জিতেছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে বিশ্বক্রীড়ায়। বিশ্বের সকল উন্নত রাষ্ট্রেই এখন খেলাধুলাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বিশ্ব সম্প্রদায়। এক কথায় সারা বিশ্বের সকল উন্নত-অনুন্নত রাষ্ট্রে এখন খেলাধুলার গুরুত্ব স্বীকৃত।

অত্যধিক খেলাধুলার অপকারিতা : খেলাধুলা অনেক উপকার করলেও এর কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাধুলা মানুষের স্বাস্থের জন্যে হুমকি হতে পারে। ফুটবল, কাবাডি, রাগবি, কুস্তি, বক্সিং ইত্যাদি খেলায় রয়েছে মারাত্মকভাবে আহত হবার আশঙ্কা। অতিরিক্ত ক্রীড়া-আসক্তি অনেক সময় জীবনের স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় কোনো প্রতিযোগিতায় পরাজিত দল ও তাদের অন্ধ সমর্থকরে জয়ী দলের বা তাদের সমর্থকদের সাথে মারামারি বাঁধিয়ে দেয়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে এই ধরনের উগ্রপন্থী মনোভাব কখনও কাম্য হতে পারে না।

উপসংহার : খেলাধুলা যেমন শরীর গঠনের সহায়ক তেমনি আনন্দদায়ক। প্রতিটি খেলায় থাকে এক ধরনের কর্তব্যবোধ। খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষ দায়িত্বশীল হয় কর্তব্য সম্পাদনে, একই সঙ্গে পায় মর্যাদা অর্জনের শিক্ষা। ক্রিকেটে সাম্প্রতিক কালে আমাদের তরুণ খেলোয়াড়দের অর্জন, জাগরণ ঘটিয়েছে জাতির মর্যাদা বোধকে। পরস্পর নির্ভরশীল যৌথ ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার গুরুত্ব পতীয়মান হয় দলগত খেলাধুলায়। ফলে জাতীয় জীবনে খেলাধুলার প্রসার ঘটলে জাতি সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করতে শেখে। শরীর ও মনের দৃঢ়তা ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে জাতি এগিয়ে যেতে পারে নিত্য-নতুন অর্জনের পথে।

22 comments:


Show Comments