বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই
Install "My All Garbage" App to SAVE content in your mobile

রচনা : মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাংলাদেশ

↬ মুক্তবাজার অর্থনীতি

↬ মুক্তবাজার ব্যবস্থা ও বাংলাদেশ


ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি। অর্থনীতিই সমাজের মূল ভিত্তি। কাজেই অর্থনীতির যেকোনো পরিবর্তন মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও চিন্তাভাবনার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই এ ধরনের চিন্তাভাবনা আজ শুধু অর্থনীতির ভাবুক মহলেই সীমাবদ্ধ নেই, এর দ্বারা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থনীতির মুক্তবাজারমুখী পরিবর্তন জীবনের সর্বস্তরে প্রভাব বিস্তার করছে। বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে মুক্তবাজার অর্থনীতির যে প্রভাব পড়ছে তার শুভ-অশুভ পরিণাম সম্পর্কে আগ্রহশীল মানুষ নানা ভাবনার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। তাই এর স্বরূপ সন্ধান করে তার কল্যাণ-অকল্যাণ সম্পর্কে বিবেচনা করা দরকার। এছাড়া বর্তমান একবিংশ শতকের আন্তর্জাতিক পণ্য ভোগে অভ্যস্ত মানুষ মুক্তবাজার অর্থনীতির ভালো-মন্দের দিকটি পরিষ্কারভাবে জানতে কৌতূহলী।

মুক্তবাজারের স্বরূপ : বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ভৌগোলিক সীমার মধ্যে তার বাজার অবস্থান করে এবং ঐ বাজারকে উপলক্ষ করে পণ্যের যাবতীয় ক্রয়-বিক্রয়, আয়-ব্যয় সেবার মান এবং দাম নির্ধারিত হয়ে থাকে। কোনো দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট মূল্যের উদ্ভব হলে তাকে বাজার বলে। আর বাজার অর্থনীতি বলতে এমন এক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকে বুঝায় যা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারের শক্তি তথা চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বাজারের এই স্বাভাবিক শক্তি তথা চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতাই মুক্ত বাজারের স্বরূপ।

মুক্তবাজার অর্থনীতির সংজ্ঞা ও তার চালিকাশক্তি : মুক্ত মানে নিয়ন্ত্রণহীনতা। বাজার অর্থনীতিতেও স্বাভাবিক শক্তিগুলোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এটি এমন এক প্রকার অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া, যা পণ্য বা সেবার দাম নির্ধারণের দায়িত্বটা বাজারের শক্তিসমূহ ও সরবরাহের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, চাহিদা ও যোগানের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দ্বারা পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতিকে ইংরেজি পরিভাষায় বলা হয় Free Enterprise Economy. মুক্তবাজার অর্থনীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জনৈক অর্থনীতিবিদ বলেছেন,
“The free enterprise economy is a market oriented economy in which the means of production and business are owned by private individuals and where is best governmental interference in the performance of economic activity.”

সাধারণত কোনো প্রতিকূলতা বা বাধা-বিপত্তি ছাড়াই একটি দেশের অভ্যন্তরের বা বাইরের যে কোনো ধরনের পণ্য কিংবা সার্ভিস বেচাকেনার সুবিধা বা সুযোগ বা বিধিব্যবস্থা বজায় রাখার নাম মুক্তবাজার বা খোলাবাজার। এ বাজারের মূল ভিত্তি হলো পূর্ণ প্রতিযোগিতা। মুক্তবাজার অর্থনীতি কোনো বাহ্যিক চাপ, সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিশেষ হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ কিংবা স্বাভাবিক চাহিদা এবং সরবরাহকে অগ্রাহ্য করে যেকোনো কৃত্রিম প্রভাবও মান্য করে না। মুক্তবাজার অর্থনীতির পূর্বশর্ত হলো, (ক) ক্রেতা-বিক্রেতার সমঝোতা, (খ) পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস, (গ) পরিপূর্ণভাব পণ্য উৎপাদন ও ব্যবসা করার সুযোগের নিশ্চয়তা। এটি একদিকে বাজার শক্তিসমূহের প্রতি নিরপেক্ষতা, মান্যতা, অন্যদিকে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক গতির ওপর ছেড়ে দেওয়ার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। কাজেই মুক্তবাজার অর্থনীতির দুটো প্রধান স্তম্ভ হলো, (ক) পূর্ণ প্রতিযোগিতার স্বীকৃতি ও (খ) ক্রেতা ও ভোক্তার সার্বভৌমত্ব।

অর্থনৈতিক নীতিমালার দিক থেকে মুক্তবাজার একটি দক্ষতার পদ্ধতি। মুক্তবাজারের অস্বাভাবিক মুনাফার অস্তিত্ব নেই। ফলে এ বাজারে ক্রেতাশোষণ অন্য যে কোনো বাজার পদ্ধতির চেয়ে কম। অন্য বাজারের তুলনায় এ বাজারে সম্পদের সমাবেশ ঘটে বেশি এবং সম্পদের অধিকতর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হয়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির যথাসম্ভব দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় বলে অন্য যেকোনো বাজারের চেয়ে এখানে দ্রব্যমূল্য সর্বনিম্ন থাকে। ভোক্তা স্বল্পমূল্যে বিদেশি পণ্য ভোগের সুযোগ পায়। এতে বাণিজ্যক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়। অর্থনীতিকে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিকভাবে চলতে দিলে সয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের উৎপাদনগুলো মুক্তবাজারের দিকে যাত্রা করে। প্রকৃতপক্ষে মুক্তবাজার হচ্ছে উত্তম দিকে এক অনিবার্য যাত্রা, উত্তম বা পরমার্থ অর্জন নয়। ক্রেতা ও বিক্রেতার আস্থাভাজন সম্পর্ক মুক্তবাজার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে ব্যক্তির উপযোগ ও ব্যক্তির সন্তুষ্টিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ব্যক্তিস্বার্থ এর মূল চালিকাশক্তি। এখানে প্রচুর পরিমাণে দেশি-বিদেশি পণ্যের সমাবেশ ঘটে, ফলে পণ্যমূল্য কম থাকে।

মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাংলাদেশ : মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্পর্কে অর্থনৈতিক মহল ও সাধারণ জনমনে পরস্পর বিপরীতধর্মী ধারণার জন্ম নিয়েছে- এটা অস্বাবাবিক নয়। কেননা, বর্তমান অর্থনীতিতে এ মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা খুব বেশি দিনের নয়। তদুপরি বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দুর্বল অর্থনীতির একটি দরিদ্র দেশ। অনেকেই মনে করেন মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হলে দেশের শিল্পকারকানা বা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। মুক্তবাজার মানেই অন্য দেশের শিল্পের স্বার্থরক্ষা এবং অন্য দেশের পণ্যের বাজার সৃষ্টি করা। মুক্তবাজার মানেই স্বদেশী পণ্য বর্জন এবং বিদেশি পণ্য গ্রহণ। মুক্তবাজার মানেই অনুন্নত দেশের শিশু শিল্পগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং এরই ফলস্বরূপ বেকারত্ব বৃদ্ধি। এসবই মুক্তবাজারের বিপক্ষের কথাবার্তা। কিন্তু অনেকেই মুক্তবাজার অর্থনীতিকে আমাদের দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। সুতরাং এর সুবিধাগুলো কী হতে পারে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা যায়।

মুক্তবাজারের সুবিধা : অর্থনৈতিক নীতিমালার দিক থেকে মুক্তবাজার এক দক্ষতার পদ্ধতি। অন্য বাজারের তুলনায় এ বাজারে সম্পদের সমাবেশ ঘটে বেশি এবং সম্পদের অধিকতর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি দাতা দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আর আমাদের অর্থনীতি ঋণনির্ভর অর্থনীতি। সমগ্র বিশ্ব যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চরম সীমায় পৌঁছতে যাচ্ছে আমরা সেখানে নানারকম রীতিনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছি। SAPTA জাতীয় কিছু বাণিজ্যিক সংস্থার সৃষ্টি করে আমরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেও প্রকৃত ভিতটি কারও কাছে অপরিষ্কার নয়। সুতরাং মুক্তবাজার অর্থনীতির সঠিক ও পূর্ণ অনুশীলন করলে বাংলাদেশের জন্য নিম্নোক্ত সুবিধাগুলো বয়ে আনতে পারে।
১. জনসাধারণ তথা ভোক্তা সাধারণ তুলনামূলক স্বল্পমূল্যে বিভিন্ন দেশের পণ্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারবে। প্রত্যেক ক্রেতা বা ভোক্তাই কম মূল্যে উন্নত পণ্য পেতে চায়, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এই সুযোগ রয়েছে।
২. উৎপাদনের উপকরণসমূহের বিশেষীকরণ সম্ভব হবে। এর ফলে উৎপাদনের উপাদানসমূহ যেমন- ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠনের প্রকৃত আয় ‍বৃদ্ধি পাবে।
৩. সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতি দেশের সম্পদসমূহের সষম বণ্টনের পথ সুগম করবে। এতে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত হবে।
৪. মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে বাণিজ্যে নিয়োজিত সকল পক্ষই লাভবান হবে। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধি পাবে।
৫. মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে দেশের নতুন নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি হবে। এবং বিদেশের বাজারেও আমাদের দেশের পণ্যের বাজার সৃষ্টি হবে। এতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
৬. দেশের শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি পেয়ে দেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
৭. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার পথ উন্মুক্ত হবে।
৮. বিভিন্ন দেশের উন্নত প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সাথে পরিচয় ঘটবে এবং এর সাহায্যে নিজেদের প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সমৃদ্ধি ঘটানো যাবে।
৯. বিদেশি উৎপাদকদের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে দেশীয় উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
১০. ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে।

মুক্তবাজারের অসুবিধা : মুক্তবাজার অর্থনীতির বহুবিধ সুবিধার পাশাপাশি এর কতিপয় অসুবিধাও রয়েছে, যা মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। মুক্তবাজার অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বা অবদান রাখলেও অনুন্নত দেশগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে শিল্পায়নের পথে বাঁধার সৃষ্টি করে। অবাধ বাণিজ্যের সুযোগ নিয়ে শিল্পোন্নত দেশসমূহ অনুন্নত দেশের বাজার দখল করবে। বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং শিল্পকারখানায় প্রভুত ক্ষতি সাধিত হবে বলে ধারণা করা হয়। কারণ, মুক্তবাজার মানেই অনুন্নত দেশের শিশু শিল্পগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। রুগ্ন শিল্পকেও চিরতরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় মুক্তবাজার। আর শিল্পখাতকে ধ্বংসের মুখোমুখি করা মানে দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি করা। তাই অনেকে মনে করেন, মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হলে বাংলাদেশের শিল্প ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে।

মোটকথা, মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফল পেতে হলে আমাদের দরকার বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা। বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ ও তাদের পুঁজির নিরাপত্তা দিতে হবে। সামাজিক সন্ত্রাস, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, শ্রমিক অসন্তোষ, ঘনঘন হরতাল, আমলাতান্ত্রিকতা, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। তবেই মুক্তবাজার অর্থনীতি সফল হবে এবং একে টিকিয়ে রাখা যাবে।

উপসংহার : মুক্তবাজার অর্থনীতির সর্বপ্রধান শর্ত হলো উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও মান উন্নয়ন নিশ্চিত করা, তাহলেই আজকের প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা সম্ভব। বাজার দখল করতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি গুণগত মানেও পণ্য প্রথম শ্রেণির হতে হবে। বাজার দখলে শ্রমশক্তিকেও কাজে লাগাতে হবে। অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির এ পন্থা অবলম্বন করেই বিশ্ববাজারে টিকে থাকা সম্ভব।

1 comment:


Show Comments