My All Garbage

Shuchi Potro
সাধারণ জ্ঞান অ্যাসাইনমেন্ট-২০২১ বাংলা রচনা সমগ্র ভাবসম্প্রসারণ তালিকা অনুচ্ছেদ চিঠি-পত্র ও দরখাস্ত প্রতিবেদন প্রণয়ন অভিজ্ঞতা বর্ণনা সারাংশ সারমর্ম খুদে গল্প ব্যাকরণ Composition / Essay Paragraph Letter, Application & Email Dialogue List Completing Story Report Writing Graphs & Charts English Note / Grammar পুঞ্জ সংগ্রহ বই পোকা হ য ব র ল তথ্যকোষ পাঠ্যপুস্তক CV & Job Application My Study Note আমার কলম সাফল্যের পথে
About Contact Service Privacy Terms Disclaimer Earn Money


নিরাপদ সড়ক চাই
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সহায়ক ওয়েব সাইট

রচনা : শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

যদি রাত পোহালেই শোনা যেতো
বঙ্গবন্ধু মরে নাই,
যদি রাজপথে আবার মিছিল হতো
বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই,
তবে বিশ্ব পেতো এক মহান নেতা
আমরা ফিরে পেতাম জাতির পিতা।

হাজার বছরের ইতিহাসে ‘শেখ মুজিব’ নামটি শ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনে আসীন হয়ে আছে- এ জাতির প্রতি তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদানের জন্য। বাঙালি জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দিয়েছেন। চিরকাল বাঙালি জাতি তাঁর এই অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

পরিচয় : ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ, মঙ্গলবার রাত ৮টায় পৃথিবীতে আগমন ঘটে এক মহান ব্যক্তির। ঐ দিন অবিভক্ত ভারতবর্ষের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ থানায় (বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলা) পাঠগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করে যে শিশু পরবর্তীতে সেই হয়ে উঠে পৃথিবীর সেরাদের একজন এবং বাঙালীদের আলোর দিশারী, স্বাধীনতার পথ প্রদর্শক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালিদের প্রাণপ্রিয় অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছোট বেলায় বাবা মা আদর করে ডাকতেন খোকা। ভালো নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান। মাতা, সায়েরা খাতুন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন তিনি। ছিমছাম, শারীরিক গঠন ও দীর্ঘাদেহী। পথ ঘাট শান্ত ছায়া নিভৃত পল্লীতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। সুশ্রী চেহারার অধিকারী এই বালকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় ১০ বছর বয়সে ১৯২৭ সালে গিমাডাঙ্গা মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ের মাধ্যমে। তারপর তাঁদের বদলাতে হয়েছে একাধিক পাঠশালা। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়, মিশন স্কুলে ছাত্রদের সভাকে সামনে রেখে এসডিও ১৪৪ ধারা জারী করে সেই সভা বন্ধ করে দেন। অগত্যা ছাত্ররা সমবেত হয়ে মসজিদে গিয়ে সভা করে এবং শেখ মুজিবুর দাঁড়িয়ে দুই-একটি কথা বলতেই তাঁকে গ্রেফতার করে সেকেন্ড কোর্টে হাজির করে দুই ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। ছাত্রদের বিক্ষোভ ও চাপে শেষ পর্যন্ত কোর্ট থেকেই তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম গ্রেফতার। ১৯৩৮ সালে (১৮ বছর বয়সে) বেগম ফজিলাতুন্নেসা রেনুর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে দাম্পত্য জীবনে তিন পুত্র ও দুই কন্যার পিতা হন।

তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন : ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। গোপালগঞ্জ স্কুল পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে বাংলোতে ফেরার পথে তাদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে এক ছাত্র অকপটে বলে যায় ছাত্রাবাসের ছাঁদ চুইয়ে পানি পড়ে ছাত্রদের বইপত্র নষ্ট হওয়ার কথা বলে যায়। তৎক্ষনাৎ প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে ১২০০ (বার শত টাকা) মঞ্জুর করেন এবং স্কুলের ছাদ মেরামতের নির্দেশ দেন। হোসেন সোহরাওয়ার্দী এই ছাত্রের সৎ সাহস ও নির্ভীকতায় অভিভুত হয়ে পিয়ন মারফত বাংলোয় খবর দিয়ে এনে নানা রকম আলোচনা করেন এবং তাঁর কথায় সন্তুষ্ট হন। তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে রাজনীতির গুরু মানতেন। ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকায় উর্ত্তীন হন শেখ মুজিব। পরে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজ) আই এ ক্লাস ভর্তি হন। তখন থেকেই মুসলিমলীগ রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন তিনি।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৬ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও ইতিহাসে অনার্সসহ ব্যাচেলার ডিগ্রি লাভ করেন। তখন থেকেই তিনি ছিলেন প্রদেশিক বেঙ্গল মুসলিমলীগের কর্মী এবং ১৯৪৩ সাল থেকেই ছিলেন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর সদস্য হন এবং ঐ বৎসর দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে তিনি জনসেবা করেন। বঙ্গীয় মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী – হাসিম গ্রুপের সাথে তিনি ছিলেন সক্রিয় ভাবে যুক্ত। ১৯৪৬ সালের ভারতবর্ষের অন্তবর্তী সরকারের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিমলীগ তাঁকে ফরিদপুর জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিব ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বঙ্গবন্ধু নিজেও সাংবাদিকতা করেছেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার পূর্ব-বাংলা প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার প্রতি কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার পর তিনি আবার গ্রেফতার হন। তাই তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা জীবন আর সমাপ্ত হয়নি।

১৯৪৯ সালের ২১শে জানুয়ারি মুক্তি লাভ করেন শেখ মুজিব। এ বছরের ২৩ জুন ঢাকা রোজ গার্ডেনে এক গোপন বৈঠকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা ভাসানীর উদ্যোগে গঠিত হয়। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম। একজন রাজবন্দী হিসেবে তখন তিনি ফরিদপুর জেলে অন্তরীণ ছিলেন। কারাবন্দী থেকেই শেখ মুজিব নির্বাচিত হলেন অন্যতম যুগ্ম-সম্পাদক পদে। ১৯৪৯ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অক্টোবরে আর্মানীটোলা থেকে এক বিশাল ভুখা মিছিল থেকেই গ্রেফতার হলেন মাওলানা ভাসানী, শামসুল হক ও শেখ মুজিব। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে (শেখ মুজিব তখনও জেলে) ভাষার জন্য আন্দোলন-সংগ্রামে দেশের পরিস্থিতি তখন টালমাটাল। ২১শে ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দিনটিকে ঘোষণা করা হলো “ভাষা দিবস” হিসেবে। মূখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন আকস্মিকভাবে ১৪৪ ধারা জারি করলে গভীর রাতে কিছু ছাত্র নেতা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নিলে শেখ মুজিবুর কারাগার থেকে এই সিদ্ধান্তে সমর্থন জানান এবং বরিশালের মহিউদ্দিন আহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে অনশন অব্যাহত রাখেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর শহীদ হন। কারাগারে স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হওয়ায় ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। মাওলানা ভাসানী স্বীয় ক্ষমতাবলে শেখ মুজিবকে আওয়ামী মুসলিমলীগের অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করেন। ১৯৫৬ সালে মহাচীনের রাজধানী বেইজিং নগরীতে আয়োজিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন শেখ মুজিব। ১৯৫৩ সালে ৯ জুলাই তিনি পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্বল্প সময়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান এ অঞ্চলে শিল্পের বিকাশে অনেক আইনি কাঠামো প্রণয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে দলের সভাপতি হবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। ষাটের দশকের মধ্যবর্তী সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেখ মুজিব আওয়ামীলীগকে পুনরুজ্জীবিত করার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সোহরাওয়ার্দী তখন রাজনৈতিক দলসমূহ পুনরুজ্জীবনের পক্ষে ছিলেন না এবং এনডিএফ বা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টভুক্ত হয়ে একযোগে ত্যাগের ঘোষণা দেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে বাংলাদেশকে বিমাতাসূলভ আচরণ করে অরক্ষিত রাখার প্রতিবাদে এই বাংলার সাধারণ মানুষ রাগে, দুঃখে ফেটে পড়েন। এই বিমাতাসূলভ আচরনের প্রতিবাদে ৬৯-এর ২৩শে ফেব্রুয়ারি প্রায় ১০ লক্ষ ছাত্র-জনতার উদ্যোগে রেসকোর্স ময়দান বর্তমান (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তৎকালীন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভায় এ বাংলার সাধারণ মানুষের পক্ষে তৎকালীন ডাকসুর নেতৃত্বে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন। কার মাথায় প্রথমে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি এসেছিল। কলামিস্ট ওবায়দুল কাদের বলেন (বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতি ও বর্তমান মন্ত্রী) ১৯৮৭ সালে ৩১শে জুলাই দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লিখেন শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে ভূষিত হন লক্ষ লক্ষ জনতার সমাবেশে, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ১৯৬৯ সালে। ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ শাখার উদ্যোগে “প্রতিধ্বনি” নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করতো। সে পত্রিকার ১৯৬৭ সালের ৩ নভেম্বরের সংখ্যায় ছাত্রলীগের নেতা রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ‘আজব দেশ’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেন। এ লেখায় তিনি নিজের ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন ‘সারথী’ নামে। লেখাটার শেষ দিকে ‘বঙ্গশার্দুল’ শেখ মুজিবের পাশে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন। এই পত্রিকায় ১৯৬৮ সালের নভেম্বর একই সংখ্যায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাবিত পূর্ব-বাংলার ‘মুক্তিসনদ’ ৬ দফা শিরোনাম হয়ে আসে। তখন একটি সাময়িকীতে ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ঢাকার ছাত্র মহলের একাংশ ছাড়া অন্য কারো নজর কাড়েনি। শব্দটি গুরুত্ব পায় যখন জাগ্রত বাঙ্গালি জাতির জাগরণের সব শ্রোতধারা এক মোহনায় একাকার, যখন গনমোহন মুজিব বিদ্রোহী বাংলা মুকুটহীন সম্রাট। তখনই মুজিবের জন্য যুৎসই এ খেতাবটি তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতৃত্বের পছন্দ হয়। চট্টগ্রামের সন্তান রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক তখন ঢাকা কলেজের তৎকালীন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ প্রসঙ্গে রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক বলেন, তিনি ও তাঁর বন্ধু শেখ কামাল (বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র) ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের মুখপত্র হিসেবে ‘প্রতিধ্বনি’ নামে এই বুলেটিন প্রকাশ করেন। ‘আজব দেশ’ নামক নিবন্ধে ১৯৬৮ সালের ৩ নভেম্বর তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি এই নাম ব্যবহার করেন। আগরতলা মামলা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত শেখ মুজিবুর রহমানের সংবর্ধনায় (১৯৬৯ এর ২৩শে ফেব্রুয়ারি) ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমদ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার পর সেটি বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৬ সালে ৭ই জুন ১১ দফাকে ৬-দফা দাবীতে রূপান্তরিত করতে জীবন দিতে জানে- গোলামী করতে জানে না। এরপর তাঁকে আগরতলা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তিনি ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ট আসনে আওয়ামীলীগকে বিজয়ী করেন। এই নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে তাঁর দল আওয়ামীলীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করার পরেও কিন্তু পাকিস্তানী দালাল ভূট্টোর চক্রান্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকতে গড়িমসি করেন। যার ফলে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এক বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং এই জনসভায় তাঁর সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা আসে- “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” এবং একই বছর ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং ঘোষণা দেওয়ার পরই তিন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে তাঁর পক্ষে তৎকালীন মেজর জিয়াউল রহমান সহ অনেকে বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে এই স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করেন। পরবর্তী ১৭ই এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী সরকার গঠন করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই বাংলার মানুষ পায় চির মুক্তির স্বাদ। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ধীরে ধীরে মুজিবুর বাঙ্গালি জাতির হৃদয়ের ফ্রেমে বঙ্গবন্ধু নামে আবির্ভাব ঘটে। বিশ্বের তিন নেতার তিন বিষয় বেশ আলোচিত, ইন্দিরার শাসন, ইয়াহিয়ার শোষণ আর বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধ পরবর্তী সময় শুরু করেন আরেকটি নতুন যুদ্ধ, একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ, অনাচারে-অনাহারে ম্রিয়মান একটি রাষ্ট্রকে পূনরায় জীবন দিতে ছুটে চলেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, বিশ্বের এক রাষ্ট্র থেকে আরেক রাষ্ট্র। তিনি প্রায়ই বলতেন, সাত কোটি বাঙালি নিয়েই আমার পরিবার।

বিলাসিতা তাঁর জীবনকে ছুঁতে পারে নায় -এমনকি সরকারী সুযোগ-সুবিধাদি গ্রহণ না করে গণভবনের আয়েশী জীবন ত্যাগ করে নিজের গড়া সেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ীতেই বসবাস করতেন। সেখানে নিরাপত্তা ছিল একেবারেই শিথিল। এ কারণেই ঘাতকরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত করার সুযোগ পান। ঘাতকদের নির্মম বুলেট তাঁকে বাঁচতে দিয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার ভোরে কতিপয় বিপদগামী সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকদের হাতে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৫৫ বছরের জীবনে কারাগারে কেটেছে ১২ বছর মতান্তরে ১৪ বছর। তবে অপচয় হতে দেননি সময়টা। নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে লিখেছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন-এর মতো মৌলিক বইসমূহ/।

ইতিহাসের রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, জার্মানির বিসমার্ক, যুগোশ্লাভিয়ার মার্শাল টিটো, চীনের মাও সেতুং, মিশরের জামাল আবদুল নাছের, ভারত বলতে যেমন মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তান বলতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আমেরিকা বলতে যেমন জর্জ ওয়াশিংটনের নাম, দক্ষিণ আফ্রিকা বলতে নেলসন ম্যান্ডেলা, মালয়েশিয়া বলতে যেমন মাহাথির মোহাম্মদের নাম স্মরণ করা হয় ঠিক তেমনি বাংলাদেশের নাম উচ্চারণের সাথে সাথে যে নামটি মানসপটে ভেসে আসে তা হলো- শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের সুচনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীর অনুসারী হিসাবে রাজনীতি শুরু করলেও সুভাস চন্দ্রের রাজনৈতিক দর্শনই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। ১৯৪২ সালে ছাত্র থাকাকালে তিনি সুভাস চন্দ্রের নেতৃত্বে পরিচালিত কলকাতায় ইংরেজদের নির্মিত হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙ্গার আন্দোলনে মিছিলে যোগ গিয়েছিলেন। কবি নির্মলেন্দু গুণ শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে বলেছেন একটি মহাকাব্য। আর সেই মহাকব্যের মহাকবি হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় শেখ মুজিবকে নাম দিয়েছিলেন ‘এ পোয়েট অব পলিটিক্স’। কবি নজরুল ইসলামের ‘কান্ডারী হুশিয়ার’ কবিতাটি পাঠ করে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বলেছিলেন,
“রাজনীতি অথবা রাজনৈতিক সংগ্রামে কবিতা অনেক সময় অস্ত্রের চাইতেও শক্তিশালী হাতিয়ার।”

যে দেশের মানুষ তাদের জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা ও জনকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং সম্মান প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ তাদের অত্যন্ত সংকীর্ণ ও নিচু শ্রেণির মানুষ বলেই মনে করে। এক কথায়, সূর্যালোকের মতো সত্য বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ নামক দেশটি সৃষ্ট হতো না। একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতির অগ্রগতি ও উন্নতি এবং বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বার্থে নেতৃত্ব যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বই পড়ার দরকার নেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংগ্রামী জীবনটাই আমাদের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বই। তিনি ছিলেন, বিশ্বের বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষকে কাছে টানার ক্ষমতা ছিল অসীম। দেশ ও জাতির সঙ্গে মিশে থাকা চেতনার নাম বঙ্গবন্ধু। আমরা জানি একটি বিশাল দেশের পাশে একটি ছোট দেশ কদাচিৎ স্বাধীন। এর একমাত্র ব্যতিক্রম দেশ কিউবা। বিশাল আমেরিকার পেটের মধ্যে অবস্থান করেও স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে টিকে আছে কিউবা। এর একমাত্র কারণ তাদের মহান নেতা ফিদেল ক্যাষ্ট্র্যে। তিনি বলেছিলেন,
“আমি হিমালয় দেখেনি তবে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি”

মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদেরও একজন ফিদেল ক্যাষ্ট্র্যে দিয়েছিলেন। যাঁর বিচক্ষণতায় তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে মিত্রবাহিনী চলে গিয়েছিল। প্রতিবেশী বিশাল দেশ ভারতের সাথে ‘ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির’ মাধ্যমে গঙ্গার পানি বন্টন স্থলসীমানা বিরোধসহ অসংখ্য অমীমাংসিত সমস্যার সম্মানজনক সমাধান করা সম্ভব হয়েছিল।

শেখ মুজিব কেবল বঙ্গবন্ধু নন, বিশ্ববন্ধুও ছিলেন বলেই আমরা ছোট দেশ হয়েও ছোট ছিলাম না। একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে বাংলা শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বাংলা শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক জনসভায় মুজিব ঘোষণা করেন যে,
“আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ বদলে ‘বাংলাদেশ’ ডাকা হবে।”

মুজিব তাঁর অন্তর্বর্তী সংসদকে একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন এবং চারটি মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র ঘোষণা করেন যা মুজিববাদ নামেও পরিচিত। মুজিব শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানী রাষ্ট্রীয়করণ করেন এবং ভূমি ও মূলধন বাজেয়াপ্ত করে ভূমি পূনর্বণ্টনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্যের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কৃষকদের পরম বন্ধু ছিলেন বঙ্গবন্ধু। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী এক কোটি শরণার্থীর পূনর্বাসনের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০০৪ সালে বিবিসি’র বাংলা রেডিও সার্ভিসের পক্ষ থেকে সারা বিশ্বের যে জরিপ চালানো হয়, তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিবেচিত হন। যদি আপনি বাঙালি হোন, আপনাকে যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে জানতে হবে, ঠিক তেমিন অবশ্যই বঙ্গবন্ধুকেও জানতে হবে।


আরো দেখুন :

No comments