মার্চের দিনগুলি

গভীর রাতের আর্তনাদ

রাত গভীর হতেই গ্রীণ সিটির দক্ষিণ দিক থেকে একটা রক্ত হীম করা চিৎকার ভেসে আসে। ব্যস... তারপরই আবার সব সুনসান নীরব। ভোরে যখন শহরের বুড়ো হ্যানসন জগিংয়ে বের হয় দূর থেকে দেখতে পায় কে যেন রাস্তায় পড়ে আছে! প্রথমে ভেবে ছিলো হবে হয়তো কোনো মাতাল। কাছে আসতেই সে থমকে দাঁড়ায় মুখ থেকে বেরিয়ে আসে চিৎকার। মুহুর্তের মধ্যে মানুষ জড়ো হয়। লাশ!!! হ্যাঁ, নিশ্চিত একটা লাশ। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে, ছবি তোলে, পরিচয় খোঁজে কিন্তু কিছু পায় না। শেরিফ সবাইকে বলে, “এটার আগেও দুটো খুন হয়েছে। কিন্তু কেসের সুরাহা করতে পারিনি। তাই কাউকে জানতে দেই নি। এবার বাধ্য হয়ে জানাচ্ছি।” 

এবার জনতার কানাকানি বেড়ে যায়। সেই কানাকানি ছাপিয়ে একটা মুখ বলে ওঠে, “আমি এই কেসের সুরাহা করে দিতে পারি।” গলাবদ্ধ কোট, পায়ে বুট জুতা, মুখে পাইপ আর চোখে কালো চশমা পড়া লোকটাকে কেউ কোনদিন এই শহরে দেখে নি। 

শেরিফ নাক কুঁচকে বলে, কোনো লাভ নেই। তবে আপনি চাইলে পুলিশের সাহায্য পাবেন। কিন্তু আপনার নামটা.............

আমি রবিনসন্স, বললো লোকটা।

মর্গে গিয়ে রবিনসন্স লাশটার দিকে তাকালো। গায়ে একফোঁটাও রক্ত নেই, গলায় দুটো কালচে দাগ। কর্মরত একজন নার্স রয়েছেন সেখানে। কাছে যাবার সময় একটা চেয়ারে বেঁধে পড়ে যাচ্ছিল রবিনসন্স। নিজেকে সামলালো। তবে চশমাটা পড়ে গেলো। তাড়াতাড়ি চশমা তুলে চোখে দিলো। কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে। নার্স যেন পাথরের মতো জমে গেলো। কি আশ্চর্য!!! লোকটার চোখ সবুজ, ঘন সবুজ। নার্সের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। রবিনসন্সের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। হাতে গ্লাভস পড়ে লাশের জিনিসপত্রের দিকে এগিয়ে গেলো। একটা প্যাকেট খুলে লাশের জুতাজোড়া বের করলো। তলার ময়লা একটা টিস্যুতে মুছে নিল। লালচে মাটি লেগে আছে। আরেকটা প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট বের করলো। নাকে ধরে শুঁকলো খানিকক্ষণ। সেটা রেখে লাশের কোটটা বের করলো। কলারের কাছে দুই ফোটা রক্ত লেগে আছে। সাথে এক ধরণের পিচ্ছিল পদার্থও। পকেট থেকে একটা স্প্রে বের করে সেখানে স্প্রে করলো। জায়গাটা নীল হয়ে গেল। মুচকি হেসে খোলা বাতাসে বের হয়ে এল রবিনসন্স। 

সন্ধ্যায় গ্রীণ সিটির দক্ষিণের শেষ লাল বাড়ির ........... ঝোঁপের পিছে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলো সে। রাত গভীর হতেই একটা পুরনো বাদামি পিকআপ নিঃশব্দে বাড়ির সামনে এসে থামলো। বের হয়ে এলো দুই তাগড়া যুবক। উভয়ই কালো পোশাকে ঢাকা। একজন গিয়ে বাড়ির সামনের ফোনের রিসিভারটা তুলে নিল। ফোনের ঐপাশ থেকে একটা কাঁপা স্বর শুনতে পেল রবিনসন্স। তার প্রতিউত্তরে যুবকটি বললো, “ক্রস ফায়ারে নিয়ে যাবে।” কিছুক্ষণ পর বাড়ির দরজাবিহীন দেয়াল সরে দরজা বের হয়ে এল। যুবকদ্বয় দ্রুত ভেতরে চলে গেলো। অনেকক্ষণ পর একটা বস্তা ধরাধরি করে গাড়িতে তুলেই চম্পট দিল। একটা মিনিট অপেক্ষা করলো রবিনসন্স। তারপর সরাইখানায় ফিরে গেল। 

পরদিন শহরের উত্তরে আরেকটি জলজ্যান্ত লাশ পাওয়া গেল। বেচারা হ্যানসনই এই লাশটাকেও আবিষ্কার করেছে। তাই তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খবর শুনে রবিনসন্স তাড়াতাড়ি থানায় রওয়ানা দিলো। সরাইখানার মালিক তাকে দেখে থমকে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর সে নিজেই আবিষ্কার করলো তার চোখে চশমা নেই। তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে চশমা বের করে পড়ে রওয়ানা দিলো। সরাইখানার মালিক পাথরের মতো দাঁড়িয়েই রইলো। যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো মর্গের নার্সটা।

রাস্তার শেষ মাথায় ভিড়। রবিনসন্স ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শেরিফ হাত-পা নাড়িয়ে সবাইকে কি যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে, রবিনসন্স লাশের দিকে তাকালো। রাতের বস্তাটার কথা মনে পড়ে গেলো। যেটা দুই যুবক ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছিল। শেরিফের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রবিনসন্স। বললো- শহরের সব বাড়ি চেক করেছেন? যদি সন্দেহজনক কিছু থাকে?

তার দিকে তাকালো শেরিফ- সবই চেক করা হয়েছে। একটু থেমে আবার বললো, দক্ষিণের লাল বাড়িটা বাদে।

- সেটাও চেক করা দরকার।

শেরিফ হাত নাড়লো- কোনো লাভ নেই। সেখানে ঢোকার মতো রাস্তা নেই। বাড়িটায় এক বুড়ি থাকে শুধু। তিনি কারো সাতে পাঁচে নেই।

রবিনসন্স পকেট থেকে একটা ছবি বের করে শেরিফের সামনে মেলে ধরলো। 

শেরিফ দেখলো সেটা শহরের ক্রিসমাস-ডে’র ছবি। ছবির এক কোণায় বুড়িটা কার সাথে যেন কথা বলছে। আশ্চর্য ব্যাপার তার সামনের দাঁত দুটো উঁচু। সে হাসছে। 

- থানার এ্যালবাম থেকে পেয়েছি।

- কিন্তু এতে কিছুই প্রমাণ হয় না। শেরিফ বললো।

একমুহুর্ত কিছু ভাবলো রবিনসন্স। তারপর দক্ষিণে হাঁটা দিলো।

লাল বাড়িটার সামনে যখন সে এলো তখন দুপুর। সে বাড়ির সামনে রিসিভারটা তুলে নিলো। ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, “আই কুইট।” রবিনসন্স জবাব দিলো, “ক্রসফায়ারে নিয়ে যাবে।” শব্দ করে দেয়াল সরে গেলো। তাকে দেখে বুড়ির চক্ষু চড়কগাছ। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে বসালো তাকে। রবিনসন্স বললো,

আমি পুলিশের পক্ষ থেকে এসেছি। একটু থেমে আবার বললো, আপনার এখানে আর কে কে থাকে? রবিনসন্স দেখলো সারা ঘর অন্ধকার। মহিলাটি জবাব দিলো-

- আমি একা থাকি। 

টি-টেবিলের উপর রাখা সিগারেটগুলোর উপরে চোখ বুলাতে বুলাতে রবিনসন্স বললো,

- কিন্তু কাল দুজন লোককে ঢুকতে দেখলাম।

ভদ্রমহিলা নড়েচড়ে বসলো- “ওরা বেড়াতে এসেছিল। চলে যাবে আজই।”

তারপর গলা চড়িয়ে কাকে যেন ডাকলো সে। সেই দুই যুবক সামনে এসে দাঁড়ালো। 

রবিনসন্স পকেট থেকে কয়েক টুকরা পেস্ট্রি বের করলো। একটা নিয়ে কামড় বসালো। বাকিগুলো তাদের দিকে বাড়িয়ে দিলো। তারা নিয়ে এক কামড় দিয়ে রেখে দিলো কিন্তু গিললো না। কামড় দেওয়া টুকরোগুলো প্যাকেটে মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো রবিনসন্স। 

- এবার তাহলে আসি।

মাথা দোলালো মহিলা।

সরাইখানায় ফিরে এসেই পেস্ট্রির টুকরোগুলো স্প্রে করলো। কামড় দেয়া অংশগুলো নীল হয়ে গেল। মুচকি হেসে থানায় রওয়ানা দিলো রবিনসন্স।

তাকে দেখেই শেরিফ বললো,

- ভালো করে বলুন তো। কত সময় চান?

রবিনসন্স শান্তমুখে বললো, কেস সল্ভড।

শেরিফ আর বাকি পুলিশেরা থ হয়ে গেল। 

রবিনসন্স ধীরে সুস্থে নিজের কোটের ভিতর থেকে ফাইল বের করে শেরিফের দিকে ঠেলে দিলো। তারপর বলতে শুরু করলো,

- শহরের দক্ষিণে যে লাল বাড়িটা আছে সব খুন সেখান থেকেই হয়। যাকে আপনারা বুড়ি বলছেন সে একটা ভ্যাম্পায়ার। সেখানে তার সাথে আরো দুটো ভ্যাম্পায়ার থাকে। আপনার খেয়াল করবেন, লাশের জুতার তলায় লাল মাটি পাওয়া যায়। কিন্তু লাশ যেখানে পড়ে থাকে সেখানে কোনো লাল মাটি নেই। একমাত্র বুড়ির বাড়ির সামনেই ওই লাল মাটি রয়েছে। সব লাশের পকেটেই ঘরোয়াভাবে তৈরি সিগারেট পাওয়া যায়। কিন্তু শহরে এরকম সিগারেট কেউ খায় না। একমাত্র সেই লাল বাড়ির তামাকগাছ থেকেই এই সিগারেট তৈরি হয়। বোঝাই যাচ্ছে, কাউকে গোপনে সেখানে দাওয়াত করে সেই সিগারেট দেওয়া হয়। সিগারেটে মেশানো থাকে অজ্ঞানের ঔষধ। তা খেয়ে যে কেউ ওই লাল মাটিতেই মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। তারপর মহিলাটি তাকে টেনে-হিঁচড়ে ঘরে নিয়ে যায়। লাশের জামায় টেনে নিয়ে যাবার দাগ রয়েছে। অনেক রাতে আরো দুটো ভ্যাম্পায়ার আসে। সব রক্ত খেয়ে লাশ ছোবড়া বানিয়ে শহরের এক স্থানে ফেলে দেয়। প্রতিদিন রাতেই তারা রক্তের জন্য পাগল হয়ে এক একটা করে মানুষের জীবন কেড়ে নিতে বাধ্য হয়। আমি তাদের রাতে সেই বাড়িতে ঢুকতে দেখেছি। আপনারা দিনে গেলে তাদের পাবেন না। রাতে যাবেন। বাড়ির কোনো দরজা পাবেন না। তাই দেয়াল ভেঙ্গে ঢুকবেন। তাদের তিনজনেরই সামনের দাঁত উঁচু। রবিনসন্স পকেট থেকে পেস্ট্রির টুকরোগুলো বের করলো, 

- দেখুন তাদের কামড়ের অংশগুলো নীল হয়ে গেছে। তারাই সেই রক্তচোষা পিশাচ। আপনারা পুলিশ। সবকিছুতেই মানুষের দোষ খোঁজেন। কিন্তু জেনে রাখবেন, পৃথিবীতে এরকমও কিছু আছে। 

এই বলে রবিনসন্স থানা থেকে বেরিয়ে এলো। পুলিশরা সব পাথর হয়ে গেলো যেন।

ভ্যাম্পায়ারদের ধরা হলো। শহরে শান্তি ফিরে এলো। কিন্তু রবিনসন্সকে আর কোনোদিন আর শহরে দেখা যায় নি। 

একদিন দুপুরে শেরিফ কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভ্যাম্পায়ের কবলে মৃতদের তালিকায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। আবেশে বারবার তার চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা ছবিতে। তার থেকে পড়ে গেল কফির মগ। অবিশ্বাস্য!!! সত্যিই অসম্ভব ব্যাপার!

সেই রবিনসন্সের ছবি, যে এই কেসের সুরাহা করেছে! কিন্তু সেই আবার অনেক আগে ভ্যাম্পায়ারের হাতে মৃত্যুবরণ করেছিল। মানে সে নিজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিজেই নিয়েছে।

শেরিফ কিছু বলতে পারলেন না। তার সামনে থেকে ছবিটা ধীরে ধীরে সবুজ রং ধারণ করলো। তিনি বোবা হয়ে সবুজ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন!

অষ্টম শ্রেণি, বয়স : ১৪ বছর
রাজশাহী
প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২, আমার আকাশ
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post