বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

অনুচ্ছেদ : বর্ষণমুখর সন্ধ্যা

বর্ষণমুখর সন্ধ্যা


দৈনন্দিন জীবনের গতানুগতিকতার মধ্যে কখনো এমন মুহূর্ত আসে যা কোনোদিন ভোলা যায় না। আমার স্মৃতির জগতে একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা তেমনই অক্ষয় হয়ে আছে। একটি বর্ষণমুখর দিন মুখর হয়ে থাকে চারপাশের দৃশ্যাবলিতে। কিন্তু একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্যা মুখর হয়ে থাকে শব্দের ছন্দে, দৃশ্যাবলির অনুভবে আর কল্পনার বিস্তারে। আলো-আঁধারি সন্ধ্যা রহস্যময়তার অঞ্জন এঁকে দেয় চোখে, আর বর্ষণমুখর সন্ধ্যা অন্ধকারের রহস্যে বিজলির চমকে এঁকে দেয় রূপালি জোছনার কোমল আলপনা। সেই আলপনা প্রতিবিম্বিত হয় হৃদয়পটে। বৃষ্টির ঝর ঝর ছন্দ সেখানে সুরের মূর্ছনায় মূর্ত হয়ে ওঠে আপন বিভাসে। বিলাসী মন মুক্ত বিহঙ্গের মতো পাখনা মেলে উড়ে চলে এক স্বপ্নময় কল্পলোকে। গ্রাম্যবধূ কাঁখে কলসি নিয়ে টানা টানা অস্ফুট চোখ মেলে সিক্ত বসনে আলপথ বেয়ে ঘরে ফেরে। কী এক অজানা রহস্য ছড়ানো তার মিষ্টি হাসিতে! সারি সারি গাছ বৃষ্টিধারায় স্নাত হয়ে পাতা নেড়ে প্রাণের আবেগে হিল্লোল তোলে। ডুমুর গাছের পাতার নিচে চুপটি করে বসে শাকিল পাখিটি কী যেন ভেবে যায় এক মনে। অল্প দূরে গাছপালা-ঘেরা গ্রামগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে। কাছের সবুজ সতেজ গাছগুলো কালছে ধূসর দেখায়। পাশের বাড়িটিও অস্পষ্ট দেখায়। কাঁচা পথে দু-একজন লোককে হাঁটতে দেখা যায়। মাথায় টোপর, সাবধানী লঘু পদক্ষেপ, বৃষ্টির পর্দার আড়ালে চেহারা অচেনা মনে হয়। পাশের ডোবা থেকে থেমে থেমে ভেসে আসছে ব্যাঙের প্রমত্ত আওয়াজ, আনন্দ জমে উঠেছে যেন। লণ্ঠন হাতে কে যেন গোয়ালে গরু বাঁধছে। মনে হচ্ছে জোনাকি আলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঝিঁঝিঁ পোকার অবিমার আওয়াজ এক মোহরম পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে। জানালার পাশে বসে এসব অনুভব করতে করতে আমার মন রঙিন স্বপ্নের মালা গেঁথে চলে। বর্ষণমুখর দিনের এসব অনুভবের আস্বাদ প্রাণভরে গ্রহণ করা যায়, স্মৃতির বাসরে স্মরণীয় করে রাখা যায়, কিন্তু স্বরূপটি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কবিগুরুর ভাষায়- ‘এমন দিনে তারে বলা যায়- এমন ঘন ঘোর বরিষায়।’ বর্ষণমুখর সন্ধ্যার যে একটা নিজস্ব রূপ আছে তা একান্তে অনুভব না করলে তার মহিমা অনুধাবন করা যায় না।

No comments