প্রবন্ধ রচনা : জিয়াউর রহমান : জীবন, কর্ম ও অবদান
| History | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Published 25-Mar-2026 | 12:18 PM |
Total View 47 |
|
Last Updated 25-Mar-2026 | 12:46 PM |
Today View 0 |
১. ভূমিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশ পুনর্গঠনে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সফল সামরিক কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ তাঁকে ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তন, সার্ক গঠনের উদ্যোগ এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলেন।
২. জন্ম ও বংশ পরিচয়
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ, যিনি সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মাতা জাহানারা খাতুন ছিলেন একজন গৃহিণী ও ধর্মপ্রাণ নারী। জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল 'কমল'। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং শিক্ষানুরাগী।
৩. বাল্যকাল ও শিক্ষা জীবন
জিয়াউর রহমানের শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে বগুড়া এবং কলকাতায়। তাঁর পিতা কলকাতায় সরকারি চাকরিতে বদলি হওয়ায় সেখানে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি কলকাতার বিখ্যাত হেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তাঁর পরিবার পাকিস্তানের করাচিতে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে তিনি করাচি একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি করাচির ডি.জে. কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।
৪. সেনাবাহিনীতে যোগদান
ছাত্রজীবনে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও চৌকস। করাচির ডি.জে. কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই ১৯৫৩ সালে তিনি কাকুলস্থ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে (পিএমএ) ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন।
৫. সামরিক কর্মজীবন ও কৃতিত্ব
কমিশন লাভের পর জিয়াউর রহমান একজন সুশৃঙ্খল এবং দক্ষ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হন। তিনি ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা বিভাগেও বেশ কিছুদিন কাজ করেন। সামরিক ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ও শৃঙ্খলার কারণে তাঁকে কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সামরিক কৌশল ও নেতৃত্বে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।
৬. ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে জিয়াউর রহমান এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। এই যুদ্ধে তিনি খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসম সাহসিকতা ও রণকৌশলের কারণে তাঁর ইউনিট যুদ্ধে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে। এই যুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব 'হিলাল-ই-জুরাত' প্রদান করে।
৭. পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
১৯৬৯ সালে জিয়াউর রহমান মেজর পদে উন্নীত হন এবং তাঁকে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম জার্মানিতে যান। দেশে ফিরে আসার পর ১৯৭০ সালে তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে চট্টগ্রামের ষোলশহরে বদলি হন। এখানেই তিনি ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসের দিনগুলোর সাক্ষী হন।
৮. মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরীহ বাঙালিদের ওপর 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন চট্টগ্রামেও তার আঁচ লাগে। জিয়াউর রহমান তাঁর অধিনায়ককে বন্দী করে বিদ্রোহ করেন এবং "We revolt" বলে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৭শে মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তাঁর এই ঘোষণা অবরুদ্ধ ও দিশেহারা বাঙালি জাতির মনে ব্যাপক আশা ও সাহসের সঞ্চার করেছিল।
৯. সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্স গঠন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জিয়াউর রহমান প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জুন মাসে তাঁকে ১১ নম্বর সেক্টরের (ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল) দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর নির্দেশে তিনটি নিয়মিত ব্রিগেড গঠন করা হয়, যার মধ্যে জিয়াউর রহমানের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে 'জেড ফোর্স' (Z-Force) গঠন করা হয়। এই ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তিনি রৌমারী, চিলমারী, এবং কামালপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ যুদ্ধগুলোতে সরাসরি নেতৃত্ব দেন।
১০. মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব ও খেতাব লাভ
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সফল নেতৃত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার জিয়াউর রহমানকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব 'বীর উত্তম' প্রদান করে। জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সুশৃঙ্খল আক্রমণ ও রণকৌশল পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে এবং রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দৃঢ় রাখে।
১১. মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ভূমিকা ও সেনাবাহিনী প্রধান
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ (উপ-সেনাপ্রধান) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেনাবাহিনী গঠন ও শৃঙ্খলায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁকে ব্রিগেডিয়ার এবং ওই বছরের শেষের দিকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অফ আর্মি স্টাফ (সেনাপ্রধান) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১২. ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতা ও অরাজকতা দেখা দেয়। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী করা হয়। এরপর ৭ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থানে সাধারণ সিপাহী ও জনতা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে 'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস' হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনার পর জিয়াউর রহমান দেশের শাসনক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
১৩. রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ
৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নেন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
১৪. বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। তিনি ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) বাতিল করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তন করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে উন্মুক্ত রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রার যোগ করে।
১৫. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন
রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ এবং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল' (বিএনপি) গঠন করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে মূল ভিত্তি ধরে গঠিত এই দলটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৬. ১৯ দফা কর্মসূচি
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে তাঁর বিখ্যাত '১৯ দফা কর্মসূচি' ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং শিল্পের বিকাশ। এই ১৯ দফা কর্মসূচি পরবর্তীকালে তাঁর দলের রাজনৈতিক ইশতেহার ও উন্নয়ন দর্শনে পরিণত হয়।
১৭. খাল খনন ও কৃষি বিপ্লব
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কার্যকর উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি ছিল স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে 'খাল খনন কর্মসূচি'। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি সারা দেশে অসংখ্য খাল খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করতেন, যা সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করত। এর ফলে কৃষিখাতে উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
১৮. শিক্ষা ও গণসাক্ষরতা কর্মসূচি
নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য জিয়াউর রহমান গণসাক্ষরতা অভিযান শুরু করেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেন এবং গ্রামে গ্রামে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। দেশের যুব সমাজকে কাজে লাগানোর জন্য তিনি যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯. গ্রাম সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য জিয়াউর রহমান 'গ্রাম সরকার' ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সমস্যাগুলো স্থানীয়ভাবেই সমাধান করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করার জন্য 'গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী' (VDP) গঠন করা হয়।
২০. পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ জোর দেন, যার ফলে বাংলাদেশের জন্য জনশক্তি রপ্তানির বিশাল বাজার উন্মুক্ত হয়। একইসাথে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথেও তিনি কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে (NAM) এবং ওআইসিতে (OIC) বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।
২১. সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও উদ্যোগ
জিয়াউর রহমানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক অবদান হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা 'সার্ক' (SAARC) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। তাঁর এই স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে।
২২. মৃত্যু ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড
১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে একটি রাজনৈতিক সফরে যান। ৩০শে মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে সেনাবাহিনীর একাংশের এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তাঁর এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে গোটা দেশ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। ঢাকায় তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে, যা তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে। তাঁকে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে সমাহিত করা হয়।
২৩. উপসংহার
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন, যখন দেশ চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর সুদৃঢ় নেতৃত্ব, নিরলস পরিশ্রম এবং দেশপ্রেম বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত করেছিল। একজন সেক্টর কমান্ডার থেকে শুরু করে সফল রাষ্ট্রনায়ক—তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। মতাদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও, দেশের স্বাধীনতা ও উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য।
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (0)