প্রবন্ধ রচনা : যে জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে সেই জঙ্গলের পাখিদের কথপোকথন
| Article Stats | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 1,006 words | 6 mins to read |
Total View 4 |
|
Last Updated 10 hours ago |
Today View 0 |
বিপন্ন অরণ্য: ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে পাখিদের কথপোকথন
ভূমিকা
অরণ্য হলো পৃথিবীর ফুসফুস, আর পাখিরা হলো সেই অরণ্যের প্রাণভোমরা। একটি সবুজ বনানী শুধু কাঠ বা পাতার সমষ্টি নয়, এটি লক্ষ লক্ষ প্রাণীর এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যুগের পর যুগ ধরে প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই অরণ্যগুলো আজ মানুষের সীমাহীন লোভ এবং আগ্রাসনের শিকার। নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং তথাকথিত উন্নয়নের নামে প্রতিদিন উজাড় হয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল সবুজ বনভূমি। যখন একটি জঙ্গল কেটে ফেলা হয়, তখন শুধু কিছু গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে না, বরং ধ্বংস হয় হাজারো পাখির বাসা, তাদের স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার অধিকার। মানুষের এই নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হয়ে থাকে বনের নির্বাক গাছপালা আর অসহায় পশুপাখি। আজ আমরা এমন একটি জঙ্গলের গভীরে কান পাতব, যেখানে যান্ত্রিক করাতের তীক্ষ্ণ শব্দের মাঝেও শোনা যাচ্ছে পাখিদের চাপা কান্না ও আর্তনাদ। ধ্বংসের ঠিক পূর্বমুহূর্তে সেই জঙ্গলের পাখিদের কথপোকথন আমাদের মানবসভ্যতার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।
পটভূমি: এক আতঙ্কিত সকাল
ভোরের আলো সবেমাত্র ফুটতে শুরু করেছে। প্রতিদিন এই সময়ে কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো জঙ্গল। কিন্তু আজকের সকালটা অন্যরকম। আজ কোনো পাখির কণ্ঠে ভোরের আগমনী গান নেই। বনের একেবারে পূর্ব দিকের সীমানায় এক ভয়ংকর যান্ত্রিক দানব—বুলডোজার আর ইলেকট্রিক করাতের গর্জন শোনা যাচ্ছে। বিশালাকার শতবর্ষী শাল, সেগুন আর কড়ই গাছগুলো একে একে প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ছে মাটিতে। বনের ঠিক মাঝখানে থাকা একটি প্রাচীন বটগাছের ডালে এসে জড়ো হয়েছে জঙ্গলের সব পাখি। তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। ডানা ঝাপটানোর অস্থিরতা আর ভীত কণ্ঠের আওয়াজে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। এই বটগাছটি তাদের শেষ আশ্রয়, কিন্তু সবাই জানে এই আশ্রয়ও আর বেশিক্ষণ টিকবে না।
পাখিদের আর্তনাদ ও কথপোকথন
সবুজ টিয়া: (অস্থিরভাবে ডানা ঝাপটে) তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ? ওই ভয়ংকর আওয়াজটা ক্রমশ আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে! কাল সকালেই তো দেখলাম পুব দিকের আমবাগানটা ওরা পুরোপুরি সাফ করে দিল। আমার ভাইটার বাসা ছিল ওখানে। কাল থেকে ওকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা এখন কোথায় যাব?
বৃদ্ধ প্যাঁচা: (চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আমি এই জঙ্গলে অনেক বছর ধরে আছি। আমার দাদাও এই বটগাছের কোটরেই থাকতেন। একসময় এই জঙ্গল ছিল অনেক বড়। ওই দূরে যে নদীটা শুকিয়ে গেছে, ওখান থেকে শুরু করে পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত শুধু সবুজ আর সবুজ ছিল। মানুষ তখন এই জঙ্গলকে ভয় পেত, সম্মান করত। কিন্তু এখন তাদের হাতে বড় বড় সব মারণাস্ত্র। তারা কংক্রিটের জঙ্গল বানানোর লোভে আমাদের আসল জঙ্গলকে খুন করছে। আমাদের আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, টিয়া।
মা শালিক: (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) আমার ছানাগুলো সবেমাত্র ডিম ফুটে বেরিয়েছে। ওদের পাখা গজায়নি এখনো, উড়তেও শেখেনি। আমি ওদের কীভাবে বাঁচাব? কাল যখন শিমুল গাছটা কাটা পড়ল, আমি নিজের চোখে দেখেছি কতগুলো পাখির ডিম আর বাচ্চা মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। মানুষের কি একটুও মায়া নেই? ওদের কি কোনো সন্তান নেই?
কোকিল: (বিষণ্ণ সুরে) প্রতি বসন্তে আমি এই বনের শিমুল আর পলাশ ডালে বসে গান গাই। আমার গানে তো কখনো কারও ক্ষতি হয়নি। বরং গ্রামের মানুষ আমার গান শুনে আনন্দ পেত। এখন সেই গ্রামও নেই, মানুষগুলোও বদলে গেছে। তারা এখন যন্ত্রের শব্দ ভালোবাসে। আমার গানের গলা কি ওই যান্ত্রিক করাতের শব্দের চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ হতে পারে? আমি আর কখনোই গাইব না। যে বনে পলাশ ফোটে না, সেখানে কোকিলের গানের কোনো মূল্য নেই।
কাঠঠোকরা: (রাগের সাথে গাছের ডালে ঠোকর মেরে) আমার এই ঠোঁট দিয়ে আমি গাছের শক্ত ছাল ফুটো করতে পারি ঠিকই, কিন্তু মানুষের ওই লোহার কুড়ুলকে তো আটকাতে পারব না! আমরা কি কিছুই করতে পারি না? আমরা কি সবাই মিলে ওই মানুষগুলোকে আক্রমণ করতে পারি না? ওদের চোখগুলো ঠুকরে দিলে হয়তো ওরা আমাদের জঙ্গল কাটা বন্ধ করবে!
ঈগল: (উঁচু ডাল থেকে গম্ভীর কণ্ঠে) না কাঠঠোকরা, সেটা সম্ভব নয়। মানুষ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি চালাক আর শক্তিশালী। আমি অনেক উঁচু দিয়ে উড়েছি, আমি দেখেছি শহরের পর শহর কীভাবে গিলে খাচ্ছে আমাদের এই পৃথিবীটাকে। তুমি ওদের আক্রমণ করলে ওরা বন্দুক দিয়ে আমাদের সবাইকে শেষ করে দেবে। আমাদের লড়াইটা অসম। ওরা প্রকৃতিকে জয় করতে চায়, কিন্তু ওরা বোঝে না যে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে ওরা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছে। আমরা না থাকলে এই জঙ্গলের কীটপতঙ্গ বাড়বে, ফসল নষ্ট হবে, পরিবেশের ভারসাম্য হারাবে। কিন্তু মানুষের সেই দূরদৃষ্টি নেই।
চড়ুই: আমি তো মানুষের কাছাকাছি থাকতেই বেশি পছন্দ করি। কিন্তু ইদানীং শহরের বাড়িগুলোতে আমাদের জন্য কোনো ঘুলঘুলি বা ফাঁকফোকর রাখা হয় না। সব কাঁচ আর কংক্রিট দিয়ে ঘেরা। ওখানে আমাদের কোনো জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে এই জঙ্গলের প্রান্তে এসে বাসা বেঁধেছিলাম। এখন তো দেখছি এই শেষ আশ্রয়টুকুও তারা কেড়ে নিচ্ছে। আমরা এত ছোট প্রাণী, আমরা কোথায় যাব?
অরণ্য ধ্বংসের নীরব পরিণতি
পাখিদের এই কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ করে একটি বিশাল সেগুন গাছ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল বটগাছটির খুব কাছেই। ধুলোর মেঘে ঢেকে গেল চারপাশ। পাখিরা ভয়ে আর্তনাদ করে আকাশে উড়ে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এল সেই চেনা ডালে। কারণ, তাদের উড়ে যাওয়ার মতো আর কোনো নিরাপদ অরণ্য নেই। চারদিকে শুধু ইট-পাথরের মরুভূমি।
মানুষ হয়তো ভাবছে তারা জঙ্গল কেটে কাঠ পাচ্ছে, নতুন নতুন কারখানা বা আবাসন প্রকল্প তৈরি করছে, এতে দেশের অর্থনীতি মজবুত হচ্ছে। কিন্তু এই তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে যে এক বিশাল পরিবেশগত বিপর্যয় লুকিয়ে আছে, তা তারা জেনেও এড়িয়ে যাচ্ছে। পাখিরা শুধু বনের সৌন্দর্যই বাড়ায় না; তারা পরাগায়ন ঘটায়, বীজ ছড়ায়, এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে বনের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমকে টিকিয়ে রাখে। আজ যখন একটি বন ধ্বংস হচ্ছে, তখন শুধু কিছু পাখি গৃহহীন হচ্ছে না, বরং এই পুরো পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। পাখিদের এই হাহাকার আসলে পুরো মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশুভ সংকেত।
উপসংহার
দিন গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। করাতের শব্দ এখন একেবারে বটগাছটির গোড়ায় এসে পৌঁছেছে। পাখিরা জানে, আর মাত্র কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। এরপর এই শতবর্ষী বটগাছটিও লুটিয়ে পড়বে মাটিতে। তাদের ডিম, ছোট ছানা এবং বহু স্মৃতিতে ঘেরা বাসাগুলো মিশে যাবে ধুলোয়। ওরা উড়াল দেবে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে, যেখানে হয়তো কোনো একদিন বিষাক্ত ধোঁয়া আর খাবারের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে তারা।
পাখিদের এই নীরব অশ্রু আর আর্তনাদ মানুষের কানে পৌঁছায় না। মানুষ তার অহংকার আর লোভের বশবর্তী হয়ে নিজেকে পৃথিবীর সর্বেসর্বা মনে করে। কিন্তু যেদিন এই পৃথিবীর শেষ গাছটি কাটা পড়বে, শেষ পাখিটি মারা যাবে এবং শেষ নদীটি বিষাক্ত হয়ে উঠবে, সেদিন মানুষ বুঝতে পারবে যে টাকা খেয়ে বেঁচে থাকা যায় না। অরণ্যের এই পাখিদের কথপোকথন আমাদের একটি চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—প্রকৃতি ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব অসম্ভব। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে পাখিদের এই করুণ পরিণতি একদিন পুরো মানবসভ্যতার দরজায় এসে কড়া নাড়বে। বনের ওই পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ যেন আমাদের বিবেকের কাছে এক চূড়ান্ত প্রশ্ন রেখে যায়—"আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটাকে তোমরা আর কতটা ধ্বংস করবে?"
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (0)