বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : নারীর ক্ষমতায়ন

↬ নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন


ভূমিকা : পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীরা এখন আর শুধু অন্তঃপুরবাসী নয়, বরং তারা উন্নয়নে পুরুষের সম অংশীদারিত্বের দাবি রাখে। অথচ বাংলাদেশের নারীসমাজ যুগ যুগ ধরে শোশিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক কুসংস্কার, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বেড়াজালে নারীদের সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। তাদের মেধা ও শ্রমশক্তিকে সমাজ ও দেশ গঠনে সম্পৃক্ত করা হয়নি। নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গ্রহণ করা হয়নি কোনো বাস্তব পদক্ষেপ। অথচ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করতেও পুরুষের পাশাপাশি সহায়তা করে নারী। এটি কোনো একমুখী প্রক্রিয়া নয় বরং দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া।

নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন : নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সর্বজনীনতা সংরক্ষণ করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে নারীর স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
১. উন্নয়ন পরিকল্পনা : ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অীধকার নিশ্চিত করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সকল নারী অবদান রেখেছেন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, সেসব নারীর পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরকার। সে সময় ১৯টি জেলা ও ২৭টি মহকুমাসহ মোট ৬৪টি কেন্দ্রের মাধ্যমে নারী উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু হয়।

নারী পুনর্বাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৪ সালে এ বোর্ড বৃহত্তর কলেবরে পুনর্গঠিত করে সংসদের একটি অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করা হয়।

২. সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ : নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে ‘বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডকে’ নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করার পর নারী উন্নয়নে নীতি নির্ধারণের মক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে মহিলাবিষয়ক স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করে। এছাড়া ১৯৭৬ সালে সরকারি রেজুলেশনবলে জাতীয় মহিলা সংস্থা গঠিত হয় এবং ১৯৯১ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থাকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। সরকারের গৃহীত নারী উন্নয়ন কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে মহিলাবিষয়ক পরিদপ্তর গঠিত হয় এবং ১৯৯০ সালে এ পরিদপ্তরকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। এছাড়া ১৯৭৬ সালে শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৪ সালে শিশু বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামকরণ করা হয় ‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’।

৩. প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন : ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকার নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অন্তর্ভুক্তি তথা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরকারি চাকরিতে দশ ভাগ কোটা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে দুজন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯৭৪ সালে একজন নারীকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় ৪ জন নারী (ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত) রয়েছেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের সংসদ নির্বাচন সরকারি ও বিরোধী দলের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৭২টি আসনে নারী সংসদ সদস্য রয়েছে, যেখানে ২৩ জন নির্বাচিত আর ৪৯ জন সংরক্ষিত আসনে মনোনীত। ইউনিয়ন পরিষদের ১২টি সদস্যপদের মধ্যে ৯টিতে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখাসহ সংরক্ষিত ৩টি আসনে নারীর প্রতিযোগিতার সুযোগ রাখা হয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের আমলে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের মহিলাদের সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটে নির্বাচন। ২০১৬ সালের নবম ইউপি নির্বাচনে বহু নারী সরাসরি ভোটে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। গ্রাম পরিষদেও ৩০% নারীর অংশগ্রহণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। একইভাবে উপজেলা ও জেলা পরিষদে ৩০% মহিলা নির্বাচিত হয়। ফলে সারা বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে নারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালী হয়েছে বলে আশা করা যায়। তাছাড়া পার্লামেন্টেও নারীর অংশগ্রহণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
১৯৭৩ – জাতীয় সংসদে সদস্য পদে মহিলাদের জন্য কোটা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

১৯৭৫ – প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে এবং বর্ষধারার পক্ষে ভোটদান করে।

১৯৭৬ – (ক) বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা গঠন করা হয়, (খ) মহিলা সেল গঠন করা হয়, (গ) মহিলাবিষয়ক বিভাগ গঠন করা হয়, (ঘ) সরকারি খাতের সাংগঠনিক কাঠামোতে কোটাভিত্তিক মহিলাদের পদ সৃষ্টি করা হয়।

১৯৭৮ – মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় চালু করা হয়।

১৯৮০ – দ্বিতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে এবং সম্মেলনে সিদ্ধান্তপত্রে স্বাক্ষরদান করে।

১৯৪৮ – (ক) ‘সিডো’ (CEDAW) সনদ গ্রহণ ও অনুমোদন করে। (খ) মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮৫ – দশক সমাপনী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে এবং সম্মেলনে (Nairobi Forward Locking Strategy) অবদান রাখে।

১৯৮৫-১৯৯০ – নারী ও পুরুষের উন্নয়নে অসাম্য দূর করতে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

১৯৯১ – WID Focal Point তৈরি করা হয়।

১৯৯৫ – (ক) NCWD (National Council For Womens Development) সৃষ্টি করে। (খ) চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে এবং সুপারিশ করে।

১৯৯৬ – (ক) PFA বাস্তবায়নের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। (খ) PFA বাস্তবায়নে কোর গ্রুপ গঠন করা হয়।

১৯৯৭ – (ক) নারী উন্নয়নে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। (খ) স্থানীয় সরকারসমূহে নির্বাচনে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৮ – নারী উন্নয়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।

২০০২ – এসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ এবং এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ জারি করা হয়।

২০০৩ – নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল পাস।

২০০৪ – সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে নারীদের জন্য ৪৫টি আসন সংরক্ষণ।

২০১১ – ৯ জানুয়ারি ২০১১ সরকারি চাকরিজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করা হয়।

২০১১ – সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে নারীদের ৫০টি আসন সংরক্ষণ।

২০১৩ – দেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে ৩০ এপ্রিল ২০১৩ শপথ ও দায়িত্ব গ্রহণ করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

২০১৫ – সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী সৈনিক এবং সীমান্ত প্রহরায় অর্থাৎ বিজিবিতে প্রথম নারী জোয়ান নিয়োগ।

২০১৭ – দেশের প্রথম নারী নির্বাচন কমিশনার হন কবিতা খানম।

২০১৮ – দেশের প্রথম নারী মেজর জেনারেল হন ডা. সুসানে গীতি।

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নে সরকার যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তা হলো :
১. নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা বাস্তাবায়ন
  • মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা যেমন – রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের যে সমঅধিকার, তার স্বীকৃতিস্বরূপ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা।
  • নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডো) বাস্তবায়ন করা।
  • সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায়ে নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া।

২. নারীর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন দূরীকরণ
  • পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন, নারী ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করা
  • নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্পর্কিত প্রচলিত আইন যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশোধন এবং নতুন আইন প্রণয়ন করা।

৩. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
  • নারীশিক্ষা বৃদ্ধি, নারী-পুরুষের মধ্য শিক্ষার হার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা এবং উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সক্রিয় ও স্পষ্ট নীতি অনুসরণ করা।
  • আগামী দশ বছরে নিরক্ষরতা দূর করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা, বিশেষত মেয়ে শিশু ও নারীসমাজের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া।
  • মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৪. নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
  • নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরি বিষয়াদি যথা – স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, তথ্য, উপার্জনের সুযোগ, উত্তরাধিকার, সম্পদ, ঋণ প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদসহ ভূমির ওপর অধিকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ ও সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা।

৫. নারীর কর্মসংস্থান
  • নারীর শ্রমশক্তির শিক্ষিত ও নিরক্ষর উভয় অংশের কর্মসংস্থানের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
  • চাকরির ক্ষেত্রে নারীর বর্ধিত নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল ক্ষেত্রে কোটা বৃদ্ধি এবং কার্যকর করা।
  • সকল নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকার অনুসৃত কোটা ও কর্মসংস্থানের নীতির আওতায় চাকরির ক্ষেত্রে নারীকে সকল প্রকার সমসুযোগ প্রদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা।

৬. নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
  • রাজনীতিতে অধিক হারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রচার মাধ্যমসহ রাজনৈতিক দলসমূহকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।
  • নারীর রাজনৈতিক অধিকার অর্জন ও প্রয়োগ এবং এর সুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

৭. নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন
  • প্রশাসনিক কাঠামোর উচ্চ পর্যায়ে নারীর জন্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্যে চুক্তিভিত্তিক এবং সরাসরি প্রবেশের (লেটারেল এনট্রি) ব্যবস্থা করা।
  • নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল পর্যায়ে, গেজেটেড ও নন-গেজেটেড পদে কোটা বৃদ্ধি করা।
উপসংহার : নারী ক্ষমতায়নের ধারণা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশ বেইজিং-এ নারী উন্নয়ন ও কর্মপরিকল্পনায় যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হয়েছে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। সুশীল সমাজ গঠনে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে মানবিক মূল্যবোধের অনুশীলন করার লক্ষ্যে শুধু সরকারি প্রচেষ্টা নয়, বেসরকারি সংস্থাসমূহের দায়দায়িত্বও অনেক। সরকরি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টায় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হতে পারে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো ]


ভূমিকা : একবিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্ব যে বিষয়গুলো আলোচনার ঝড় তুলেছে নারীর ক্ষমতায়ন এর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে নারীর যে মানবেতর অবস্থান কেবল তা থেকে মুক্তিই নয়, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রিক যে- কোনো ধরনের সমস্যা সমাধান ও নীতি নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণকে অন্যতম অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ক্ষমতায়ন কী? : ‘ক্ষমতায়ন’ শব্দটি তুলনামূলকভাবে নতুন। ক্ষমতায়ন বলতে মূলত বোঝায় নারীর স্বাধীনতা ও সকল ক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা। ক্ষমতা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ- বস্তুগত, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ। নারীর ক্ষমতায়নের অর্থই হলো, সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন একটি সুস্থ পরিবেশ থাকবে যেখানে নারী আপন মহিমায় স্বাধীন ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠবে; নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে বস্তুগত, মানবিক ও জ্ঞান সম্পদের উপর। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া নারীর শিক্ষা প্রসার এবং দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার তাগিদ দিয়েছেন। নারী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী সুফিয়া কামালও নারীর বন্ধনমুক্তি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।

নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য : শিশুকাল থেকে নারীর ভেতর বপন করা হয় নীচতার এক বীজ। এর জন্যে অনেকখানি দায়ি পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ, ধর্মীয় গোঁড়ামি। ক্ষমতায়নের লক্ষ্যই হলো পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শ ও অধস্তনতার অনুশীলনকে রূপান্তর করা। একমাত্র সম-অংশীদারিত্বেই ক্ষমতায়নের ভিত্তি প্রস্তুত হয়। নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নির্যাতক ও শোষকের অবস্থান থেকে পুরুষকে মুক্ত করা। বিদ্যমান সমাজে পুরুষের দায়িত্বের পাশাপাশি নারীর দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা, পুরুষের অধিকারের পাশাপাশি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা। সম অধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে পুরুষরা গৃহস্থালি ও সন্তান লালন-পালনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করবে, পাশাপাশি নারীরাও পুরুষের দায়িত্ব পালনে সমানভাবে অংশ নেবে। ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত কায়রো সম্মেলনে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকেই বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ১৭৯টি দেশের অংশগ্রহণে ১১৫ পৃষ্ঠার একটি প্রস্তাবনায় সাম্য, ন্যায়বিচার, সন্তান ধারণের প্রশ্নে নারীর ইচ্ছার প্রাধান্য, নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রভৃতি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধকতা : দু-একজন নারী সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা মুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেই নারীর ক্ষমতায়ন হয় না। নারীর ক্ষমতায়ন দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগ যে নারী তাদের সঠিক ক্ষমতায়নকে বোঝায়। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রধান দুটি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে :

ক. প্রচলিত মূল্যবোধ ও আইনের সীমাবদ্ধতা: সমাজে প্রচলিত মূল্যবোধ নারীকে পুরুষের অধস্তন করে রাখে। শিশুবয়স থেকেই নারী দেখে সমাজে পুরুষদের প্রভাব। শিশুকাল থেকেই সে আচার-আচরণ, পোশাক, চলাফেরা ও কথা বলার ধরন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিভিন্নধর্মী নিয়মের জালে আবদ্ধ হয়ে যায়। পিতৃতন্ত্রের পক্ষে এমন সব মূল্যবোধ তৈরি হয় যা নারীকে ছুড়ে ফেলে দেয় অন্ধকার আবর্তে। নারী শিক্ষার সুযোগ পায় না, স্বাবলম্বী হতে পারে না; সর্বোপরি আর্থিক বা মানসিকভাবে তাকে পুরুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়।

প্রচলিত আইনও নারীর বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। সংবিধানে নারী-পুরুষের সম অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ হচ্ছে না। যৌতুক, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ প্রভৃতি অপরাধে শাস্তির বিধান থাকলেও আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় অপরাধী। সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিয়ে, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব- সব ক্ষেত্রেই আইনের কাঠামোগত দুর্বলতায় নারী হয় বঞ্চিত। দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে যে সন্তানকে সে জন্ম দেয়, বড় করে, সে সন্তানের অভিভাবকত্ব পায় না নারী। সম্প্রতি বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নামের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। সম্পত্তির ক্ষেত্রে মুসলিম আইনে নারী পুরুষের অর্ধেক পায়, হিন্দু নারীরা কিছুই পায় না।

খ. পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল ধর্মান্ধ মানসিকতা : সমাজে রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন কিছু লোক নারীকে সর্বক্ষেত্রে অবদমিত করে রাখতে চায়। নারীমুক্তিকে তারা ধর্মের চরম অবমাননা বলে ভাবে। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন নিয়মের জালে তারা নারীসমাজকে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। আজও গ্রামবাংলার বহু নারী রক্ষণশীল ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন কিছু লোকের ফতোয়ার শিকার। এটি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।

প্রচার মাধ্যমগুলোতে নেতিবাচক ভাবে নারীকে উপস্থাপন : প্রচার মাধ্যমগুলোতে নারীকে সবসময় পুরুষের অধস্তন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞাপন চিত্রে অহেতুক নারীর উপস্থিতি টেনে আনা হয়। চলচ্চিত্র কিংবা নাটনে নারীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন শাড়ি কিংবা গয়না ছাড়া নারীদের আর কিছুই চাইবার নেই। গণমাধ্যমে নারীকে হীনভাবে উপস্থাপন করার জন্যে নারীরাও অনেকাংশে দায়ী।

ক. নারীর স্বার্থ রক্ষাকারী আইন প্রবর্তন : বিয়ে, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তান ধারণে পূর্ণ স্বাধীনতা, সম্পত্তিতে সম অধিকার, সন্তানের অভিভাবকত্ব প্রভৃতি বিষয়ে সনাতন আইন পালটে নারী-পুরুষের সমান স্বার্থ রক্ষাকারী আইন প্রবর্তন করতে হবে।

খ. শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ ও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ : নারীকে নিজ নিজ অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্যে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নারীকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী সতামতের প্রাধান্য দিতে হবে।

গ. প্রচার মাধ্যমগুলোতে নারীকে সম্মানজনকভাবে উপস্থাপন : প্রচার মাধ্যমে নারীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা চলবে না। যথাযোগ্য সম্মানের সাথে এবং রুচিসম্মতভাবেই গণমাধ্যমগুলোতে আসবে নারী চরিত্র।

ঘ. নারীর কাজের স্বীকৃতি : নারীকে তার কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। সন্তান লালন ও গৃহস্থালি কাজকে কিছুতেই ছোট করে দেখা চলবে না। বরং পুরুষকেও এসব কাজে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে যাতে নারী-পুরুষ উভয়ই ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজে অংশ নিতে পারে।

ঙ. রক্ষণশীল মানসিকতার পরিবর্তন : ধর্মকে পুঁজি করে রক্ষণশীলদের যে ফতোয়াবাজি তা বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

উপসংহার : এঙ্গোলস তাঁর ‘অরিজিন অব দ্যা ফ্যামিলি’ গ্রন্থে বলেছেন, “নারী মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারীরা সমাজের প্রতিটি কমংকাণ্ডে সমগুরুত্ব নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।” আর নারীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে, নারীর উন্নয়নের জন্যে, এক একথায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে দরকার সব ধরনের প্রতিবন্ধকতার অবসান। প্রয়োজন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। নারী স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মতামত প্রদানে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে নারীর ক্ষমতায়নে আর কোনো অপশক্তিই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

6 comments:


Show Comments