বাংলাদেশ নামের ইতিহাস
| History | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Published 06-Dec-2025 | 11:23 PM |
Total View 52 |
|
Last Updated 11-Dec-2025 | 10:59 AM |
Today View 0 |
'বাংলাদেশ’ শব্দটি এসেছে মূলত বঙ্গ বা বঙ্গাল থেকে। প্রাচীনকালে ‘বঙ্গ’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি মৌর্য, গুপ্ত ও পাল সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। মধ্যযুগে, বিশেষ করে সুলতানি আমলে ‘বাংলা’ শব্দটি পুরো অঞ্চলের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। মুঘল আমলে ‘সুবা বাংলা’ নামে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল। কিন্তু বঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গ, পূর্ব বাংলা এবং তারপর কীভাবে বাংলাদেশ হলো তা নিয়ে এ আলোচনা-
উপত্তি : আর্যরা ‘বঙ্গ’ বলে এই অঞ্চলকে অভিহিত করতো। সংস্কৃত ‘বঙ্গ’ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত আলি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘বাঙ্গালী’ শব্দটির জন্ম। তবে বঙ্গে বসবাসকারী মুসলমানরা এই ‘বঙ্গ’ শব্দটির সঙ্গে ফার্সি ‘আল’ প্রত্যয় যোগ করে। তা থেকেই ‘বাঙ্গাল’ বা ‘বাঙ্গালা’ শব্দের আবির্ভাব। ‘আল’ বলতে জমির বিভক্তি বা নদীর ওপর বাঁধ দেওয়াকে বোঝায়। তবে বাংলা, বাঙাল ও দেশ- এই তিনটি শব্দই ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। বঙ্গদেশকে পর্তুগিজরা বলত ‘বেঙ্গলা’। ইংরেজরা বলত ‘বেঙ্গল’।
বঙ্গ নামের উৎস : বঙ্গ, বাংলার একটি সুপ্রাচীন মানব-বসতির স্থান বা জনপদ, যা চৌদ্দ শতকে মুসলমান শাসনামলে পরিবর্তিত রূপ বাঙ্গালাহ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
- ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম মগধের সাথে বঙ্গ নামক একটি জনগোষ্ঠীর কথা উল্লিখিত হয়।
- বৌধায়ন ধর্মসূত্রে একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে।
- রামায়ণে অযোধ্যার সাথে বঙ্গের মৈত্রীবন্ধনের কথার উল্লেখ রয়েছে।
- মহাভারত মহাকাব্যটির একটি অধ্যায় থেকে জানা যায়, বঙ্গদের রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।
- চৈনিক গ্রন্থ Wei-Lueh-তে বঙ্গ (Pan-yueh)-কে Han-yueh (Xan-gywat) বা গঙ্গার একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে একটি সর্বপ্রাচীন ভৌগোলিক ইউনিট হিসেবে।
- কালিদাসের রঘুবংশে বঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
- শক্তিসঙ্গমতন্ত্র-এর সৎপঞ্চাশোদ্দেশ বিভাগে বলা হয়েছে যে, সমুদ্র থেকে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত বঙ্গের বিস্তৃতি ছিল। এর মাধ্যমেই সম্ভবত বঙ্গের উত্তর ও পূর্বদিকের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছিল।
- সেন যুগের লিপি সাক্ষ্যে বঙ্গের ‘বিক্রমপুরভাগ’ ও ‘নাব্যভাগ’-এর উল্লেখ রয়েছে।
- বৈদ্যদেবের কমৌলি তাম্রশাসনে ‘অনুত্তর বঙ্গ’ অথবা দক্ষিণ বঙ্গের উল্লেখ আছে।
- বিশ্বরূপ সেনের সাহিত্য পরিষদ তাম্রশাসনে বঙ্গের নাব্য এলাকার রামসিদ্ধি পাটক-এর ‘বঙ্গাল-বড়াভূ’-এর কথা বলা হয়েছে।
- চন্দ্র তাম্রশাসনে উল্লিখিত চন্দ্রদ্বীপও একই এলাকা নির্দেশ করে এবং এটিও বঙ্গেরই একটি অংশ ছিল।
- ষোলো শতকের দিগ্বিজয় প্রকাশ-এ ‘উপবঙ্গ’-কে যশোর ও তৎসংলগ্ন বনাঞ্চলের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। খুব সম্ভবত এটি ছিল সুন্দরবনের অংশ। বঙ্গের দক্ষিণ অংশের সমুদ্র তীরবর্তী অংশটি ছিল বঙ্গাল, ইতিহাসের কোন এক সময়ে যার ছিল পৃথক ভৌগোলিক অস্তিত্ব।
উপর্যুক্ত তথ্যসূত্রগুলো থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, অন্যান্য এলাকার মতো বঙ্গ নামটিও জাতিগতভাবে উদ্ভূত।
ভৌগোলিক নাম
বাঙ্গালাহ | বেঙ্গালাহ | বাঙালা | বেঙ্গল | বঙ্গ | বাংলা
ভাষাগত নাম
বাংলাদেশ | বঙ্গদেশ | বঙ্গভূমি | বঙ্গরাজ্য | বঙ্গরাষ্ট্র | অসমবঙ্গ
রাজনৈতিক নাম
পূর্ববঙ্গ | পশ্চিমবঙ্গ | শাহীবাংলা | বিশাল বাঙ্গালা | ঈশানবাংলা | ঈশানবঙ্গ | বৃহত্তর বাংলাদেশ | মহাবাঙালা | মহাবঙ্গ | অবিভক্তবঙ্গ
ভৌগোলিক প্রভেদ
উত্তরবঙ্গ | দক্ষিণবঙ্গ | পূর্ববঙ্গ | পশ্চিমবঙ্গ | ঈশানবঙ্গ
ঐতিহাসিক নাম
বঙ্গা | বাং | বঙ্গ | বঙ্গদেশম | গৌড় | বাঙ্গালা | শাহী বাঙ্গালা | সুবাহ-ই-বাঙ্গালা | বেঙ্গালা | বেঙ্গালেন | বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি
বঙ্গের ডাকনাম
সোনার বাংলা | রূপসী বাংলা | শ্যামল বাংলা | বাংলা মা | বঙ্গমাতা | এপার বাংলা | ওপার বাংলা | পদ্মাপাড় | নদীমাতৃক দেশ | গঙ্গাপাড় | হাজার নদীর দেশ | শাহী বাংলা
অন্যান্য নাম
গঙ্গাহৃদ | গঙ্গাঋদ্ধি | গঙ্গারাষ্ট্র | গৌড় রাজ্য
বঙ্গ থেকে বাংলাদেশ : প্রাচীনকালে কখনো বঙ্গ, কখনো গৌড় নামে বাংলা পরিচিতি লাভ করে। মধ্যযুগে, ‘বাংলা’ শব্দটি পুরো অঞ্চলের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। মুঘল আমলে ‘সুবা বাংলা’ নামে একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ছিল। খ্রিস্টীয় চৌদ্দ শতকে সমগ্র বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বাংলা) ‘বাঙ্গালাহ’ নামে পরিচিত হয়।
১৩৩৬-১৫৭৬ সাল পর্যন্ত সুলতানি আমলে এবং ১৫৭৬ সালে মুঘলরা বাংলা দখল করার পরে এই অঞ্চলটি ‘বঙ্গাল’ বা বাঙালাহ নামে পরিচিতি পায়। শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাও বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসামের মতো কয়েকটি প্রেসিডেন্সি নিয়ে নাম দেন ‘বঙ্গ’, যা ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায় এবং ১৭৫৭ সালে তা সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলের নাম হয় ‘বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি’। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় গোটা বাংলায় একটা প্রশাসনিক বিভাজন হয়। বাংলার পশ্চিম অংশ হয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব অংশ হয়ে যায় পূর্ব বাংলা। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের মধ্যে, আর পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে পড়ে। সে সময় পাকিস্তানিরা পূর্ব বাংলার নাম দিতে চাইলো পূর্ব পাকিস্তান। ১৪ অক্টোবর ১৯৫৫ ‘পূর্ব বাংলা’ নামটি পরিবর্তন করে সরকারিভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়।
তবে ১৯৬৫ সাল থেকে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম এই ভূখণ্ডের নামকরণ বাংলাদেশ করার দাবি উঠতে শুরু করে। এরপর ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের স্লোগানে বাংলাদেশ নামটি আসে। একই বছরের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে এ দেশের নাম বাংলাদেশ করার প্রস্তাব রাখেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও বলা হয় এই দেশটির নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের পর এই দেশটির সাংবিধানিক নাম রাখা হয় ‘বাংলাদেশ’ যা কার্যকর হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২।
বাংলাদেশ শব্দের প্রথম ব্যবহার : ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়। একটি মত হলো বাংলাদেশ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়। তার বিখ্যাত দেশপ্রেমমূলক গান ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’ লেখা হয়। ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক কুমুদীন্দ্রনাথ মজুমদারের ‘বাংলাদেশের কথা’ নামে বইতে প্রথম বাংলাদেশ শব্দটি ব্যবহার করা হয় বলেও কেউ কেউ মনে করেন। কিন্তু এর সঠিক প্রকাশ সাল নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।
সাহিত্যে বাংলাদেশ : অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত কোনো হিন্দু কবি তাদের লেখায় ‘বাংলা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। গৌড়বঙ্গ হিসেবেই তারা ভৈাগোলিকভাবে চিহ্নিতকরণ করতেন। বঙ্গ সাহিত্যের আদি কবি কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর ‘রামায়ণ পাঁচালী’তে ‘বঙ্গ’ শব্দটিকেই ব্যবহার করেছেন। বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্য মঙ্গল’ এবং ‘চৈতন্যভাগবতে’ এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডটিকে ‘গৌড়’ নামেই চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধারাটা চলে এসেছিল রাজা রামমোহন রায়ের সময় পর্যন্ত। ১৯ শতকে তিনি যে ব্যাকরণ গ্রন্থটি লেখেন, তার নাম দেন ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘গৌড়’ নামটির প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বল ছিলেন বলেই বোধ হয় তাকে লিখতে হয়েছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কিংবদন্তি তুল্য পংক্তিটিও এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে- ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ।’
| শব্দ | যেখানে ব্যবহার | রচয়িতা | প্রকাশ |
|---|---|---|---|
| বঙ্গ | ‘মানসোল্লাস’ নামের সংস্কৃত গ্রন্থে | রাজা তৃতীয় সোমেশ্বর | ১১২৯ |
| বাংলা | ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে | আবুল ফজল | ১৫৯০ |
| বঙ্গদেশ | ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৮৭২ |
| সোনার বাংলা | ‘বাউল’ নামক গ্রন্থের গান | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯০৫ |
| জয় বাংলা | ‘ভাঙার গান’ কাব্যগন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ শিরোনামের কবিতায় | কাজী নজরুল ইসলাম | ১৯২২ |
| বাঙলাদেশ | গীতিগ্রন্থ ‘বনগীতি’তে স্বদেশি গানে | কাজী নজরুল ইসলাম | ১৯৩২ |
| বাংলাদেশ | ‘বৃহৎবঙ্গ’ গ্রন্থে | দীনেশচন্দ্র সেন | ১৯৩৫ |
| জয় বাংলা | ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে | কাজী নজরুল ইসলাম | ১৯৪২ |
| বাংলাদেশ | ‘পূর্বাভাস’ কাব্যগ্রন্থের ‘দুর্মর’ শিরোনামের কবিতাতে* | সুকান্ত ভট্টাচার্য | ১৯৫০ |
| রূপসী বাংলা | ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থে | জীবনানন্দ দাশ | ১৯৫৭ |
* এই গ্রন্থের কবিতাগুলো সুকান্ত লেখেন ১৯৩৭ সালের দিকে।
১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা একটি চিঠিতে জীবনানন্দ দাশ ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। রবীন্দ্রনাথের প্রসংসা করে তিনি লিখেছেন : ‘আজকালকার বাংলাদেশের নবীন লেখকদের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য এই যে, তাদের মাথার ওপরে স্পষ্ট সূর্যালোকের মতো আধুনিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষীকে তারা পয়েছে।
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (0)