বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান

↬ সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহার

↬ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা


ভূমিকা : 
‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;- 
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি, / পর-পর-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ 
পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। / মাতৃভাষা-রূপ খানি, পূর্ণ মণিজালে।’ 
- এই অনুশোচনা, এই আত্মবিলাপ ও আত্মসমালোচনার বাণী মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের। এ থেকে অনুধাবন করতে পারি, মানবজীবনে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা সহজ ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে থাকে। এ বিষয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছে, ‘শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ স্বরূপ।’ মাতৃদুগ্ধ শিশুর পক্ষে যেমন পুষ্টিকর, বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষা তেমন সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। মাতৃভাষা প্রাণ-মনকে দেয় তৃপ্তি আর চিন্তাচেতনাকে দেয় দীপ্তি। যেকোনো ব্যক্তিই যদি তার মাতৃভাষাকে কঠিন ও অবহেলাযোগ্য মনে করে, তো তাকে মূর্খ ও পাষণ্ড না-বলে উপায় নেই। 

বিদেশি ভাষার অসুবিধা : 
মাতৃভাষায় কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করা যত সহজ, অন্য ভাষায় সেটা তত সহজ নয়। মাতৃভাষা সহজাত আপন ভাষা, অন্য ভাষা পরের ভাষা। বিদেশি ভাষা শেখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মাতৃভাষা যেমন প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় জ্ঞানানুশীলন ব্যতীত বিশ্বে কোনো জাতিই উন্নতি লাভ করতে পারেনি। ইংরেজরা যেদিন ফরাশি ভাষাকে মাতৃভাষার ওপর স্থান দিয়েছিল তখন সে দেশের সাহিত্যের স্ফুরণ হয় নি। স্ফুরণ হয়েছিল যেদিন জেমস্ মাতৃভাষায় পবিত্র বাইবেলের অনুবাদ করে দেশের মানুষের বাইবেল ও মাতৃভাষা উভয়কেই অসীম মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করলেন। রাশিয়াও মাতৃভাষাকে স্বীকার করেই জ্ঞান-বিজ্ঞান শিল্প-সাহিত্যের গৌরবময় অগ্রগতির পথে বিশিষ্ট মর্যাদায় চিহ্নিত হয়েছে। প্রাচ্যের জাপানও একদিন প্রাচ্যের শিক্ষা-ধারাকে গ্রহণ করেছিল। সেদিন তার অগ্রগতি ছিল কুণ্ঠিত। তারপর মাতৃভাষার মাধ্যমেই তারা গৌরবময় অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। 

মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা : মাতৃভাষাকে আশ্রয় করেই প্রকৃত পক্ষে দেশের মানুষের চিৎশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি, সৃষ্টি-শক্তি ও কল্পনা-শক্তির যথার্থ বিকাশ সম্ভব। প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য- 

‘আমাদের মন তেরো চৌদ্দ বয়স হইতেই জ্ঞানের আলোক এবং ভাবের রস গ্রহণ করিবার জন্য ফুটিবার উপক্রম করিতে থাকে, সেই সময়েই অহরহ যদি তাহার উপর বিদেশি ভাষার ব্যাকরণ এবং মুখস্থ বিদ্যার শিলাবৃষ্টি বর্ষণ হইতে থাকে তবে তাহা পুষ্টিলাভ করিবে কী করিয়া।’ 

তাই শিক্ষা যেখানে মানুষের সহজাত অধিকার, সভ্যতার ক্রমাগ্রগতির অনিবার্য অঙ্গীকার, সেখানে কৃত্রিমতার কোনো অবকাশ নেই। ‘কোনো শিক্ষাকে স্থায়ী করিতে হইলে, গভীর করিতে হইলে, ব্যাপক করিতে হইলে তাহাকে চির পরিচিত মাতৃভাষায় বিগলিত করিয়া দিতে হয়।’ নানা কারণে অন্য যে কোনো ভাষার চেয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার গুরুত্ব ও শ্রিষ্ঠত্ব সর্বজনস্বীকৃত: 

(১) প্রতিদিনের ভাবের আলাপন, সুখ-দুঃখ, আশা-নৈরাশ্য, আনন্দ-বেদনার প্রকাশ মাতৃভাষায়। তাই মাতৃভাষা মনোভাব প্রকাশে যত উপযোগী অন্য ভাষা তত নয়। 

(২) মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীরা সহজেই সে বিষয়টি আয়ত্ত করতে পারে। মাতৃভাষায় কোনো ভাব যত সহজে বোঝা যায়, তা আর কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। অপরপক্ষে, মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষার সহজবোধ্যতার ভিত্তি নেই। পরভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভে শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক শক্তির যথেষ্ট অপচয় হয়। 

(৩) মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষায় জ্ঞানার্জন করতে গেলে বিষয় ও বাহন উভয়ের প্রতি সমান গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে বিদ্যার্জনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বিনা পরিশ্রমে কোনো ভাষা শুদ্ধভাবে বলা বা লেখা কোনোটাই সম্ভব নয়। বিদ্যার মাধ্যম আয়ত্তের জন্যে সময়েরও অপচয় হয় প্রচুর। যা ব্যক্তিক, সামাজিক ও জাতীয়ভাবে ক্ষতিকর। 

(৪) দেশ-কালের সঙ্গে ইতিহাস ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির যে যোগ রয়েছে তার সঙ্গে গভীর মিলবন্ধন রচনা করতে পারে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা।

(৫) স্বদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা গড়ে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে। বিদেশি ভাষার আধিপত্য মনোজগতে বিদেশমুখিতা ও পরানুকরণ প্রবৃত্তির জন্ম দেয়। 

(৬) মায়ের সাথে, মাটির সাথে, দেশের সাথে, প্রকৃতির সাথে যোগসূত্র গড়তে হলে প্রয়োজন মাতৃভাষার।

(৭) দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্যে তথা সমৃদ্ধশালী করতে হলে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

(৮) সবচেয়ে বড় কথা মাতৃভাষা মায়ের ভাষা, স্বদেশী ভাষা- মাতৃভাষার চেয়ে সহজ অন্য কোনো ভাষা হতে পারে না। কারণ জন্মের পর থেকে এই ভাষার আশ্রয়ে ও পরিমণ্ডলেই একজন বড় হয়ে ওঠে। সুতরাং, মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। 

মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা বা বাংলা ভাষার মাধ্যমে পঠন-পাঠন : মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান যে একান্ত আবশ্যক এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বর্তমান শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সর্বত্রই বাংলাভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বাংলা ভাষার মাধ্যমে সরকারি অফিস-আদালত নির্দেশাদি দানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চতর শিক্ষা উপযোগী পুস্তকাদি বাংলা ভাষায় রচনা ও অনুবাদের জন্যে পরিভাষাও রচিত হয়েছে। স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা যতই দৃঢ় হবে, ততোই বিদেশি ভাষার সাহায্য শিক্ষাদানের চিন্তা দূর হবে। 

মাতৃভাষার মুক্তি আন্দোলন : বাংলাদেশে মাতৃভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষার মাধ্যমে যে শিক্ষাদান পদ্ধতি বর্তমানে চালু রয়েছে, এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে আছে ভাষা-আন্দোলনের রক্তমাখা ইতিহাস। ইংরেজ শাসনের পর স্বাধীন পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বলে ঘোষণা করা হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী জনগণ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাভা করার আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রফিক, বরকত, জব্বার প্রমুখ ছাত্রগণ এই ভাষা আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করে। এরই ধারাবাহিকতায় পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। আর সেদিন হতেই এদেশের মাতৃভাষা বাংলা, রাষ্ট্রভাভার মর্যাদা লাভ করে এবং সর্বস্তরে শিক্ষা বাহনরূপে বাংলা ভাষা ক্রমেই বিস্তার লাভ করে চলেছে। 

উপসংহার : জীবন ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার একমাত্র পথ হচ্ছে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান। শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য ও সর্বশ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে ব্যক্তিসত্তার পূর্ণ সাধন। আর এ জন্যে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানই হচ্ছে সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি। শিক্ষার আনন্দ পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে চাইলে এবং প্রকৃত শিক্ষা লাভ করতে চাইলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তার অপরিহার্য। এর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই, তাই মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি আবদুল হাকিমের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই- 
‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, 
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

4 comments:


Show Comments