বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক

ভূমিকা : শের শব্দের বাংলা অর্থ বাঘ। শের-ই-বাংলা বা শেরে বাংলা শব্দের মানে দাঁড়ায় বাংলার বাঘ। বাঘের মতই ছিল তাঁর শক্তি ও সাহস। যেমন ছিল তাঁর বিশাল সুগঠিত দেহ, তেমনি ছিল তাঁর জ্ঞান ও বুদ্ধি। বাংলার বুকে জন্ম নিয়ে আপামর বাঙালি জনগণের প্রাণ প্রিয় নেতা তিনি হতে পেরেছিলেন। তিনি জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য দিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়াই করেছেন। শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা অন্যায় ও শাসকদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন জাগ্রত প্রহরী। বাঘের হুঙ্কার ও শক্তি নিয়ে তিন ঝাঁপিয়ে পড়তেন চাষী-মজুর, ছাত্র-কর্মচারী, মেহনতী সকল মানুষের পক্ষে। 

জন্ম : ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে অক্টোবর পিরোজপুর জেলার রাজাপুর থানায় সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খ্যাতনামা উকিল ওয়াজেদ আলী থাকতেন বরিশাল জেলা শহরে। শেরে বাংলার আসল নাম আবুল কাশেম ফজলুল হক সংক্ষেপে ডাকা হত এ. কে. ফজলুল হক। জনগণ ডাকত হক সাহেব। 

শিক্ষা ও কর্ম জীবন : শেরে বাংলার প্রাথমিক শিক্ষা আরম্ভ হয় একটি মাদ্রাসায়। পরে তিনি বরিশাল জেলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে বিশেস কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্‌স পাস করেন। প্রথম বিভাগে আই. এ. পাস করে প্রেসিডেন্সী কলেজে অনার্সসহ বি.এ.পড়েন এবং ১৮৯৩ সালে কৃতিত্বের সাথে বি. এ. পাস করেন। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে অংকশাস্ত্রে তিনি বিশেষ কৃতিত্বের সাথে এম. এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পিতার পরামর্শে তিনি আইন কলেজে পড়েন এবং ১৮৯৯ সাল হতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এর পর তিনি বাংলা ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি নেন। তখন থেকেই তিনি রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত হন। ১৯১১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি আইন ব্যবসা আরম্ভ করেন। 

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কৃতিত্ব : তাঁর চরিত্রে বজ্রের ন্যায় কঠোরতা এবং কুসুমের ন্যায় কোমলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এক অবিসংবাদিত ও জনপ্রিয় নেতা। তিনি ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী পুরুষ স্বাধীনচেতা নেতা। তিনি কোনদিন কোন অন্যায়-অবিচারের কাছে মাথা নত করেননি। তিনি দেশের সর্বহারা কৃষকের দুঃখ-দুর্দশা নিজের হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন এবং সারা জীবন তাদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তৎকালে মহাজনেরা চড়া সুদে কৃষকদের টাকা ধার দিয়ে তাদের জমি, বাড়ি, বলদ সব নিলামে তুলে সুদের টাকা আদায় করত। মহাজনদের এই অত্যাচার থেকে কৃষকদের বাঁচাবার জন্য তিনি প্রত্যেক ইউনিয়নে ‘ঋণ সালিশী বোর্ড’ গঠন করেন। এই বোর্ডের মাধ্যমে টাকা ধার নিয়ে কৃষকরা মহাজনী সুদের হাত হতে রক্ষা পেত। 

কীর্তিসমূহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, কলকাতা ব্রার্বোন মহিলা কলেজ, বরিশালের চাখার কলেজসহ তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ঢাকায় শেরে বাংলা ফজলুল হক হল তাঁর উজ্জ্বল নাম ধারণ করে আছে। তিনি বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের শিক্ষা ও উন্নতি, সুস্থ মানুষের সেবা, অসহায় ও বিপদাপন্ন মানুষকে সহায়তা করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন দানবীর। কাবুলিওয়ালার কাছে সুদে টাকা ধার করে সমস্তই তিনি পরের কল্যাণে দান করে দিয়েছেন। 

উপসংহার : ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে এপ্রিল এই মহামনীষী মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর ‘কৃষক-প্রজা পার্টি’ রাজনৈতিক দলের কথা, ১৯৪০ সালে লাহোরে ঐতিহাসিক পাকিস্তান প্রস্তাবের কথা ভোলা যায় না। কিন্তু, মুসলিম লীগ বারবার তাঁর সাথে বেঈমানী করে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি দেখিয়েছিলেন তিনি জনগণের বড় নেতা। ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

No comments