বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : গরু

↬ গরুর রচনা

↬ গৃহপালিত পশু গরু


সূচনা : সৃষ্টিলগ্ন থেকে আজ অবধি সভ্যতার অগ্রগতির সাথে মানুষের পাশাপাশি যে প্রাণী সবচেয়ে বেশি উপকার করে আসছে তার নাম গরু। এ প্রাণী খুব শান্তশিষ্ট ও অত্যন্ত নিরীহ। নীরবে-নিবৃতে সবার উপকারই করে, কিন্তু কোনো প্রতিদান চায় না। এই প্রানী এক সময় বন্য ছিল। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে নিতান্ত প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ গরুকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে। আর তখন থেকেই গরু গৃহপালিত জন্তু হিসেবে আমাদের ভালোবাসা ও মমতা লাভ করে আসছে। শুধু তা-ই নয়, আমাদের অর্থনীতিতেও গরুর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আকৃতি ও প্রকৃতি : গরু একটি গৃহ পালিত চতুষ্পদ প্রাণী। চতুষ্পদ এই প্রাণীটি ‍উচ্চতায় তিন-চার হাত ও দৈর্ঘ্য পাঁচ-ছয় হাত হয়ে থাকে। এটির মুখ লম্বাকৃতির, মাথায় দুটি শিং, জলে-ভাসা ডাগর ডাগর কালো দুটি চোখ, দুটি লম্বা কান ও শরীরের পেছনে একটি লম্বা লেজ আছে। তার অগ্রভাগে একগুচ্ছ চুল আছে। এর গলার চামড়া ঝুলে থাকে। এটি গলকম্বল নামে পরিচিত। গরুর সারা শরীর ছোট ও ঘন লোমে আবৃত। এদের পায়ের খুর দ্বিখন্ডিত। মুখের দুমাড়ির নিচেরটিতে কেবল একটি পাটি দাঁত আছে। গরু বিভিন্ন বর্ণের দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে লাল, কালো, সাদা এবং কিছু কিছু মিশ্র বর্ণের হয়ে থাকে।

প্রকৃতি : গরু অত্যন্ত নিরীহ ও শান্ত প্রকৃতির জন্তু। স্ত্রীজাতীয় গরু ও পুরুষজাতীয় গরুর স্বভাব একটু পৃথক। এক বছর পরপর গাভী একটি বাচ্চা প্রসব করে। গাভীর সন্তানবাৎসল্য মায়ের মতোই। সদ্যপ্রসূত বাচ্চার ধারেকাছে গেলে কিংবা বাছুরকে ধরতে গেলেই এরা শিং নাড়া দিয়ে ভয় দেখায়। পুরুষ গরু বা ষাঁড় রাগীও হয়। তারা পোষ মানে। হাম্বা শব্দে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করে। সুস্থ অবস্থায় এরা পনেরো থেকে বিশ বছর পযন্ত বেঁচে থাকে।

খাদ্য : তৃণভোজী প্রাণী গরু ঘাস ছাড়াও গাছের পাতা, শুকনো খড়, ভুসি, খৈল, কলাই, ভাতের ফেন ইত্যাদিও খেয়ে থাকে। গরু খাওয়ার সময় প্রথমে গিলে ফেলে, পরে বিশ্রামের সময় সেই খাদ্যদ্রব্য উগরে মুখে নিয়ে আসে, তারপর ভালোমতো চিবিয়ে খায়। একে জাবর কাটা বলে।

উপকারিতা : অন্যান্য যে-কোনো পশুর তুলনায় গরু সবচেয়ে উপকারী জন্তু। গরুর দুধ অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। এই দুধ অনেক সময় মানবশিশুর মায়ের দুধের অভাব পূরণ করতে পারে। দুধ থেকে দই, ছানা, মাখন, ঘি, পনির, ক্ষীর ও নানা রকম মিষ্টি তৈরি হয়। স্বাস্থ্যের জন্য এগুলোর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। গরুর মাংস একটি উপাদেয় ও বলকারক খাবার। তা ছাড়া, গোময় বা গোবর একটি উত্তম সার। অনেকে আবার গোবর শুনিয়ে ঘুঁটে তৈরি করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। গরুর চামড়া দিয়ে জুতা, ব্যাগ, সুটকেস, বাক্স তৈরি হয়। শিং ও খুর দিয়ে শিরিষ আঠা তৈরি হয়। হাড় থেকে তৈরি হয় বোতাম ও চিরুনি। হাড়ের গুঁড়ো একটি উত্তম সার। ষাঁড় ও বলদ লাঙল, গাড়ি ইত্যাদি টানে। একসময় আমাদের দেশের কৃষকরা জমি ও মইয়ের জন্যে গরু ছাড়া আর কিছুর কল্পনাই করতে পারত না।

প্রাপ্তিরস্থান : পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গরু দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের গরু অন্যান্য দেশের গরুর তুলনায় কিছুটা ছোট। ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও আমেরিকার গরু অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ। তা ছাড়া বুনোগরুও আছে। এরা সাধারণত হিংস্র প্রকৃতির হয়। বাংলাদেশের সুন্দর বন ও অন্যান্য স্থানে এ সমস্ত বুনোগরু দেখা যায়। তার মধ্যে নীল গাই অন্যতম।

রোগ : গরু সাধারণত পেটফুলা, তড়কা, খুরারোগ, গোবসন্ত, গলাফুলা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

উপসংহার : গরু আমাদের যত উপকার করে থাকে সে তুলনায় তাদের প্রতি আমরা উদাসীন। খাটুনির হারে খাবার দিই কম। ফলে অসহায় জন্তুগুলো দিন দিন দুর্বল ও রুগ্ন হয়ে পড়ে। তাই দেখা যায়, একটি ফ্রিসিয়ানা বা অস্ট্রেলিয়ান গাভী যতটুকু দুধ দেয় আমাদের দেশি গাভী তার চেয়ে কম দুধ দেয়। শুধু তা-ই নয়, উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে আলাদা গোচারণ ভূমি নেই। অনেক সময় অসুস্থ গরু প্রায় বিনা চিকিৎসায় ও গৃহস্থের অবহেলায় মৃত্যুবরণ করে। গরুর মতো এমন জন্তু নেই যা আমাদের এত বেশি উপকারে আসে। সহানুভূতিশীল হলে এগুলোও শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ হয়ে উঠবে, দুধও দেবে অনেক। তা ছাড়া গরুপালন অত্যন্ত লাভজনক। বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারের পশুপালন বিভাগ সংকর প্রক্রিয়ায় ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত প্রজাতির বাছুর পাবার ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে মূলকথা হচ্ছে, গরুর প্রতি আমাদের সবার যত্নশীল ও সদয় হওয়া কর্তব্য।

1 comment:


Show Comments