বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

↬ পরিবেশ দূষণ ও নিয়ন্ত্রণ

↬ পরিবেশ ‍দূষণ ও বাংলাদেশ

↬ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

↬ পরিবেশ ও জীবন

↬ আমাদের পরিবেশ সমস্যা

↬ পরিবেশ সংরক্ষণ

↬ মানব জীবনে পরিবেশের প্রভাব

↬ বাংলাদেশের পরিবেশ সমস্যা এবং সমাধান


ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বে পরিবেশগত সমস্যা একটি মারাত্মক সমস্যা। একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাই, নিজেদের অবহেলার কারণেই প্রতিদিন আমরা চারপাশে তৈরি করছি বিষাক্ত পরিমণ্ডল এবং নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছি এক নিঃশব্দ বিষক্রিয়ার মধ্যে। ফলে পরিবেশের মারাত্মক অবনতি ঘটছে, যা আমাদের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ।

বাংলাদেশের পরিবেশ ধ্বংসকারী বিভিন্ন মাধ্যম বা উপাদান : এক সময় বাংলাদেশ ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি, এর মাঠ-ঘাট, পাহাড়, নদী-নালা, বায়ু সবকিছুই ছিল বিশুদ্ধ আর নির্মল। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় মানুষের তথা প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার পরিবেশের প্রধান তিনটি উপাদান, যথা-মাটি, পানি ও বায়ু নানা উপায়ে দূষিত হচ্ছে; এ দূষণ আমরা ঘটাচ্ছি কখনো জেনে আবার কখনো না জেনে। যে সকল বিভিন্ন উপায় বা মাধ্যমে বাংলাদেশের পরিবেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয় সেগুলো নিম্নে আলোচিত হলো :

১. পলিথিন : বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও তা রূপ পরিবর্তন করে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পলিথিন নামক এ বিপদজনক দ্রব্যটির যাত্রা শুরু হয় আশির দশকের গোড়ার দিকে। বর্জ্য হিসেবে পলিথিন এই সভ্যতার এক ভয়াবহ শত্রু। বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সাবধান বাণী থাকা সত্ত্বেও পলিথিন সামগ্রীক ব্যবহার এ দেশে বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। পলিথিন এক অবিনাশী বর্জ্য, যেখানেই ফেলা হোক না কেন এর শেষ নেই। পোড়ালে এই পলিথিন থেকে যে ধোঁয়া বের হয় তা-ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে ২০০২ সালের ১ মার্চ সরকার সারা দেশে পলিথিনের শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছে।

২. বন উজাড় : যে কোনো দেশের পরিবেশে বনভূমি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বনভূমির ওপর দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য বহুলাংশে নির্ভরশীল। কোনো দেশে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য দেশের বনভূমির পরিমাণ ১০ শতাংশেরও কম। সরকারি হিসেবে বনভূমির পরিমাণ ১৭.৫ শতাংশ। বনভূমি উজাড় আমাদের দেশের পরিবেশগত সমস্যার অন্যতম কারণ।

৩. পানিতে আর্সেনিক : দেশের অনেক অঞ্চলে খাবার পানিতে আর্সেনিকের মতো মারাত্মক রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তথ্যটি যে কোনো নাগরিকের জন্য উদ্বেগজনক বিষয়। কারণ আর্সেনিক সরাসরি পাকস্থলীতে গেলে সাথে সাথে মৃত্যু ঘটতে পারে।

৪. শব্দদূষণ : শব্দদূষণ বর্তমান সময়ে এক মারাত্মক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা এখন বাস করছি হাইড্রোলিক হর্ন নামে এক ভয়ঙ্কর শত্রুর সঙ্গে, যার উৎকট আওয়াজ প্রতিদিন একটু একটু করে চাপ বাড়াচ্ছে আমাদের কানের পর্দার ওপর এবং ক্ষয় করে দিচ্ছে আমাদের শ্রবণ ক্ষমতাকে। এছাড়া আমাদের শ্রবণযন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য রয়েছে মাইকের আওয়াজ ও কলকারখানার শব্দ। এর ফলে আরো ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিরও সৃষ্টি হচ্ছে। এ শব্দদূষণ আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয়কে আরো ঘনীভূত করছে।

৫. রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার : ভালো ও উন্নত জাতের ফসল ফলানোর জন্য এবং কীটপতঙ্গের হাত থেকে ফসলকে রক্ষার জন্য কৃষকরা অপরিকল্পিতভাবে এবং কীটপতঙ্গের হাত থেকে ফসলকে রক্ষার জন্য ব্যবহার করছে। এগুলো অতিমাত্রায় ব্যবহারের দরুন জীবজগৎ, প্রাণিজগৎ এবং পরিবেশ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব : ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ ও অবাধে বৃক্ষ নিধন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতার অভাবে আমাদের বর্তমান পরিবেশ আজ বসবাজের অযোগ্য হয়ে উঠেছে। কল-কারখানা এবং যানবাহনের নানা রকম ক্ষতিকারক গ্যাস, ইটের ভাটা কালো ধোঁয়া, শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য প্রভৃতির কারণে বাংলাদেশের পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকীর সম্মুখীন। অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে যাচ্ছে দ্রুত, বাড়ছে সিসার পরিমাণ, বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির পক্ষীকুল ও বনজ প্রাণী। নদীতে পানি দূষণের ফলে ধীরে ধীরে মাছের সংখ্যা কমে আসছে। ফলশ্রুতিতে পরিবেশ হচ্ছে দূষিত, হারিয়ে ফেলছে এর ভারসাম্য।

পরিবেশ সমস্যার সমাধান : পরিবেশ সমস্যা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। তাই এই সমস্যার সমাধান আশু প্রয়োজন। নিচে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ সমস্যার সমাধান আলোচনা করা হলো :

১. বনায়ন : পরিবেশ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বনায়ন বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই পরিবেশ দূষণের মরণ ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বনায়ন করা দেশের সচেতন প্রত্যেকটি নাগরিকের কর্তব্য।

২. শব্দদূষণ রোধ : হাইড্রোলিক হর্ন এবঙ যত্রতত্র মাইক বাজানোর বিরুদ্ধে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে শব্দদূষণের কবল থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন করা হলেও বর্তমানে তা কাগুজে বাঘ হয়ে আছে। সুতরাং বর্তমান সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থে শব্দদূষণ রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৩. পলিথিন বর্জন : পলিথিন পরিহার করা পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে দেশের প্রতিটি মানুষের কর্তব্য। নব্বই সালের গোড়ার দিকে দেশে পলিথিন উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে তৎকালীন সরকার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু পরে রাজনৈতিক জটিলতা এবং ভোট নষ্ট হবার আশঙ্কায় সিদ্ধান্তটির মৃত্যু ঘটে। সম্প্রতি পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও এর ব্যবহার কমবেশি এখনো চলছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে আরো কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।

৪. পরিবেশ আইনের প্রয়োগ : প্রত্যেক দেশের মতো আমাদের দেশেও পরিবেশ রক্ষার জন্য বেশ কিছু আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর যদি পরিবেশ আইন যথাযথ বাস্তবায়ন করে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের সমস্যা সম্পর্কে অধিক প্রচারণা চালায় ও জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে তাহলে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমরা অনেকটা নিরাপদ থাকতে পারব বলে বিশ্বাস।

৫. সচেতনতা বৃদ্ধি : পরিবেশ বিপর্যয়ের সমস্যা সামগ্রিকভাবে একটি দেশের জাতীয় সমস্যা। কাজেই এই সমস্যা থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ আইনই যথেষ্ট নয়, এজন্য দরকার দেশের সমগ্র জনগণের চেতনাবোধ। দেশের জনগণ যদি পরিবেশ বিপর্যয়ের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে পরিবেশ বিপর্যয়ের কবল থেকে আমরা অতি সহজেই নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারব।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশ বিপর্যয়ের মতো নিঃশব্দ শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদের এখনই উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। তাই বর্তমান সরকারের উচিত রাজনৈতিক দক্ষতা, সকলের ম্যান্ডেট আর সমন্বিত প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কাজে লাগিয়ে বিপন্ন পরিবেশের মরণ ছোবল থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর স্বদেশভূমি নিশ্চিত করা।


[ একই রচনা আরেকটি বই থেকে সংগ্রহ করে দেয়া হলো ]


ভূমিকা : সারা পৃথিবী জুড়ে ঘনিয়ে আসছে পরিবেশ সংকট। মানুষের সৃষ্টি যন্ত্রসভ্যতার গোড়াপত্তন থেকেই চলছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মানুষের নির্মম কুঠারাঘাত। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ভোগলালসা চরিতার্থ করার জন্যে বিচার-বিবেচনাহীন মানুষ দূষিত করছে জীবনের অপরিহার্য উপাদান পানি ও বায়ু। মারাত্মক পানি দূষণ ও বায়ু দূষণ নিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আজ উদ্বীগ্ন। এ থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। এ ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে জাতিসংঘ ৫ই জুনকে ঘোষণা করেছে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে।

পরিবেশ দূষণের কারণ : পরিবেশ দূষণের কারণ অগণিত। তবে মূল কারণসমূহ হচ্ছে : অপিকল্পিত নগরায়ন ‍ও শিল্পায়ন, জনসংখ্যার লাগামহীন বৃদ্ধি এবং আদিপ্রাণ বৃক্ষ আর বনভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার। এটা সত্য যে উনিশ শতকে শিল্প বিপ্লবের দ্রুত অগ্রগতির ফলে ভোগবিলাসী ও লোভে ব্যাকুল মানুষ দস্যুর মতো লুণ্ঠন করতে থাকে নিজের ও পৃথিবীর নানা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ। ঔপনিবেশিক শাসন আর শোষণ এই প্রক্রিয়াকে করেছে আরো বেগবান। প্রাকৃতিক সম্পদের এই যথেচ্ছ ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্যকে করেছে বিনষ্ট। পরিবেশ দূষণের আর একটি কারণ পৃথিবীর বুকে জনবসতি বৃদ্ধি। এর ফলে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাহিদার চাপ পড়েছে প্রচণ্ডভাবে। খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র, কর্মসংস্থান ইত্যাদির পরিমাণ বর্ধিত জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় ভূমিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে চাষের তীব্রতা, ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃত্রিম সার ও কীটনাশকের। এতে বিনষ্ট হচ্ছে চাষযোগ্য ভূমির সঞ্জীবনী শক্তি, অন্যদিকে নতুন নতুন বসতি আর কলকারখানা স্থাপনের মধ্য দিয়ে ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে চাষযোগ্য ভূমি ও প্রতিদিন নদী, হ্রদ, সমুদ্রে মিশছে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্যদ্রব্য। মাটি, পানি, বাতাস এবং আমাদের চারপাশের উদ্ভিদ ও প্রানীজগতের ওপর বিষক্রিয়ার প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ হয়ে উঠছে ভারসাম্যহীন, দূষিত ও বসবাস অযোগ্য।
শিল্প-কারখানার বর্জ্য, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসের সাথে মিশে সৃষ্টি করছে বায়ু দূষণ। তাছাড়া এর ফলে বাতাসে অতি প্রয়োজনীয় ওজেন স্তরে ধরেছে ফাটল, ফলে সূর্যের অতি বেগুণী রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছে যাবে যার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ।
সমগ্র পৃথিবীতে শিল্প-কারখান থেকে বছরে প্রায় বিশ কোটি টন বিষাক্ত গন্ধকের ধোঁয়া বাতাসে মিশছে। এসব গন্ধকের ধোঁয়া বাতাসের জলীয় অংশের সাথে মিশে সালাফিউরিক এসিডে পরিণত হয়। যা বৃষ্টির সাথে এসিড বৃষ্টি নামে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে ইতোমধ্যে এসিড বৃষ্টির মাত্রা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মানুষ তার পৃহনির্মাণ, শিল্প-কারখানার কাঁচামাল ও জ্বালানী কাঠের প্রয়োজনে প্রতিদিন উজাড় করছে বনভূমি। শিল্পের জ্বালানী হিসেবে কাঠ কয়লার প্রয়োজনে মানুষ অনেক সময় অবৈধভাবে বনভূমিতে আগুন ধরিয়ে সংগ্রহ করে কাঠ কয়লা। সমগ্র পৃথিবীতে জনসংখ্যার অত্যধিক বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এসব উপযোগের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন হ্রাস পাচ্ছে মুক্তভূমি ও বনাঞ্চল। যার নেতিবাচক প্রভাব পরিবেশ দূষণকে করছে তরান্বিত।
পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আশঙ্ক্ষা করছেন বাতাসে যদি কার্বন ডাই-অক্সাইড ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে আর তার ফলে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের গড় তাপমাত্রা যদি ২° সে. বৃদ্ধি পায় তাহলে উত্তর সাগরের বরফ গলে উঁচু হয়ে উঠবে সাগরের পানি। আর বহু কোটি টন কয়লার ধোঁয়া আর ধুলোবালি যদি প্রাণদায়ী সূর্যালোককে পৃথিবীতে পৌঁছতে বাধা দেয় তবে তার ফলাফলও হবে ভয়াবহ। যদি এ কারণে পৃথিবীতে আলো আসার পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় ১.৫% থেকে ২% ভাগও কমে যায় তাহলে ক্রমে মেরু অঞ্চলের চিরস্থায়ী বরফ ছড়িয়ে পড়বে বিষুব অঞ্চল পর্যন্ত। আর পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে প্রবল শীতের মৃত্যু পরশ।
পরিবেশ দূষণের জন্যে মূলত পাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত দেশগুলোই দায়ী। দূষণ মাত্রার পরিসংখ্যান যোগ করলে দেখা যাবে প্রায় ৭০% - ৮০% পরিবেশ দূষণের জন্যে শিল্পোন্নত দেশগুলো নিজেরাই দায়ী। কিন্তু আমরা ভুলতে বসেছি যে, পরিবেশের বিপর্যয় এককভাবে কোনো দেশ বা ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের জন্যে নির্দিষ্ট নয়। এটা সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে দেবে।

পরিবেশ দূষণ সমস্যা ও বাংলাদেশ : নদী মাতৃক বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক জীবন স্বভাবতই মানুষকে করেছে প্রকৃতি ও পরিবেশপ্রেমী। কিন্তু সীমিত ভূখণ্ড ও সম্পদ এবং তুলনামূলকভাবে অতি ঘন জনবসতি ও দুর্যোগপ্রবণ ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের মানুষকে পরিণত করেছে পরিবেশের শিকারে। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে :

(১) জনবিষ্ফোরণ : জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে বাংলাদেশে মুক্তাঞ্চল ও বনভূমির পরিমাণ কমছে। বাসস্থান ও চাষের জমির ওপর বিপুল চাপ পড়ায় জলাভূমি ভরাট করেও ব্যবহার করা হচ্ছে। মাছের আবাসস্থল নষ্ট হওয়ায় গ্রামবাসী প্রোটিন ঘাটতির শিকার হচ্ছে।

(২) সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার : ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে জমিতে ব্যাপক হারে সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে মাটির দূষণ ঘটছে এবং জমির গুণ নষ্ট হচ্ছে। এই সব রাসায়নিক উপাদান বৃষ্টিতে ধুয়ে নদী ও জলাশয়ের পানিতে মিশে গিয়ে জলজ উদ্ভিদ ও প্রানীর মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।

(৩) শিল্প দূষণ : বাংলাদেশের অধিকাংশ কারখানার অবস্থান নদীর তীরে। এসব কলকারখানা থেকে নিঃসৃত তরল রাসায়নিক বর্জ্য পানিকে কেবল দূষিত করছে না, আমিষের অপার ভাণ্ডার মাছের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কলকারখানার নির্গত ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করছে। তা জনস্বাস্থ্যের জন্যেও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

(৪) বন উজাড়করণ : পরিবেশ রক্ষার জন্যে দেশে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারি হিসেবে ১৬ শতাংশ হলেও বাস্তবে ৯ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে প্রতি বছর উজাড় হচ্ছে ১.৪ শতাংশ। ফলে ভূমিক্ষয়ের মাত্রা বাড়ছে, বন্যা প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দেশের গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে।

(৫) ডিপ-টিউবওয়েল স্থাপন : সাম্প্রতিক কালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ডিপ-টিউবওয়েল স্থাপন ও ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে চলে যাচ্ছে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ছে। প্রকট হচ্ছে পানিতে আর্সেনিক দূষণের সমস্যা।

(৬) আবর্জনা সমস্যা : শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণ এবং পরিকল্পিত ময়লা আবর্জনা ফেলার স্থান না থাকায় যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়। এসব ময়লা আবর্জনার পঁচা গ্যাস বায়ু দূষণ সৃষ্টি করে।

(৭) ভূমির অপর্যাপ্ততা : পাহাড় কেটে বসতবাড়ি তৈরি করায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শহরের ভাসমান মানুষ ও বিপুল বস্তিবাসীর চাপেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

প্রতিকার : আমাদের দেশে পরিবেশ দূষণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে সেগুলো হলো : পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে এবং গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। দেশের মোট আয়তনের নূন্যতম ৫০% এলাকায় বনায়ন করতে হবে। বর্তমান জ্বালানী পরিবর্তন করে বাতাস, সৌর ও পানি বিদ্যুতের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানীর প্রচলন করতে হবে। বন উজাড়করণ ও ভূমিক্ষয় রোধ করতে হবে। শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালী বর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। বর্জ্য থেকে সংগৃহীত গ্যাস জ্বালানী হিসেবে এবং পরিত্যক্ত পদার্থটি সার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে হবে এবং পরিবেশসম্মত কৃষি ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধের কাজকে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ দিতে হবে। শিল্প-কারখানাগুলো আবাসিক এলাকা থেকে দূরে স্থাপন করতে হবে। শিল্পে এবং যানবাহনে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ ব্যবহার রোধ করতে হবে এবং অল্প জ্বালানীতে অধিক কার্যকর যন্ত্র আবিষ্কার করতে হবে। এছাড়াও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোধ ও শিক্ষার হার বাড়ানো, যে-কোনো পরিকল্পনার পূর্বে তার পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ এবং বাঁধের পাশে বনায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এবং ব্যাপক আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
সরকার পরিবেশ সংরক্ষণে অত্যন্ত প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে জাতীয় পরিবেশ নীতিমালা অনুমোদিত হয়েছে। ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যে ২০ বছর মেয়াদি বন মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানী কাঠ সরবরাহ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহ, দারিদ্র্য বিমোচন ও আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণ রোধে পদক্ষেপ : জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) ও বিজ্ঞানীদের সময়োচিত তৎপরতায় ১৯৮৭ সালে কানাডায় মন্ট্রিল প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রটোকলের আওতায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী বস্তুসমূহের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে। ১৯৯২ সালে ৩রা ও ১৪ই জুন ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ‘ধরিত্রী শীর্ষ সম্মেলনে’ পরিবেশের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের যোগসূত্র খুঁজে বের করা হয়। এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয় প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র অভিযাত্রী ইয়ান জিয়েনান সমুদ্র দূষণ প্রত্যক্ষ করে ১৯৯৩ সালে ‘বিশ্ব পরিচ্ছন্ন আন্দোলন’-এর সূত্রপাত করেন। জাতিসংঘ পরিবেশ বিভাগের সহায়তায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২০টি দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ এ অভিযানে শরিক হয়।

পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যক্তিগত ভূমিকা : প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশ বিদূষণ নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি, যার সামগ্রিক অবদান হবে বিরাট। আমাদের কাজ হবে:

(১) পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা : যত্রতত্র বর্জ্য বা আবর্জনা না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা;

(২) সম্পদ সংরক্ষণ : পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ব্যবহারে যথাসম্ভব সাশ্রয়ী হওয়া এবং খাদ্যদ্রব্যসহ সব ধরনের সম্পদের অপচয় কমানো। সব ধরনের বিলাসিতা বর্জনের চেষ্টা;

(৩) ক্ষতিকর সিনথেটিক বর্জন : পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় যেসব দ্রব্য প্রকৃতিতে আপনা আপনি ক্ষয় না হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে সেগুলো বর্জন করা এবং এর পরিবর্তে পাট জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করা;

(৪) নবায়ণযোগ্য শক্তির ব্যবহার : কাঠ, কয়লা, তেল ইত্যাদি যেসব জ্বালানি পরিবেশের দূষণ ঘটায় সেগুলো যথাসম্ভব কম ব্যবহার করা এবং তার পরিবর্তে সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করা;

(৫) উন্নত ও দূষণমুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার : ঘরবাড়ি কিংবা কলকারখানায় যথাসম্ভব দূষণহীন প্রযুক্তি ব্যবহার না করা;

(৬) বেশি বেশি গাছ লাগানো : পরিবেশ সংরক্ষণের জন্যে যথাসম্ভব বেশি বেশি গাছ লাগানো।

উপসংহার : পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্ব কেবল সরকার, বা কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি-বিশেষের নয়, এ দায়িত্ব সকল বিশ্ববাসীর, প্রতিটি ব্যক্তির। যারা অজ্ঞতাবশত পরিবেশ দূষণে যুক্ত হচ্ছেন তাদের যেমন সচেতন করা প্রয়োজন তেমনি যারা অতি মুনাফার লোভে জেনে শুনেও পরিবেশের তোয়াক্কা করছেন না তাদের কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও পরিকল্পনার নীতি কর্মসূচির মধ্যে থাকতে হবে। বিরল সম্পদ রক্ষার জন্যে বিকল্প উপায় উদ্ভাবন এবং পরিবেশের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহার।

26 comments:


Show Comments