বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সমাজ

↬ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সমাজের ভূমিকা

↬ জাতি গঠনে নারী সমাজের ভূমিকা


ভূমিকা : আধুনিককালে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃত। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে নারী সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ও ফলপ্রসূ অবদান রাখছে। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর সুপ্রাচীন ভূমিকা : অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর ঐতিহাসিক ভূমিকা আমাদের স্বরণে রাখতে হবে। সুপ্রাচীনকাল থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, নারীই প্রথম কৃষিকাজের সূচনা করে। পুরুষরা যখন শিকারে যেত তখন নারী বাড়ির আশেপাশে ফলের বীজ ছড়িয়ে দিত, চারা লালন করত, এভাবেই মানব সমাজে কৃষির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। কুটির শিল্পের বিকাশেও নারীর ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। ঘরে বসে অবসরে বাঁশ, বেত ইত্যাদি দিয়ে নানা রকম হাতের কাজ তারাই প্রথম শুরু করে। এভাবেই কুটির শিল্পের সূচনা ও প্রসার ঘটে। পারিবারিক কাজে, সমাজের মঙ্গলে ও দেশের উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা ও অবদান ইতিহাস-স্বীকৃত।

নারীর শ্রমের মূল্যায়নে সীমাবদ্ধতা : দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশে নারী সমাজ প্রথাবদ্ধ সংস্কার ও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। তারা প্রাতিষ্ঠানিক ও নাগরিক নানা সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত। সন্তান ধারণ, সন্তান প্রতিপালন, গৃহকর্ম সম্পাদনসহ নানা কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে দৈনিক গড়ে তিন ঘণ্টা বেশি পরিশ্রম করলেও তার উপযুক্ত স্বীকৃতি মেলে নি। গৃহস্থালী এবং পারিবারিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কাজে নিয়োজিত নারীশ্রম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলে গণ্য হলেও জাতীয় আয়ের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায় না।

জাতীয় অর্থনীতিতে নারীশ্রমের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব : বিগত প্রায় অর্ধশতক ধরে সংগঠিত নারী মুক্তি আন্দোলন বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি, নারীর ক্ষমতায়নে নতুন ধ্যান-ধারণার বিস্তার ইত্যাদি অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে বর্তমানে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের পথ অধিকতর প্রশস্ত হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এদেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাজে ক্রমবর্ধমান অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমশক্তি : বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ প্রায় তিন কোটি। এর মধ্যে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার কাজে দশ হাজারের বেশি নারী কাজ করে। ৮০ শতাংশ নারী মৎস্য, বনায়নসহ কৃষি খাতে নিয়োজিত। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং পোশাক শিল্পে নিয়োজিত ৮০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এই নারী শ্রমিকরা পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছ। শহরে শিক্ষিত নারীদের বড় অংশ নিয়োজিত আছেন শিক্ষকতা ও স্বাস্থ্য কার্যক্রমে, অভ্যর্থনা ডেস্কে ও বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ও এনজিওতে, প্রশাসনে ও ব্যবস্থাপনায়।

উদ্যোক্তা হিসেবে নারী : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ কিছু নারী উদ্যোক্তা এগিয়ে এসেছেন। এঁদের ক্রমপ্রসারমান উদ্যোগ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা বেশি সক্রিয় শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উপার্জনশীল অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে কাপড় সেলাই, নকশা, বাটিক, বুটিক, এমব্রয়ডারি ও খাদ্য সমগ্রী বিক্রয়। বিপণিকেন্দ্রগুলোতেও অনেক নারী উদ্যোক্তা নিয়োজিত আছেন। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পের মতো সংগঠিত শিল্প স্থাপনে কিছু কিছু নারী উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে এগিয়ে এসেছেন।

উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের পথে অন্তরায় : অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা লক্ষ করা যায়। যেমন-
১। প্রায় ক্ষেত্রেই নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার;
২। চাকরি ও শ্রম বাজারে প্রবেশাধিকারের অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়;
৩। নিয়োগের সুযোগ থাকলেও নানা অজুহাতে নারীকে নিয়োগ-বঞ্চিত করা হয়;
৪। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য নারীর ক্ষমতায়ন জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও নারী সমাজ অনেক পিছিয়ে আছে।

নারী উদ্যোক্তারাও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। যেমন:
১। উপযুক্ত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার অভাব এবং চলাফেরার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নারীরা নিজেদের ক্ষমতা ও সুযোগের যথাযথ সদ্ব্যবহার করতে পারে না;
২। ব্যবসায়িক উদ্যোগে ঝুঁকি নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা নানা সমস্যার সম্মুখীন;
৩। পুরুষ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষে কঠিন;

এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী সমাজ ধীর ধীর অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন। বাণিজ্যিক ও সেবা খাতে নারীর উদ্যোগ ক্রমেই বাড়ছে। শহরাঞ্চলে নারীদের মালিকানা ও পরিচালনায় বাটিক, রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা ইত্যাদি ক্রমেই গড়ে উঠছে। বহু নারী মনোহারী দোকান, স্বাস্থ্য ক্লিকিন, ভ্রমণ এজেন্সি ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন।

উপসংহার : নারীরা যাতে অধিক হারে চাকরি ও শ্রমে নিয়োজিত হতে এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক উদ্যোগে সক্রিয় হতে পারে সে জন্যে সরকার ইতোমধ্যে নানা বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ সব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্যে শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র স্থাপন, সরকারি চাকরিতে নারী কোটা সংরক্ষণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শহরে ও গ্রামে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষায় নারীর সুযোগ সম্প্রসারণ ইত্যাদি। আশা করা যায়, সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ হলে অর্নৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারী সমাজ আরো ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

1 comment:


Show Comments