ব্যাকরণ : শব্দ

শব্দ
Word

শব্দ : কিছু ধ্বনি উচ্চারিত হয়ে বা বর্ণ একত্রে বসে যদি কোনো নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ করে, তবে তাকে শব্দ বলে। অর্থাৎ এক বা একাধিক ধ্বনি বা বর্ণ মিলে কোনো অর্থ প্রকাশ করলে তাকে শব্দ বলে। বাক্যের মৌলিক উপাদান হল শব্দ। শব্দকে বাক্যের একক বলা হয় তথা বাক্যের বাহন হলো শব্দ। শব্দের অর্থযুক্ত ক্ষুদ্রাংশকে রূপ বলে। শব্দ—কে বাক্যের প্রাণ বলা হয়।

শব্দ সম্পর্কে আধুনিক চিন্তা : আধুনিক চিন্তা থেকে বলা হয়ে থাকে, শব্দ একটি ধারণা বা ইমেজ। শব্দ মানুষের মনোজগতে পৃথক পৃথক প্রতিচ্ছবি বা ইমেজ তৈরি করে। যেমন— সে অসুখে প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছে। এমন বাক্য দেখলে বা বললে যেকোনো বাঙালি বুঝবেন কোনো একজন লোক / ব্যক্তি অসুখে আছে। কেউ কিন্তু মনে করবে না যে— কোনো প্রাণী, জন্তু বা সাপ ঘুমিয়ে আছে বা অন্য কোনো মানে। কারণ সে দ্বারা সাধারণত কোনো মানুষ কে বোঝানো হয়েছে। কখনোই কারো কল্পনায় সে এর ইমেজ হিসেবে সাপ, বাঘ, সিংহ বা অন্য কিছু আসবে না। তাই বলা যায়— শব্দ হলো আইডিয়া যা মানুষের জ্ঞানরাজ্য বা অভিজ্ঞতায় বিস্তৃত। শব্দই ব্রহ্ম— সংস্কৃত পণ্ডিতদের এই বক্তব্যের সাথে আধুনিক ‘ওয়ার্ড ইজ আইডিয়া'র’ মিল পাওয়া যায়।

সর্বজনীন শব্দের সত্যতা : পাঁচটি মহাদেশে ব্যবহৃত হয় এমন একটি শব্দের খোঁজ পেয়েছেন ভাষাবিজ্ঞানীরা। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, নেদারল্যান্ডসের ম্যাক্স ইন্সটিটিউট ফর সাইকোলিঙ্গুইস্টিকসের বিজ্ঞানীরা দাবি করেন— উচ্চারণে সামান্য একটু পার্থক্য থাকলেও এ রকম একটি শব্দ তারা খুঁজে পেয়েছেন। এটিকে বরং শব্দ না বলে ধ্বনি বলা শ্রেয়। সেটি হলো— ‘হাহ’ (ইংরেজি বানান: এইচইউএইচ)। কখনো প্রশ্নবোধক, কখনো অনিশ্চিয়তাসূচক এই ধ্বনির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি মানুষ ব্যবহার করে থাকে বলে দাবি তাদের। এর অর্থ অনেকটাই ‘তাই না’ এর মতো। এই গবেষণার আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল। সেটি হলো আধুনিক ভাষা বিজ্ঞানের জনক নোয়াম চমস্কির মতবাদ কে খণ্ডন করা। কারণ তিনি ভাষার মধ্যে ব্যাকরণিক নিয়ম সহজভাবে মেনে চলার পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান বিশেষজ্ঞরা বলতেছেন— সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্যেই ভাষার ভিত্তি নিহিত থাকে। যেমন— মা বা মামা শব্দের শব্দ ব্যবহারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভিন্নতা আছে। তেমনি পিতা বা পাপা শব্দেও সেই ভিন্নতা বিদ্যনান। কিন্তু ‘হাহ’ এর ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী ভিন্নতা অনেক কম। তাই ‘হাহ’ কে বিশ্বজনীন শব্দ বলা হয়।

শব্দ গঠন : শব্দের অর্থ—বৈচিত্র্যের জন্যে নানাভাবে তার রূপান্তর করা হয়। এভাবে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্যে শব্দ তৈরি করার প্রক্রিয়াকে এক কথায় শব্দগঠন বলে। শব্দ গঠনের প্রধান উপায় তিনটি। যথা— উপসর্গ যোগে, প্রত্যয় যোগে ও সমাসের সাহায্যে।

শব্দ গঠনের উপায়সমূহ : পৃথিবীর যেকোনো ভাষাতেই মৌলিক শব্দের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম থাকে। সেইরূপে বাংলা ভাষাতেও মৌলিক শব্দের পরিমাণ অনেক কম। পৃথিবীর যেকোনো ভাষার শব্দকোষ বৃদ্ধি পায় বিভিন্ন উপায়ে শব্দ গঠনের মাধ্যমে। বাংলা ভাষাতেও সেইরকম ঘটে। বাংলা ভাষার শব্দ গঠনের কয়েকটা উপায় নিম্নে উল্লেখ করা হল :

(১) সন্ধির মাধ্যমে : সন্ধির সাহায্যে নতুন শব্দ গঠন করে। যেমন— হিম + অচল = হিমাচল, বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়।

(২) সমাসের মাধ্যমে : সমাসের সাহায্যে একাধিক শব্দকে এক শব্দে পরিণত করে। যেমন— জায়া ও পতি = দম্পতি, চৌ রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা।

(৩) বহুবচনের মাধ্যমে : (গ্রন্থ থেকে) গ্রন্থাবলি।

(৪) বাক্যসংকোচনের মাধ্যমে : লাভ করার ইচ্ছা = লিপ্সা

(৫) পদ—পরিবর্তনের মাধ্যমে : পদ পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন শব্দ গঠন হয়। যেমন— সুন্দর > সৌন্দর্য, মানব (বিশেষ্য) = মানবিক (বিশেষণ)।

(৬) উপসর্গ সহযোগে : শব্দের আগে উপসর্গ যোগ করে। যেমন— দুর্ + অবস্থা = দুরবস্থা, আ + হার = আহার।

(৭) প্রত্যয় সহযোগে : শব্দের শেষে প্রত্যয় যোগ করে। যেমন— ঘর + আমি = ঘরামি, ঢাকা + আই = ঢাকাই।

(৮) দ্বিরুক্তি শব্দের সহযোগে : দ্বিরুক্তির সাহায্যে নতুন শব্দ গঠিত হয়। টক্ টক্, ঘ্যান্ ঘ্যান্, ঝির ও ঝির = ঝিরঝির।

✔ শব্দ বাক্যে সম্পর্কহীন এবং পদ বাক্যে সম্পর্কযুক্ত; মূলত এটাই হল শব্দ ও পদের মধ্যে পার্থক্য।

✔ ‘খ’ একটি শব্দ; এর অর্থ আকাশ।

আজিবুল হাসান
১৮ মে, ২০২১
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post