মার্চের দিনগুলি

তথ্যকোষ : পহেলা বৈশাখ

নদীর আছে গন্তব্য, মিশে যায় মোহনায়। ম্রিয়মাণ ছায়া পেছনে ফেলে রৌদ্রজ্জ্বল দিনও বাড়ি যায়।অস্তমিত হয় শেষ বিকেলের সূর্য। সময় এমনি হয়। সেই সময়ের পথ ধরে পুরনো হয়ে যায়, এক একটি গল্পের পান্ডুলিপি। দিনবদলের পালায় যাত্রা শুরু হয় নতুনের। কবির ভাষায়---

বৎসেরর আবর্জনা দূর হয়ে যাক
যাক পুরনো স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মেলাক.....
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা---

এমন কল্যাণময় বার্তাকে বুকে ধারণ করেই পালন করা হয় পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি সকল বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। নববর্ষ বাঙালিদের সর্বজনীন লোকউৎসব হিসেবে পরিচিত।

পহেলা বৈশাখ

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এ উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এ দিনটি ধার্য করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৫এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। এছাড়াও দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে  ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে বরণ করে নেয়।

শোভাযাত্রা,  মেলা, পান্তা ইলিশ খাওয়া,  হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপিত বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হলো "শুভনববর্ষ"। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এ উৎসব শোভাযাত্রাকে 'মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে ঘোষণা করে।

সৌর পঞ্জিকা অনুসারে নববর্ষ

সৌর পঞ্জিকার শুরু গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল,  উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত পতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।

বাংলা সনের জন্ম ও নববর্ষের সূচনা

বাঙালি জাতির জন্ম এ ক্রমবিকাশের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সভ্যতা,  সংস্কৃতি,  লোকাচার,  উৎসব, পার্বন সবই কৃষিকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বাংলা সনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতো। তখন অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে বাঙালিরা নববর্ষের উৎসবে মেতে উঠত। রাজকার্য সম্পাদানে হিজরি সাল নিয়ে কিঞ্চিৎ অসুবিধার সৃষ্টি হলে সম্রাট আকবর বঙ্গদেশ বা সুবে বাঙ্গালার জন্য বাংলা সন সৃষ্টির নির্দেশ দেন। সম্রাট রাজসভার নবরত্নের বাইরে দশম রত্ন আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে বাংলা সন প্রবর্তনের দায়িত্ব দেন। প্রচলিত হিজরি চান্দ্র সন এবং বাংলা সৌর সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্রাটের রাজজ্যােতিষী পন্ডিত আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংরা সন গনণা শুরু হয়। তবে এ গনণা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ  নামে পরিচিতি লাভ করে। বস্তুত খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রনয়নের লক্ষ্যে সম্রাট বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন।

এ উপলক্ষ্যে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

বর্ষবরণ

বাঙালির বর্ষবরণে স্বতঃস্ফূর্ত অংশ কেবল গ্রামে -গঞ্জে নয়, শহরে, বন্দরে,  রাজধানীতে বাংলা সন,  পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষকে বরণ করতে বাঙালি সাংস্কৃতিক উৎসবে মেতে ওঠে। চারুকলা ইনস্টিটিউট এর শিক্ষার্থীর লোকজ চিত্রকলা এঁকে রোকজ  সাজে হাতি, ঘোড়ার মুখোশ তৈরি করে বৈশাখী র্যালীতে অংশ নিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে। ভোর থেকে রমনার বটমূলে রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে ছায়ানট। পহেলা বৈশাখের সূর্যতপ্ত সকালে রমনার আশেপাশে বাতাস ভেদ করে বাঙালির মর্মস্পর্শ করে কবিগুরুর আহ্বান----

এসো হে বৈশাখ,  এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে-মুমূর্ষুেরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আর্বজনা দূর হয়ে যাক।।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক: বাংলা নববর্ষ

বাংলা নববর্ষ (পহেলা বৈশাখ) বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান উপাদান এবং অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব। সম্প্রীতির মিলিত স্রোত বাংলা সনটিকে অসাম্প্রদায়িক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।  বস্তুত শিশু যুবা - বৃদ্ধাসহ সব বয়সের,  সব শ্রেণি ও ধর্মের মানুষই এ দিনটি উদযাপন করে। আনন্দঘন পরিবেশে পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। পহেলা বৈশাখ মানে জীর্ণ - শীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুনের আহ্বানে সামনে এগিয়ে যাওয়া, বাঙালির চিরায়িত উৎসবে মেতে ওঠা, প্রাণ খুলে আনন্দে ভেসে যাওয়া। আর তাই অতীতের ভুল ত্রুটি ও ব্যার্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনায় উদযাপিত হয় প্রাণের স্পন্দন বাংলা নববর্ষ "পহেলা বৈশাখ"।

বাংলার গ্রামীণ ও নগর জীবনে বাংলা নববর্ষ

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। ফলে দিনটি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়ি ঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং সকালে স্নানাদি সেরে পূতপবিত্র হয়। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া ও ভালো পোশাক পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক মনে করে। দিনটিতে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানারকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চালে এখন বহুল প্রচলিত। বাংলা নববর্ষ নগর মহানগরগুলোতে নতুন প্রাণের বারতা নিয়ে আসে। নগরীর প্রায় প্রতিটি ঘরে পান্তা ইলিশ ও বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। গ্রামের চেয়েও নগরের লোকেরা নববর্ষকে জমকালোভাবে উদযাপন করে। মহিলারা প্রায় সবাই বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে আর পুরুষেরা পরে পাঞ্জাবি-পাজামা। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা নানা রকম কর্মসূচি গ্রহণ করে। সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে নববর্ষে হালখাতার হিড়িক পড়ে নগর ও গ্রামগঞ্জে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাঙালির বর্ষবরণ আয়োজনে মিশে আছে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যােগে  প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখে এ মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এ শোভাযাত্রায় চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশগ্রহন করে। এ শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরণের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। আরো থাকে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ, রং বেরংয়ের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সালে প্রথম শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া ও হাতি।

প্রাণের নববর্ষ হোক চেতনার ধারক

নববর্ষ আমাদের জীবনে কেবল একটি উৎসব নয় বরং একদিকে যেমন নির্মল আনন্দের খোরাক, অন্যদিকে তেমনি একটি চেতনার ধারক। এ দিনটি আমাদের দরিদ্র,  নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগায়। তাই বিশ্বায়নের বিভ্রান্তি থেকে নতুন প্রজন্মকে হতে হবে শেকড়সন্ধানী। আঁকড়ে ধরতে হবে বাঙালীর জাতীয় সংস্কৃতিকে। পরিহার করতে হবে পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতি। তাহলেই সার্থক হবে বাঙালীর 'নববর্ষ' উদযিপন। নতুনের আহ্বানে কবিকন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমরা বলি------

যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপনে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post