১৯৫২ থেকে ১৯৭১: স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদান
| Article Stats | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 748 words | 5 mins to read |
Total View 47 |
|
Last Updated 25-Mar-2026 | 12:09 PM |
Today View 0 |
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও, পূর্ব বাংলার মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই বাঙালিদের ওপর শাসন, শোষণ ও বৈষম্যের স্টিম রোলার চালাতে থাকে। তবে বাঙালি জাতি কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। দীর্ঘ ২৪ বছরের বহু ত্যাগ, রক্ত ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালে আমরা ছিনিয়ে আনি চূড়ান্ত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল ৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এক মহাকাব্যিক লড়াই।
৫২'র ভাষা আন্দোলন: আত্মত্যাগের প্রথম প্রহর
২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: আমতলায় ঐতিহাসিক ছাত্রসভা
স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভভরে ঘোষণা করেন, "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।" এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। আন্দোলন দমাতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি অকুতোভয় ছাত্র-জনতা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শহীদ হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। তাদের এই রক্ত বৃথা যায়নি; অবশেষে ১৯৫৪ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।
৬৬'র ঐতিহাসিক ছয় দফা: বাঙালির মুক্তির সনদ
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ৬ দফা পেশ করছেন বঙ্গবন্ধু
বাঙালি জাতির শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটাতে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান পেশ করেন ঐতিহাসিক 'ছয় দফা' দাবি, যা বাঙালির "ম্যাগনাকার্টা" বা মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত। এই দাবিগুলো পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা তুলে ধরে। এতে ভীত হয়ে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে বারবার কারারুদ্ধ করে এবং তাকে প্রধান আসামি করে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রদ্রোহী 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করে।
৬৯'র গণঅভ্যুত্থান: স্বৈরশাসনের পতন
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি পেশ করে। অচিরেই এই ছাত্র আন্দোলন এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর গুলি, কারফিউ এবং ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে লাখো জনতা রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলনের তীব্রতায় টিকতে না পেরে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বাধ্য হয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন।
৭০-এর সাধারণ নির্বাচন: ব্যালট বিপ্লব
১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে। এটি ছিল মূলত ছয় দফার পক্ষে বাঙালির নিরঙ্কুশ রায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে।
৭১'র মুক্তিযুদ্ধ: চূড়ান্ত বিজয়
ক্ষমতা না দিয়ে ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ "অপারেশন সার্চলাইট" শুরু করে। গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে এম.এ. হান্নান এবং পরবর্তীতে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সেই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
স্বাধীন বাংলার রূপকার: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা—শব্দ দুটি যেন একে অপরের পরিপূরক। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর অবিসংবাদিত নেতৃত্ব ছাড়া এই স্বাধীনতা অর্জন প্রায় অসম্ভব ছিল। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে তাঁর প্রধান অবদানগুলো হলো:
- ১. ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা: জেলে বন্দি থাকা অবস্থাতেও বঙ্গবন্ধু চিরকুটের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।
- ২. স্বায়ত্তশাসনের দাবি: ১৯৫৫ সালের ৫ই জুন পল্টন ময়দানের জনসভায় তিনি ২১ দফা দাবি পেশ করেন, যার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন।
- ৩. সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে তিনি তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন, যার ফলে তাকে জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কারাগারে কাটাতে হয়।
- ৪. ছয় দফা পেশ: ১৯৬৬ সালে পেশ করা ছয় দফা দাবি ছিল মূলত বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের প্রথম সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, যা তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়।
- ৫. 'বাংলাদেশ' নামকরণ: ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীর জনসভায় শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের নাম রাখেন "বাংলাদেশ"।
- ৬. ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"—বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল।
- ৭. স্বাধীনতার ঘোষণা: ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তাঁর দেয়া স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সূচনা।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একজন নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক, মুক্তির দিশারি। একটি স্বাধীন দেশ, একটি নির্দিষ্ট মানচিত্র এবং একটি লাল-সবুজ পতাকা—এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে তাঁর আজীবনের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে।
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (0)