আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

রচনা : সাহিত্য ও সমাজ

↬ সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক

↬ সাহিত্য সমাজের দর্পণ


ভূমিকা : মানুষ তার মনের ভাব অপরের কাছে প্রকাশ করার জন্য সাহিত্যের আশ্রয় নেয়। ‘অপর’ বলতে এখানে মূলত বােঝানাে হয়েছে সমাজের মানুষদের, যারা আমাদের আশেপাশে বসবাস করছে। আবার সাহিত্যিক যেহেতু সমাজেরই একজন, তাই সাহিত্যে তিনি তার ব্যক্তিমনের নিভতে সঞ্চিত আশা-আকাঙ্ক্ষা, কল্পনাকে পরিস্ফুট করার পাশাপাশি প্রকাশ করেন দেশ-কাল-সমাজের একটি বিশেষ রূপ। সমাজ ছাড়া সাহিত্যিক সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন না। কারণ তাঁর রচনার উপকরণ তিনি সমাজ থেকেই সংগ্রহ করেন। তাই সমাজ ছাড়া সাহিত্যিকের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। আবার সাহিত্যিক ছাড়াও আধুনিক সমাজের কথা ভাবা যায় না। এককথায় সাহিত্য ও সমাজ পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক : সাহিত্য সমাজের দর্পণস্বরুপ। সমাজজীবনের নানা বিষয় সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়। সমাজকে কেন্দ্র করেই সভ্যতা বিকশিত হয়। লেখক যেহেতু সামাজিক জীব, তাই তার রচনায় সমাজের প্রতিফলন ঘটে। সাহিত্য সৃষ্টিতে সাহিত্যিক কল্পনার আশ্রয় নেন। তবে এই কল্পনার সাথে বস্তুগত বিষয়ও থাকে। আর এ বস্তুস্পর্শ লাভ করা যায় জীবন তথা সমাজ থেকে। কাজেই এ কথা নিশ্চিত যে, সাহিত্যের সাথে সমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং সাহিত্য রচিত হয় সমাজবদ্ধ মানুষের জন্যই। মানবজীবনের একটি অংশ হলাে আনন্দ। আর সাহিত্যপাঠের মাধ্যমে মানুষ আনন্দ লাভ করে। তাই আনন্দকে বাদ দিয়ে সাহিত্য সার্থক হয় না। কাজেই জীবনের সজো সাহিত্যের সংযােগ যেমন বস্তুসত্তার দিক দিয়ে তেমনি আনন্দের দিক থেকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত আলােচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সাহিত্য দুই ধরনের একটি ভাবপ্রধান, অন্যটি বস্তুপ্রধান। দুই ধরনের সাহিত্যেই রয়েছে জীবনের বিশ্লেষণ অর্থাৎ সমাজজীবনের চিত্র। যে লেখক যত সূক্ষ্মভাবে জীবনকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন তাঁর সাহিত্যে সমাজ তত জীবন্ত হয়ে ওঠে। সাহিত্য হলাে সমাজনির্ভর শিল্প। তাই সাহিত্যে সমাজের কথা, সমাজবদ্ধ মানুষের কথা থাকে। সাহিত্য রচিত হয় মানুষের জন্য, সাহিত্যের জন্য মানুষ সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু তাই বলে সাহিত্যের মুখ্য প্রসঙ্গ সমাজ নয়। সমাজ এবং সামাজিক সমস্যা সাহিত্যের আংশিক প্রসঙ্গ হিসেবে আসতে পারে, যদি তা সার্বিক অর্থে মুখ্য হয়ে দাড়ায় তবে তা শ্রেষ্ঠ বা সার্থক সাহিত্য হিসেবে পরিগণিত হবে না। তা হবে সামাজিক সমস্যার। তাই বলে সাহিত্যের সাথে সমাজনীতির বিরােধ আছে এমন কথা বলা যাবে না। সামাজিক সমস্যা অনেক কাল ধরেই সাহিত্যে ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

বিশ্বসাহিত্যে সমাজ : আনুমানিক দু’হাজার বছর আগে মিসরে লিখিত বিভিন্ন কাহিনিতে সে সময়ের সমাজ-বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রাচীন গ্রিক ও রােমান সাহিত্যেও সমাজচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের রচনায় সমাজের ছবি বারবার ধরা দিয়েছে, প্রকাশ পেয়েছে সমাজ সম্পর্কে তাদের মনােভঙ্গি। দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘ম্যাক্সিম গাের্কির মা' প্রভৃতি সাহিত্যে রাশিয়ার সমাজবাস্তবতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেড়িগুলােতে সমকালীন ইংল্যান্ডের জনমানুষের ছবি ফুটে উঠেছে। সংস্কৃত ভাষার কবি কালিদাসের রচনাবলিতে আমরা গুপ্তযুগের ভারতবর্ষের একটি আনুপূর্বিক জীবনচিত্রের সন্ধান পাই। চার্লস ডিকেন্স, তলস্তয়, ফ্লবেয়ারের কথাসাহিত্যে সমাজের বাস্তবচিত্র যথাযথভাবে রূপায়িত হয়েছে। 

বাংলার সাহিত্য ও সমাজ  : পৃথিবীর সব দেশের সাহিত্যের মতােই বাংলা সাহিত্যেও সমাজজীবনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের সূচনাপর্ব থেকেই কবি-সাহিত্যিকদের সমাজচেতনা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নিচে বাংলা সাহিত্যে সমাজচিত্র কীভাবে রূপায়িত হয়েছে সে সম্পর্কে আলােচনা করা হলাে

১. প্রাচীন সাহিত্য ও সমাজ : বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হলাে চর্যাপদ। এগুলাে বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের সাধন সংগীত। তারা নিগূঢ় তত্ত্বকথা বলতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত রূপক, প্রতীক ও অলংকারের। তাই ধর্মকে ছাপিয়ে মানুষ ও সমাজবাস্তবতাই এখানে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। সেই হাজার বছর আগে বাঙালি সমাজে শ্বশুর - শাশুড়ি পৱিবৃত যৌথ সমাজ ছিল। সেকালের মানুষরা নৌকা তৈরি করত, শিকার করতে যেত বনাঞলে এবং নারীরা ছিল আজকের মতােই প্রসাধনপ্রিয়। দারিদ্র্যপীড়িত সমাজজীবনের চিত্র রয়েছে চর্যাপদে। একটি চর্যায় স্পষ্টই বলা হয়েছে 

টালত মাের ঘর নাহি পড়বেসী
 হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।

অর্থাৎ  টিলায় আমার ঘর, প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই অথচ নিত্য অতিথি আসে। বর্ণাশ্রমপীড়িত শ্রেণিভিত্তিক সমাজের চিত্রও চর্যাপদে খুঁজে পাওয়া যায়। 

মধ্যযুগের সাহিত্য ও সমাজ : বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের রচনা ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কৃষ্ণ ও রাধার হৃদয়-বেদনার কথামালা হয়েও তা যেন সমাজেরই আলেখ্য। এ কাব্যে কৃষ্ণ একজন অশিক্ষিত যুবক, দেবতা নন। অন্যদিকে রাধাও দেবী নন। তিনি মানবিক বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ রক্তমাংসের মানুষ। তার সমাজের লাজলজ্জার ভয় আছে। এখানে আমরা অসম বিবাহ ও তার বেদনাময় পরিণতি, হাঁচি টিকটিকি প্রভৃতি কুসংস্কার, নারীদের বিচিত্র সাজসজ্জা, নারী-পুরুষের প্রেম প্রভৃতির চিত্র পাই। মধ্যযুগের আরেকটি উল্লেখযােগ্য নিদর্শন হলাে মঙ্গলকাব্য। মঙ্গলকাব্যে যেসব দেব-দেবী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন তারা সমাজের অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর শ্রেণির পূজা পেয়েছেন প্রথমে, পরে সমাজের তথাকথিত উচ্চবিত্তে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। মঙ্গলকাব্যে তৎকালীন সমাজজীবনের দুঃখ, দারিদ্র্য, আনন্দ-বেদনা প্রভৃতির চিত্র রূপায়িত হয়েছে।

উনিশ শতকের সাহিত্য ও সমাজ : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূচনা ঘটে উনিশ শতকের প্রারম্ভ থেকেই। তখনকার মানুষের সামাজিক জীবনচর্চার পরিচয় পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ বা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ ও মীর মশাররফ হােসেনের ‘জমীদার দর্পণ’ -এর মতাে নাটকে। উনিশ শতকের বিশিষ্ট সৃষ্টি হলাে গীতিকবিতা। ব্যক্তি হৃদয়ের উপলব্দি এ ধরনের সাহিত্য সৃষ্টির মূল প্রেরণা। কিন্তু সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তি-উপলব্বির প্রকাশ ঘটানাে সম্ভব ছিল না। আধুনিকতার সূচনার সঙ্গে সাহিত্যেও অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সমাজজীবন আশ্রিত ব্যক্তিঅভিজ্ঞতারই এক নান্দনিক প্রকাশ হলাে গীতিকবিতা। আঠারো শতকের শেষার্ধ এবং উনিশ শতকের প্রথমার্ধে যে কবিগান ও শায়েরের সৃষ্টি হয়েছিল তা তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা অব্যবস্থারই ফল।

বাংলা কথাসাহিত্য ও সমাজ : বাংলা কথাসাহিত্যে বাবু'র সঙ্গে বাবু'র ধারক ক্ষয়িষ্ণু সমাজের চিত্র পাওয়া যায় ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায়। তার ‘নব বাবু বিলাস’ (১৮২৫) এ ধরনের সাহিত্যের উল্লেখযােগ্য দৃষ্টান্ত। ক্যাথেরিন মুলেন্সের লেখা ফুলমণি ও করুণার বিবরণে (১৮৫২) খ্রিস্ট ধর্মান্তরিত বাঙালি পরিবারে ধর্মজীবনের সমস্যাকে কেন্দ্র করে এক পূর্ণতর সমাজচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এরই কিছু সময় পর লেখা তারকনাথ গঙ্গােপাধ্যায়ের ‘স্বর্ণলতা’য় (১৮৭৪) বাংলার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের চিত্র রূপায়িত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনেক উপন্যাসে সমাজজীবন ও সমাজব্যবস্থার রূপ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গােরা’ (১৯১০) উপন্যাসে বৃহত্তর সমাজ কাঠামাের পরিচয় আমরা পাই। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে মূলত সমাজের নির্মমতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে এবং এ সমাজের প্রতি ঔপন্যাসিকের সহানুভূতি লক্ষ করা যায়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে রাঢ় বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচয় পাই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য ও জীবনচেতনার এক অনুপম কথামালা। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছােটগল্পে সমাজের মধ্যবিত্ত, কেরানি শ্রেণি ও নিম্নবিত্ত মানুষের পরিচয় পাই। 

বাংলা নাটকে সমাজ : সমাজজীবন সাহিত্যকে কীভাবে প্রভাবিত করে তার প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে বাংলা নাটকে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ (১৮৬০) প্রহসনে তৎকালীন বাবু সমাজের তথা ইংরেজি শিক্ষিত নব্য যুবকদের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। তার ‘বুড়াে শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনে তিনি তুলে ধরেছেন ধনী, চরিত্রহীন জমিদারের চরিত্র। দীনবন্ধু মিত্র তাঁর ‘সধবার একাদশী’ (১৮৬৬) -তে অধঃপতিত ইয়ং বেঙ্গল সমাজের প্রকৃত চিত্র অঙ্কন করেছেন। ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০) নাটকে তিনি নীলকরদের অত্যাচার এবং প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে গিরিশচন্দ্র ঘােষের ‘প্রফুল্ল’ (১৮৮৯) নাটকে সামাজিক সমস্যার সংবেদনশীল চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।

বাংলা কবিতা ও সমাজ : বাংলা কাব্যসাহিত্যেও সমাজজীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে। জসীমউদদীনের কবিতায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সমাজজীবন প্রাধান্য লাভ করেছে। অত্যন্ত সফলভাবে তিনি গ্রাম্যজীবন ও গ্রামবাংলার পরিবেশকে কাব্য রচনার উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, ‘সােজন বাদিয়ার ঘাট’ প্রভৃতি কাব্যে বাংলার মানুষ ও প্রকৃতি বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর কবিতায় প্রথম ঘােষণা করেন- “আমি কবি যত কামারের আর কুমারের, মুটে মজুরের।” শ্রমজীবী সমাজকে তিনি তাঁর বিভিন্ন কবিতায় তুলে ধরেছেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার প্রধান লক্ষণ হলাে যুগচেতনা ও সমাজ-মনস্কতা। তার ‘পদাতিক’, ‘ছাড়পত্র’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ এরই স্বাক্ষর বহন করে। কাজী নজরুল ইসলাম কাব্যের মাধ্যমে সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যেও সমাজচেতনার বিষয়টি লক্ষণীয়। 

উপসংহার : সাহিত্যের সঙ্গে সমাজের সংযােগ একালে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ। সমাজের নানা সংঘাত যত বাড়বে, সাহিত্যও তত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে। কেননা সাহিত্যের বিষয় মানুষের জীবন ও মন। সেই জীবন ও মনের ওপর ভিত্তি করেই সাহিত্যসৌধ নির্মিত হয়। সমাজজীবনে নানা সংকট বিদ্যমান। সাহিত্য সমাজের এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। তাই একজন সাহিত্যিককে সমাজের কল্যাণের দিকে লক্ষ রাখা উচিত এবং সাহিত্যে তার প্রকাশ ঘটানাে সাহিত্যিকের কর্তব্য। কেননা সমাজমনস্ক একজন সাহিত্যিক সমাজের বিবেকরূপে গণ্য হতে পারেন।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post