বইয়ে খোঁজার সময় নাই
সব কিছু এখানেই পাই

রচনা : ইভটিজিং

বর্তমান সময়ে ইভটিজিং একটি ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা। ইভটিজিং-এর বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত আমাদের সমাজ। প্রতিদিনের খবরে কাগজ খুললেই ইভটিজিং-এর কারণে বর্বরতা, নির্মম প্রাণহানী ও আত্ম-হননের খবর দেখা যায়। বর্তমানে ইভটিজিং একটি বহুল আলোচিত শব্দ। বাইবেলের ভাষ্য অনুযায়ী ‘ইভ’ পৃথিবীর আদি মাতা, আমরা মুসলমানরা বলি হাওয়া, ইভ শব্দটি নারীর রূপক হিসেবে ব্যবহৃত। ‘টিজিং’ অর্থ উত্যক্ত বা জ্বালাতন করা। কোনো নারীকে উত্যক্ত করা অর্থে ‘Eve Teasing’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে উত্যক্তকারীদের জ্বালাতনে নারীদের জীবন অতিষ্ঠ। বিশিষ্টজনের মতে অশালীন চাহনির মাধ্যমে মেয়েকে উত্যক্ত করা, সিসি বাজানো, আচমকা হাত তালি দেয়া, অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে লাফিয়ে পড়া, অশালীন গান গেয়ে ওঠা, বাজে মন্তব্য করা, ক্যামেরা বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছবি তোলা বা ভিডিও করা, মোবাইল ফোনে মিস কল দেয়া বা ম্যাসেজ করা, ইভটিজিং-এর পর্যায়ে পড়ে। ইভটিজিং-এর কারণে প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। সভ্য সমাজে এটা কারও কাম্য হতে পারে না। তাই ইভটিজিং রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

সমাজ যখন নৈতিক দিক থেকে আদর্শহারা হয়ে পড়ে, তখন সে সমাজে নানা ধরনের অন্যায় মাথাচারা দিয়ে ওঠে। আজকে যারা ইভটিজিং-এ জড়িয়ে পড়ছে, তারা এ সমাজেরই সন্তান। তারা বখাটে ও কিশোর-যুবক। যাদের কাজ নেই অর্থাৎ কর্মহীন বেকার, বাংলাদেশের নারীর জীবন হাজারো সমস্যায় পীড়িত; এর মাঝে আবার শুরু হয়েছে বিড়ম্বনার আরেক উপদ্রব যার নাম- ইভটিজিং। কিছু মানুষের বিকৃত মানসিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের অভাব এর প্রধান কারণ। যেকোনো রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থার ভেতর বাস করা নারী কোনো বিছিন্ন মানুষ নয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন আমাদের সংবিধানের ২৭, ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবে। সংবিধানে নারীর সম্মান অবস্থানের কথা উল্লেখ থাকলেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা নারীর সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইভটিজিংয়ের ফলে মেয়েদের অধিকার স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাদের প্রাপ্য অধিকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। ফলে শিক্ষা ও জীবন বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্য অপমানিত হয়ে আত্মসম্মানবোধ হারিয়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহনিতা থেকে সঙ্কট মানসিক চাপ সহ্য না করতে পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের বিধি-নিষেধের বেড়াজালে বন্দি করে রাখা হচ্ছে। তা ছাড়া ছেলে-মেয়ের বৈষম্যের ফলে বয়ঃসন্ধিকালীন কৌতূহলের কারণে ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ ঘটছে। অভিভাবকরা নিরাপত্তার অভাবে মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে বলা হয়েছে, ২৯৪ এবং ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ সালের ধারা ৭৬ দণ্ডবিধি ৫০৯ ধারা মোতাবেক কেউ যদি কোনো নারীর শালীনতার অমর্যাদা করার জন্য কোনো মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি বা কোনো বস্তু প্রদর্শন করে, তাহলে ঐ ব্যক্তি ১ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এ ছাড়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১-এর সংশোধনী আনতে হচ্ছে। তাতে মোবাইল বা অন্যকোনো টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি বা বেতান যন্ত্রপাতির সাহায্যে কোনো মেয়ের অশ্লীল ছবি, গুরুতর অপমানজনক, অশোভন মন্তব্য, হুমকি ভীতি প্রদর্শন করলে অনধিক ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ইভটিজিংয়ের ফলে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে পরিবারে, সমাজে নিরাপত্তাহীনতা ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্রী সিমি বানু আত্মহত্যার আগে চিরকুটে ৫ জন বখাটের নাম লিখে বলেছিলেন- ওদের অপমান একজন মেয়েকে রাস্তায় ফেলে রেপ করার চেয়েও নির্মম; তার চিরকুটের লেখা থেকে এই অনুভব করা যায় ইভটিজিং-এর প্রভাব আমাদের সমাজে কত ভয়াবহ। যৌন হয়রানিমূলক ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে এ পর্যন্ত কতজন মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তার হিসাব নেই। ন্যাশনাল উইম্যান ল’ইয়ার অ্যাসোসিয়েশন-এর এক সাম্প্রতিক তথ্যে দেখানো হয়েছে- বর্তমানে দেশে ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৯০% নারী ঘরে এবং ঘরের বাইরে ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন।

নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই ইভটিজিং-এর উৎস, ইভটিজিং প্রতিরোধে প্রতিটি কিশোরী, যুবতী ও তরুণদের মাঝে আত্মসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। নারীদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টি সুপ্রসারিত করতে হবে। পরিবার প্রথম ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ শুরু করতে পারে। ইভটিজিংয়ের ঘটনার জন্য মেয়েকে দায়ী না করে বরং মানবিক সমর্থন দিতে হবে যাতে সে বিপর্যস্ত না হয়ে পড়ে; ইভটিজিং প্রতিরোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, আত্মকর্মসংস্থান, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং স্কুল-কলেজে ছাত্রদের ঝড়ে পড়ার হার কমানোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তা ছাড়া নিরাপত্তা রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে।

ইভটিজিং একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কেউ যাতে এ ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে থাকার সাহস না পয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নারীকে দক্ষ ও যোগ্য মানব-সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের অবশ্যই নীরবতা ভেঙে রাস্তাঘাটে উত্যক্ত ও হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যৌবনের উদ্দীপনা, সাহসিকতা, দুর্বার গতি, নতুন জীবন রচনার স্বপ্ন এবং কল্যাণকর হোক, পথভ্রষ্ট যুবকেরা আলোর পথে ফিরে আসুক, সমাজ থেকে শুরু হোক ইভটিজিংয়ের কালো ছায়া। তরুণ্যের শক্তির জয় হোক, এটই আমাদের প্রত্যাশা।

1 comment:


Show Comments