প্রবন্ধ রচনা : সমুদ্র সম্পদ

History 📡 Page Views
Published
23-Nov-2021 | 08:17 AM
Total View
1.7K
Last Updated
28-Dec-2024 | 06:52 AM
Today View
0
↬ সমুদ্র সম্পদের গুরুত্ব 
↬ মানুষ ও সমুদ্র সম্পদ

নিত্যবিগলিত তব অন্তর বিরাট
আদি অন্তর স্নেহরাশি-আদি অন্তর তাহার কোথারে, 
কোথা তার তল। কোথা কূল। বলে কে বুঝিতে পারে।
 তাহার অগাধ শান্তি, অপার ব্যাকুলতা,
 তার সুগভীর মৌন, তার সমুচ্ছল কলকথা।
                      ---রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভূমিকা : সৃষ্টির ঊষা লগ্নে দেবাসুরের সমুদ্র মন্থনে অমৃতকুম্ভ কক্ষে নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন ঐশ্বর্য সম্পদের দেবী সমুদ্র লক্ষ্মী। এই পৌরাণিক রূপকের মধ্যেই রয়েছে সমুদ্রের যথার্থ পরিচয়। সমুদ্র অফুরন্ত সম্পদের ভাণ্ডার। তার তলদেশ শুধু যে মহার্ঘ রত্নরাজিতে সমৃদ্ধ তা নয়, খাদ‍্য তেল, খনিজ পদার্থের অকৃপণ দাক্ষিণ্যেও তা পরিপূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান চাপে পৃথিবীর খাদ্য জ্বালানি তেল আর খনিজ সম্পদ ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আগামী প্রজন্মের মানুষের জন্য বিজ্ঞানীরা এবার হাত বাড়িয়েছেন সমুদ্র সম্পদের দিকে। সমুদ্রসম্পদ আগামী দিনের মানুষের জীবনধারণের অন্যতম ভরসা।

খাদ্যের উৎস হিসেবে সমুদ্র : মহাদেশের স্থলভূমির সঙ্গে সমুদ্রের জলীয় পরিবেশের বিস্তর পার্থক্য থাকলেও খাদ্যোৎপাদনের ব্যাপারে দু জায়গাতে কিন্তু একই নিয়মনীতি বর্তমান। খাদ্য বলতে আমরা যা বুঝি, জলেস্থলে তার মূল উৎস হলো গাছপালা। সালোকসংশ্লেষণের সাহায্যে গাছপালা সূর্যের আলো থেকে শক্তি জমা করে নিজেদের শরীরে। উদ্ভিদ খেয়ে প্রাণধারণ করে যেসব ছোটখাটো জীবজন্তু তাদের বলা হয় তৃণভোজী। আবার এসব তৃণভোজীদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে জীবনধারণ করে মাংসাশীরা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ছোট মাংসাশী প্রাণীকে আবার খায় বড় মাংসাশী প্রাণী। জলজ উদ্ভিদ আর প্ল্যাঙ্কটন নামে এককোষী জীব আহার করে প্রাণধারণ করে যেসব ছোট মাছ, তারাই আবার বড় মাছ আর সামুদ্রিক প্রাণীদের উদরপূর্তির কাজে লাগে।

সমুদ্র সম্পদের স্বরূপ : যেহেতু পৃথিবীর শতকরা ৭০ ভাগ অঞ্চল সমুদ্রের দখলে, সুতরাং সূর্যের যে আলো বা শক্তি পৃথিবী পায়, তার সিংহভাগটাই ভোগ করে সমুদ্র। ডাঙাজমির বনজঙ্গলে গাছপালার যেখানে সূর্যের আলোর শতকরা ৯৯ ভাগকে সালোকসংশ্লেষের কাজে লাগায়, সামুদ্রিক গাছপালা আর শ্যাওলারা গড়পড়তা সৌরশক্তির ১ শতাংশকেও খাদ্য তৈরির কাজে লাগাতে পারে না। অথচ কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, চর্বি জাতীয় খাদ্যকণা বানানোর জন্য গাছপালার যা প্রয়োজন তার সবই সমুদ্রে অফুরন্ত। কার্বন ডাইঅক্সাইড, জল, সূর্যের আলো এমনকি প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ সমুদ্রের কোনোটারই অভাব নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রে রয়েছে প্রায় ২৫,০০০ কোটি টন নাইট্রেট এবং ৭,৫০০ কোটি টন ফসফেট। বাতাসে যে পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড রয়েছে তার ২০ থেকে ৩০ গুণ রয়েছে সমুদ্রের কূলে কার্বনেট জাতীয় যৌগের আকারে।

সামুদ্রিক মাছ : জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর জিনিসগুলো সমুদ্রের সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। সমুদ্রোপকূলের কাছাকাছি অগভীর জলের ভেতর সূর্যের আলো পৌছায় প্রায় ১৫০ মিটার পর্যন্ত। এখানেই উদ্ভিদকণা খেয়ে বেঁচে থাকে প্রচুর মাছ। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৭২৪ কিলোমিটার সমুদ্র উপকূল রয়েছে। আমাদের উপকূল ততটা গভীর নয় বলে এখানে মৎস্যকুল অনায়াসে বিচরণ করতে পারে। বাংলাদেশের সমুদ্রক্ষেত্র থেকে যেসব মাছ ধরা হয় সেগুলোর মধ্যে, টোনা, স্যাকালের, গলদা চিংড়ি, রূপচাঁদা, কোরাল, তাপসী, রিটা, ছুরি, ভেটকি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। যতই গভীর সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, মাছের ঝাঁক ততই কমে আসে। সাগর-মহাসাগরগুলোর ৯০ শতাংশ অঞ্চলেই জীবনের ধারা বড় ক্ষীণ। গভীর সমুদ্রে হাঙর, তিমি বা বড় বড় স্কুইড ছাড়া মাছ তো নজরেই আসে না। আজ সারা পৃথিবীতে জেলেরা সমুদ্র থেকে প্রতি বছর যে মাছ ধরে তার পরিমাণ কমবেশি ৭ কোটি টন। বিজ্ঞানীরা যে হিসাব করেছেন তাতে এখনই প্রতি বছরে যদি ১০ থেকে ১২ কোটি টন ছোট মাছ তোলা হয়, তবে সমুদ্রের ভাঁড়ারের কোনো টান পড়ে না।

প্ল্যাঙ্কটন : যেহেতু সমুদ্রের যাবতীয় প্রাণী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্ল্যাঙ্কটনের কাছ থেকেই প্রোটিনের যোগান পায়, কারও কারও মনে হতে পারে, পানি থেকে প্ল্যাঙ্কটনকে ছেঁকে নিয়ে খেলেই বা দোষ কী? অসুবিধে হলো জাহাজে করে মাছের তুলনায় প্ল্যাঙ্কটন বয়ে আনার খরচ পড়ে বেশি এবং পানির বাইরে আনলে প্ল্যাঙ্কটনেরা বেশিক্ষণ বাঁচে না। তাছাড়া মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যেই এদের শরীরে পচন ধরে।

খাদ্য হিসেবে সামুদ্রিক আগাছা : খাদ্য হিসেবে প্ল্যাঙ্কটনের তুলনায় সামুদ্রিক আগাছা অনেক বেশি সরস ও পুষ্টিকর। পৃথিবীর প্রায় যাবতীয় সমুদ্র উপকূলের অগভীর অঞ্চলে এদের দেখা পাওয়া যায়। পৃথিবীতে একমাত্র জাপানিরাই প্রায় ৩০০ বছর ধরে তাদের খাদ্য তালিকায় সামুদ্রিক আগাছাকে ধরে রেখেছে। জাপানে আজও কমবেশি ৫০ হাজার পরিবারের জীবিকাই হলো প্রায় দু লাখ একর জলা জায়গায় ‘ল্যাভার’ নামে এক বিশেষ জাতের সামুদ্রিক শ্যাওলার চাষ। সামুদ্রিক আগাছায় প্রোটিনের ভাগ যথেষ্টই যদিও অভ্যাস না থাকলে প্রথম প্রথম হজমের গণ্ডগোল বাধায় এরা। সামুদ্রিক আগাছা থেকে আয়োডিন, লোহা, পটাসিয়াম এবং অন্যান্য উপকারী মৌলের যোগান সম্ভব।

জ্বালানি তেল : সাগরের খনিজ সম্পদকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগটায় রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ব্রোমিন, আয়োডিন থেকে শুরু করে সোনা-রূপা ইত্যাদির প্রায় ৭০টির বেশি মৌল এ যাবৎ যাদের সন্ধান মিলেছে সাগরের পানিতে মিশে থাকা লবণের মধ্যে। সাগরের পানি থেকে যদি যাবতীয় ধাতু এবং ধাতু গঠিত লবণগুলোকে আলাদা করা যায়, তবে প্রতি ঘনকিলোমিটার সমুদ্রজলের খনিজ ঐশ্বর্যের দাম হয় অন্ততপক্ষে ১,০০০ কোটি টাকা। সমুদ্রের খনিজ সম্পদের দ্বিতীয় ভাগটা নুড়ির আকারে ছড়িয়ে রয়েছে পানির চার পাঁচ হাজার মিটার গভীরে, সমুদ্রের তলদেশে। বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় এগুলো হলো ‘মাঙ্গানিজ নুড়ি’ যার মধ্যে থাকে প্রধানত ম্যাঙ্গানিজ আর লোহা। সমুদ্রের তৃতীয় ধরনের সম্পদ লুকিয়ে আছে সমুদ্রের নিচে মাটির তলায়। এদের মধ্যে প্রথমেই নাম করতে হয় জ্বালানি তেলের। এখন পৃথিবীতে জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট চাহিদার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসছে সমুদ্রগর্ভ থেকে ভারতের মুম্বাই হাই থেকে তেল পাওয়া গেছে। প্রাকৃতিক গ্যাস মিলেছে বঙ্গোপসাগরে ও আন্দামানের উপকূলে।

অন্যান্য খনিজ পদার্থ : পৃথিবীর বিভিন্ন সাগর-উপসাগরের মাটির তলা থেকে পেট্রোলিয়াম ছাড়াও ব্যবসায়িক ভিত্তিতে অন্যান্য যে খনিজ পদার্থ তোলা হয়, তার ৯০ শতাংশই হলো কয়লা, বাকি ১০ শতাংশের অর্ধেক হলো লোহা এবং আর অর্ধেক সালফার। সমুদ্রগর্ভ থেকে প্রথম কয়লা তুলে আনার দাবি করতে পারে স্কটল্যান্ডের উপকূলবাসীরা। সারা পৃথিবীতে এ জাতীয় কয়লা খনির সংখ্যা এখন ১০০-র বেশি।

উপসংহার : সমুদ্রগর্ভ বা সাগরের পানি ছাড়া সমুদ্র উপকূলের বালিতেও নানা ধরনের খনিজের সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে বিশেষ করে 'মোনাজাইট'-এর নাম করতে হয়। এখন বোধ হয় নির্দ্বিধায় বলা যায়, পৃথিবীর ডাঙ্গাজমির নিচে খনিজ সম্পদ ফুরিয়ে আসার দিনে, রত্নাকর সমুদ্রই আজ মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা। সেজন্য সমুদ্র সম্পদের দিকেই আজ বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে দৃষ্টি দিয়েছেন।
Facebook Messenger WhatsApp LinkedIn Copy Link

✅ The page link copied to clipboard!

Leave a Comment (Text or Voice)




Comments (0)