My All Garbage

Shuchi Potro
সাধারণ জ্ঞান বাংলা ব্যাকরণ বাংলা রচনা সমগ্র ভাবসম্প্রসারণ তালিকা অনুচ্ছেদ চিঠি-পত্র ও দরখাস্ত প্রতিবেদন প্রণয়ন অভিজ্ঞতা বর্ণনা সারাংশ সারমর্ম খুদে গল্প ভাষণ লিখন দিনলিপি সংলাপ অ্যাসাইনমেন্ট-২০২১ English Grammar Composition / Essay Paragraph Letter, Application & Email Dialogue List Completing Story Report Writing Graphs & Charts পুঞ্জ সংগ্রহ বই পোকা হ য ব র ল তথ্যকোষ পাঠ্যপুস্তক CV & Job Application My Study Note আমার কলম সাফল্যের পথে
About Contact Service Privacy Terms Disclaimer Earn Money


মুক্তিযোদ্ধা দিবস - বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস - বিজয় দিবস
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সহায়ক ওয়েব সাইট

রচনা : ফলের রাজা আম

ফলের রাজা আম। আম খেতে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশ্বের সব দেশে আম নেই, কিন্তু একবার যে এই আম খেয়েছে তার পক্ষে একে ভুলা সম্ভব নয়।

কত রকম আমই না আমরা খেয়ে থাকি। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হল সত্যিকার অর্থে “ফলের রাজপুত্তুর”। রাজশাহী, নবাবগঞ্জের আমের মধ্যে সেরা হল ল্যাংড়া, ফজলি, রসাপাতি (গোপালভোগ), হিমসাগর, লণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, ফজলি। আছে রানীপসন্দ, বেগম পসন্দ, বাদশাপসন্দ।

আবার উন্নত জাতের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত আম হল বারি-১, বারি-২, বারি-৩ এবং বারি-৪। এখন নতুন যোগ হয়েছে আম্রপালি ও মলি−কা। দিনাজপুরের সূর্যপুরীও বিখ্যাত। ভারতের সেরা আম হল মুম্বাইয়ের পশ্চিমাঞ্চলের আফুজ বা আলফাঁসো ও পাইরি, দক্ষিণাঞ্চলের নীলম ও বাঙ্গানপলী, অন্ধ্রে মালগোরা ও সুবর্ণরেখা, যুক্তপ্রদেশ ও বিহারে চৌশা, দশেরী ও ল্যাংড়া, পশ্চিমবঙ্গে গুলাবখাস ও বোম্বাই। এছাড়া ফজলি (বা মালদহের আম) তো আছেই। 

বাংলাদেশ ও ভারতের নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করে একটি ছোটখাট তালিকা প্রস্তুত করা যায়। এর মধ্যে সব আমাদের দেশে হয়তো নেই। তবে নামের বেলায় বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে সীমা নেই। যেমন বাদশাহী, আলমশাহী, বৃন্দাবনী, দিলশাদ, কোহিনূর, কোহেতুর, ওয়াবজান, হায়াত, বড় শাহী, ছোট শাহী। দিলখোশ, ফেরদৌস পসন্দ, সুলতান পসন্দ, বোম্বাই ও গোলাবখাস প্রভৃতি আম নবাবগঞ্জ, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ এলাকায় হয়। নবাবগঞ্জের পুবে রাজশাহীতেও এর অনুকরণে নাম আছে। রাজশাহী ও নবাবগঞ্জে তাই আছে রসাপাতি, বোম্বাই রসাপাতি, সর রসাপাতি, ছোট রসাপাতি, কোহেতুর, জাফরান, মোহনভোগ প্রভৃতি। এর অধিকাংশই ভালো আম।

প্রথমে আসে বোশেখি আম। তারপর হিমসাগর, রসাপাতি, ল্যাংড়া, লণভোগ, আষাঢ়ী, শ্রাবণী, ভাদুরিয়া, লম্বা এবং আশ্বিনী প্রভৃতি ক্রমান্বয়ে। এদের নামও চমৎকার! যেমন বিসমনী, ভরত, বিড়া, ভোজ, বৃন্দাবনী, বাবুই ঝাঁকি, বাতাস, চম্পা, চকচকি, চাপাতি, দুধসর, দ্বারিকা, দুধকুমার, দুধভোগ, আক্কেল গরম, ডায়মন্ড, নীলম, দোকশলা, বারোমাসি, কাঁচামিঠে, মিছরীভোগ, মিঠুরা তোতাপুরী, কোহেতুর, কপটভাঙ্গা, হাতিঝুল ইত্যাদি। এছাড়া আরও আছে- কোলোপাহাড়, ফারীয়া, লতা, তোতা ফজলি, চিনি ফজলি, মালদহ, গৌরজিৎ, মোহনভোগ, কিষাণভোগ, কালিভোগ, শিকাভোগ, সীতাভোগ, মিছরিভোগ, চিনিভোগ। আরও কত ভোগ যে আছে! আবার ল্যাংড়ার মধ্যেও আছে নানা নাম। এই যেমন ল্যাংড়া, হাজি ল্যাংড়া, কাশীর ল্যাংড়া ইত্যাদি। আরও নানা নামের ল্যাংড়া আছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানে গিয়েও সব নাম লেখা সম্ভব নয়। একটা কথা বলে রাখি, যত গাছপাকাই হোক না, ওই গাছপাকা আম আরও তিন দিন রেখে খেলে তবেই আমের আসল ও মধুর স্বাদ পাওয়া যাবে। তখন আম হবে সত্যিকার অর্থে অমৃত ফল। প্রাচীন কালে গ্রীকরা একে বলেছেন ‘থিওব্লোমা’, অর্থাৎ দেবভোগ্যও অমৃত ফল।

ফজলি নামটি ব্রিটিশ যুগে মালদহের কালেক্টর র‌্যাভেনশ-এর দেওয়া। ফজলি নামে গ্রামের এক গরিব মুসলমান নারী তাঁকে নিজের গাছের আমটি খাইয়ে চমৎকৃত ও তৃপ্ত করেছিলেন। তাই তিনি ওই আমের নাম ফজলি দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। এছাড়া রাজা-বাদশা, উজির-নাজির, নবাব-বেগম এমনকি সেই কালের শত্রু ইংরেজদের নামেও আম আছে। সারাবিশ্বে এক আম ছাড়া কোনো ফলের এত নাম নেই, দুশো ভাগের এক ভাগও নেই। বাংলাদেশ ভারতে কেউ বলেন দু’ হাজার নাম আছে, কেউ বলেন পাঁচ শো রকম আমের নাম পাওয়া যায়। পলাশির আমবাগানে অল্পসংখ্যক সৈন্যের হাতে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্ত গেলেও তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল কিছু এ দেশীয়। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রধান সিপাহসালার ছিল মীর জাফর। সে তার অনুগত সব সৈন্য নিয়ে ইংরেজের পে যোগ দিয়ে নবাবের পে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে।

ইংরেজরা পলাশির যুদ্ধে জিতে গেলে এই আমাবাগানের উলে−খ্যযোগ্য উন্নয়নে অবদান রাখেন। তারা এদেশের আমে এমন মজে গেছেন যে তারাও আম নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামিয়েছেন। ঘাম ফেলেছেন। আর কী নিয়েই না মাথা ঘামাননি! নদী, পাখি, ভাষা, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব সবকিছু নিয়ে গবেষণা করেছেন। এবং তার ফল রেখে গেছেন। উইলিয়াম কেরি ও মিসেস হেনা ক্যাথারিনা মুলান বাংলা ভাষা চর্চা ও রচনায় অমর হয়ে আছেন। ডেভিস উদ্ভাবিত সেকালের একটি বিখ্যাত বর্ণসংকর আমকে বলা হত ‘ডেভিস ব্রিড’। আর আজকের যে সব বিখ্যাত আম আমরা খাই তার সবগুলোই অনেক গবেষণার ফলে পাওয়া। বুনো আমকে শত শত বছর কলম, জোড়কলম, বর্ণসংকর করে আজকের সুমিষ্ট আম পেয়েছি। এজন্য আজকের আমকে বলা হয় ‘কালটিরভর’ বা ‘আবাদিত’ আম। আমাদের দেশি রাজা-রানী, নবাব-বেগমদের পাশাপাশি আমের তালিকায় আছে ইংরেজ ‘বুথ নাট’, ‘হলওয়েল’, ‘হেস্টিংস’, ‘পিটার হরস’ প্রমুখদের নাম। আবার আশু মুখার্জি, বংশী ঘোষের নামেও আম আছে। কিছু কাল আগেও কোলকাতার বাজারে চন্দননগর থেকে দুটি উৎকৃষ্ট আম আসত। তাদের নাম চ্যাটার্জী ও ব্যানার্জি।

এমন আম আছে যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও মিষ্টি। আবার এমন টক আম আছে যা ভীষণ ভীষণ টক। বাংলা ভাষার বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ড. সুকুমার সেন সেই যম-টক আম মুখে দিলে কেমন লাগে তা বলেছেন এভাবেক প্রথমে ‘তুড়ুক তোবা, দোসরা বাঁদর বোবা, তেসরা কাক দেশান্তরী’। অর্থাৎ এই যম টক আম খেয়ে বানর বোবা ও কাক দেশ ছেড়ে চলে যায়। এই আম হল বৈজ্ঞানিক নামে- সিলভাটিকা রকসবা। আর খাওয়ার উপযুক্ত আমের বৈজ্ঞানিক নাম গধহমরভবৎধ রহফরপধ।

ইংরেজদের আগে পর্তুগিজ আলম থেকে এদেশে শত শত বছর ধরে পশ্চিমারা আমাদের আমলের আমের প্রশংসা করে বিস্তর লেখালেখি করে গেছেন। ওই যে সেই বাদশা অসময়ে আম খেতে চাইলে নিরুপায় হয়ে উজির এক কাণ্ড করেন। কারণ বাদশার আম খাওয়ার রোগ না হয় সারবে না। বাদশা অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে রাজ্যের সর্বনাশ। তাই উজির উপায় না দেখে, নিজের দাড়িতে তেঁতুলের একটু টক ও চিনি মিশিয়ে বাদশাকে চুষতে দেন। ব্যস, বাদশাও দাড়িকে মনে করলেন আমের আঁশ, আর টক মিষ্টি থেকে পেয়ে গেলেন স্বাদ। বাদশার রোগ সেরে গেল, রাজ্যও বাঁচল।

আর ইংরেজ সাহেব এই পাকা হড়হড়ে আম খেতে গিয়ে হাত জামা কাপড় নষ্ট করে ফেললেন। তাই তিনি বললেন, আম খাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হল, আমটা নিয়ে বাথটবে চলে যাওয়া সেখানে আমটা খেয়ে একেবারে স্নান গোসল শেষ করে পরিষ্কার হয়ে চলে আসাই সেরা উপায়। কিন্তু তারাই আবার আমকে বললেন, ‘প্রিন অব ফ্রুট’ বা ‘ফলের রাজপুত্তুর’। আর অনেকেই এদেশীয়দের সঙ্গে মনে প্রাণে সায় দিয়ে বলেছেন, আম ফলের রাজা।

No comments