বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

ব্যাকরণ : ভাষা ও বাংলা ভাষা - ব্যাকরণ ও বাংলা ব্যাকরণ

ভাষা
‘ভাষা’ সংস্কৃতি ‘ভাষা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বলা’ বা ‘কওয়া’। ‘মনের ভাব প্রকাশের জন্য উচ্চারিত অর্থবহ শব্দসমষ্টি বা স্বতন্ত্রভাবে বিশেষ কোনো জনসমাজে ব্যবহৃত হয় তাই ভাষা।’

ভাভাবিজ্ঞানীগণ মনে করেন, পৃথিবীতে চার থেকে আট হাজার ভাষা আছে। তবে এদের মধ্যে আড়াই হাজারের মতো ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বহৎ ভাষা। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় পঁচিশ কোটি লোকের ভাষা বাংলা।

বাংলা ভাষা
পরস্পরের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের জন্য বাংলা শব্দ ব্যবহার করে আমরা যে সব অর্থপূর্ণ ধ্বনি উচ্চারণ করি সাধারণভাবে তাকেই বলি ‘বাংলা ভাষা’। পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার মত বাংলা ভাষারও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে দুটি বিভাজন- লেখ্য এবং কথ্য বা মৌলিক রূপ।
bhasha o bangla bhasha - byakoron o bangla byakoron
ভাষা ও ব্যাকরণ

সাধু ভাষা প্রাচীনকাল থেকেই সাহিত্যের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাধু ভাষা ছিল সাহিত্যিক ও কৃত্রিম ভাষা।

ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বাংলা সাহিত্যে ‘চলিত ভাষা’র প্রচলন শুরু হতে থাকে। চলিত রীতির প্রতিষ্ঠায় যিনি সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি হলেন প্রমথ চৌধুরী (সাহিত্যিক নাম বীরবল)। তাঁর সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) পত্রিকার মাধ্যমে তিনি সাধু ভাষার বিপক্ষে এবং চলিত রীতির পক্ষে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন তাকে চলিত রীতির প্রবর্তকের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। চলিত রীতির প্রতিষ্ঠায় তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি হলো- ‘ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে উল্টোটি হলে মানুষের মুখে কালি লাগে’ তাঁর আরেকটি বিখ্যাত উক্তি, ‘শুধু মুখের কথাই জীবন্ত। যতদূর পারা যায়, যে ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষায় লিখতে পারলে লেখা প্রাণ পায়।’

বাংলা ভাষার লিখিত রূপের দুটি রীতি বিদ্যমান- সাধু ও চলিত। আবার মৌখিক রূপের চলিত রূপ ছাড়াও আঞ্চলিক রূপ রয়েছে।

সাধু রীতি : এ রীতি সুনির্ধারিত ব্যাকরণের নিয়ম অনুসরণ করে চলে এবং এর কাঠামো সাধারণত অপরিবর্তনীয়। এর পদার্থবিন্যাস সুনিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট। এ রীতি গুরুগম্ভীর ও আভিজাত্যের অধিকার, নাটকের সংলাপ ও বক্তৃতার অনুপযোগী। এ রীতিতে তৎসম শব্দবহুলতা দেখা যায়। এ রীতি সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের বিশেষ রীতি মেনে চলে।

চলিত রীতি : চলিত রীতি পরিবর্তনশীল। এটি শিষ্ট ও ভদ্রজনের মুখের বুলি হতে কালের প্রবাহে অনেকটা পরিবর্তিত রূপ লাভ করেছে। এ রীতি কৃত্রিমতাবর্জিত। মানুষের মনের ভাব প্রকাশে এটি অপেক্ষাকৃত উপযোগী। চলিত রীতিতে তদ্ভব শব্দবহুলতা দেখা যায়। সাধুরীতির ব্যবহৃত সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ চলিত রীতিতে সংক্ষিপ্ত হয়।
  • বাংলা ভাষায় যতি চিহ্নের প্রবর্তন করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
  • বাংলা ভাষায় প্রধানত ১২টি যতি চিহ্নের প্রচলন রয়েছে।

ব্যাকরণ ও বাংলা ব্যাকরণ
ব্যাকরণ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ। এর বিশ্লেষণ বি + আ + কৃ + অন। যার অর্থ বিশেষরূপে বিশ্লেষণ। ব্যাকরণ ভাষার নানা প্রকৃতি ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করে এবং অভ্যন্তরীণ নিয়মকানুন, রীতিনীতি শৃঙ্খলাবদ্ধ করে থাকে। কোন ভাষায় অভ্যন্তরীণ নিয়মরীতিই সেই ভাষার ব্যাকরণ হিসেবে বিবেচিত।

বাংলা ব্যাকরণের উৎপত্তির ইতিহাস ও ক্রমবিকাশ
বাংলা ব্যাকরণের রচনার ইতিহাস ২৫০ বছরেরও বেশি অর্থাৎ মনোএল দ্যা আসসুম্পসাঁও থেকে ড. সুনিতীকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. সুকুমার সেন পর্যন্ত। বাংলা ভাষায় প্রথম ব্যাকরণ রচিত হয় ইউরোপীয়দের হাত ধরে।

বাংলা ব্যাকরণের প্রথম গ্রন্থ- ‘মনোএল দ্যা আসসুম্পসাঁও’র দ্বিভাষিক শব্দকোষ ও খণ্ডিত ব্যাকরণ’ আঠার শতকের চল্লিশের দশকে রচিত হয়। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার ভাওয়ালে পর্তুগীজ ভাষায় তিনি রচনা করেন “Vocabolario em edioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes” নামে।

গ্রন্থটি দুটি অংশে বিভক্ত; প্রথম অংশ বাংলা ব্যাকরণে একটি সংক্ষিপ্তসার এবং দ্বিতীয় অংশ ব্যাকরণের একটি অংক্ষিপ্তসার এবং দ্বিতীয় অংশ বাংলা-পর্তুগিজ এবং পর্তুগিজ-বাংলা শব্দবিধান। এতে কেবল রূপতত্ত্ব এবং বাক্যতত্ত্ব আলোচিত হয়েছে, ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কে কোন আলোচনা নেই।

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলি থেকে প্রকাশিত হয় ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড রচিত ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ, ‘A Grammar of the Bengali Language.’ এটি বাংলা ভাষায় দ্বিতীয় ব্যাকরণ গ্রন্থ’। হ্যালহেডকে বাংলা ব্যাকরণ রচনার পথিকৃৎ বলা হয়।

বাংলা ভাষায় বাঙালির লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রামমোহন রায়ের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। স্কুল সোসাইটির অনুরোধে ১৮৩০ সালে। তিনি এটি রচনা করেন যা ১৮৩৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

No comments