রচনা : আদমশুমারি

↬ ↬ লোকগণনা


ভূমিকা : আভিধানিক অর্থে ‘আদমশুমারি’ বলতে লোকগণনা বা জনসংখ্যা নির্ধারণ বোঝালেও এর অর্থ ও তাৎপর্য অনেক ব্যাপক। প্রকৃত অর্থে আদমশুমারি বলতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে অবস্থিত জনসংখ্যার হিসাবসহ আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা বিজ্ঞানসম্মত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ বোঝায়। এই তথ্য সংগ্রহের ফলে দেশের মোট জনসংখ্যা ছাড়াও জনসংখ্যা বৃদ্ধির আনুপাতিক হার, বয়স অনুপাতে জনসংখ্যা, জন্ম-মৃত্যুর হার, পুরুষ-নারীর আনুপাতিক হার, মাথাপিছু আয়, বেকারত্বের হার, সাক্ষরতা ও শিক্ষার হার, স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা, আবাসন পরিস্থিতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত জানা যায়। 

আদমশুমারির উদ্দেশ্য : অতীতে আদমশুমারির উদ্দেশ্য ছিল মূলত করধার্য করার জন্যে গোত্রের লোকসংখ্যা ও তাদের সম্পত্তির হিসাব রাখা কিংবা শত্রুর আক্রমণ মোকাবেলার জন্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে জনসংখ্যার সক্ষমতার খতিয়ান বের করা। তবে আধুনিক কালে আদমশুমারির উদ্দেশ্য ও উপযোগিতা অনেক ব্যাপক। আদমশুমারির মাধ্যমে জনসংখ্যার নানা মাত্রিক চিত্র পাওয়া যায়। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, অভিবাসনসহ জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধির হার ইত্যাদি সবই ধরা পড়ে আদমশুমারি প্রতিবেদনে। যে কোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে বাস্তব পরিকল্পনা প্রণয়নে আদমশুমারি এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। 

আদমশুমারির প্রয়োজনীয়তা : জনসংখ্যার প্রকৃতি ও দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও গতিপ্রকৃতির তথ্য-উপাত্ত ছাড়া দেশ পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ে। বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে ভুল হয়। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের উপযোগী শিশুর সংখ্যা জানা না থাকলে স্কুল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যবই মুদ্রণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য না পেলে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা গ্রহণ বাধাগ্রস্থ হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা না হলে, কিংবা ঘাটতির ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা না হলে দেশে দুর্ভিক্ষ মহামারী দেখা দিতে পারে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সেক্ষেত্রে দিতে পারে কার্যকর দিক-নির্দেশনা। দেশের জনসংখ্যার কত অংশ জনসম্পদ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে, বেকারত্বের হার কত, কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র কী, বিদেশে জনসম্পদ রপ্তানির সম্ভাবনা যাচাই ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অপরিহার্য উপাদান বলে বিবেচিত হয়। অর্থনীতির ক্ষেত্রে তো বটেই, সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের গবেষণায়ও গবেষকদের আদমশুমারি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সহায়তা নিতে হয়। 

লোকগণনার ঐতিহাসিক পটভূমি : সুপ্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীতে লোকগণনার রীতি চলে আসছে। বাইবেলে এক ধরনের আদমশুমারির উল্লেখ আছে। হযরত মুসা (আ.) -এর সময়ে বণি ইসরাইলদের শক্তি নিরুপণ করার জন্যে লোকগণনা করা হয়েছিল। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চীন ও মিশরে আদমশুমারি হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৭৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে, ১৮০১ সালে ইংল্যান্ডে ও ১৮৭১ সালে ভারতবর্ষে লোকগণনা শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আদমশুমারি হয় ১৯৭৪ সালে। কারণ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলায় আদমশুমারি করা সম্ভব হয় নি। বাংলাদেশে দ্বিতীয় আদমশুমারি হয় ১৯৮১ সালে এবং তৃতীয় আদমশুমারি হয় ১৯৯১ সালে। বিশ্বে প্রতি দশ বছর অন্তর প্রত্যেক দশকের শুরুতে আদমশুমারি করা হয়ে থাকে। একুশ শতকের প্রথম আদমশুমারি হয় ২০০১ সালে। 

আদমশুমারির পদ্ধতি : আদমশুমারি বিশেষ পদ্ধতিতে সুপরিকল্পিত পন্থায় সম্পন্ন করা হয়। এজন্যে আগে ভাগেই সুপরিকল্পিত ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করা হয়। আদমশুমারি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্যে সমস্ত দেশকে ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে এলাকাভিত্তক বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গণনাকারী নিয়োগ করা হয়ে থাকে। তাঁরা বিশেষভাবে প্রণীত প্রশ্নপত্রের ফরম নিয়ে প্রত্যেক বাড়িতে বা স্থাপনায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। দক্ষ তত্ত্বাবধায়কের সতর্ক দায়িত্বে এ কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর সমস্ত তথ্য একত্রিত করা হয়। প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য পরীক্ষা ও শ্রেণীবিন্যাস করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে পাঠানো হয়। সেখানে বিশেষ বিশেষ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সামগ্রিকভাবে গণনা ও বিশ্লেষণ করার পর চূড়ান্ত তথ্য বিবরণ প্রকাশিত হয়। ঐ বিবরণে দেশের সামাজিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা, সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ইত্যাদির সামগ্রিক তথ্য ও চিত্র পাওয়া যায়। ঐ তথ্য ও চিত্র কেবল দেশের জন্যে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয় না, সমগ্র বিশ্ব পরিসরেও এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব থাকে। 

আদমশুমারি নির্ভুলতার গুরুত্ব : আদমশুমারির তথ্য নির্ভুল না হলে তার গুরুত্ব ও মূল্য কমে যায়। সে জন্যে গণনা যথাসম্ভব বাস্তবভিত্তিক ও নির্ভুল হতে হয়। গণনা সাধ্যমতো নির্ভুল করার জন্যে ব্যাপক পরিকল্পনা ও আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে। গণনার নির্ভুলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গণনাকারী নিষ্ঠা ও সততা অপরিহার্য। গণনা নির্ভুল করার লক্ষে সরকার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেন এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ গণনা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন। 

উপসংহার : আধুনিক বিশ্বে যে-কোনো দেশের কিংবা বৈশ্বিক অগ্রগতির জন্যে আদমশুমারির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যসহ দেশের সার্বিক তথ্য ও চিত্র হাতে থাকা দরকার। আদমশুমারির মাধ্যমে সে তথ্য ও চিত্র পাওয়া যায়। সে চিত্র যেন নির্ভুল ও বাস্তব হয় সে জন্যে সরকার, জনগণ ও গণনাকারী সকলকে পালন করতে হয় সৎ ও সনিষ্ঠ ভূমিকা।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post