বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : মানবজীবনে অবকাশ

↬ অবকাশের উপযোগিতা

↬ অবকাশ – বিনোদন


ভূমিকা :
‘একদিকে ক্ষুধা মারছে চাবুক, তৃষ্ণা মারছে চাবুক, তারা জ্বালা ধরিয়েছে বলছে কাজ করো। অন্যদিকে বনের সবুজ মেলেছে মায়া, রোদের সোনা মেলেছে মায়া, ওরা নেশা ধরিয়েছে, বলছে, ছুটি, ছুটি।’ -রবীন্দ্রনাথ

মানব-জীবনে অবকাশের গুরুত্ব অপরিসীম। গতিচঞ্চল এ ধরণীর বুকে অবকাশ শক্তিসঞ্চয়ের উৎস। অবকাশই মানুষকে তার অভ্যস্ত জীবন থেকে, প্রাত্যহিকতার মালিন্যস্পর্শ থেকে, জড়বস্তুর জগৎ থেকে নিয়ে যায় এক সৌন্দর্যের অমরাবতীতে। তখনই জীবন হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ, সার্থক। অবকাশই মানুষের নেত্র-পল্লবে পরিয়ে দেয় সুদূরের মায়াঞ্জন। অবকাশই তার কর্মের প্রেরণা, তার শোক তপ্ত প্রাণে সান্ত্বনা, শক্তি। মানবজীবনের সিংহভাগই তো অবকাশ। অবকাশই জীবনকে এত রমণীয়, এত সুন্দর করেছে। করেছে বৈচিত্র্যময়। বিশ্বের চারদিকে সুন্দরের যে নিত্য লীলা চলছে, সেই আনন্দ-যজ্ঞে অবকাশই মানুষের কাছে পাঠায় আমন্ত্রণলিপি। অবকাশ না থাকলে কি মানুষ গাছে গাছে ফুলের শোভা দেখতে পেত, দেখতে পেত নদী-তরঙ্গের নৃত্যচপল ভঙ্গি, নক্ষত্রমণ্ডলীর অপরূপ আলোকসজ্জা। অবকাশের মধ্যেই তো রয়েছে জীবনের বিচিত্র লীলারঙ্গ। রয়েছে নব সৃষ্টি সুখের উল্লাস। ‘পৃথিবীর সমস্ত প্রয়োজন ধূলির উপরে; কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত সংগীত ঐ শূন্যে, যেখানে তাহার অপরিচ্ছিন্ন অবকাশ।’

অবকাশের দার্শনিক তাৎপর্য : অবসর শুধু মানুষের কর্মপ্রবাহের মধ্যে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ক্ষণ-বিরতি নয়, নয় কর্মতরঙ্গের বিপরীত স্থির অচঞ্চল কোনো সত্তা। অবসরের মধ্যেই নিহিত আছে আরও গভীর এক অর্থ-ব্যঞ্জনা। অবকাশের অর্থই জীবনের ছন্দ, চলার গতি।

অবকাশ যাপনের বৈচিত্র্য : কর্মস্রোতে জীবন যখন রুদ্ধশ্বাস, তখন সামান্য অবকাশই নিয়ে আশে মুক্তির আশ্বাস। অবকাশ তখন অবসাদ নয়। এক দুর্লভ আনন্দ-মুহূর্ত। এক মহৎ অভিজ্ঞতা। তবে অবকাশ যাপনের জন্যে চাই যথার্থ সৌন্দর্য- সম্ভোগের মানসিকতা। মানুষ বিচিত্র। বিচিত্র তার রুচি। এই রুচি বৈচিত্র্যই অবকাশ-যাপন বৈচিত্র্যের মূলে। কত ভাবেই না মানুষ তার অবসর যাপন করে! কাজের জগৎ থেকে তার মুক্তি, মনের জগতে তাই অপ্রয়োজনের অভিসার-নেশা। রূপের মহলে তখন তার ডাক পড়েছে। তখনই তো তার জীবনে সুন্দর এই ধরণীর দিকে চোখ মেলে তাকাবার আসে শুভক্ষণ। ঘর ছেড়ে সে বেরিয়ে পড়ে। পথিক-মন ছায়াভরা পথে হেঁটে চলে। কেউ বা ছুটে যায় নদী ও সমুদ্রের কাছে। তার ঢেউ, তার দিন-রাত্রের গর্জন, তার অনাদি-অনন্ত সৌন্দর্যের রূপবৈভব দেখতে দেখতে দিন চলে যায়। আবার কেউ বা যায় পাহাড়-পর্বতে। যেখানেও কত নয়ন-বিমোহন সৌন্দর্যের নানা উপচার। তখন মানুষ যা দেখে তাই তার কাছে সুন্দর হয়ে ওঠে। যা তুচ্ছ, তাও তখন অসামান্য ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়। কেউ-বা ভালোবাসে গভীর অরণ্য। কেউ মাছ ধরার নেশায় মাতে। কেউ-বা পাখি ধরে। কেউ-বা অবকাশ যাপন করে প্রিয় গান শুনে। কেউ-বা স্বপ্ন দেখে অরণ্যের নিভৃত নির্জনতায়, বনে ঝোপে নতুন নতুন ফুল ফোটাবার। বিভূতিভূষণের যুগলপ্রসাদের মতন এমন কত মানুষই তো প্রকৃতি-পাগল! কেউ-বা অবসর-মুহূর্তে শিকারের নেশায় ছুটে যায় গহন অরণ্যে। কেউ বেরিয়ে পড়ে নতুন নতুন অভিযানে। কারো কাছে ভ্রমণই অবসর-বিনোদনের একমাত্র সঙ্গী। কেউ ঘরে বসেই তাস দাবা খেলে। আড্ডা মেরে, ছবি তুলে অবসর যাপন করে। কোনো কোনো ক্রিকেট খেলোয়াড় অবকাশ কাটায় গল্ফ খেলে, কোনো কোনো ফুটবলার খেলে টেনিস। এমনি আরও কত খেয়াল-খুশির ভেতর দিয়ে অবসর জীবনকে রমণীয় করে তোলে।

প্রাচীন ও আধুনিক যুগে অবসর-বিনোদনে পার্থক্য : ইতিহাসের ধারা বয়েই চলে। যুগে যুগে কত পরিবর্তন-পরিমার্জন, কত পরিবর্জন-পরিগ্রহণ। প্রাচীনযুগের ধরন-ধারণেও এসেছে নানা পরিবর্তনের জোয়ার। অবসর-যাপনের কিছু কিছু নৃশংস পদ্ধতির হয়েছে চির নির্বাসন। একদা রাজা-বাদশারা বদ্ধ জায়গায় জীব-জন্তুর লড়াই দেখে আনন্দ পেতেন। অবসর-বিনোদনের এও ছিল এক বিশেষ পদ্ধতি। অনেক সময় আবার মানুষে-পশুতে লড়াইয়ের অনুষ্ঠান-আয়োজনে ফুটে উঠত অবসর-যাপনের নিষ্ঠুর মানসিকতা। হৃদয়হীন কিছু আমীর-ওমরাহ বা রাজা-বাদশার খেয়ালখুশি চরিতার্থ করবার জন্যে সেদিন কত হতভাগ্যই না প্রাণ দিয়েছে। ইতিহাসের সেই কলঙ্কিত, নিষ্ঠুর অমানুষিক অধ্যায় আজও বিভীষিকার বিষয়, আজও এক দুঃস্বপ্ন। বাঘে-মানুষে বা বাইসন-মানুষে লড়াইয়ের সেই বীভৎস দিন এ-যুগে দুঃস্বপ্নের মতই মিলিয়ে গেছে। বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের অবদান অবসর-বিনোদনেও ফেলেছে গভীর, দূরবিস্তৃত প্রভাব। রেডিও, টি.ভি., সিনেমা, রেকর্ড-প্লেয়ার, টেপ-রেকর্ডার, ভি.সি.পি. ইত্যাদিও অবসর-বিনোদনকে করেছে বিচিত্রমুখী। সচেতন পরহিতব্রতী মানুষ অবসর পেলেই তাকে কাজে লাগান মানব-হিতৈষণামূলক নানা কাজে। গ্রামে গ্রামে স্বক্ষরতা প্রসারে, স্বাস্থ্য-সচেতনতা বৃদ্ধিতে, পল্লী উন্নয়নে সময় দেওয়া অনেকেরই ব্রত। কেউ দুঃস্থ মানুষের সেবায় সাংগঠনিক কাজ করেন। কেউ নাগরিক অধিকার রক্ষা, বস্তি উন্নয়ন, স্বেচ্ছায় রক্ত দান, বৃক্ষরোপন, পরিবেশ সংরক্ষণ, অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ ইত্যাদি নানা সামাজিক সাংগঠনিক কাজে অবসরের মুহূর্তগুলো কাজে লাগান।

ছাত্রজীবনে অবকাশ : কখন ছুটির ঘণ্টা বাজবে? শিক্ষাক্রম আর রুটিনে বাঁধা-পড়া শিক্ষার্থীর জীননে ছুটির ঘণ্টা যেন মাতাল হাওয়ার মতো আনন্দের উল্লাসের। তত্ত্ব আর তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত মন হঠাৎ হয়ে যায় হালকা, ঝরঝরে। তখন মন ছুটে যায় তেপান্তরে, উধাও হয়ে যায় যেন কোন নিরুদ্দেশ যাত্রায়, উড়তে থাকে কল্পনার রাজ্যে। কোনো শিক্ষার্থী অবকাশ কাটাতে যায় কোনো নিসর্গশোভিত অবকাশ কেন্দ্রে, কেউ-বা ছুটে যায় গ্রামে। এই অবকাশের মধ্যেই কেউ-বা মেলে দেশব্রতী কাজে, পরিবেশ রক্ষায়, গ্রামোন্নয়নে, নিরক্ষরতা দূরীকরণে।

অবসরের প্রয়োজনীয়তা : অবসর-যাপনের প্রয়োজনীয়তা কথার কেউ অস্বীকার করতে পারে না। অবকাশই মানুষের মধ্যে নতুন কর্মপ্রেরণার সঞ্চার করে। প্রাত্যহিক কর্তব্য-কর্মের একঘেয়েমি থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়। মনে আনে নতুন উৎসাহ, উদ্দীপনা। একটানা কাজের মধ্যে মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে। কর্মের ছন্দ হয় শ্লথগতি, বৈচিত্র্যহীন। অবসর-বিনোদনে মানুষের গতানুগতিকতার অবসান হয়। মানুষ আবার নব উদ্যম-উদ্দীপনায় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। ‘মানুষের চিত্তের চারিদিকেও একটি বিশাল অবকাশের কায়ুমণ্ডল আছে। সেইখানেই তাহার নানা রঙের খেয়াল ভাসিতেছে; সেখানেই অনন্ত তাহার হাতে আলোকের রাখী বাঁধিতে আসে।’

স্বরণীয় মানুষের অবসর-বিনোদন পদ্ধতি : স্মরণীয় অনেকেরই অবসর-যাপন পদ্ধতি অদ্ভুত ও বিচিত্র। রবীন্দ্রনাথ অবসর সময়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন। বিদ্যাসাগরও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে আনন্দ পেতেন। আলবেয়ার কামু ফুটবল খেলতেন। ক্রাইম লেখন জাঁ ব্রুস গাড়ি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। এই প্রতিযোগিতাতেই তিনি প্রাণ হারান। ফুলের বাগান করা আগাথা ক্রিস্টির অবসর-বিনোদনের একটি বিশেষ ধরন। ফুটবল জর্জ বেস্ট অভিনয়ে অংশ নেন। বিজ্ঞানী নিউটন অবসর মুহূর্তে ধর্ম ও ইতিহাস চর্চা করতেন। আইনস্টাইন বেহালা বাজাতেন। জর্জ ওয়াশিংটন গাছ কেটে অবসর বিনোদন করতেন। সত্যেন বোসও বেহালা বাজাতেন, বেড়াল পুষতেন। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় পরলোক-চর্চা করতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি আঁকতেন। মাক্সিম গোর্কি অবসর সময়ে দাবা খেলতেন। দাবা খেলতেন রাষ্ট্রনায়ক হো-চি-মিনও। তল্‌স্তোয়ের ছিল অত্যধিক সঙ্গীত-প্রীতি।

উপসংহার : অবকাশের মধ্যে কোনো তাড়া থাকে না। সেখানে নেই কোন আজ্ঞা পালনের নির্দেশ। নেই একঘেয়েমির ক্লান্তি। থাকে শুধু নিজের খেয়াল-খুশিতে সেই অবসর মুহূর্তকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দেওয়ার বাসনা। সেখানে পাতা হয় সৌন্দর্য দেবতার আসন। মানুষ সেখানে নিজেকে উজাড় করে দেয়। এই বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই তার পূর্ণতা। তার মুক্তি। অবকাশ-যাপন মানবজীবনের এক মহৎ অভিজ্ঞতা। এক মহৎ প্রাপ্তি। অবকাশ তাই তার কাছে এক অনিবার্য সম্পদ। এক অভিলাষিত ঐশ্বর্য। নিরবিচ্ছিন্ন কাজও যেমন ক্লান্তিকর, একটানা অবসরও তেমনি বিরক্তিকর। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পাওয়া অবকাশেই আছে বেঁচে থাকার গভীর তাৎপর্য। আর তখনই কবি ডেভিসের মতো বলতে ইচ্ছে করে-
‘A poor life is this full of care if we have no time to stand and stare.’

1 comment:


Show Comments