বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : বাংলাদেশের খাদ্য সমস্যা ও তার প্রতিকার

↬ খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য সমস্যা


ভূমিকা : মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রথম উপকরণ হচ্ছে খাদ্য। আর বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য হল ভাত। এদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক কৃষিকর্মে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলেও বর্তমানে খাদ্য সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। ফলে প্রতিবছর বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে খাদ্য সমস্যা এখন একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। দেশের কিছু কিছু এলাকায় এটি ‘মঙ্গা’য় রূপ নিয়েছে। সেসব অঞ্চলে চলে প্রকট খাদ্যভাব। যা ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। 

খাদ্য সমস্যা কী? : অবাধ খাদ্য সরবরাহ এবং সারা বছর খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতাকে বলা হয় খাদ্য নিরাপত্তা। খাদ্য নিরাপত্তা দুরকমের- গৃহগত বা পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি পরিবারের পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, যাতে পরিবারের প্রতিটি লোক সর্বদা স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য খেতে পারে। একইভাবে, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সারা দেশের জনগণের জন্য যথেষ্ট খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমত, একটি পরিবার ও গোটা জাতির প্রয়োজনীয় মোট খাদ্যের প্রাপ্যতা। দ্বিতীয়ত, স্থানভেদে বা ঋতুভেদে খাদ্য সরবরাহের যুক্তিসঙ্গত স্থায়ীত্ব। তৃতীয়ত নির্বিঘ্ন ও মানসম্মত পরিমাণ খাদ্য প্রত্যেক পরিবারের ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবাধ অধিকারের নিশ্চয়তা। আমাদের দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দেশের জনগণ খাদ্য নিরাপত্তা পাচ্ছে না। ফলে প্রকট হয়ে ওঠছে খাদ্যসমস্যা। সামগ্রীকভাবে পারিবারিক ও জাতীয়ভাবে খাদ্য নিরাপত্তার অভাব অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহ না থাকা বা ব্যর্থ হওয়াকে খাদ্য সমস্যা বলা হয়। 

বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান অবস্থা : অতীতে এদেশে খাদ্যের অভাব ছিল না। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ প্রবাদে রূপ নিয়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন নয়। ১৯৫৩ সালের পর থেকেই এদেশে খাদ্য সমস্যা ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে। জনগণের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশকে বর্তমানে বিদেশী সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৩৫-৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশষ্য বীদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যার মূল্যমান প্রায় ১০০০ কোটি টাকারও বেশি। যদিও বর্তমানে সরকার এ সমস্যা কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। 

খাদ্য সমস্যার কারণ : বাংলাদেশে খাদ্য সমস্যার নানা কারণ বিদ্যমান। নিচে প্রধান প্রধান কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হল : 

(১) জনসংখ্যা বৃদ্ধি : বাংলাদেশে আবাদী জমির পরিমাণ মাত্র এক লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার নয়শ আটানব্বই বর্গ কিলোমিটার। এই স্বল্প পরিমাণ আবাদী জমির উৎপাদনের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের পনের কোটি মানুষ। বর্তমানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে এমনিভাবে যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে আগামী কুড়ি বছরে আমাদের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে পতিত হবে। তাছাড়া যদি জনসংখ্যার আধিক্য দিন দিন বৃদ্ধি পায় তাহলে আমাদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয়িত হবে খাদ্যশস্য আমদানি করতে। ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কাজ মুখ থুবরে পড়বে। 

বাংলাদেশে জন্মের হার পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। জমির উৎপাদন শক্তি যতই বাড়ানো হোক না কেন তার সর্বশেষ একটা সীমা আছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে হয়। সীমিত জমির সীমিত উৎপাদন শক্তি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। তাই খাদ্যের উৎপাদন জনসংখ্যা অনুপাতে এতই অপ্রতুল যে, তা খাদ্য সমস্যা দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে। 

(২) কৃষি পদ্ধতি : কৃষি আমাদের সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র। এদেশের অধিকাংশ কৃষক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চাষাবাদের সাথে পরিচিত নয়। তারা অশিক্ষিত বা নিরক্ষর হওয়ায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত জাত নির্বাচন, সার, কীটনাশক ওষুধ, বীজ ইত্যাদি জমিতে সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। এখনও সনাতন পদ্ধতিতে লাঙল, গরু দিয়ে চাষাবাদ করে। ফলে অধিক উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায় প্রতিবছর খাদ্য ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। তাছাড়া উপযুক্ত জনশক্তি রয়েছে কিন্তু তারা যথেষ্ট কর্মদক্ষ নয়। দক্ষতার অভাবে জনগণ অধিক ফসল উৎপাদনে ব্যর্থ হয়। ফলে খাদ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পায়। 

(৩) প্রাকৃতিক দুর্যোগ : বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও এদেশের কৃষকদের প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত হলে সেচকার্যও ভাল হয় এবং ফসলও ভাল জন্মে। আবার অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পোকার উপদ্রব, বিভিন্ন অব্যবস্থা, ভূমি ক্ষয়, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল হানি ঘটে। তখন দেশের সাধারণ লোক যারা অধিক মূল্য দিয়ে খাদ্য কিনতে পারে না বলে তারা দারুণ খাদ্যভাবে নিপতিত হয়। 

(৪) মূলধন : মূলধন এদেশের খাদ্য উৎপাদনের পথে প্রধান অন্তরায়। কৃষকরা দরিদ্র হওয়ায় প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে তারা আধুনিক যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক ওষুধ ইত্যাদি কিনে জমিতে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে ফসল উ’ৎপাদনও আশানুরূপ হয় না। 

খাদ্য সমস্যার প্রতিকার বা সমাধানের উপায় : বর্তমানে সরকার খাদ্য ঘাটতি সমস্যার সমাধানের জন্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তদুপরি খাদ্য সমস্যা সমাধানের জন্য আরও একাধিক পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। যেমন- 

১। আমাদের দেশের খাদ্য সমস্যা সমাধান করতে হলে আমাদের কৃষিকার্যের উন্নতির উপর জোর দিতে হবে এবং দেশের কৃষিকার্যে আমুল পরিবর্তন সাধন করতে হবে। 

২। খাদ্য সমস্যা সমাধানের প্রধান উপায়ে দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এজন্য দেশের যে কৃষক সম্প্রদায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন করে তাদের অবস্থার উন্নতি করতে হবে। কৃষিকার্যে উন্নত এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য কৃষকদের শিক্ষা দিতে হবে। এজন্য কৃষি বিশেষজ্ঞদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বীজ বপন, সার, কীটনাশক ওষুধ ছিটানো, সেচকার্য, বীজ সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিতে হবে। সমবায় পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জমি চাষাবাদ অধিক ফসল ফলানো সম্ভব হবে। তাতে খাদ্য ঘাটতি হ্রাস পাবে। 

৩। আমাদের দেশের কৃষি সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়। বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা ও নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ফসলের প্রধান অন্তরায়। এসব দুর্যোগের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ অপরাপর সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। 

৪। আমাদের জমির অধিক পরিমাণে রবিশস্য উৎপাদন করার জন্য কৃষকদের মনোযোগী হতে হবে। জমিতে উন্নত ধরনের বীজ বপন ও সার প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া দেশের সর্বত্র ফল ও শাকসব্‌জির চাষ বাড়াতে হবে। আমাদের খাওয়ার রুচি পরিবর্তন করতে হবে – ভাতের বদলে অধিক ফল ও শাকসব্‌জির, আলু, রুটি ইত্যাদি খেতে হবে। 

৫। উৎপাদিত ফসল প্রয়োজনমত সরকারকে স্থায়ীভাবে সংগ্রহ করে গুদামজাত করতে হবে, যাতে বন্যা বা মহামারিতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি করতে না পারে। আমাদের খাদ্যদ্রব্য যাতে বিদেশে চোরাচালন বা পাচার না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। 

৬। কৃষকদের স্বল্পমূল্যে উন্নত সার, বীজ, কীটনাশক ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। ফলে দরিদ্র কৃষকেরা প্রয়োজন মতো সবকিছু কিনে জমিতে ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবে। 

৭। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে তাদেরকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সহায়তা করতে হবে। মৌসুমভিত্তিক ন্যায্য মূল্যে কিংবা কম মূল্যে সার, কীটনাশক ওষুধসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। 

৮। খাদ্য সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে প্রধান অন্তরায় আমাদের দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। তাই দেশের এ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সবার আগে। এজন্য দেশের জনগণকে শিক্ষিত ও জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

৯। কৃষির উপর চাপ কমাতে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ কল-কারখানা গড়ে তুলতে হবে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত শিল্পজাত দ্রব্য রপ্তানি করে কৃষি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে। এতে একদিকে কৃষির উপর চাপ কমবে এবং অধিক খাদ্যশষ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। ফলে খাদ্যঘাটতি কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে। 

উপসংহার : খাদ্য ঘাটতি আমাদের দেশে যে হারে বেড়ে চলেছে তাতে এর আশু সমাধান প্রয়োজন। জনবুহল এদেশের প্রত্যেকটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ। বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন করতে হলে সরকারি, বেসরকারি সকল পর্যায়ে সহযোগিতা প্রয়োজন। খাদ্য সমস্যা সমাধানে শুধু বৃহৎ পরিকল্পনা করলেই চলবে না। তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সার, ওষুধের ব্যবহার, শিক্ষিত জনশক্তি, জনসংখ্যা সমস্যা রোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার সঠিক পদ্ধতি বা উপায়, পানি সেচসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি অধিক ফসল ফলানোর মধ্য দিয়ে জাতীয় খাদ্যঘাটতির মোকাবেলা করতে পারলে খাদ্য সমস্যা সমাধান নিশ্চিত করা যেতে পারে।

No comments