বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : গ্রামোন্নয়নই দেশোন্নয়ন

ভূমিকা : গ্রামই বাংলাদেশের প্রাণ। শহর-বন্দর-নগর যা কিছু আছে, তা দাঁড়িয়ে আছে কৃষিনির্ভর আটষট্টি হাজার গ্রামকে ভিত্তি করে। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটির ওপর। এর আশি ভাগ মানুষ পল্লীগ্রামে বসবাস করে। তারা ক্ষেতে খামারে কাজ করে, ফল-ফসলাদি উৎপাদন করে, খাল-বিল-নদী থেকে মাছ আহরণ করে, ছোটখাট ব্যবসা করে। কৃষিই তাদের প্রধান উপজীব্য। তাদের অক্লান্ত শ্রমে উৎপাদিত খাদ্যের উপর শহুরে মানুষেরা বেঁচে আছে। পল্লীগ্রাম থেকে কেবল খাদ্যই নয়, কাঁচামাল এবং কল-কারখানার শ্রমিকও সরবরাহ করা হয়। কাজেই গ্রাম এবং গ্রামের মানুষ বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। গ্রামোন্নয়নই দেশোন্নয়ন- এটা ধ্রুব সত্য। 

বাংলাদেশের গ্রাম : বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। প্রায় ৮০/৮৫ ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। গ্রামের সংখ্যা আটষট্টি হাজার। অধিবাসীদের অীধকাংশ কৃষিজীবী; কেউ মৎস্যজীবী, কেউবা কামার-কুমার, কেউ বা ছোটখাট ব্যবসায়ী, দোকানদার। কয়েকটি গ্রাম মিলে ইউনিয়ন। ইউনিয়ন পরিষদই বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিন্যাসে প্রাথমিক ইউনিট। অবশ্য বর্তমানে আরো তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি গ্রামে গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এদের তেমন কোন আর্থিক-প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় সেগুলো কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারছে না। কয়েকটি ইউনিয়ন মিলে থানা বা উপজেলা। উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তাই অধীনস্থ সকল গ্রাম ও ইউনিয়নের হর্তাকর্তা। 

গ্রামের অতীত ঐতিহ্য : বাংলাদেশের গ্রামগুলো অতীতকালে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ছিল। এক কথায় তাকে বলা হত ‘সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামল বাংলা’। অতীতে গ্রাম বাংলা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। মানুষে মানুষে ছিল সম্প্রীতি। পারিবারিক ও আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ হয়ে পল্লীগ্রামের এক-একটি অঞ্চলে তারা বসতি গড়ে ছিল। জনসংখ্যাও তখন এমন ভয়াবহ ছিল না। অভাব অনটন হাহাকার ছিল না। গোলাভরা ধান পুকুর ভরা মাছ ছিল। গোয়ালভরা গরু-ছাগল, গাছে গাছে ফল। গ্রামের পরিবেশ ছিল, কবির ভাষায়, “ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়”। 

গ্রামের বর্তমান অবস্থা : বিশ শতকের শেষার্ধ থেকে গ্রাম বাংলায় কিছুটা পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। সাম্প্রতিক কালে গ্রামীণ অর্থনীতিতে পুঁজি বিনিয়োগের ফলে সে পরিবর্তন আরও স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে। ঔপনিবেশিক আমলের মত গ্রাম এখন আর আত্মনির্ভর নয়। গ্রামে গ্রামে এখন যান্ত্রিক বর্ষণ, সেচ ও মাড়াই ব্যবস্থা চালু হওয়া শুরু হয়েছে। মান্ধাতার আমলের লাঙল দিয়ে চাষাবাদ এখনও প্রধান হলেও ধনী কৃষকরা গ্রামে কলের লাঙল ব্যবহার করতে শুরু করেছে। উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার, ব্যাপক কৃষিক্ষেত্র সেচের আওতায় আনয়ন, রাসায়নিক সারের ব্যবহার, অনুকূলে আবহাওয়া ইত্যাদির ফলে খাদ্য উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। শহর সংলগ্ন গ্রামাঞ্চলে গবাদি পশুপালন, দুগ্ধখামার স্থাপন, হাঁস-মুরগি পালন শুরু হয়েছে হ্যাচারি, মৎস্য চাষ, হিমাগারসহ কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রকল্প স্থাপিত হচ্ছে। এর ফলে গ্রামের অর্থনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কিন্তু এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও অধিকাংশ গ্রামের অবস্থা করুণ ও মর্মন্তুদ। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট। ভূমিহীন ক্ষেতমজুররা অভাব-অনটন, অশিক্ষা, রোগ-ব্যাধিতে ক্লিষ্ট। গ্রামে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এখন আগের সেই সমৃদ্ধ গ্রাম পাওয়া যায় না। সার্বিক বিবেচনায় দেশের সবচেয়ে পশ্চাদপদ অংশ এখন গ্রাম। ভূমিহীন কৃষকদের গোলাভরা ধান তো দূরের কথা, দুবেলা খাবার নেই, রোগে ওষুধ নেই, চিকিৎসার সুব্যবস্থা নেই, সন্তানদের লেখা-পড়া শেখাবার সামর্থ্য নেই। অধিকাংশ গ্রামবাসী সীমাহীন দারিদ্র্য ও বঞ্চনার শিকার। গ্রামীন পরিবেশেও এখন আর আগের মতো সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি লক্ষ করা যায় না। তবে গ্রামের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কিছু কিছু গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বেসরকারি নানা সাহায্য সংস্থা গ্রামে কাজ করছে। প্রায় গ্রামে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সে শিক্ষা মানসম্মত নয়। অনেক গ্রাম এখন বিদ্যুতায়িত। তবে বিদ্যুৎ-সংকট সেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার। ফলে পরিবর্তন সত্ত্বেও গ্রামবাংলা সংকটে নিপতিত। 

গ্রামের দুরবস্থার কারণ : গ্রামের দুরবস্থার পেছনে অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী মন্দা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বড় বড় শহর গড়ে ওঠা, গ্রামের সচ্ছল ও শিক্ষিত লোকদের গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসা এবং গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানা সব শহরকেন্দ্রিক হওয়া, জনসংখ্যার তুলনায় আবাদী জমি না বাড়া, গ্রামোন্নয়নে কোন কালেই বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ না নেওয়া; দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামবাসীর চাষবাস, চলাচল-যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রায়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও ঋণদানে অপ্রতুলতা ইত্যাদি। গ্রামের বর্তমান দুরবস্থা ও শ্রীহীনতার জন্যে কোন একটি কারণ বিশেষভাবে দায়ী নয়। তবে কম জনসংখ্যার অতীত সমৃদ্ধি অত্যধিক জনসংখ্যার চাপে আজ দারিদ্র্যে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে মানুষ শহরমুখী হয়েছে- ধনী-গরিব নির্বিশেষে। গ্রাম হয়েছে উপেক্ষিত। গ্রানোন্নয়নের জিগির কোন কাজে আসছে না। শহরের চাকচিক্য যতই বাড়ছে গ্রামাঞ্চল ততই অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গ্রামোন্নয়নের গুরুত্ব : শিল্পে-বাণিজ্যে, শিক্ষায়, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিতে- এক কথায় সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকেই বাংলাদেশের উন্নয়ন বোঝায়। আর এ উন্নয়ন কখনই আটষট্টি হাজার গ্রামকে পেছনে ফেলে রেখে অর্জন করা সম্ভব নয়। কেবল রাজধানীও গুটিকতক শহরের উন্নয়নের মানে বাংলাদেশের উন্নয়ন নয়। কেননা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বসবাস করে গ্রামে। তাদের উন্নয়ন, তথা গ্রামের উন্নয়নই বাংলাদেশের উন্নয়ন। বাংলাদেশ কৃষি-অর্থনীতি নির্ভর উন্নয়নশীল দেশ। কাজেই কৃষক এবং তার কর্মক্ষেত্র গ্রামের উন্নতির গুরুত্ব বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। গ্রাম শহরকে বাঁচিয়ে রাখছে, শহরবাসীর খাদ্য জোগাচ্ছে, কাঁচামাল সরবরাহ করছে, শিল্প-কারখানায় শ্রমিকও আসছে গ্রাম থেকে। বাংলাদেশের ধমনীতে রক্ত সঞ্চালন করছে গ্রাম। এজন্যে গ্রামকে অবহেলা করে, গ্রামের মানুষকে অশিক্ষিত, স্বাস্থ্যহীন, দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত রেখে আমরা কোন উন্নতির কথাই কল্পনা করতে পারি না। বস্তুত, গ্রাম উন্নত হলেই দেশ উন্নত হবে। এজন্যে বলতে হয় যে, গ্রামোন্নয়নের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। 

গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনা : গ্রামোন্নয়নের লক্ষ্যে আসলে কোন সরকারের আমলেই বাস্তবমুখী ব্যাপক কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় নি। তবে সব সরকারই গ্রামোন্নয়নে নানা আশ্বাস ও সস্তা স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় নি। বস্তুত, গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন সাধনের ক্ষেত্রে ‘গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনা’র গুরুত্ব অপরিসীম। এজন্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সরকার, প্রশাসন ও শাসক দলের সদিচ্ছা ও দৃঢ় প্রয়াস। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করে, গ্রামীণ পরিবেশে পর্যাপ্ত কৃষিভিত্তির কুটিরশিল্প নির্মাণ করে, সর্বোপরি কৃষক ও প্রান্তিক চাষীদের জন্যে পর্যাপ্ত কৃষিঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করে গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়। গ্রামের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রাম নির্ভর উপজেলাকে অধিক প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করেও কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। গ্রামের শিক্ষিত বেকার ছেলেরা যেন শহরমুখী না হয়ে গ্রামে থেকেই আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের এবং গ্রামের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে, সেজন্যে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে হবে গ্রামোন্নয়নের ছন্দ ও সুর। 

উপসংহার : আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে- কথাটা অতীব সত্য। যেহেতু গ্রামই বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহের প্রধান ও সর্ববৃহৎ উৎস, সেহেতু দেশোন্নয়নের জন্যে আগে গ্রামোন্নয়ন আবশ্যক। সুতরাং গ্রামকে অবহেলা করে, গ্রামের মানুষকে নিরন্ন নির্বস্ত্র নিরক্ষর রেখে কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভবপর হবে বলে মনে হয় না।


আরো দেখুন :

No comments