বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

ভাবসম্প্রসারণ : হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে / করব মোরা পরিহাস। / মুক্ত করো ভয়, / আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়।

হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে
করব মোরা পরিহাস।
অথবা
                                 মুক্ত করো ভয়,
আপনা মাঝে শক্তি ধরো নিজেরে করো জয়।

মূলভাব : ভারতবর্ষের মানুষ একসময় বিশ্বাস করত, পূর্ব জন্মের কর্মফল এ জন্মে সমস্ত কর্মফল নিয়ন্ত্রণ করে। শুধু ভারতবর্ষ নয়, প্রাচীন গ্রীস ও অন্যান্য কয়েকটি দেশের মানুষও এ মনোভাব পোষণ করত।

সম্প্রসারিত ভাব :  যা দেখা যায় না, তাই অদৃষ্ট। বিংশ শতাব্দীর শেষে বিজ্ঞানের কল্যাণে অনেক অজানা জানা গেছে, অনেক রহস্য ভেদ হয়েছে। অতীত বিশ্বের বহু তথ্য অজানা রয়ে গেছে। যতদিন না সেগুলোর রহস্য উন্মোচিত হয় ততদিন অদৃষ্ট কথাটি থেকেই যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এ কথা সত্য আজকের মানুষ অনেক এগিয়েছে, সে এখন পুরষ্কারের পূজারী। তাই আমাদের কবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে, 

জীবন মরণের সূত্রে জগৎ আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে জগতের এত রহস্য সব সময় উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয় না বলেই আমরা ভাগ্যের লিখন বা কপালের দোহাই বলে থাকি। বর্তমানকালের মানুষ ক্রমশ যুক্তি নির্ভর হয়ে উঠছেন অজ্ঞাত অবোধ্য কোন কাজে সে আর পিছপা নয়। বুদ্ধি আর মেধার দৌলতে অলৌকিক ক্রমশ তার কাছে লৌকিক রূপে ধরা দিচ্ছে। তাই অদৃষ্ট আজ মানুষের কাছে ভয়ের কারণ নয়, উপহাসের পাত্র। জগতে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে মানুষই শ্রেষ্ঠ। কারণ সে শক্তির রহস্য ভেদ করতে পেরেছে, শক্তিকে আয়ত্ত করতে পেরেছে। অথচ সৃষ্টির ঊষালগ্নে মানুষ নিজ শক্তিকেই উপলব্ধি করতে পারেনি। ফলে অসহায় মানুষ অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে পড়ে পড়ে মার খেয়েছে। তখন ভয় ছিল জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে। তারপর ক্রমশ নিজেকে চিনতে শিখল, জগতের কর্মযজ্ঞে নিজেকে সঁপে দিল। শুরু হল তার নতুন মানবসত্ত্বা। অসাফল্য আর ব্যর্থতা তাকে আরও বেশি নিষ্ঠা এনে দিল। 

যারা ভীরুতার দুঃখে কাতর। অসাফল্যে, ব্যর্থতায় তারা কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। ভাগ্যের দোহাই দিয়ে কর্মের পথ থেকে সরে যায়। আর যারা সাহসী, তারা ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে আশার আলোর সন্ধান পায়। আত্মবিশ্বাসী মানুষ কখনও অদৃষ্টের দোহাই দেন না। অলীক অদৃষ্টকে তুচ্ছ করে জীবন পথে এগিয়ে চলেন। তাদের কাছে, সংগ্রামই হল জীবন, আর অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে সংগ্রামহীনতার নামই হল মৃত্যু।


এই ভাবসম্প্রসারণটি অন্য বই থেকেও সংগ্রহ করে দেয়া হলো


ভাব-সম্প্রসারণ : মানুষ তার নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। যারা ভীরু, দুর্বল; যাদের আত্মবিশ্বাস কম, শুধু তারাই অদৃষ্টবাদী। মানুষ অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠ শ্রমের দ্বারা তার নিজ ভাগ্যকে সার্থক করে তোলে।

জীবনসংগ্রামে পরাভূত মানুষ নিজেকে ভাগ্যহত, দৈবলাঞ্ছিত বলে মনে করে। তার ধারণা এক অদৃশ্য দৈবশক্তি নেপথ্য থেকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে চালনা করে চলেছে। আত্মশক্তিতে আস্থাহীন মানুষ সেই অন্ধ দৈবশক্তির নাম দিয়েছে অদৃষ্ট। অদৃষ্টের হাতে শৃঙ্খলিত সেই মানব বন্দী প্রমিথিয়ুসের মতো বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে নি। তার সত্তায় ব্যক্তিত্বের স্ফুলিঙ্গ অগ্নি হয়ে দেখা দেয় নি। বিজ্ঞানের এ যুগেও কোনো কোনো মানুষ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে সমর্পণ করে অদৃষ্টের অলীক হাতে। যৌবনশক্তির দুর্বার গতিবেগে প্রাণচঞ্চল যারা, দুর্মর সংগ্রামের ক্ষুরধার পথে হাঁটাই তাদের কাম্য। অদৃশ্য দৈবী শক্তিতে তারা বিশ্বাসী নয়, সংগ্রামে-সংঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসলটি তুলে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। তাদের দৃঢ় প্রত্যয় হলো ভাগ্য মানুষকে চালিত করে না, মানুষই ভাগ্য গড়ে। কর্ম হল সুপ্রসন্ন সৌভাগ্যের জনক। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে কর্মবিমুখতা নিজের শক্তিমত্তার কাছ থেকে পলায়নী মনোবৃত্তির নামান্তর। কর্মবীর মানুষই সৌভাগ্যের স্বর্ণশীর্ষে হয় আসীন। অপরদিকে অদৃষ্টনির্ভর মানুষ তার নিশ্চেষ্ট আলস্যহেতু পদে পদে বরণ করে পরাজয়, জীবনভর তাকে হতাশায় নিরাশায় দীর্ঘশ্বাসের সেতু রচনা করতে হয়।

যাঁরা আত্মশক্তিতে বীর্যবান তাঁরা দুর্দমনীয় যৌবনশক্তির আবেগে সদা কম্পমান। তাদের গতিবেগ ঝড়ের মতো, তাদের জীবনের চলার পথ বাধা-বিপত্তি যত দুর্লঙ্ঘই হোক না কেন অদৃষ্টের কাছে তারা নতজানু না হয়ে দুর্জয় আত্মশক্তিতে তা অতিক্রম করে।

No comments