বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : সড়ক দুর্ঘটনা : কারণ ও প্রতিকার

↬ নিরাপদ সড়ক চাই


ভূমিকা : সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমান সময়ের আলোচিত ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষ, ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে হাজারো স্বপ্ন। পত্রিকার পাতা খুললেই এ সভ্যতার প্রমাণ মিলে। সড়ক দুর্ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ আমাদের নিরাপত্তার প্রধান হুমকি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। ফলে অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে। দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটছে। কিন্তু কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক পথ হয়ে উঠছে বিপজ্জনক। তাই স্বাভাবিকভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া আজ সময়ের দাবি।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ : সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণ বিদ্যমান। নিচে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কয়েকটি কারণ আলোচনা করা হলো :

১. অতিরিক্ত গতি এবং ওভারটেকিং : সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হচ্ছে গাড়িগুলোর অতিরিক্ত গতিসীমা। অসাবধানতার সঙ্গে অতিরিক্ত গতিতে অন্য একটি চলমান গাড়িকে ওভারটেকের চেষ্টাই সড়ক দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ। পুলিশ রিপোর্টেও বেশির ভাগ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে অতিরিক্ত গতি এবং চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো।

২. অপ্রশস্ত পথ : অপ্রশস্ত পথ ব্যবস্থাও বাংলাদেশের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। ঢাকা থেকে যাতায়াতের সবচেয়ে ব্যস্ত পথ ঢাকা-আরিচা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রশস্ত না হওয়াতে এ দুটি পথেই দুর্ঘটনা এবং হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঘটে।

৩. ওভারলোডিং : ‘ওভারলোড’ মানে পরিমিতির বেশি মাল বহন করা। বেশি ওজনের মালামাল বহন করে গতি সীমা ছাড়িয়ে প্রতিটি ট্রাকই এক একটি যন্ত্রদানব হয়ে উঠে। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চালকরা প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়।

৪. আইন অমান্য : সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ আইন অমান্য করে গাড়ি চালানো। জরিপে দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ চালক জেব্রা ক্রসিংয়ে অবস্থানরত পথচারীদের অধিকার আমলই দেয় না। পাশাপাশি ৮৪ ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙে রাস্তা পার হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে শতকরা ৯৪ জন রিকশাচালক ট্রাফিক আইন ও নিয়মের প্রাথমিক বিষয়গুলোও জানে না। তারা জানে না ডানে বা বাঁয়ে যেতে হলে কি সংকেত দিতে হবে। কোথায় কিভাবে মোড় নিতে হবে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ।

৫. ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশে সড়ক পথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার। এসব সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল করছে। কেবল রাজধানী ঢাকায় বাস মিনিবাস, প্রাইভেটকার, জিপ, পিকআপ, ট্রাক, অটোরিক্সা ও মটর সাইকেল মিলিয়ে কয়েক লক্ষ যানবাহন চলাচল করে। এছাড়াও বৈধ-অবৈধ রিকশার সংখ্যা কয় লক্ষ তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এই বিশাল যানবাহন বাহিনীকে সুশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে আনার মতো ট্রাফিক ব্যবস্থা এদেশে আজও গড়ে উঠেনি।

সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি : সড়ক দুর্ঘটনার ফলাফল কেবল মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি নয়, অপূরণীয় আরো অনেক ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেয় সাধারণের জীবনে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেক মানুষ প্রাণে বেঁচে থাকে বটে, কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক গতি তারা হারিয়ে ফেলে চিরকালের মতো। পঙ্গুত্ব, শারীরিক বৈকল্য আর যন্ত্রণা ও বেদনার ভার বহন করে বেঁচে থাকা সেই সব মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়।

পুলিশের এফআইআর (FIR মানে First Information Report) অনুযায়ী ২০১৪ সালে শুধু মহাসড়কগুলোতেই ২ হাজার ২৭টি দুর্ঘটনা ঘটে এবং এতে ২ হাজার ৬৭ জন নিহত হয় এবং অন্তত ২ হাজার জন আহত হয়। এটা কেবল পুলিশের নিকট নথিভুক্ত মহাসড়কগুলোর দুর্ঘটনার হিসাব। মহাসড়ক ছাড়া অন্যান্য সড়কে, পুলিশের কাছে নথিভুক্তহীন অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশে মহাসড়কসহ নিহতের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ১২-২০ হাজার জন। সম্প্রতি এক জরিপ থেকে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫% থেকে ৩০% শয্যায় দুর্ঘটনা কবলিত রোগীদের ভর্তি করতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করছে অপ্রত্যাশিত চাপ। এর ফলে স্বাস্থ্যখাতে সীমিত সম্পদের অনেকখানিই চলে যায় সড়ক দুর্ঘটনার আহতদের সেবায়।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায় : নিঃশব্দ আঁততায়ীর মতো প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের চার হাজার স্বজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এ মৃত্যুকে তো আমরা ঠেকাতে পারি। এজন্য প্রয়োজন একটু সচেতনতা, ধৈর্য, সতর্কতা আর ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ। যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার প্রত্যেকটি কারণই প্রতিরোধযোগ্য। তাই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য করণীয় হলো :

১. বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ : সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হলো গাড়িগুলোর বেপরোয়া গতি এবং ওভারটেকিং করার প্রবণতা। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা বেশি দেখা যায় ট্রাক, মিনিবাস আর দূরপাল্লার বাস চালকদের মধ্যে। এসব গাড়ির চালকগণ ভুলে যায় বেশ কিছু মানুষের জীবন কিছু সময়ের জন্য তাদের জিম্মাদারিতে রয়েছে। চালকগণ একটু সহনশীল হলে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোজনিত সড়ক দুর্ঘটনা সহজেই প্রতিরোধ করা যায়।

২. ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ : ট্রাফিক আইনের যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে যদি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ অনেক কমে যাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।

৩. লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতি প্রতিরোধ : সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করার জন্য গাড়ির লাইসেন্স ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে হবে। বর্তমানে দেখা যায় লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে হবে। বর্তমানে দেখা যায় লাইসেন্স প্রদানে জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ অনভিজ্ঞ ড্রাইভারদের হাতে ছেড়ে দেন নিরীহ যাত্রীদের ভাগ্য। তাই গাড়িচালক ও গাড়ির লাইসেন্স প্রদানে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করে তা কার্যকর করতে হবে।

৪. ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন গাড়ি প্রতিরোধ করা : এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দেশের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী গাড়ির মধ্যে অর্ধেকের বেশি গাড়ি লাইসেন্স বিহীন। আবার লাইসেন্সবিহীন গাড়ির মধ্যে অধিকাংশেরই রাস্তায় চলাচলের উপযোগী ফিটনেস নেই। যার ফলে ঘটে দুর্ঘটনা। আবার যেসব গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট আছে তার মধ্যেও রয়েছে অনেক গাড়ি যেগুলো চলাচলের উপযোগী নয়। এগুলোর ফিটনেস যাতায়াত করার সময় নানাবিধ দুর্ঘটনার শিকার হয়। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য অবৈধ উপায়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদান করা বন্ধ করে ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

৫. পথচারীকে সতর্ক হতে হবে : সড়ক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য পথচারীদের পথ চলার নিয়ম সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। পথচারীরা অনেক সময় প্রচলিত আইন অমান্য করে রাস্তা দিয়ে হাঁটেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও তারা খুব কমই ব্যবহার করেন। তাছাড়া অনেক সময় পথচারীরা অসতর্কতার সাথে রাস্তা পার হন যার দরুন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। সুতরাং রাস্তায় চলাচলের সময় পথচারীদের আরও সতর্ক ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ : সড়ক দুর্ঘটনার আর্থ-সামাজিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অপরিসীম। তাই সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন –

সড়ক নিরাপত্তা ও সরকার : সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময় সরকার দেশে সড়কসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে। সড়ক পরিবহন সেক্টরের সার্বিক তত্ত্বাবধান, ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকার ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ-BRTA) গঠন করে। এ সংস্থা দেশের যান্ত্রিক যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, উপযুক্ততা সনদসহ মোটরযান অধ্যাদেশে বর্ণিত অন্যান্য রেগুলেটরি দায়িত্ব পালন করে আসছে। এর আগে দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ সালে জারিকৃত এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে গঠিত হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি-BRTC)। পরিবহন অবকাঠামো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ও সমন্বয় সাধন এবং পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি-DTCB)। এ ছাড়াও সরকার সড়ক নিরাপত্তার জন্য সড়ক নিরাপত্তা সেল গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট – BUET) দুর্ঘটনা রিসার্চ সেন্টার স্থাপন করেছে। সড়ক ও মহাসড়কে অপরাধ এবং দুর্ঘটনা রোধকল্পে দেশের ৭২টি হাইওয়ে ফাঁড়িকে একক কমান্ডে এনে ১১ জুন ২০০৫ যাত্রা শুরু করে হাইওয়ে পুলিশ।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা প্রেক্ষিতে বলা যায়, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যায় কত প্রাণ। কত ঘরে জমে বুক চাপা কান্না। কত পরিবারের বেঁচে থাকার আলো যায় নিভে। স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়, কিন্তু তবুও মানুষকে পথ চলতে হয়। মানুষের পথ চলা যতদিন থাকবে দুর্ঘটনাও ততোদিন থাকবে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের কার্যক্রম জোরদার না করলে এ নিঃশব্দ ঘাতকদের রোধ করা যাবে না। তাই বাড়াতে হবে জনসচেতনতা। সচেতন হতে হবে যানবাহন চালক, হেলপার, যানবাহন মালিক, যাত্রী, পথচারী, ট্রাফিক পুলিশ সবাইকে।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো  ]


ভূমিকা : সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সৃষ্ট স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোরে সংবাদপত্র হাতে নিলেই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের মর্মান্তিক দুঃসংবাদ। আজকাল শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় পায়ে হেঁটে বা যানবাহনে চলাফেরা রীতিমত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বর্তমানে বাসায় সঠিক সময়ে কেউ না ফিরলে যে কথাটি সর্ব প্রথম মনে উদয় হয় তা হল- সড়ক দুর্ঘটনা। 

লোকসংখ্যা ও যানবাহন বনাম রাস্তা : স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর বাংলাদেশের সড়ক পথের যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ হাজার কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে যার মধ্যে মাত্র ৪০% হাইওয়ে সম্পন্ন। অপরদিকে, এ দেশে শুধু মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষাধিক। রিক্সা, ভ্যান, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি, অটোরিক্সা ইত্যাদি অগণিত। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উন্নত দেশের তুলনায় এগুলো প্রায় ৩০ গুণ বেশি। কেননা, দেশের বৃহত্তম শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বন্যার বেগে ছুটে আসা মানুষ আর যানবাহনের ভিড় যা উপলব্ধি করা যায় রাস্তাগুলোতে দীর্ঘ জ্যামের দিকে লক্ষ্য করলেই। 

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ : আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়। নানাবিধ কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হল : 

১. চালকদের অসাবধানতা, অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক। 
২. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। 
৩. রাস্তার স্বল্পতা ও অপ্রশস্ততা। 
৪. প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো এবং ওভারটেকিং দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। 
৫. প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশের অভাব ও ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গ করা। 
৬. যানবাহনে ব্যবহৃত তেলে ভেজাল। 
৭. রাস্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা। 
৮. ওভারব্রিজের স্বল্পতা। অসাবধানে রাস্তা পারাপার বা রাস্তা পারাপারের নিয়ম না জানা। 
৯. রিক্সা ও ভ্যানের সংখ্যাধিক্য। 
১০. সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার ও স্থাপনা। 
১১. ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ ও ক্ষেত্রবিশেষে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অদক্ষ রিক্সাচালকদের রিক্সা ও ভ্যান চালনা। 
১২. ট্রাফিক-পুলিশের সংখ্যা স্বল্পতা ও দায়িত্বহীনতা। 
১৩. বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা না করে যখন-তখন যেখানে-সেখানে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। 
১৪. অতিরিক্ত মাল ও যাত্রী বোঝাই, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পথ অবরোধ, পথ-সভা, হরতাল প্রভৃতি কারণে যানজট সৃষ্টির ফলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। 
১৫. দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবসহ আরো নানাবিধ কারণ রয়েছে। 
১৬. সড়ক পরিবহনের সাথে সম্পৃক্ত এক ধরনের কর্মচারীদের দুর্নীতি। এছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে ছোটখাট আরও নানাবিধ কারণ রয়েছে। 

দুর্ঘটনার চিত্র : বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশের সড়ক দুর্ঘটনার হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। বলে তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়। বিআরটিএ-র এক জরিপ মতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহাণি ছাড়াও বছরে দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এক হিসেবে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতিবছরে ৫ হাজারেরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় ১ হাজারেরও বেশি লোক প্রাণ হারায় এবং ১০ হাজারেরও বেশি লোক আহত হয়। বর্তমানে ২০১৬ সালের বিআরটিএ-র জরিপ মতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। 

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার যেসব চিত্র পাওয়া যায় তা সত্যিই ভয়াবহ দুঃখজনক। দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ছিনিয়ে নিচ্ছে মানুষের অমূল্য জীবন, ভেঙে দিচ্ছে অসংখ্য সাজানো সংসার। স্বজন হারা মানুষের আহাজারি, পিতৃহারা সন্তানের আকুতি ‘আর যেন কোন সন্তানকে এতিম হতে না হয়।’ সরকারি হিসাবেই এ সংখ্যা বছরে প্রায় চারশ। কোথাও বাসের সাথে বাস, কোথাও বাসে-ট্রাকে, কোথাও টেম্পু-বাসে ঘটে এ দুর্ঘটনা। আবার কোথাও রিক্সা বা নিরীহ পথচারীকে চাপা দেয় দ্রুতগামী বাস বা ট্রাক, কেড়ে নেয় অমূল্য মানবজীবন। 

ঢাকার চিত্র : ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি। প্রায় আড়াই কোটি লোকের তুলনায় এখানে রাস্তা বা রাস্তার বাহন, যানবাহন কোনটাই যথেষ্ট নয়। আর যেগুলো আছে সেগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনার পাশাপশি মৃত্যুর সংখ্যা। 

ঢাকার বাইরে : তুলনামূলকভাবে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার হার কিছুটা কম। দূরপাল্লার বাস, ট্রাকই মূলত এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়। অনেক সময় ফেরিতে উঠতে গিয়ে অথবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছে ধাক্কা খেয়ে, অথবা প্রতিযোগিতামূলকভাবে কোন গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে সংঘটিত দুর্ঘটনা অকালে বিধবার সাজে সাজাচ্ছে কাউকে, কাউকে বা করছে এতিম, সহায় সম্বলহীন। 

প্রতিকার : সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার সর্বদা সচেষ্ট থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। এর ফলে অকালে মা হচ্ছেন সন্তান হারা, স্ত্রী হচ্ছে স্বামী হারা আর সন্তান হচ্ছে পিতৃহারা। তাই আজ গণবিবেক জেগে উঠেছে। ২০১৮ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর গণআন্দোলনে নামে দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা। তারা নিজের হাতে ট্রাফিক কন্ট্রোল করে দেশের আইন যে অন্ধত্বের ভূমিকা পালন করছে তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিয়েছে। তাই আমাদেরকে আজ ভাবতে হচ্ছে এর প্রতিকার ব্যবস্থা নিয়ে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে : 

১. সাবধানে গাড়ি চালনার জন্য চালকগণকে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সহাসড়কে অবৈধ রিকশার অনুপ্রবেশ রোধ। 
২. অনির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং বন্ধ। 
৩. লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে চালকের দক্ষতা ও যোগ্যতা ভালভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন কেউ যেন গাড়ি চালাতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখাও আবশ্যক। 
৪. গাড়ি রাস্তায় বের করার পূর্বে এর যান্ত্রিক কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই হ্রাস পাবে। 
৫. সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তি অর্থাৎ সিআরপিসি-র ৩০৪ বি ধারা পরিবর্তন করে সাজার পরিমাণ সত বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। এ শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ১০ বছর করা দরকার। 
৬. মোটর যান অধ্যাদেশের ১৪৩, ১৪৬ ও ১৪৯ ধারায় যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে তা বাড়ানো দরকার। 
৭. বিআরটি-এর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রচলিত পদ্ধতিতে লাইসেন্স প্রদানে প্রতিবন্ধকতা ও লাইসেন্সের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কম দামে জাল লাইসেন্স তৈরি ও বিক্রি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা কাগজপত্রের প্রমাণের অভাবে প্রতিকার করা দুরূহ। এ ধরনের জাল সার্টিফিকেট দেয়া বন্ধ করা জরুরি। 
৮. পুলিশ ও বিআরটি-এর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা জরুরি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ আসল লাইসেন্সকেও জালের অভিযোগে অভিযুক্ত করারও নজির রয়েছে। 
৯. বীমা আইনের আওতায় বীমার টাকা তোলার বিষয়টি আরও সহজ করা দরকার। 
১০. হাইওয়েতে মানুষ বা কোনো প্রাণী চালিত বাহন চলাচল বন্ধ করে তাদের জন্য বিকল্প রাস্তা তৈরি করা দরকার। 
১১. রাস্তায় পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 
১২. ফুটপাত হকারদের দখলমুক্ত করে পথচারী চলাচলের উপযোগী করে তোলার বিষয়গুলো মাথায় রেখে গোটা ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন ঘটানো অপরিহার্য। অন্যথায় গড়ক দুর্ঘটনা দিনের পর দিন আরও বাড়তে থাকবে, যা দেশ ও জাতির জন্যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি পথচারীকেও ট্রাফিকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। 
১৩. গাড়ির প্রতিটি চালক ও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত মাল ও যাত্রীবহন বন্ধ করা। 

উপসংহার : প্রতিটি জীব বা প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতে হবে, আমাদেরও মরতে হবে। কিন্তু নিশ্চয়ই পথের বলি হয়ে কেউ মরতে চাই না। তাই সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি যতই জটিল সমস্যা হোক না কেন সকলের সামগ্রিক চেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে এ থেকে রক্ষা পাওয়া তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ -এ শ্লোগানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

6 comments:


Show Comments