বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ

↬ এদেশের শিশু ও বিশ্ব শিশু

↬ আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যৎ


ভূমিকা :
‘ধরায় উঠেছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি 
নন্দনের এনেছে সম্বাদ 
ইহাদে করো আশীর্বাদ।’ 
                                             ------ রবীন্দ্রনাথ
শুচিতার মূর্ত প্রতীক শুভপ্রাণ শিশুরাই ধরার বুকে নিয়ে আসে নন্দনের সংবাদ। আযানের ধ্বনিতে / উলুধ্বনি-শঙ্খধ্বনিতে হয় নবজাতকের বরণ। শিশুরাই আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন। অনাগত দিনের নতুন ইতিহাস। এদের মধ্যেই সুপ্ত আছে ভাবীকালের কত কবি শিল্পী সাহিত্যিক, কত সত্যসন্ধ বিজ্ঞানী, কত দুঃসাহসী অভিযাত্রী, কত আলোকতীর্থের অভিসারী যুগাবতার ধর্মগুরু, ইতিহাসের কত খ্যাত-কীর্তি পুরুষ। আজ মর্ত্যের প্রাঙ্গণে যার অপটু, ভীরু-চরণধ্বনি, উত্তরকালে তারই দৃপ্ত পদচারণা। 

শিশু-পরিচর্যার প্রয়োজন : যে শিশুরা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনার বলিষ্ঠ অঙ্গীকার, যাদের কর্মসাধনা ও সিদ্ধির ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির গৌরব-ইতিহাস, যারা আগামী দিনের স্বপ্ন ও সার্থকতা, তাদের জীবনে উপেক্ষা, আর অশ্রুসিক্ত বেদনার কত করুণ কাহিনী। দুঃখ-দারিদ্র্য-লঞ্ছনার কত অভিশাপ। জন্ম-মুহূর্তেই কত নবজাতক আমাদের অবহেলায়, নিষ্ফল আর হতাশের দলে। পূর্ণ প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই পথ-প্রান্তে কত শিশু-পুষ্প নিঃশব্দে অকালে ঝরে যায়। ওদের জীবনের সুষ্ঠু বিকাশের জন্যে চাই যথার্থ পরিবেশ রচনা, চাই উদার, সহৃদয় মানসিকতা, চাই প্রীতিপ্রেমের পরিচর্যা। পিতামাতা এবং সমাজই তাকে পরিকল্পিত রূপ দেওয়ার কারিগর। পৃথিবীতে ওরা নবীন অতিথি। চোখে ওদের ভীরু, অসহায় দৃষ্টি। পায়ে নেই চলার স্বচ্ছন্দ গতি। তাই পৃথিবীর মানুষের কাছে ওদের স্নেহ-ভালবাসার বুভুক্ষু হৃদয়ের প্রসারিত আহ্বান। 

অতীতের শিক্ষা-ব্যবস্থা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা : শিশুদের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আধুনিক কালের সুদূর অতীতে পৃথিবীর সব দেশের শিশুরা ছিল সামাজিক অবহেলা, হৃদয়হীনতার শিকার। ওদের শিক্ষা-ব্যবস্থায় ছিল অমানুষিক নির্যাতন আর নির্মমতা। প্রহার ও নানা ধরনের শারীরিক ক্লেশই ছিল সেদিনের শিক্ষা-ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ। শিক্ষকের রক্তচক্ষু, বেত্রদণ্ডের আস্ফালনে শিশুর জীবন ছিল নিয়ত ভীত, সন্ত্রস্ত। শিক্ষা ছিল সেদিন প্রাণহীন, বিভীষিকার বস্তু। মানসিক বিকাশের স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল অনুপস্থিত। ফলে, তারা পরিণত হয় স্বভাব-ভীরু জড়, অপদার্থ মানব সন্তানে। শিক্ষা-জীবনের বিভীষিকা, দুঃস্বপ্ন তাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও ছায়ার মতন অনুসরণ করত। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই শিশুরা সেদিন ছিল অনাদৃত, স্নেহ-উপেক্ষিত। বৃহত্তর শিশু-সমাজ ছিল অনাদরের ধূলিধূসরতায় বিবর্ণ, ক্লান্ত-প্রাণ। অবশেষে এই মুমূর্ষু মৃতপ্রায় প্রাণে এলো নবজীবনের ঢেউ। অসহায়, ম্লান-মুখ, হতভাগ্য শিশুরা তাকাল চোখ মেলে। দেশে দেশে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাধারার নতুন দিগন্তদ্বার উন্মোচিত হল। এলেন মনীষী শিক্ষাবিদের দল। তাঁরা শিশুদের জীবনে নিয়ে এলেন আনন্দের জোয়ার। শিশুর সাবলীল বিকাশের পটভূমিকা বিরচিত হল। শিশুরা নূতন শিক্ষা-ধারায় নবজীবনের আশীর্বাদ পেল। 

বর্তমান সমাজে শিশুদের অবস্থা : আজও এদের বৃহদাংশের জীবনে অশিক্ষার অন্ধকার, সমাজের নির্মম অবহেলা। আজও তাদের জন্যে নেই যোগ্য সমাদরের আসন। এখনও বিশ্বের অজস্র শিশুর জীবনে অর্থনৈতিক অভিশাপ, সমাজের নিষ্ঠুর ঔদাসীন্য। আজও কত শিশুগৃহ পরিত্যক্ত, অনাথ। বহু শিশু এখনও ক্ষুধার তাড়নায় সমাজবিরোধীদের সহজ শিকার। ভবিষ্যতের অনপনেয় কলঙ্কের গ্লানি, অখ্যাতি আর অবজ্ঞায় জীবনের ঋণশোধ করে যেতে হয় আজও কত শিশুকে। কত শিশু আজও অপুষ্টি-অনাহারে নীরবে-নিভৃতে অকাল-মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কেউ তার হিসেব রাখে না! আজও ওরা বাস করে আলো-বাতাসহীন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, ভোগ করে দুঃসহ নরকযন্ত্রণা। আজও কত শিশুর পরনে বস্ত্র নেই, রোগে ওষুধ নেই, ক্ষুধায় অন্ন নেই। কত দুরারোগ্য ব্যাধি তাদের জন্মসঙ্গী। এখনও বহু শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে পথে পথে ভিক্ষা বৃত্তি করে। এখনও অনেক বালক-ভৃত্য নিতান্তই কষ্টে-ক্লিষ্টে প্রাণধারণের তাগিদে অন্যের গৃহে, হোটেল-রেস্টুরেন্টে, কলে-কারখানার কাজ করে। শিক্ষা-অঙ্গনে এখনও কোটি কোটি শিশুর প্রবেশের নেই ছাড়পত্র। এ চিত্র বাংলাদেশেও। 

আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষের তাৎপর্য : বিশ্ব শিশু দিবসের অঙ্গীকার শিশুর জন্যে নিরাপদ বিশ্ব গড়া। এ অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৫৩ সাল থেকে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয়। বর্তমানে এই দিবস পালন করা হয় জাতিসংঘ ঘোষিত ‘শিশু অধিকার সনদ’ পালনের অঙ্গীকার নিয়ে। পৃথিবীব্যাপী শিশুবর্ষের উদ্দেশ্য হল বিবিধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশে দেশে অবহেলিত শিশুর প্রতি সমাজের নতুন দৃষ্টি চেতনার উন্মেষ ঘটানো, বিশ্বকে শিশু-কল্যাণে উৎসাহিত করা। এই শিশু-বিশ্ব গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত আছে ভবিষ্যতের এক আদর্শ মানবজাতি গঠনের শুভপ্রয়াস। এর মধ্যেই শিশুরা শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে, চিন্তায়-আনন্দে খুঁজে পাবে এক বিশ্বাসের পৃথিবী। 

শিশু অধিকার সনদের মূল কথা : জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদের মূল কথা হচ্ছে : শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্যে চাই নিরাপদ পরিবেশ, চাই তার সকল ধরনের সুরক্ষার ব্যবস্থা, তার চাই খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, চাই পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সেবা, চাই উপযুক্ত শিক্ষা। এক কথায় শিশুকে উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে চাই অভাবমুক্ত ও অনুকূল জীবন-পরিবেশ। 

বাংলাদেশে শিশুর সুযোগ : বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশ। তাই এদেশের শিশুরা বহু অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ দেশে রচিত হয় নি। অধিকাংশ শিশুই দারিদ্র্য ও অপুষ্টির শিকার। দারিদ্র্যের কারণে বিপুল সংখ্যক শিশুকে জীবিকার তাড়নায় শ্রমদাসে পরিণত হতে হয়। তারা শিক্ষার সুযোগ পায় না। নির্মল আনন্দের সুযোগ থেকে হয় বঞ্চিত। যদিও শিশু-প্রতিভার আবিষ্কারে কত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন। শিশুদের বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার আজও বিরাম নেই। কোথাও দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করা হয়েছে। ওদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যেও কিছু কিছু উদ্যোগ-আয়োজন হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ব্যবস্থা সামান্য। 

উপসংহার : শিশু অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সীমাহীন দারিদ্র্য প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে। তাই বাস্তব পদক্ষেপ ছাড়া এক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হবে না। শুধু প্রতিবছর শিশুবর্ষ পালনের মহাউৎসব পালন করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, এই আলোকোজ্জ্বল উৎসব-প্রাঙ্গণের বাইরে যে কত শিশু ছিল ক্ষুধায় ক্লান্ত – পীড়িত কত শিশু ছিল নগ্ন, কত শিশু অকালে বিদায় নিয়ে চলে গেল, তার খবর কেউ রাখে না। জীবনধারণের সামান্যতম উপকরণও তাদের ভাগ্যে জুটল না। বরং ওরা পেল সমাজের নিদারুণ ঔদাসীন্য। ওদের কাছে মিথ্যে হয়ে গেল আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষ। তাই এই বর্ষ উদ্‌যাপনের মধ্যেই যেন আমাদের সব উদ্যম, দায়িত্ব নিঃশেষিত না হয়। বহু শতাব্দী ধরে আমরা এই নবজাতকদের অবহেলা আর উদাসীনতায় যে মহা-অপরাধ করেছি, এই যেন হয় আমাদের পাপের পায়শ্চিত্তের শুভলগ্ন। যেমন এই পুণ্য মুহূর্তে আমাদের প্রার্থনা হয়, 
‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; 
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত তার ধ্বংসস্তূপ-পিঠে 
চলে যেতে হবে আমাদের। 
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ 
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, 
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি- 
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ 

No comments