প্রবন্ধ রচনা : নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস
| Article Stats | 💤 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 1,133 words | 7 mins to read |
Total View 2.8K |
|
Last Updated 19-Jun-2026 | 12:54 PM |
Today View 0 |
ভূমিকা :
‘যখনি চিত্ত জেগেছে / শুনেছ বাণী
তখনি এসেছে প্রভাত / যাও তোমার ব্রতপালনে’
এই মহাব্রত উদ্যাপনে যাঁরা নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, মানবতার বেদীমূলে যাঁদের জীবন অর্ঘ্য-রূপে নিত্য নিবেদিত, যাঁরা ক্ষুধাক্লিষ্ট, আর্ত, দারিদ্র্য-জর্জর, অসহায় মানুষের আশ্রয়, তাপিত-প্রাণে শান্তির শীতল বারি, সন্তাপে সান্ত্বনা, রুক্ষ ধূসর প্রেমহীন মরু-জীবনে যাঁরা করুণা-উৎস, তাঁদের মধ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নাম স্মরণীয়। পৃথিবী থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাবের চিরবিদায়ী কাণ্ডারী, সহস্রাব্দের তূর্যবাদক, শতাব্দীর বার্তাবহক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছেন।
'Some are born great,
Some achieve greatness, and
some have greatness thrust
upon them.'
... William Shakespeare
জন্ম ও শিক্ষাজীবন : ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর জন্ম ১৯৪০ সালের ২৮ জুন, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বথুয়া গ্রামে। তাঁর পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ও মাতা সুফিয়া খাতুন। তিনি ছিলেন ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। ভাইবোনদের পাঁচজনই মারা যায় শৈশবে। ১৯৪৭ সালে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। প্রথম পড়াশোনা গ্রামের স্কুলেই। এরপর লামাবাজার প্রাইমারি স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়েছেন। এখান থেকেই এস. এস. সি. পাস করেন মেধা তালিকায় ১৬তম স্থান নিয়ে। স্কুল জীবনে স্কাউট ছিলেন। ১৯৫৫ সালে কানাডার ওয়ার্ল্ড স্কাউট জাম্বোরিতে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনার সময় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও অংশ নেন। নাটক অভিনয়ের জন্য পুরস্কৃত হন। ১৯৫৭ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকেই ১৯৬০ সালে বি.এ. ও ১৯৬১ সালে নেন এম.এ. ডিগ্রি। গ্র্যাজুয়েশনের পর যোগ দেন অর্থনীতি ব্যুরোতে এবং গবেষণা সহকারি হিসেবে কাজ করেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের অধীনে।
কর্মজীবন : ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। এরপর চলে যান আমেরিকা। ১৯৬৯ সালে ভ্যানডার বিল্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। ১৯৬৯ থেকে ’৭২ পর্যন্ত মিডল টেনিসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। এরপর বাংলাদেশে এসে অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭৪ সালে প্রথম ক্ষুদ্র ঋণ প্রবর্তন করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন তেভাগা খামার এবং গ্রামীণ ব্যাংক।
মুক্তিযুদ্ধে ড. মুহাম্মদ ইউনূস : ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তখন আমেরিকায় পড়াশোনা করতেন গরিবের এই ব্যাংকার। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গড়তে সুদূর আমেরিকায় নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি। সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের অধিকারী এই বাংলাদেশি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশি নাগরিক কমিটি। চালু করেন বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্র। আমেরিকার তৎকালীন পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত বাংলাদেশি অফিসারদের সেখান থেকে বের হবার জন্য সাহায্য করেন। সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ ডিফেন্স লিগেরও। এ দলটি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতা দিতো।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর জীবনাদর্শ : খুব সাধারণ ও সাদাসিধে মানুষ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাগ কম। অহঙ্কার তার কাছে ঘেঁষতে পারে নি। কথা বলেন গুছিয়ে। তাঁর হাসিতে দ্যুতি খেলে। যে হাসিতে গরিব মানুষ তার কষ্ট ভুলে যান। তিনি ছুটে যান গ্রাম থেকে গ্রামে। মানুষের জন্য জামানত ছাড়া ঋণ নিয়ে। জোবরা গ্রাম তেভাগা সমিতি থেকে আজকের গ্রামীণ ব্যাংক। কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন। কাজের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পান। তাঁর আলাদা কোন দামি গাড়ি-বাড়ি নেই। তিনি কখনো কখনো অফিসের মাইক্রো অথবা জিপ ব্যবহার করেন। অফিস ঘরে তার বিশেষ গদি আঁটা চেয়ার নেই। কাঠের চেয়ার-টেবিল ব্যবহার করেন তিনি। গ্রামীণ চেকের ফতুয়া পরেন তিনি। গ্যাবাডিন কাপড়ের নরমাল-কাট প্যান্ট পরেন সঙ্গে। বাসায় লুঙ্গি পরেন। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেলই ব্যবহার করেন। এ পোশাকেই তিনি দেশ থেকে দেশে, গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। বিশ্বের দেশে দেশে সবখানেই একই পোশাকে ইউনূস হাজির হন। এতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। নিঃসঙ্কোচে সব মানুষের সঙ্গে মেশেন। কোনো কৃত্রিমতা নেই। প্রাণখুলে কথা বলেন। মানুষের কথা শোনেন। মানুষকে আশার কথা শোনান।
ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক : ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর খ্যাতি দারিদ্র্য-দূরীকরণে ক্ষুদ্র ঋণকে ব্যাংকিং জগতে প্রবর্তক হিসেবে। তাঁর এ ক্ষুদ্র ঋণ দেশের সবচেয়ে অভাবী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও যারা দুর্বল, সবচেয়ে অসহায়, সেই নারীর জন্য। পুরুষরাও পেতে পারেন এ ঋণ, তবে অগ্রাধিকার নারীদের। দারিদ্র্য তার ধারণায় একটি অস্বাভাবিক পঙ্গুত্ব। তুলনা করেছেন বনসাই বৃক্ষের সঙ্গে। যে গাছটা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে নির্দিষ্ট আকার আয়তন লাভ করত, সেটাকে কৃত্রিম উপায়ে খর্ব করা হয়েছে। তাকে বাড়বার সুযোগ দেওয়া হয় নি। গ্রামীণব্যাংক এনজিও নয়, দাতা নীর্ভরশীলও নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের মাত্রা প্রায় শতভাগ। দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং-এ এক কল্পনাতীত ব্যাপার। দেশে যত বড় ঋণ গ্রহীতা, তত বড় ঋণ খেলাপী। সাধারণ ব্যাংকিং-এর পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংকের এসব বৈশিষ্ট্য, গ্রামের নরনারীদের দরোজায় পৌঁছে দেয়া, দেশের দরিদ্র নারীদের জীবনে, তাদের চিন্তায়, তাদের স্বপ্নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। নারীর ক্ষমতায়নে এ দেশে যতো কাজ হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে সার্থক কাজের স্বীকৃতি লাভ করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর গ্রামীণ ব্যাংক।
নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন : ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক। যেটি ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসূচির মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র নারীদের অভাবমুক্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছে। নোবেল কমিটির ঘোষণাপত্রে বলা হয়, তৃণমূল পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে সমান দুইভাগে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠী যদি দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথ না পায় তাহলে টেকসই শান্তি অর্জন সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিরাট মডেল ও আদর্শের উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা এবং বিতর্ক : ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি 'নাগরিক শক্তি' নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে তা থেকে সরে আসেন। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ২০১১ সালে বয়সের কারণ দেখিয়ে তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে কর ফাঁকি, শ্রম আইন লঙ্ঘন এবং অর্থ আত্মসাতের একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শ্রম আইন লঙ্ঘনের একটি মামলায় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও দেশি-বিদেশি ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা স্থগিত করা হয়। আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কর ছাড় দেওয়ার ঘটনা কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ছাত্র-জনতার জোরালো প্রস্তাব ও রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে ৮ আগস্ট ২০২৪ নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকার দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচন (২০২৬) আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ করেছেন। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ২০২৫ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় স্থান দিয়েছে।
উপসংহার : যারা দরিদ্র তারা চিরজীবন দরিদ্র থাকবে, যারা বঞ্চিত তারা চিরকাল অবহেলার শিকার হবে- এটা হতে পারে না। বঞ্চিত মানুষকে তাদের অর্থনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজীবন কাজ করে গেছেন। ক্ষুদ্র ঋণ থেকে শুরু করে আজ তিনি একটি জাতির গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাষ্ট্র মেরামতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর মতো মহান ব্যক্তির আদর্শকে ধারণ করে হৃদয়বান মানুষ ও তরুণ সমাজ এগিয়ে এলেই একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ 'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্ন সার্থক হবে।
Comments (2)
Good and excellent.Fantastic composition of honourable Dr.Mohammad Yunus
Fine