রচনা : সুশাসন

↬ সুশাসন জনপ্রশাসনের জন্য একটি নব্য সংস্কৃতি

↬ সুশাসন ও দুর্নীতি দমন

↬ বাংলাদেশে সুশাসন : সাফল্য ও ব্যর্থতা


ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রচলিত শাসনব্যবস্থাগুলোর মধ্যে যেমন গনতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা সর্বাধিক, তেমনি এ শাসনকে সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য একটি নাম ‘সুশাসন’। সুশাসন শাসন-প্রক্রিয়ার সুশৃঙ্খল ও কাঠামোবদ্ধ একটি রূপ, যা একটি আদর্শরূপে বাস্তবায়িত হয় এবং যেখানে সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য, জনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক, নেতা, জনতা ও রাষ্ট্রের আন্তঃসম্পর্ক, প্রশাসন, জনগণ ও রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের নানা দিক বিস্তারিত বিশ্লেষণসহ স্থান পায়। শাসন-প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক সব সমস্যার সমাধান করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্বশীলতা কার্যকর ও সফলতা লাভ করা যায় সুশাসনের মাধ্যমে। জনগণ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সাথে অতি ঘনিষ্ঠ প্রত্যয় এখন ‘সুশাসন’। তাই বলা হয়ে থাকে ‘সুশাসন জনপ্রশাসনের জন্য একটি নব্য সংস্কৃতি’। 

সুশাসন জনপ্রশাসনের জন্য নব্য সংস্কৃতি : সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনাচরণের সার্বিক রূপ। জীবনাচরণের সবকিছুই সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত। সামাজিক ও রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়া, রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জীবনের অতি ঘনিষ্ঠ অংশ। আমরা রাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করি, রাষ্ট্রের আইনকানুন অনুসারে পরিচালিত হই এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করি। রাষ্ট্রের আইনকানুন, প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, আইন, বিচার, সংবিধান, সংসদ, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, মানবাধিকার, গণতন্ত্র- সবকিছুই জীবনের সাথে অত্যন্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ এ সবকিছুই সুশীল সমাজের অংশ এবং সংস্কৃতি। সুতরাং বলা হয়ে থাকে, সাম্প্রতিক সময়ে বিস্তার লাভকারী সুশাসনের ধারণাটি জনগণ ও প্রশাসনের তথা জনপ্রশাসনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এক কথায় সুশাসন জনপ্রশাসনের জন্য নব্য সংস্কৃতি। 

সুশাসন : সুশাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Good Governance’. ‘Good Governance’ শব্দটি ‘Good’ এবং ‘Governance’ এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নির্ভুল, দক্ষ ও কার্যকরী শাসন। সাধারণভাবে সুশাসন বলতে শাসন প্রক্রিয়ার সুশৃঙ্খল ও কাঠামোবদ্ধ একটি রূপকে বোঝায় যা একটি আদর্শরূপে বাস্তবায়িত হয় এবং সেখানে রাষ্ট্র, জনগণ ও প্রশাসনের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারিত ও আন্তঃসম্পর্কে সম্পর্কিত। অন্যভাবে বলা যায়, জনগণের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং গণতন্ত্রের সুফল আনয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নে যা প্রয়োজন তাই হলো সুশাসন। সুশাসনের মাধ্যমেই দেশের সীমিত সম্পদকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে জনগণকে অধিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করা যায় এবং তাদের অধিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। সুশাসন সরকার ও জনগণ উভয়ের কল্যাণ এবং স্বার্থই সুনিশ্চিত করে। তাই বলা হয় সরকার ও জনগণের স্বার্থকে এক সুতায় বাঁধার নাম সুশাসন। 

বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সুশাসন প্রত্যয়টি সর্বাপেক্ষা প্রত্যাশিত এবং আলোচিত একটি ধারণা হলেও আজ অবধি সুশাসনের কোনো একক গ্রহণযোগ্য ও সার্বজনীন সংজ্ঞা প্রদান করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিভিন্ন জন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সুশাসনের স্বরূপ নিরূপণে সচেষ্ট হয়েছেন। যেমন : 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আতাউর রহমানের মতে,
Good governance implies the ability of political system, its effectiveness, performance and quality. 

ম্যাককরনীর মতে,
সুশাসন হচ্ছে সরাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের সাথে শাসিত জনগণের ও শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ক।

মারটিন মিনোগের মতে,
বৃহৎ অর্থে সুশাসন হচ্ছে কতিপয় উদ্যোগের সমাহার ও একটি সংস্কার কৌশল, যা সরকারকে আরও বেশি গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য সুশীল সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তুলে।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান সুশাসনের ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
সুশাসন মানবাধিকার ও আইনের শাসকে নিশ্চিত করে, জনপ্রশাসনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিতকে শক্তিশালী করে তোলে।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সুশাসন হচ্ছে এমন একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিফল যেখানে শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে, সর্বোচ্চ স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকবে, আইনের শাসন থাকবে, নীতির গণতন্ত্রায়ন থাকবে, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা থাকবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে, মতামত ও পছন্দের স্বাধীনতা থাকবে এবং থাকবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। 

সুশাসনের উপাদান : সুশাসনের উপাদান নিরূপণে বিভিন্ন সংস্থা তাদের স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যেমন : UNDP সুশাসন নিশ্চিত করতে মোট ৬টি উপাদান উল্লেখ করেছে তা হলো- 
১. সংসদীয় পদ্ধতির উন্নয়ন। 
২. নির্বাচন ব্যবস্থা ও পদ্ধতির সাথে সহযোগিতা করা। 
৩. ন্যাযবিচার ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ। 
৪. তথ্য প্রবাহে প্রবেশাধিকারের উন্নয়ন। 
৫. ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সমর্থন করা। 
৬. লোক প্রশাসন ও সরকারি সেবাখাত সমূহের সংস্কার সাধন করা। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন সুশাসনের ৫টি মৌলিক উপাদান চিহ্নিত করেছেন। যথা : Transparency, Responsibility, Accountability, Participation and Responsiveness। 

জাতিসংঘে সুশাসনের ৮টি উপাদান সম্পর্কে আলোচনা করেছে। নিচের ছকে তা প্রদত্ত হলো :
বাংলাদেশে সুশাসন : সাফল্য ও ব্যর্থতা

বাংলাদেশে সুশাসনের সমস্যাবলি : বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায় বা সমস্যাসমূহ নিম্নরূপ : 

রাজনৈতিক অস্থিরতা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বদা অস্থিরতা বিদ্যমান। এ অস্থিরতা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা। এ অস্থিরতার কারণে সুশাসন বিঘ্নিত হয় এবং বিরাজ করে অরাজকতা। অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড না থাকলে বিরাজ করে গণতন্ত্রের সুশীতল হাওয়া। এ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। 

নেতৃত্বের সংকট : একজন যোগ্য সৎ ও দক্ষ নেতা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের নেতার সংকট সর্বদা লক্ষণীয়। স্বাধীনতার পর যে দু-একজন যোগ্য নেতা তাদের নেতৃত্বের গুণাবলি দ্বারা রাষ্ট্রের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তারা নির্মমভাবে হত্যার শিকারে পরিণত হয়েছেন। এর পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের সৃষ্টি কিংবা বিকাশ কোনোটিই ঘটেনি এবং নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে সুশাসন ব্যাহত হয়েছে। 

দুর্নীতি : দুর্নীতি বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা। এদেশে এমন কোনো ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে দুর্নীতির উপস্থিতি নেই। দুর্নীতি যেন রীতিমতো রীতিতে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই দেশে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতি সুশাসনের অনুকূল পরিবেশকে বিনষ্ট করেছে। 

সন্ত্রাস : দুর্নীতির মতো সন্ত্রাসও এদেশে অন্যতম অন্তরায়। সন্ত্রাস দেশের সর্বত্র জালের মতো ছড়িয়ে আছে। ধর্মীয় কেন্দ্র থেকে জঙ্গিবাদ, পবিত্র শিক্ষাঙ্গন থেকে ‘শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস’ পত্রিকার পাতায় প্রচারিত দৈনন্দিন খবর। চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, টেন্ডারবাজি, প্রাণনাশের হুমকি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ঘটনাও লক্ষণীয় যে, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশও। 

আইনের শাসনের অভাব : প্রকৃত আইনের শাসনের উপস্থিতি থাকলে সুশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে আইনের শাসন যেন “কাজীর গরু, কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।” আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এদেশে বিদ্যমান সমস্যা এতই প্রকট যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা এ কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তৎপর নয়। এ অবহেলা, ঔদাসীন্য ও ব্যর্থতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং সুশাসন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব : স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনোর জন্য অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশে জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অত্যন্ত অভাব রয়েছে। এ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব সুশাসনের অন্যতম অন্তরায়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। জনগণ এ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে না। 

সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সহযোগিতা ও ঐক্যের নয় বরং সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার। এ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈরী মনোভাব সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের থেকে দলের স্বার্থে, দলের স্বার্থের থেকে ব্যক্তিস্বার্থকে অনেক বড় করে দেখে থাকে। ফলে সরকার ও বিরোধী দল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সব সময়ই একটি দ্বন্দ্ব কাজ করে। অথচ, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিষ্ঠিত হতো, ব্যক্তির থেকে দল বড় দলের থেকে দেশ বড় নীতি। 

জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতা : ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলাদেশের মানুষ যে স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য আত্মনিয়োগ করেছিল, সে স্বপ্ন পরে বাস্তবায়িত হয়নি। স্বপ্ন ও বাস্তবতার এ ব্যবধান সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বপ্নের শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না হওয়ায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। 

শাসক ও শাসিতের দ্বন্দ্ব : একটি দেশের সরকার ও জনগণ উভয়ই দেশের নাগরিক। সরকারের নীতিনির্ধারক রাজনীতিবিদেরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তারা নির্বাচিত হন জনগণের কল্যাণের জন্য এবং জনগণের সেবা করার জন্য। কিন্তু দায়িত্বকে ক্ষমতা হিসেবে মনে করে তারা নিজেরা ভূমিকা পালন করে শাসকের আর জনগণ পরিণত হয় শাসিতে। এ শাসক ও শাসিতের ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তা দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। এ অবস্থা সুশাসনকে বাধাগ্রস্ত করে। 

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় করণীয় : বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে : 

রাজনৈতিক ঐক্যমত সৃষ্টি : রাজনৈতিক দলগুলোর ভালো কাজে একমত হওয়া এবং দেশের স্বার্থবিরোধী কাজে বিরোধিতার মনোভাব পোষণ করা উচিত। ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারলে দেশের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। 

জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা : সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনীতি ও প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, সংসদের ব্যর্থতা, দুর্নীতি সবকিছুই কমে আসবে। কারণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকলে, সকল কর্মকাণ্ড সকলের কাছে পরিষ্কার থাকলে যে কেউ যাচ্ছেতাই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না। 

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : সুশাসনের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রয়োজন। কারণ গণমাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু, গণমাধ্যম স্বাধীন না হলে সেখানে জনগণের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন ঘটে না এবং প্রকৃত সত্য পর্দার অন্তরালে থেকে যায়। ফলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্বের দেওয়াল নির্মিত হয় এবং সুশাসন অন্ধকারেই থেকে যায়। 

গণতন্ত্রের চর্চা বৃদ্ধি : সংবিধানের ধারা-উপধারায় আর রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতায় গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রত্যেক নাগরিকের মাঝে প্রতিষ্ঠা করে পুরো রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। 

ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতি প্রত্যাহার : সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করতে হবে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ব্যক্তিস্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য সাধারণ মানুষের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে অনেক মানুষ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে স্বজনপ্রীতিও যোগ্য মানুষকে যোগ্যতার মূল্য থেকে বঞ্চিত করে। এর ফলে অনিয়ম ও অরাজকতা বিরাজ করে। 

দুর্নীতি প্রতিরোধ : সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সকল স্তর থেকে দুর্নীতি পরিহার করতে হবে। প্রকল্পে দুর্নীতি, সরকারি রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতি, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, ভূমি জরিপে দুর্নীতি, পুলিশ ও প্রশাসনে দুর্নীতি প্রভৃতি সকল দুর্নীতি রোধের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত উন্নতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব। সকলকে দুর্নীতি রোধে সজাগ থাকতে হবে এবং দুর্নীতি রোধে একসাথে সকলকে কাজ করতে হবে। 

চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি : নির্বাচনের সময় নেতাদের উদ্দেশ্যে স্লোগান দেওয়া হয়ে থাকে “অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র” কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় নেতাদের চরিত্র বর্ণনাতীত। জন্যদিকে জনগণেরও রয়েছে নানা চারিত্রিক সমস্যা। দেখা যায়, ক্ষুদ্র স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য টাকা বা উপহারের বিনিময়ে ভোটাররা তাদের মূল্যবান ভোট বিক্রি করে দেয়। চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি করে এ সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। 

দাতাগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দাতাগোষ্ঠীর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। দাতাগোষ্ঠী বৈদেশিক সাহায্য প্রদানের সময় কিছু শর্ত আরোপ করে থাকে। এসকল শর্তকে পরবর্তীকালে বাধ্যতামূলকভাবে পালন করতে হয়। এজন্য দাতাগোষ্ঠীর ঋণ বা বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা হ্রাস করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রণমুক্তভাবে শাসন পরিচালনা করতে হবে, যাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। 

এনজিওদের সহযোগিতা বৃদ্ধি : সরকারের একক প্রচেষ্টায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের সমন্বয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে অনেক এনজিও এদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এদের তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। 

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রোধ : সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে পরিপূর্ণভাবে নিরসন করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন হলে প্রশাসন হবে গণমুখী, জনগণের কাছে আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কাজে অহেতুক কালক্ষেপণের অবসান হবে। 

ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি : ধর্মকে রাজনীতিতে প্রয়োগ করে অরাজকতা সৃষ্টি কিংবা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা দ্বন্দ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি সুশাসনের জন্য অন্তরায়। এ সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে এবং শান্তি বিনষ্ট করে। এজন্য সকলের মধ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করতে হবে। 

স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা : একটি দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না হলে সে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বিচারব্যবস্থা হওয়া উচিত সবার আস্থার কেন্দ্রবিন্দু। অপরপক্ষে, বিচারব্যবস্থার দৃষ্টি থাকা উচিত ‘আইনের চোখে সকলেই সমান’। বিচারব্যবস্থায় শাসন ও আইন বিভাগের হস্তক্ষেপ রোধ করতে হবে। অপরপক্ষে, বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত। 

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ : ক্ষমতা ও সম্পদের সুষম বণ্টন সুশাসনের জন্য সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। এজন্য প্রয়োজন সকল পদক্ষেপে সরকার ও জনগণের যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতা আবশ্যক। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সব ক্ষমতা যেন রাষ্ট্রের কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত না হতে পারে, এজন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। অপরপক্ষে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর করার মাধ্যমে উন্নয়নকে ছড়িয়ে দিতে হবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল স্তরে। 

আইনের সংস্কার : বাংলাদেশে বিদ্যমান অনেক আইন যুগোপযোগী নয়। এসব আইন অনেক প্রাচীন এবং সময়ের আবর্তে বর্তমানে তা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এসকল আইনের সংশোধন ও পরিমার্জন প্রয়োজন এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন আইন প্রয়োজন। প্রণীত এ নতুন আইনগুলোকে সফলভাবে কার্যকর করতে পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। 

কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা : বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কার্যকর থাকার রেকর্ড নেই বললেই চলে। এখানে বিরোধী দলকে সর্বদাই সহযোগী হিসেবে না দেখে “শত্রু” হিসেবে দেখা হয়। সংসদে প্রচলিত আছে “ওয়াকআউটের” সংস্কৃতি। সংসদ সদস্যদের অসংসদীয় আচরণ এখানে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা অকারণে সংসদে অনুপস্থিত থাকেন। এর কোনো জবাবদিহিতা নেই। এ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে কার্যকর সংসদ করলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। 

ই-গভর্নন্স প্রতিষ্ঠা : বর্তমান বিশ্বে ই-গভর্নেন্সের ধারণা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য একটি ধারণা। এটি প্রতিষ্ঠা না করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অনেকাংশে অসম্ভব। ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি রোধ হবে, প্রশাসনে জটিলতা রোধ এবং রাষ্ট্রের সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত সহজ হবে। কোনোরূপ হয়ারানি ও কষ্ট ছাড়া রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিচালিত হবে। 

উপসংহার : সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে তা নেই। তার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনসংখ্যার আধিক্য, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নানা সমস্যায় জর্জরিত জনগণ ও সরকার সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় কণ্টকাকীর্ণ এ পথ পরিণত হতে পারে পুষ্পিত পথে।
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post