প্রবন্ধ রচনা : জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা

Article Stats 📡 Page Views
Reading Effort
1,023 words | 6 mins to read
Total View
638
Last Updated
27-Dec-2024 | 01:28 PM
Today View
0
ভূমিকা : আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা বিষয় দুটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে বর্তমান বিশ্ব একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়েছে। কোনো একটি দেশের উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান বহুলাংশে অন্য একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। একটি দেশের সাথে অন্যদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ কী? : জাতীয়তাবাদ (Nationalism) হলো নিজেকে কোনো জাতির অন্তর্ভুক্ত জ্ঞান করা। সেই জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিকাশ, অগ্রগতি, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষা ইত্যাদির সাথে একাত্মবোধ করা এবং সংশ্লিষ্ট জাতির ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, স্বকীয়তা রক্ষা ও বিকাশে বিশ্বাসী হওয়া। অপরদিকে আন্তর্জাতিকতাবাদ (Internationalism) হলো এমন একটি ধারণা বা মতবাদ যে ধারণা বিভিন্ন রাষ্ট্র বা জাতিকে একই বা বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। জাতীয়তাবাদ যেমনভাবে একটি দেশের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার কথা বলে, তেমনি আন্তর্জাতিকতাবাদ দেশের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

জাতীয়তাবাদের প্রকাশ : আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। বর্তমান বিশ্বে প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই জাতীয় রাষ্ট্র বা National State বলা হয়। কোনো দেশের জনগণ যখন নিজস্ব ঐতিহ্য শিক্ষা-সভ্যতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংস্কৃতিক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয় তখনই তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটে। জাতীয় চেতনায় বলীয়ান জাতি পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়। সকল দেশের জাতীয়তার ধরণ এক নয়। প্রত্যেকটি জাতির মধ্যে জাতীয়তাবোধের একেক দিক বিশেষরূপে প্রকাশ পায়।

জাতীয়তাবাদের উদ্ভব : প্রাচীন যুগে গ্রিক ও হিব্রুদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রথম দেখা যায়। গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলো বিধ্বস্ত হওয়ার পর রোমানদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সমগ্র মধ্যযুগব্যাপী খ্রিস্টধর্মের প্রভাবে যখন দেশ পরিচালিত হয় তখন জাতীয়তাবাদ পুরোপুরি বিলীন হয়। এর পরিবর্তে সম্রাজ্যের ধারণা জন্মলাভ করে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়, যখন ল্যাটিন ভাষার আধিপত্যের বিপরীতে বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার ব্যবহার বাড়তে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী জাতীয়তাবাদ ধারণাটি দৃঢ় হয়। ১৭৭২ সালে পোলান্ডের ভাগাভাগির সময়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা জনসাধারণের মধ্যে প্রসার লাভ করে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের স্লোগানঃ ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা’ জাতীয়তাবাদকে আরো জোরদার করে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিক এবং বিংশ শতাব্দী জাতীয়তাবাদের গৌরবোজ্জ্বল যুগ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একই সালে জাতীয় রাষ্ট্রের ওপর ভিত্তি করে ইউরোপের মানচিত্র নতুন করে আঁকা হলে চেক, পোল, স্লাভ জাতিগুলো নতুন রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দূরপ্রাচ্যে জাতীয়তার ভিত্তিতে অনেকগুলো জাতীয় রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

জাতীয়তাবাদ চেতনার গুরুত্ব : জাতীয় চেতনা কোনো দেশ বা জাতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একটি জাতি তার স্বতন্ত্র সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লালন করেই প্রথমে জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে সে জাতি অগ্রসর হয় আন্তর্জাতিকতার দিকে। জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সার্বভৌম ক্ষমতার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। জাতীয় চেতনার ফলেই ব্যক্তির মধ্যে দেশপ্রেম এবং দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়।

আন্তর্জাতিকতাবাদ চেতনার সৃষ্টি : আন্তর্জাতিকতা বলতে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝি। বর্তমান যুগে বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানের প্রসার লাভ করছে। অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নত হচ্ছে। কিছু দেশ আবার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক সমৃদ্ধ। আধুনিক বিশ্ব প্রতিযোগিতার বিশ্ব, এখানে কোনো রাষ্ট্র কোনা দিক থেকে পিছিয়ে থাকতে চায় না। তাই তারা সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বাধ্য হচ্ছে। এক দেশের মানুষ এখন সহজেই অন্য দেশে গমন করতে পারছে, তথ্য আদান প্রদান করতে পারছে। মানুষ সমগ্র পৃথিবীকে নিজেদের মনে করছে। আর এভাবেই আন্তর্জাতিক চেতনার সৃষ্টি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক চেতনার গুরুত্ব : বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আন্তর্জাতিক চেতনার গুরুত্ব অপরিসীম। দেশ ও জাতির প্রতি অবদান রাখার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ এখন নিজ নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে উচ্চ শিক্ষা এবং গবেষণার জন্য অন্যদেশে পাড়ি জামাচ্ছে। বর্তমান পৃথিবীতে ১৯৪টি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ রয়েছে। তারা নিজেদের প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক চেতনায় ভর করে সম্পর্ক স্থাপন করে চলছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক প্রয়োজনে বা কখনো কখনো ধর্ম, ভাষা, গোত্রগত দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতিসমূহের মধ্যে বন্ধুত্বের মনোভাব গড়ে তুলতে, বিরাজমান নানা সমস্যা ও সংকট দূরীকরণে, অগ্রগতি ও মঙ্গল নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোতে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সার্বিক সহযোগিতা আন্তর্জাতিক চেতনার উপর নির্ভর করে।

উগ্র-জাতীয়তাবাদের কুফল : জাতীয়তাবাদ যেমন মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তেমনি উগ্র-জাতীয়তাবাদ অনেক ক্ষেত্রে কোনো দেশের জনগণকে মাত্রাতিরিক্ত অহঙ্কারী করে তোলে। এ জন্য তারা অন্য দেশের প্রতি বৈরী মনোভাব দেখায়, সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর জাতি মনে করে। উগ্র-জাতীয়তাবাদের প্রভাবে তারা অন্য দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসিদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তবাদের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকাতে এ রকম ধারণা প্রচলিত ছিল।

আন্তর্জাতিকতাবাদের ফলে গঠিত সংগঠন : আন্তর্জাতিকতাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠেছে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সংগঠন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ (United Nations) গঠিত হয়। বর্তমানে ১৯৩টি দেশ এই সংগঠনটিতে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (WTO)। বৃটেন শাসিত দেশ নিয়ে গড়ে উঠেছে কমনওয়েলথের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠন। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য ১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টে¤¦র গড়ে উঠেছে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (OIC), এ ছাড়া NAM, IMF ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংগঠন সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।আন্তর্জাতিকতার ফলে গড়ে উঠেছে অনেক আঞ্চলিক সংগঠন। ASEAN (এশিয়ান) ভুক্ত দেশ সমূহের মধ্যে সহযোগিতার ফলে ঈর্ষনীয় উন্নতি লাভে সক্ষম হয়েছে। পৃথিবীব্যাপী রাজনৈতিক সহযোগিতার ফলে গড়ে উঠেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU), আফ্রিকান ইউনিয়ন , আরব লীগ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোট হিসেবে G-8 (Group 08), D-8 (Developing-8), G-77, OPEC, APEC ইত্যাদি সংগঠন গঠিত হয়েছে। এছাড়াও সামরিক, আর্থিক, সেবা, মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে ন্যাটো (NATO), IDB, ADB, NAFTA, APTA, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি সংগঠন আন্তর্জাতিকতার ভিত্তিতেই কাজ করে যাচ্ছে।

জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতায় বাংলাদেশ : ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতার পর থেকে বাঙালি জাতীয়তার ওপর ভিত্তি করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ইত্যাদির সমন্বয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে বাংলাদেশের মানুষ দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর পরই ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে যোগদান করেছে। এরপর ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ এই ৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC)। বর্তমানে আফগানিস্তানসহ ৮টি দেশ নিয়ে এ সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, ADB, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

উপসংহার : পারস্পরিক সহযোগিতা ব্যতীত আজকের বিশ্বে উন্নয়ন অসম্ভব। সকল দেশের উচিত নিজ নিজ জাতিগত দম্ভ ভুলে বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা। তবেই দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নতির পাশাপাশি বৈশ্বিক উন্নয়ন সম্ভব হয়ে উঠবে।

💎 উপরের লিখাগুলো ওয়ার্ড ফাইলে সেভ করুন!

মাত্র 10 টাকা Send Money করে অফলাইনে পড়ার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য উপরের লিখাগুলো Microsoft Word ফাইলে ডাউনলোড করুন।

Download (.docx)

Sribas Ch Das

Founder & Developer

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং পরিচালক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts

Facebook Messenger WhatsApp LinkedIn Copy Link

✅ The page link copied to clipboard!

Leave a Comment (Text or Voice)




Comments (0)

Old Taka Archive (ota.bd)

✓ ১০০% আসল নোটের নিশ্চয়তা