ভাবসম্প্রসারণ : অর্থ সম্পদের বিনাশ আছে, কিন্তু জ্ঞান সম্পদ কখনও বিনষ্ট হয় না

অর্থ সম্পদের বিনাশ আছে, কিন্তু জ্ঞান সম্পদ কখনও বিনষ্ট হয় না

মূলভাব : অর্থ-সম্পদ বস্তগত। নানা কারণেই এর ক্ষয় আছে, ধ্বংস আছে। কিন্তু জ্ঞান সম্পদ চিরন্তন। এর কোনো ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই।

সম্প্রসারিত ভাব : দৈনন্দিন জীবনে অর্থ-সম্পদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্যে অর্থ-সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো মুহুর্তে, যে কোনো কাজে টাকা-পয়সা ছাড়া চলে না। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নানা উপকরণের দরকার হয়। এসব কেনার জন্যে প্রয়োজন অর্থ-সম্পদ। আবার কঠিন রোগে-শোকে, তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে এসব সম্পদ বিক্রি করার প্রয়োজন হয়। অর্থ-সম্পদের নগদ মূল্য থাকলেও এর ক্ষয় ও বিনাশ আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, অপচয়, অপব্যয়ে, চুরি-ডাকাতির ফলে এসব নষ্ট হয়- হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে সম্পদশালী ব্যক্তিও মুহুর্তে নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে।

সম্পদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো জ্ঞান। কিন্তু অর্থ সম্পদের তুলনায় এর গুরুত্ব বেশি। এর বৃদ্ধি আছে, কিন্তু ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই, বিনাশ নেই। জ্ঞান সম্পদ অব্যয়-অক্ষয়। চর্চা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ও উৎকর্ষ ঘটে। জ্ঞান মানুষের মনকে আলোকিত করে তাকে সচেতন করে তোলে। ফলে তার বিবেক-বুদ্ধি জাগ্রত হয়। মনুষ্যত্বের বিকাশের ফলে তার আদর্শ ও মূল্যবোধ সুদৃঢ় হয়। আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও আবিষ্কার জ্ঞানের সঞ্চরণ ও প্রভাবেরই নামান্তর। অন্যকে বিতরণ করলেও জ্ঞানের সঞ্চয় নিঃশেষ হয় না। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জ্ঞান ধ্বংস হয় না।

পৃথিবীতে যারা জ্ঞানের ধারক ও বাহক তারাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্মরণীয় হয়ে আছেন। মানুষের হৃদয় ও ইতিহাসের পাতায় তাঁদের জ্ঞানের প্রতিফলন অমর হয়ে আছে। তাঁদের আদর্শ অনুকরণ ও অনুসরণ করে অন্যরাও জ্ঞানী হয়ে ওঠে- প্রসংসা ও খ্যাতির অধিকারী হয়। জ্ঞানীদের তৎপরতায়ই মানবসভ্যতা আজকের এ পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছে। মহাকাল তাঁদের কীর্তিকেই সানন্দে ধারণ করে। অন্যদিকে অর্থ-সম্পদকে মহাকাল জ্ঞানের মতো মূল্য দেয় না। কেননা তা ক্ষণস্থায়ী।

মন্তব্য : অর্থ-সম্পদের জন্যে অধীর না হয়ে জ্ঞান সম্পদের প্রতি সকলের আগ্রহ হওয়া উচিত। কেননা জ্ঞান চিরন্তন, চিরস্থায়ী ও অবিনাশী।


এই ভাবসম্প্রসারণটি অন্য বই থেকেও সংগ্রহ করে দেয়া হলো


মূলভাব : ক্ষণস্থায়ী এ জগতের কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। যার সৃষ্টি আছে তার ধ্বংস অনিবার্য। কিন্তু বিদ্যা এ নশ্বর জগতের এমন এক সম্পদ যা চিরন্তন এবং অবিনশ্বর। এটি ক্ষয়হীন, ধ্বংসহীন এক অমূল্য সম্পদ।

সম্প্রসারিত ভাব : পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য ধনসম্পদের প্রয়োজন রয়েছে এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু অর্থ-সম্পদ আহরণ করার আকাঙ্ক্ষা যদি কোনো ব্যক্তির মনে প্রবল আকার ধারণ করে তখন তার থেকে লালসা জন্ম নেয়। অর্থ-সম্পদের প্রতি মানুষের লালসা জন্ম নিলে উত্তরোত্তর তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। লালসা চরম আকার ধারণ করলে অর্থ-সম্পদ সংগ্রহই মানুষের প্রধান কর্ম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এ অর্থ-সম্পদের বিনাশ বা ক্ষয় আছে। বাস্তবে দেখা যায়, বিত্তবান ব্যক্তি স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই বিত্তবান হয়ে পড়ে এবং এর উল্টোও দেখা যায়। এতেই প্রমাণিত হয়, অর্থ-সম্পদের বিনাশ বা ক্ষয় আছে। এ ধন-সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকলে সে রাজা-বাদশাহ সদৃশ। আবার এসব হাতছাড়া হলে সে রাস্তার লোকে পরিণত হয়। আমরা জানি, এ ইহলৌকিক বস্তুগত সম্পদ ছাড়াও আরো একটা বিশাল সম্পদ রয়েছে, সেটি হলো জ্ঞান সম্পদ। অর্থ সম্পদের ক্ষয় থাকলেও এ সম্পদের কোনো ক্ষয় বা বিনাশ নেই। বিদ্যা বা জ্ঞানের সমতুল্য কোনো সম্পদ এ পৃথিবীতে নেই। এজন্য বিদ্যাকে অমূল্য রত্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ অমূল্য রত্ন সদৃশ্য সম্পদটির কোনো ক্ষয় নেই। জীবন যত দিনের ততদিন এ অমূল্য সম্পদটি ছায়ার মতো আমাদের অনুসরণ করে সব বাঁধা-বিপত্তি দূর করে দেয়। এর ফলে আমাদের জীবন সহজ-সরল এবং জগতের সংখ্যাতীত নক্ষত্র মধ্যস্থিত সমুজ্জ্বল পূর্ণচন্দ্র স্বরূপ হয়ে ওঠে। জ্ঞান-সম্পদ পশুতুল্য মানুষকে সত্যিকার মানুষরূপে গড়ে তোলে। জ্ঞানের লালসা থেকে মানুষ দেবতায় উন্নীত হয়। অপরপক্ষে, ধন-সম্পদ অর্থাৎ অর্থ-সম্পদের নেশা মানুষকে পশু-সদৃশ অমানুষে পরিণত করে। এ ধন-সম্পদ ক্রমাগত ব্যয় করলে এক সময় তা শেষ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, জ্ঞান-সম্পদ ব্যয় করলে তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। সুতরাং জ্ঞান-সম্পদের মতো অক্ষয়, অব্যয়, অমূল্য সম্পদের সমতুল্য সম্পদ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। পানি দ্বারা নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা অগ্নিতে পুড়ে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি চোর-ডাকাত, ছিনতাইকারীর ভয়ও নেই। বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি মৃত্যুর পরেই সবার মন থেকে বিস্মৃত হয়। অপরদিকে জ্ঞান-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি চিরকাল মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে। এসব জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির মৃত্যু বাসস্থান স্থানান্তরের মতো অপরদিকে ধন-সম্পদের অধিকারী পশুসদৃশ মানুষটির মৃত্যু মানে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। কিন্তু জ্ঞান সম্পদ আহরণকারী ব্যক্তি তাঁদের অর্জিত ধন-সম্পদের বিনিময়ে আজও আমাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ধন-সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিকে সম্মান সর্বযুগে, সর্বদেশে স্বীকৃত। জ্ঞানের যেমন ক্ষয় নেই তেমনি ক্ষয় নেই জ্ঞান আহরণকারী ব্যক্তির।

অর্থ-সম্পদ আজ আছে কাল নেই। কিন্তু বিদ্যা অমূল্য সম্পদরূপে যুগের পর যুগ টিকে থাকে। এর ক্ষয় এবং বিনাশ নেই।

2 Comments

Post a Comment
Previous Post Next Post