ভাবসম্প্রসারণ : পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়া হিংসায় / পিপীলিকা বিধাতার কাছে পাখা চায়, / বিধাতা দিলেন পাখা, দেখো তার ফল, / আগুনে পুড়িয়া মরে পিপীলিকার দল।
| Article Stats | 💤 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 724 words | 5 mins to read |
Total View 3.9K |
|
Last Updated 09-May-2026 | 10:55 AM |
Today View 1 |
পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়া হিংসায়
পিপীলিকা বিধাতার কাছে পাখা চায়,
বিধাতা দিলেন পাখা, দেখো তার ফল,
আগুনে পুড়িয়া মরে পিপীলিকার দল।
মূলভাব : বাংলায় অতি প্রচলিত প্রবাদ, ‘পিপীলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে’। এ সংসারে নিজের যা আছে তা নিয়েই সবার সন্তুষ্ট থাকা উচিত। কারণ স্রষ্টা যখন সৃষ্টি করেছেন তখন তিনি সমস্ত কিছুই নিজের ইচ্ছেমতো দিয়েই সৃষ্টি করেছেন।
সম্প্রসারিত ভাব : তিনি পাখির ডানা সৃষ্টি করেছেন উড়বার জন্য। পাখি এ ডানায় ভর করে নীলাকাশে উড়তে পারে। এ পাখিদেরকে আকাশে উড়তে দেখে পিপীলিকা ঈর্ষাকাতর হয়ে ঈশ্বরের কাছ থেকে উড়ার জন্য পাখা চেয়ে বসল। এর ফল হল মারাত্মক। কারণ পিঁপড়ের পাখা হওয়ার পর সে উড়ে আগুনে পুড়ে মরতে লাগল। পাখাই হল তাদের সর্বনাশের কারণ। কিন্তু তারা যদি তাদের আগের অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকত তাহলে আগুনে পুড়ে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে হতো না। অতিরিক্ত কোন কিছুই আশা করা ভালো নয়। বেশি বড় বাড়লে গাছ ঝড়ে ভেঙে পড়ে, অতি ছোট হলে ছাগলে মুড়ে খায়। অতি দর্পে জগতের বড় বড় ক্ষমতাশালী রাজাধিরাজ যে কি রকম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল তার খবর আমাদের সকলেরই জানা আছে। তাই প্রত্যেক মানুষেরই নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকা উচিত। মনুষ্যত্বের বৃহৎ পরীক্ষায় ঈর্ষাকাতর হয়ে পরের অনুকরণ করলে বিপদ বাড়ে। দেশীয় ঐতিহ্যবিভিক্ত অক্ষম পরাণুকরণ কোনদিনই আমাদের সম্মানীয় আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে না।
তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত, নিজের যা আছে তা নিয়ে সুখে থাকা। এবং অন্যকে অনুকরণ না করা।
এই ভাবসম্প্রসারণটি আবার সংগ্রহ করে দেওয়া হলো
মূলভাব : বাংলায় বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ হলো— “পিপীলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে”। এই প্রবাদে বোঝানো হয়েছে, অযথা লোভ, ঈর্ষা এবং নিজের সীমা ভুলে অন্যের অনুকরণ করতে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিই হয়। স্রষ্টা প্রত্যেক জীবকে তার স্বভাব, প্রয়োজন ও ক্ষমতা অনুযায়ী গড়ে তুলেছেন। তাই নিজের সামর্থ্য ও অবস্থার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকাই কল্যাণের পথ।
সম্প্রসারিত ভাব : প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের স্বাভাবিক ভারসাম্য। পাখিকে ডানা দেওয়া হয়েছে আকাশে উড়ে বেড়ানোর জন্য, মাছকে দেওয়া হয়েছে পানিতে সাঁতার কাটার ক্ষমতা, আর পিপীলিকাকে দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র দেহ, পরিশ্রম ও দলবদ্ধভাবে কাজ করার শক্তি। প্রত্যেকের গঠন, ক্ষমতা ও কাজ আলাদা। এই ভিন্নতার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও সুশৃঙ্খলতা।
একদিন পিপীলিকা আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিদের দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠল। সে ভাবল, পাখিরা কত স্বাধীনভাবে আকাশে ঘুরে বেড়ায়, অথচ তাকে সারাক্ষণ মাটিতেই চলতে হয়। ঈর্ষার বশে সে বিধাতার কাছে পাখা প্রার্থনা করল। বিধাতা তার ইচ্ছা পূরণ করলেন। কিন্তু যে শক্তি বা সামর্থ্য তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ছিল না, তা-ই তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াল। পাখা পাওয়ার পর পিপীলিকা উড়ে আগুনের দিকে ছুটে গেল এবং আগুনে পুড়ে মারা পড়ল। যে বস্তু তাকে আনন্দ দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই তার ধ্বংস ডেকে আনল।
এই ঘটনাটি মানুষের জীবনেও গভীর সত্য প্রকাশ করে। অনেক সময় মানুষ নিজের যা আছে তাতে সন্তুষ্ট না থেকে অন্যের জীবন, সম্পদ, ক্ষমতা বা মর্যাদা দেখে হিংসা করে। সে ভাবে, অন্যের মতো হতে পারলেই বুঝি সুখী হওয়া যাবে। কিন্তু অন্ধ অনুকরণ অনেক সময় মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ সবার যোগ্যতা, সামর্থ্য, পরিবেশ ও দায়িত্ব এক নয়। অন্যের জন্য যা উপযোগী, তা নিজের জন্যও উপযোগী হবে— এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আমাদের সমাজে এর বহু উদাহরণ দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থী নিজের আগ্রহ ও যোগ্যতা না বুঝে বন্ধুর অনুকরণে কোনো বিষয় বেছে নেয়। পরে সে সেই বিষয়ে সফল হতে পারে না। আবার অনেক মানুষ সামর্থ্যের বাইরে বিলাসী জীবনযাপন করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ দ্রুত ধনী হওয়ার লোভে অসৎ পথে পা বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত সম্মান, সম্পদ ও শান্তি— সবই হারায়। অর্থাৎ অযথা উচ্চাশা ও পরের অনুকরণ জীবনে অকল্যাণ ডেকে আনে।
বাংলা সাহিত্যে ও প্রবাদে এ শিক্ষার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বলা হয়— “অতি লোভে তাতি নষ্ট”। আবার গাছ যদি অতি উঁচু হয়ে যায়, ঝড়ে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে অহংকার, ঈর্ষা ও সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা মানুষের পতনের কারণ হতে পারে। ইতিহাসেও দেখা যায়, অতি ক্ষমতার অহংকারে বহু রাজা-বাদশাহ ধ্বংস হয়েছে। তাই জীবনের প্রকৃত জ্ঞান হলো নিজের সীমা জানা এবং সেই সীমার মধ্যেই উন্নতির পথ খোঁজা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের উন্নতির আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। উন্নতির ইচ্ছা অবশ্যই থাকা উচিত, কিন্তু তা হতে হবে বিবেচনাপূর্ণ, পরিশ্রমনির্ভর ও বাস্তবসম্মত। নিজের সামর্থ্য, যোগ্যতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়াই সত্যিকার উন্নতি। ঈর্ষা নয়, বরং অন্যের সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অতএব, পিপীলিকার পাখা চাওয়ার কাহিনি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অন্যের অনুকরণে অযথা লোভ করা উচিত নয়। নিজের সামর্থ্য, স্বভাব ও অবস্থাকে বুঝে চলাই জীবনের কল্যাণের পথ। সন্তুষ্টি, আত্মজ্ঞান ও সংযম মানুষকে নিরাপদ ও সফল জীবনের দিকে নিয়ে যায়।
সিদ্ধান্ত : অন্যের প্রতি হিংসা করে অন্ধ অনুকরণ করলে জীবনে বিপদ ও ক্ষতি ডেকে আসে। তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের অবস্থায় সন্তুষ্ট থেকে পরিশ্রম, সততা ও বিবেচনার মাধ্যমে উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়া।
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (1)
মানুষের চাহিদা আকাশের সমান