বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : আমার শখ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে; মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি
----জীবনানন্দ দাশ

মানুষ চির যাযাবর। তার ধমনীর রক্তে আছে ভ্রমণের নেশা- অজানাকে জানার অনন্ত জিজ্ঞাসা। তাই স্বভাবতই মানুষ ভ্রমণ-বিলাসী। বিপুল এই পৃথিবী। বিশাল তার আয়োজন। কত বৈচিত্র্যময় দেশ-দেশান্তর- কত নদী নির্ঝর, কত গিরি পর্বত, কত অরণ্য কান্তার সৌন্দর্যের অপরূপ ডালি সাজিয়ে পৃথিবীর বুক জুড়ে রয়েছে। পৃথিবীর কত অজস্র কোণে কত বিচিত্র জনপদ তাদের বিচিত্র জীবনচারণ সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে-বর্তে আছে। তার কতটুকুই-বা আমাদের জানার সৌভাগ্য হয়। চারিদিকে সবই অজানা, সবই অচেনা। আমাদের নিত্যকার পরিচিত পৃথিবীর বাইরে অপরিচয়ের দুস্তর মহাসমুদ্রের অদৃশ্য তরঙ্গ প্রতিনিয়ত আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেই অজানা, অচেনা বিপুল পৃথিবীকে জানবার জন্যে আমাদের অসীম আগ্রহ, অনন্ত উৎকণ্ঠা। তারই দুর্নিবার আকর্ষণে পরিচিত পৃথিবীর রুদ্ধ দুয়ার খুলে আমরা বেরিয়ে পড়ি অজানার সন্ধানে-
’দেশে দেশে কত নগর রাজধানী-
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু রয়ে
গেল অগোচরে।’

এবার বলি আমার কথা, আমি একজন শিক্ষার্থী বৈ তো নয়। হ্যাঁ, মানুষ মাত্রই আজীবন ছাত্র। ‘ছাত্রানং অধ্যয়নং তপঃ।’ অর্থাৎ অধ্যয়নই ছাত্রদের তপস্যা। এই সাধনা সিদ্ধির লক্ষ্যে আমার উদ্দেশ্য, আমার শখ- দেশভ্রমণ।

নদী-সমুদ্র-মরু-পর্বত, বন-উপবন শোভিত এই বিশাল বিপুল বিশ্ব আমাকে প্রতি মুহূর্তে হাতছানি দিয়ে ডাকে। বিশ্বের এই বিশাল আয়োজনের সঙ্গে রয়েছে আমার অন্তরের একটি নিগূঢ় যোগসূত্র। ’চরৈবেতি ররৈবেতি’- চলো, চলো, চলো। প্রভাতের আলোর মতো চলো, পাখির গানের মতো চলো, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো চলো। অনাদ্যন্ত গতিমুখরতাই এই সৃষ্টির মর্মরহস্য। আমাদের অন্তরের মর্মবাণীও তো তাই। কত অজ্ঞাত দেশ-দেশান্তর, কত বিচিত্র মানব-সমাজ, তাদের কত বিচিত্র জীবনধারা- কিছুই আমাদের দেখা হলো না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কত অফুরন্ত পসরা নিয়ে কত নাম-না-জানা ভূখণ্ড কত যুগ ধরে অধীর আগ্রহে আমাদের প্রতীক্ষায় আছে। তার আকর্ষণে আমরা গৃহপ্রাচীরের আবেষ্টনী মুক্ত হয়ে, সুদূরের অনন্ত আহ্বানে সাড়া দেবার জন্যে ছুটে চলি মহাবিশ্বের সৌন্দর্য-রোমাঞ্চিত মুক্তাঙ্গনে।

এরই মধ্যে দেশের পায় সবকটি বিভাগই ঘুরেছি আমি। বগুড়ার মহাস্তানগড় দেখে আমি জেনেছি আমার দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতার নব নব রূপায়ণ। ইতিহাস ও ভূগোলের প্রত্যক্ষ এবং অবারিত সান্নিধ্যে দাঁড়িয়ে আমি প্রত্যক্ষ করেছি এক অপার আনন্দ, অনন্ত মুক্তি। এই আনন্দ এবং অপরিমেয় মুক্তির স্বাদ দেশভ্রমণেরই পরম অবদান। যারা দিগ্বিজয় করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, সেই শক্তিমদমত্ত হতভাগ্যের দল এই আনন্দ ও মুক্তির আস্বাদ থেকে বঞ্চিত।

আমরা স্কুল ও কলেজে ভূগোল-ইতিহাস পড়ি, কিন্তু পৃথিবী মানে তো আর মানচিত্রের কয়েকটি মৃত রেখা নয়, দেশ মানেও নয় ভূগোলের নিষ্প্রাণ বিবৃতি। পৃথিবী বহু মানুষের কলরব-মুখরিত, সজীব-সুন্দর বিচিত্র বিস্ময় এই দেশ রক্তমাংসের মানুষের হাসিকান্নার সংমিশ্রিত শ্যামল-শোভন প্রাণোচ্ছল ভূখণ্ড। তাই কেবল ইতিহাস আর ভূগোল পাঠই জ্ঞান লাভের পরিপূর্ণতা আনতে পারে না, তার জন্যে প্রয়োজন দেশভ্রমণ। অবাধ উন্মুক্ত আকাশের নিচে জীবন্ত দেশটি দেখে, তার অধিবাসীদের প্রত্যক্ষ স্পর্শ লাভ করা, সেই জ্ঞানই তো প্রকৃত জ্ঞান।

মানুষ দিনের পর দিন তার অভ্যস্ত বাসগৃহের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের মধ্যে বন্দী থেকে হাঁপিয়ে ওঠে। একসময় সে সেই চার দেয়ালের স্বচরিত কারাগার থেকে খোঁজে মুক্তি। মানুষ বৃহতের সন্তান। সে বৃহতের মধ্যে দেখতে চায় নিজেকে। আমিও আমাকে দেখতে চাই, জানতে চাই। ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতার কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতির অবারিত সান্নিধ্যে স্থাপিত তীর্থস্থানগুলোর পাদপীঠতলে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করেছি এ অনির্বচনীয় আনন্দ। বহু মানবের পবিত্র স্পর্শ লাভ করে আমার ঘটেছে নবজন্ম। যুগযুগান্তরে মানুষের তীর্থ ভ্রমণের গোপন রহস্য এইখানেই।

ভ্রমণের নেশাই গতির নেশা, এই গতির নেশা আমার রক্তে দিয়েছে দোলা। এখন গৃহবন্দী জীবনের সুখ আমার কাছে মিথ্যা, রুটিন-বাঁধা জীবনাচরণ মিথ্যা। যাঁরা স্মরণীয় পরিব্রাজক, তাঁরা এই গতির নেশায় জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অজানিতের পথে পাড়ি দিয়ে ’দুর্গম গিরি, কান্তার মরু দুস্তর পারাপার’ লঙ্ঘন করে দেশ-দেশান্তরে ছুটে গিয়েছেন। ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান পৃথিবীর দেশ-দেশান্তরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সম্যক পরিচয় লাভের জন্যে দূর অজানা বন্ধুর পথে জীবনকে বাজি রেখে দুর্বার পাড়ি দিয়েছিলেন। ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাস, লিভিংস্টোন, ক্যাপ্টেন কুক, মার্কোপোলো প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকের দুঃসাহসিক পর্যটনের ফলে আজ পৃথিবীর বহু দুর্গম দেশ-দেশান্তর মানুষের জ্ঞানের পরিধির মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে। তাঁদের দুর্বার দেশ পর্যটন ও আবিষ্কার-যাত্রার ফলে পৃথিবীর কত নামহীন গিরি-নদ, কত অজানা অরণ্য-জনপদ, কত বালুকাময় মরুভূমি ও কত তুষারাচ্ছন্ন মেরুপ্রদেশ আবিষ্কৃত হয়ে আজ মানুষের জ্ঞান-ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

অতীতকালে দেশভ্রমণ ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। বর্তমানে পথ ও পরিবহনের নানা সুবিধার ফলে দেশভ্রমণ হয়েছে আগের চেয়ে অনেক সহজ। দেশ-দেশান্তরে রেলপথ বিস্তৃত রয়েছে, প্রস্তুত হয়েছে বিশালকায় সেতু। রেল, মোটর, এরোপ্লেন ইত্যাদির প্রচলন হওয়ার ফলে পথের বাধা-বিপত্তিও প্রায় উধাও। ভ্রমণ ব্যাপারে সাহয্য করার জন্যে ‘টুরিস্ট ব্যুরো’ স্থাপিত হয়েছে। সেখানে পর্যটন স্থান সম্পর্কে বিশদ বিবরণ, পথের বর্ণনা, মানচিত্র ইত্যাদি প্রকাশ করে ভ্রমণার্থীদের নানাভাবে সাহায্য করা হয়।

বর্তমানকালে দেশভ্রমণ শিক্ষার একটি অপরিহার্য অঙ্গরূপে স্বীকৃত। দেশ-দেশান্তরের ভৌগোলিক পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সেখানকার নরনারীদের সভ্যতা, সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ দেশভ্রমণের মাধ্যমেই সম্ভব। আনন্দ লাভই দেশভ্রমণের একমাত্র ফলশ্রুতি নয়। মনের প্রসারতা, হৃদয়ের ব্যাপ্তি এবং সেই সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে অখণ্ড সংহতি সৃষ্টিও দেশভ্রমণের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের মধ্যস্থতায় বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যে অখণ্ড ভাব-সংহতি গড়ে ওঠে তা জাতীয় সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে, জাতীয় সংহতির পক্ষে ও মানবিক সৌহার্দ্যবোধের উন্মেষের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সারা পৃথিবীতেই দেশভ্রমণের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। রাষ্ট্রসংঘও দেশভ্রমণকে ‘বিশ্বশান্তির ছাড়পত্র’ অভিহিত করে বিশ্ববাসীর কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। তাই আজ পৃথিবীর দেশে দেশে লাখ কোটি ভ্রমণবিলাসীর দল বিশ্বের অজানা অচেনাকে জানবার জন্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ছে দিকে দিকে। অজানিতের পথে পাড়ি দেবার জন্যে সুদূর বিশ্ব তাই আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে:
’উত্তর মেরু মোরে ডাকে, ভাই, দক্ষিণ মেরু টানে।’

সেই আকুল আহ্বানে সাড়া দেবার জন্যে সংকীর্ণ গৃহকোণ ছেড়ে আমি চাই অনন্ত বিশ্বের পথে পাড়ি জমাতে। আমি হতে চাই চিরকালের অক্লান্ত পথিক।

2 comments:


Show Comments