My All Garbage

Shuchi Potro
সাধারণ জ্ঞান বাংলা ব্যাকরণ বাংলা রচনা সমগ্র ভাবসম্প্রসারণ তালিকা অনুচ্ছেদ চিঠি-পত্র ও দরখাস্ত প্রতিবেদন প্রণয়ন অভিজ্ঞতা বর্ণনা সারাংশ সারমর্ম খুদে গল্প ভাষণ লিখন দিনলিপি সংলাপ অ্যাসাইনমেন্ট-২০২১ English Grammar Composition / Essay Paragraph Letter, Application & Email Dialogue List Completing Story Report Writing Graphs & Charts পুঞ্জ সংগ্রহ বই পোকা হ য ব র ল তথ্যকোষ পাঠ্যপুস্তক CV & Job Application My Study Note আমার কলম সাফল্যের পথে
About Contact Service Privacy Terms Disclaimer Earn Money


বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সহায়ক ওয়েবসাইট

বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ

কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' কবিতা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। মাত্র ২২ বছর বয়সে নজরুল রচনা করেছিলেন প্রায় ১৫০ পঙক্তির এই ভুবনবিজয়ী কবিতা। নজরুল 'বিদ্রোহী' রচনা করেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। নানা দৃষ্টিকোণেই হতে পারে এ কবতার ব্যাখ্যা ও বিবেচনা। এ কথা ঐতিহাসিক সত্য যে, 'বিদ্রোহী' নামের এ কবিতাই বাংলা কবিতার ধারায় নির্মাণ করেছিলেন সম্পূর্ণ নতুন একটি পথ। সেই পথই এখন বাংলা কবিতার অন্যতম রাজপথ। এখানেই যুগস্রষ্টা নজরুলের কালোত্তীর্ণ সিদ্ধি।

কবিতার ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এক অনন্য সাধারণ নির্মাণ। আজ থেকে ঠিক শতবর্ষ আগে রচিত এ কবিতা এখনো প্রাসঙ্গিক, অব্যাহতভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে চিরকাল।
মাত্র ২২ বছর বয়সে নজরুল রচনা করেছিলেন প্রায় ১৫০ পঙক্তির এই ভুবনবিজয়ী কবিতা। নজরুল 'বিদ্রোহী' রচনা করেন ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। কবিতাটির প্রথম শ্রোতা ছিলেন মুজফফর আহমদ। কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনের ভাড়াবাড়ির একতলায় থাকতেন মুজফফর আহমদ ও নজরুল ইসলাম।

কবিতাটি নজরুল লিখেছিলেন রাতে, এক টানে; সকালে তিনি মুজাফফর আহমদকে পড়ে শোনান। প্রসঙ্গত তিনি জানাচ্ছেন, 'আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। তার ঘুম সাধারণত দেরিতেই ভাঙতো, আমার মতো তাড়াতাড়ি তার ঘুম ভাঙত না। সেই সময়ে নজরুলের কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তার হাত তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিল।'

মুজফফর আহমদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, 'বিদ্রোহী' কবিতাটি নজরুল প্রকাশের জন্য মোসলেম ভারত পত্রিকায় দিলেও, তা প্রথমে বিজলী পত্রিকায় ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয়। তবে এ বিষয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি হলো- ছাপার তারিখের সাক্ষ্য মতে 'বিদ্রোহী' প্রথমে মুদ্রিত হয় মোসলেম ভারত পত্রিকার কার্তিক ১৩২৮ (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯২১) সংখ্যায়। তারপর এটি প্রকাশিত হয় বিজলীতে ২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দে (৬ জানুয়ারি ১৯২২)।

মোসলেম ভারত'র প্রকাশ ছিল অনিয়মিত। কার্তিক সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছিল ফাল্গুনে, ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯২২। তার আগেই নজরুলের 'বিদ্রোহী' প্রকাশিত হয়েছে বিজলী পত্রিকায় (২২ পৌষ ১৩২৮/৬ জানুয়ারি ১৯২২)।

মজার কথা, কবিতাটির প্রকাশ তথ্য হিসেবে বিজলীতে লেখা হলো, 'বিদ্রোহী' মোসলেম ভারত থেকে পুনর্মুদ্রিত, অথচ মোসলেম ভারত তখন প্রকাশিতই হয়নি। এ তথ্য হয়তো জানা ছিল না বিজলী কর্তৃপক্ষের। সততার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েই সেদিন তারা এই কথা লিখেছিলেন।

নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতায় ২ জন আছেন—একজন বক্তা, একজন শ্রোতা। বক্তা বা পুরোহিত তার শ্রোতা কিংবা শিষ্যকে বিদ্রোহ ব্যঞ্জক কিছু বলতে বলছেন। কিন্তু নজরুলের অসামান্য নির্মাণ কুশলতার পরিণতিতে বক্তা বা শ্রোতা নন, কবি নিজেই হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী, উপাধি পান 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে। একটি কবিতার শিরোনাম একজন কবির নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি আছে কি না সন্দেহ।

ঔপনিবেশিক শোষণ, সামন্ত মূল্যবোধ ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী রূপে 'বিদ্রোহী' কবিতায় আবির্ভূত হন নজরুল। রোমান্টিক অনুভববেদ্যতায় মানবতার সপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেন বিদ্রোহের বাণী, সত্য সুন্দর মঙ্গল ও শান্তির কামনায় তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন যাবতীয় অপশক্তি, ধর্মীয় শোষণ ও জীর্ণ-সনাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে।

পরাধীনতার গ্লানিতে নজরুলচিত্ত দীর্ণ হয়েছে এবং এই গ্লানি থেকে মুক্তির অভিলাষে তিনি হয়েছেন বিদ্রোহী। তবে কেবল দেশের স্বাধীনতা কামনাতেই তার বিদ্রোহী চিত্তের তৃপ্তি ছিল না।

তার বিদ্রোহ ছিল একাধারে ভাববাদী ও বস্তুবাদী। তার বিদ্রোহ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার, সকল আইন-কানুনের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, ইতিহাসনিন্দিত চেঙ্গিসের মতো নিষ্ঠুরের জয়গানে মুখর, মানবধর্ম প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্প, ধ্বংসের আবাহনে উচ্ছ্বসিত, সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় উদ্বেলিত।

'বিদ্রোহী' কবিতায় নজরুল ইসলাম সৃষ্টিকে স্থাপন করেছেন আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক জীবন বাস্তবতায় জটিল আবর্তে। কবিতা তাই হয়ে উঠেছে সামাজিক দায়িত্ব পালনের শানিত আয়ুধ। 'বিদ্রোহী' কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহ চেতনার মাঝে লক্ষ্য করা যায় ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য।
  • অসত্য অকল্যাণ অশান্তি অমঙ্গল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
  • স্বদেশের মুক্তির জন্য ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং
  • শৃঙ্খল-পরা আমিত্বকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিদ্রোহ।

নজরুলের বিদ্রোহ চেতনাকে নানা মাত্রায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কখনো তা হয়েছে সদর্থক, কখনো-বা নৈতিবাচক। তবে তার বিদ্রোহী সত্তাকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, তা ছিল মূলত সৃষ্টিশীল। তার বিদ্রোহ সৃষ্টিশীল বলেই ধ্বংসের মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছেন নতুন সৃষ্টির উৎস।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা

বল বীর -
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর -
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর -
আমি চির উন্নত শির!
আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর -
চির-উন্নত মম শির!
আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা!
আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর!
বল বীর -
আমি চির উন্নত শির!
আমি চির-দুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম হ্যায় হর্দম ভরপুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণ-তূর্য;
আমি কৃষ্ন-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধীর।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর -
চির -  উন্নত মম শির!
আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড,
 আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ খোলা হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস!
আমি কভূ প্রশান্ত কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
আমি প্রভোন্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল,
আমি উদ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্জ্বল,
আমি উচ্ছ্বল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!
আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্ণি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বন্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ – জ্বালা, প্রিয় লান্চিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উথ্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্ণি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি’ ভূমিকম্প।
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’ -
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।
আমি দেব শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অন্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা-
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
 আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়।
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উত্‍পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না -
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না -
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর -
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
 
তথ্যাবলি
বিদ্রোহী কাজী নজরুলের বিখ্যাত কবিতাসমূহের একটি। ১৩৯ লাইনের এই কবিতাটি তিনি লিখেছেন ডিসেম্বর ১৯২১। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি বিজলী পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ধূমকেতুতে (২২ আগস্ট ১৯২২) ছাপা হয়। প্রকাশ হওয়া মাত্রই এটি ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ‘চির উন্নত শির’ বিরাজমান। কবিতাটির প্রথম প্রকাশ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের মতে- ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বিজলীতে প্রকাশেরও আগে মোসলেম ভারত এ প্রকাশিত হয়।

ইতিহাস : ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে কাজী নজরুল ইসলাম তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুজাফফর আহমদের সাথে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে, যখন তারা কলকাতার তালতলা লেনে বসবাস করছিলেন, তখন নজরুল কবিতাটি লেখেন। মুজাফফর আহমেদের মতে, কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ৬ জানুয়ারি ১৯২২ সালে সাপ্তাহিকক বিজলী পত্রিকায়। প্রকাশের পর, কবিতাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং দ্য মোসলেম ভারত, প্রবাসী, মধুমতি এবং সাধনা ম্যাগাজিন সহ অন্যান্য কিছু পত্রিকাও কবিতাটি প্রকাশ করে। কবিতাটি প্রথম ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিতঅগ্নিবীণা বইয়ে অন্যান্য ১১টি কবিতার সাথে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

পাঠক জনপ্রিয়তা : বিজলী পত্রিকায় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, ২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ শুক্রবারে প্রথম কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। কবতাটি প্রকাশের পর হতেই নজরুল সকলের কাছে পরিচিত হতে থাকে এবং নানানভাবে সমাদৃত হতে থাকে। সে সময় বিজলী পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলো নলিনীকান্ত সরকার। বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশনার ঐদিন বিজলী পত্রিকা পরপর দুইবার ছাপ্তে হয়েছিল, যার সংখ্যা ছিলো ২৯ হাজার। মুজাফফর আহমদের কাছ থেকে জানা যায়, সেদিন কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ বিদ্রোহী কবিতাটি পড়েছিল।

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমাদর : কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রশংসা করে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন- ‘মনে হলো এমন কিছু আগে কখনো পড়িনি’। এরপর তিনি আরো এর স্থানে বলেন ‘বাংলা সাহিত্য বিশ শতকে রবীন্দ্র প্রভাব এতো সর্বগ্রাসী হয়েছিল, মনে হচ্ছিল- ‘এর বাইরে যাওয়া যাবে না, যতক্ষন না বিদ্রোহী কবিতার নিশান উড়িয়ে হইহই করে নজরুল এসে হাজির হলেন।’

বিদ্রোহী স্মরণে : ২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ উপলক্ষে জাতীয় কবির সমাধিস্থলে অনুষ্ঠিত হয়েছে শত কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা পাঠ। এ পাঠের আয়োজন করে নজরুল চর্চা কেন্দ্র বাঁশরী।


eNoteShare.com

No comments